প্রকাশনা উৎসবে পঠিত প্রবন্ধ | ড. রেনু লুৎফা | কবি নজরুল সেন্টার | লন্ডন, যুক্তরাজ্য

উপস্থিত সাহিত্যপ্রেমী বন্ধুরা আমার-

মনজুরুল আজিম পলাশকে তার চমৎকার বক্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

সেই ধন্যবাদ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে অবশ্য আজকের এই অনুষ্টানের মূল মধ্য পুরুষ কবি ওয়ালি মাহমুদ। ওয়ালি মাহমুদ তার কবিতার মাধ্যমেই আমার কাছে প্রথম ধরা পড়েন। এখনকার বাংলা পত্রিকার সাহিত্য পাতাগুলোর মাধ্যমেই কিছু কিছু কবিতা পড়তে গিয়ে হঠাৎ করে থমকে যাওয়ার সুযোগ হয়। কবিতাটি বার বার পড়তে ইচ্ছে হয়। মাঝে মাঝে কবিতার মোড় ও মনন নিয়ে ভাবতে শেখায়। ব্রিটেনের বাংলা সাহিত্য নিয়ে অনেকেই নাক সিঁটকান। এরা ছড়া, কবিতা, গল্প কিছুই লিখতে পারেন না বলে মাঝে মাঝে হুংকার শুনি। অনেকেই মনে করেন এরা লিখার চেষ্টা করেন তবে তাদের শব্দ ও ভাষা ব্যবহারে দীনতা বেশী। এই কথাগুলো কারা বলেন? বাংলা ভাষা নিয়ে কথা বলার অধিকার তাদের কে দিয়েছে? কবির কবিতার ভাষা তার আপন। কবিতার সাথে কবির ভালোবাসা থাকলেই হলো। কবির মনে যখন কোন ভাব, কোন স্পষ্ট বা অস্পষ্ট কল্পনা জাগে অথবা এমন কিছু ঘটে যার অভিঘাত কবির মধ্যে তীব্রতা সৃষ্টি করে কেবলমাত্র তখনই কবির কলম দিয়ে কবিতার সৃষ্টি হয়, লাইনগুলো ঝরঝরিয়ে বেরিয়ে আসেÑ ভাবতে হয় না। কবির কলম তখন এতোটা স্বচ্ছন্দে বেরিয়ে আসে যে, তখন ৫০/১০০ টি লাইনও বেরিয়ে আসতে পারে।  সেই লাইনগুলো, কথাগুলো কবির একান্ত নিজস্ব। তার সুখ দু:খের ছবি। তিনি কেবল মাত্র তার রঙ তুলি দিয়ে সেই ছবি আঁকেন। তখন তার কবিতা বিশ ¦কবি, রাজ কবি, জাতীয় কবি বা সেরা কবিদের মতো হলো কিনা তাতে তার কোন পরোয়া থাকে না। তিনি কবিতাটি সৃষ্টি করেই তৃপ্তি বোধ করেন। খাঁটি কবি তার কবিতার তুলনা নিশ্চয় পছন্দ করেন। তবে এতে সমসাময়িক কবিদের পরিবেশের প্রভাব পড়বেই। ওয়ালি মাহমুদের কবিতা আমার কাছে টুঁই টুম্বর রসে ভরা ফলের মতো। মুখে পুরলেই যেমন স্বাদ পাওয়া যায় তেমনি চিবিয়ে খেলে আরো স্বাদ লাগে।

মনজুরুল আজিম পলাশের মূল বক্তব্যের সাথে আমার তেমন কোন বিরোধ না থাকলেও তার একটি বক্তব্যের একটি অংশের সাথে আমার মিল হচ্ছেনা । মনে হচ্ছে পলাশ ইচ্ছে বা অনিচ্ছায় ভাষা সংকীর্ণতায় ভূগছেন। তার নিজের কাছে ভাষা সংকীর্ণতা না হয়ে হয়তো ভাষার উৎকর্ষ সাধনও মনে হতে পারে। তবে আমার কাছে সংকীর্ণতাই মনে হচ্ছে। তিনি বলেছেন,‘ওয়ালি মাহমুদ মাঝে মাঝে আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেন তার কবিতায়। এই ব্যবহার দূর্বোধ্যতা বা জটিলতা তৈরী না করে মাঝে মাঝে একটি ভিন্ন ব্যঞ্জনা যেমন দেয় বা পাঠককে যেমন আগ্রহী করে তোলে শব্দটির সঠিক অর্থ জানতে, অনুমান করতে- অন্যদিকে একটু ঝুকিও তৈরী করে। হঠাৎ হঠাৎ এই আঞ্চলিক শব্দের অর্থহীনতার কাছে অসহায় আটকে থাকতে হয়।’

আঞ্চলিক শব্দের অর্থহীনতা বলতে পলাশ কি বুঝাতে চেয়েছেন? হয়তো সঠিক করে বুঝতে পারছে না। তবে আমি বলব- পাঠকের এই অসহায় আটকে থাকাটাই কবির সার্থকতা। কারণ আটকে থাকাটাই  আমাদের এগুতে বলে, পরিশ্রমী হতে বলে, অজানাকে জানতে বলে, আমাদের উৎসুখ্যটাকে ঝড়বেগী করে তোলে। একজন পাঠককে যদি কবি পাঠককে যদি কবি এতোটা উদ্বুদ্ধ করতে পারেন- তাহলে ক্ষতিটা কোথায়? আমরা যদি বর্তমানে ইংরাজী ভাষার দিকে তাকাই তাহলে দেখি প্রতি বছর এরা দুনিয়ার  তাবৎ ভাষা থেকে কয়েকটি শব্দ এনে নিজেদের ভাষাতে যোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলা ভাষার দিকে তাকালে দেখিÑ আমরা ইংরাজী, উর্দু, হিন্দী, জাপানী, ফার্সী সব ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে পারি কিন্তু দেশের ভিতরের কোন একটা বিশেষ অঞ্চলের ভাষা হলেই নাক সিঁটকাই। আমাদের এই উন্নাসিকতার, এই দৈন্যতার কি কোন শেষ হবে না? আমি চাইবো কবি যেন আরো বেশী করে আমাদের খালে বিলে ছড়িয়ে থাকা শব্দগুলোকে কুড়িয়ে এনে বাংলা ভাষার ভান্ডারকে আরো সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেন। দেশের শুধু একটি বিশেষ অঞ্চলের নয়, প্রতিটি অঞ্চলের ভাষাকে যেন কুড়িয়ে আনেন। এতে আমাদের ভাষার ভান্ডার সমৃদ্ধ হবে। যারা সংকীর্ণতায় ভোগেন তারা চিরকালই ভূগবেন কিন্তু তাদের কাছে হেরে গেলে তো চলবে না। বাংলা ভাষায় এখনো আঞ্চলিক শব্দগুলোকে নিয়ে যে সংকীর্ণতা করা হয় তার সাথে কোন মতেই সন্ধি করা চলে না।

বুদ্ধদেব বসু যখন তার বন্দির বন্ধনা কবিতাটি লিখেছিলেন তখন তার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার কড়া অভিযোগ উঠেছিল। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতার প্রশংসা করেছিলেন বলে এক সমালোচক রবী ঠাকুরেকে উপলক্ষ্য করে লিখেছিলেন,‘ঠাকুর কবি দীর্ঘকাল ধরিয়া ইউরোপ আমেরিকার সাথে কারবার করিতেছেন বলিয়া দেশের লোকদের বুদ্ধি সম্বন্ধে আর তেমন শ্রদ্ধান্বিত নহেন। তিনি মনে করেন বাঙ্গালী এমনই শিশু যে তার সম্মূখে সাহিত্যিক উলঙ্গতা প্রকাশে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন নাই। নইলে এমন বেসামাল হইতে লজ্জা বোধ করিলেন না কেন?

অথচ মাত্র কয়েক বছর পরই এই বন্দীর বন্দনা কবিতাটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে সকলেই একযোগে বলেন, বন্দীর বন্ধনা কবিতাটি কল্পনায় দৃঢ়, ভাষায় পরিস্ফুট, প্রকাশভঙ্গিতে সাবলীল কিন্তু কোথাও কোন অশ্লীলতার নাম গন্ধও নেই।

পলাশ যে দুইটি শব্দের উদাহরণ দিয়েছেন তা হলো- মাইজলা এবং টুমা’র। বাংলা ভাষার ব্যায়াকরণ সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন, তাদের কাছে এই দুইটি শব্দোদ্ধারে এমন কোন বাঁধা আছে বলে আমার মনে হয় না। ব্যক্তি নির্দেশক ও বস্তু নির্দেশক সর্বনামে (কর্তৃকারকে প্রথম বিভক্তি) খুঁজতে গেলেই তা পরিষ্কার হয়ে আসে। কচুর মতো রঙ যার তাকে যেমন কচুয়া বলে তেমনি মধ্য বা মাঝখানে যার অবস্থান, তাকে মাইজলা বলে। সেই ভাবেই টুকরো পরিমান অর্থে বহু বচনে টুমা, টুমার, টুমাইন এ সবের ব্যবহার রয়েছে সিলেটি ভাষায়।

আমি ওয়ালি মাহমুদকে বলবো তিনি যেন অঞ্চলিক ভাষাকে তার কবিতায় আরো বেশী করে ব্যবহার করে বাংা ভাষার ভান্ডারকে ভরে তুলতে এগিয়ে আসুন। ব্রিটেনের ইনার সিটির গ্যাটো শব্দ ব্লিং ব্লিং যদি হীরের ইংরাজী শব্দার্থ হয়ে অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে যোগ হতে পারে তবে আমরা কোন অযথা অনর্থক এই শব্দ ও ভাষা নিয়ে তর্ক করছি? এই অযথা অনর্থক শব্দটিরও একটি সিলেটি শব্দ রয়েছে- ‘আলে না মছলে’। পলাশকে আবারও ধন্যবাদ দিয়ে আমি ওয়ালি’র কবিতার বহু প্রচার কামনা করি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Share Now

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *