ওয়ালি মাহমুদের কবিতায় তার চিন্তাচেতনা | ড.রেনু লুৎফা | সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকা | লন্ডন, যুক্তরাজ্য

একটি দীর্ঘশ্বাসের মৃত্যু ও  আমি এক উত্তরপুরুষ। একাত্তরের প্রজন্ম কবি ওয়ালি মাহমুদের দু`খানি দ্বিভাষীয় কবিতা গ্রন্থ। চমৎকার প্রচ্ছদ ও বাধাঁইয়ে বাংলা ও ইংরাজীতে কবিতাগুলো সাজানো হয়েছে।


সূচীপত্রহীন আমি এক উত্তরপুরুষ গ্রন্থে ২০টি কবিতা আর একটি দীর্ঘশ্বাসের মৃত্যু গ্রন্থে স্থান পেয়েছে ২১টি কবিতা। বেশ কিছুদিন থেকে ওয়ালি মাহমুদের কবিতা পড়ছি। কবিতার মাধ্যমে তিনি নিজের চিন্তা চেতনাসহ সৃষ্টিশীল মননশীলতার একটি স্পষ্ট ও শক্তিশালী পরিচয় পাঠকের কাছে তুলে ধরার সাফল্য দেখিয়ে যাচ্ছেন। ওয়ালি মাহমুদের কবিতাগুলোর পরিস্ফুট শব্দ চয়ন এবং ভাবপ্রকাশের ভঙ্গিমার সাথে পাঠক অতি সহজেরই নিজের চেনাজানা চৌহদ্দির  ঘনিষ্ঠতা বোধ করতে পারেন।

আমি কি অপেক্ষা করছি কারো/ প্রাণ ভূলানিয়া উত্তরসূরী`র? বিরাণ ভবিষ্যতের সনে/ কাল কিংবা শতাব্দীর প্রত্যহিক জীবনের ভাঁজে; ধরায় বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, বিশেষণের পারস্পর্যে আমি এক উত্তরপুরুষ।

অনুশোচনার দহনে তিনি যখন বলেন- আমি সুখের কাছে যাই/ গিয়ে শুনি- ওখানে সে মরে গেছে/ আমি দুখের কাছে যাই/ গিয়ে দেখি, ওখানে সে আমার কষ্টকে অতন্দ্র প্রহরা দিচ্ছে।

বাংলা কবিতার অনেক বেড়ী, অনেক বাঁধা বন্ধন চুর্ণ করেছিলেন মাইকেল মধুসূদন। আর রবি ঠাকুর শুধু বাংলা কবিতাকে নয়, গোটা বিশ্ব সাহিত্যকেই মানুষের চিরকালীন শিল্প-ভাবনাকে এবং সমগ্র দার্শনিক চিন্তার জগতকে দান করলেন রোমান্টিক মানবতাবাদী ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে পরিণতত্ত¡  ও দৃষ্টান্ত। সেই ধারায় কবি ওয়ালি মাহমুদ তার `তুমি আসবে কখন` কবিতায় বলেছেনÑ তন্দ্রাচ্ছন্ন করেছো, ভালবাসার মোহে/ আবেগের সাগরে ভাসিয়েছো/ জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রণয়গীতের/ উপসংহারের করুণ সুর বাজাচ্ছি/ অঙ্গুলী বাঁশিতে, তোমার কাহিনীর তীরে/ তুমি আসবে কখন/ পেছন থেকে হাত রাখবে, কাঁধে/ আমি দেখবো সফল সমাপ্তির। অথবা `অ্যা মেসেজ অব ওয়েডিংস`-এ বলেছেনÑ বড় কষ্ট হচ্ছে বুকে, কিন্তু কেন? কতটুকু চাওয়া ছিল, বুঝিনি আগে।

কবিতার মধ্যে ভাষা সংস্থানের দৈনন্দিন স্বাভাবিক প্রবাহ যুক্ত করে `রক্তের তাপ` কবিতায় বলেছেনÑ আমি চাই মনের মধ্যাকর্ষণের টানে তোমাকে নামাবো/ যা জানি তা তোমায় জানাবো/ শব্দের সীমায় শব্দ দিয়ে ডাকবো/ রক্তে, রক্তের তাপ দেবো/ শরীরের চত্বরে।

যে কোন বিষয় নিয়ে যে কোন মনোভঙ্গি নিয়ে, যে কোন উপলক্ষে কবিতা লেখা চলে, কবির কলমে যদি শক্তি থাকে তাহলে কবিতা উতরে যায়। যেমন- ‘ভালবাসার  কষ্ট’ কবিতায় বলেছেন- তার চোখে অশ্রু দেখলে আমি কষ্ট পাই/ যেমন বর্ষার ধারা পতিত হলে/ আমার ওপর অজ্ঞাতে/ অশ্রু সুখের বা দুখের বোঝবার আগে/ শীত ও গ্রীষ্মে তার চোখ আপক্ষ প্লাবিত হয়/ মন বলে- তার অশ্রুতে/ আমার ভালবাসার কষ্ট আছে। অথবা `নিশির অভ্যন্তরে` বলেছেন- মরুভূমির এক গুহাচারী হয়ে আছ তুমি/ শশিকর রাত হলেও/ জোৎন্সা দেখিনা/ অলক সুন্দরীতে অন্ধ/ কি সুন্দর অন্ধ দুইজন।

বাংলা কবিতার সাথে এদেশে আমাদের ছেলেমেয়েদের তেমন কোন জানাশোনা নেই। এই নতুন প্রজন্মের সাথে ওয়ালি মাহমুদ যোগাযোগ করার যে শ্কত প্রচেষ্টা করেছেন এর জন্য অবশ্যই তাকে সাধুবাদ। বাংলা কবিতা থেকে বাংলাভাষীরা যে স্বাদ নিতে পারবেন তেমন স্বাদ নিতে পারবেন না ইংরাজ কবিতা প্রেমীরা।

বাংলায় যেমন তিনি শব্দ নিয়ে খেলা করেছেন ইংরাজীতে ততোটুকু খেলতে পারেনি। সীমবদ্ধতাটুকু প্রকাশিত এবং বোধগম্য, তারপরেও ওয়ালি মাহমুদ যে প্রচেষ্টা শুরু করেছেন তা দেখে অনুমান করতে পারি ছোট ছোট কবিতার ভাবগুলো ও শৈলীগত পারস্পরিক (বাংলা ও ইংরাজী) ঘনিষ্ঠতার ফলে কবির বিশিষ্ট বার্তাকৌশল আমাদের ছেলেমেয়েদের মাঝে নান্দনিক উদ্দীপনার সম্ভাবনা তৈরী  করবেই।

 

দ্র: আলোচনাটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকার ইস্যু ১৩৩৩, ২৫ ডিসেম্বর ২০০৩ সালে প্রকাশিত।

Share Now

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *