ডায়াস্পোরা লিটারেচার গবেষণা | দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরীর সাহিত্যসম্ভার | ওয়ালি মাহমুদ | এডিটরস ইংল্যান্ড


দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরীর সাহিত্যসম্ভার 

ওয়ালি মাহমুদ

প্রথম প্রকাশ: ২০১৩

প্রকাশক: এডিটরস ইংল্যান্ড


 

আব্দুর রউফ চৌধুরীর সাহিত্যসম্ভার

 জীবনকথা  সাহিত্যকথা  রচনা-নিদর্শন  গুণীজনের দৃষ্টিতে

জীবনকথা

 জন্ম ও শিক্ষা  কর্ম ও সংসার  দেশব্রত ও মুক্তিযুদ্ধ  সাহিত্য ও সমাজ সাধনা  শেষজীবন ও মৃত্যু

সাহিত্যকথা

 সাহিত্য-সাধনা  সাহিত্য-ধারা  সাহিত্য-মূল্যায়ন

রচনা-নিদর্শন

 কবিতা  ছোটগল্প  প্রবন্ধ

গুণিজনের দৃষ্টিতে


আব্দুর রউফ চৌধুরী’র সাহিত্য-সম্ভার

[১৯২৯-১৯৯৬]

 জীবনকথা

  জন্ম ও শিক্ষা

আব্দুর রউফ চৌধুরীর পৈতৃকনিবাস বৃহত্তর সিলেটের [তখন আসাম প্রদেশের অংশ] হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ থানার শাখা-বরাক নদীর তীরবর্তী গ্রাম মুকিমপুর। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আজহর চৌধুরী ও মাতার নাম নাজমুন নেসা চৌধুরী। তিনি মুকিমপুর-শ্রীকৃষ্ণপুর-শ্রীচন্দ্রপুর-বাঘারাই-আইনপুর মৌজার ক্ষয়িষ্ণু জমিদারির শেষ উত্তরাধিকার। আব্দুর রউফ চৌধুরীর প্রপিতামহ মুরাদ চৌধুরী ও প্রপিতামহী মস্তোরা চৌধুরী। প্রসঙ্গত, সরকারি ভূমিসংক্রান্ত দলিলপত্রে মস্তোরা চৌধুরীর নামে এখনো মুকিমপুর-শ্রীকৃষ্ণপুর-শ্রীচন্দ্রপুর-বাঘারাই-আইনপুরের বিশাল জমি-মাঠ-খাল-বিল পাওয়া যায়। পারিবারিক অসম্প্রীতি ও কূটকৌশলের কারণে পিতামহ নাদির চৌধুরীর মৃত্যুর পর জমিদারিতে ধস-নামতে শুরু করে এবং তা চূড়ান্তরূপ ধারণ করে নাদির চৌধুরীর সন্তানদের সময়ে। তাঁর সন্তানরা ছিলেন আজহর চৌধুরী, জয়ধন চৌধুরী, সোনাহর চৌধুরী, কর্ণহর চৌধুরী, আবদুল কাদির চৌধুরী ও আবদুল গণি চৌধুরীর জনক। আব্দুর রউফ চৌধুরীর পিতা ছিলেন নাদির চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ সন্তান। নাদির চৌধুরীর সময়েই ভাগলপুরে বিশাল গৃহস্থির ব্যবস্থা করা হয়; কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছয় সন্তানের আশ্রয় হয় তাঁর শ্বশুর বাড়িতে (পিঠুয়া, চৌধুরী বাড়ি)। এখানেই তাঁর ছয় সন্তান তাঁদের মামার যত্নে লালিত-পালিত হতে থাকেন; কিন্তু আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে আজহর চৌধুরী সস্ত্রীক (নাজমুন নেসা চৌধুরী) মুকিমপুরে চলে আসেন। মুকিমপুরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় আব্দুর রউফ চৌধুরীর শৈশব-কৈশোর, তাই মুকিমপুর তাঁর স্মৃতিতে গভীর স্থান করে নেয়, এমনকি জীবনের শেষসময় পর্যন্তও তাঁর হৃদয় এই গ্রামটিকে লালন করে। মুকিমপুরের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা এবং কুসংস্কার তাঁর হৃদয়ে দাগ কাটে। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে মাকে লেখা তাঁর চিঠিতে সেই মুকিমপুরের অমলিন চিত্র ধরা পড়ে, মাইজি গো, মনে আছে আমার ছেলেবেলায় বাংলাদেশে ভূতের ভয় খুব বেশি ছিল। অজ্ঞতা, ধর্মান্ধতা ও হাজার বছরের গড়ে ওঠা কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশের সুযোগে পীর-মৌলভীরা ভয় দিয়ে শোষণ করতেন শিশুর মতো সরলপ্রাণ গ্রামের মানুষগুলোকে।

মুকিমপুর-শ্রীকৃষ্ণপুর-শ্রীচন্দ্রপুর-বাঘারাই-আইনপুর মৌজার চৌধুরী পরিবার ছিলেন শিক্ষানুরাগী। মুকিমপুরের মাদ্রাসা ও পাঠশালা শিক্ষাব্যবস্থা চৌধুরীদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়। মুকিমপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি তাদেরই দান। আর পিঠুয়া বালিকা বিদ্যালয় চৌধুরীরাই নিজ জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন, এর প্রধান শিক্ষক ও সহযোগি-শিক্ষাকরা ছিলেন চৌধুরীদের স্ত্রী-পুত্রবধুরা। হবিগঞ্জের দুর্লবপুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিও তাদের প্রতিষ্ঠিত। এই পরিবারের সন্তান আব্দুর রউফ চৌধুরীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ-বাড়িতেই, মুন্সি ও পন্ডিতের কাছে আরবি ও বাংলা শিক্ষার মাধ্যমে; তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় খঞ্জনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে। এসময়ের স্মৃতি মন্থন করতে গিয়ে আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

একবার অন্য ছেলেদের সঙ্গে সরকার বাজারের বারুণী মেলায় গিয়েছিলাম, এক টাকা নিয়ে, ঘুড়ি ও উকড়া কিনবো বলে। জুয়ার ফাঁদে পড়ে টাকাটা হারিয়ে কেঁদে কেঁদে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল। মেলার মূল আকর্ষণ, পেরেক ঢুকিয়ে জিহ্বাকে ছিদ্র করে ধারালো কিরিচের ওপর দাঁড়িয়ে মেলা প্রদক্ষিণ, আমার দেখা হল না বলে কত দুঃখ করেছি।

‘দ্বিতীয় মান’ শ্রেণীতে উঠে তিনি চলে যান গোরারাই বিদ্যালয়ে। আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

আরও দশজনের মতো আমিও মা-বাপের আদরের ছিলাম। হয়তো প্রথম ছেলে বলে আদরের পরিমাণ বেশি ছিল। তাই একটু বড় হয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু হয়। […] আমার যেতে হত খঞ্জনপুর প্রাইমারী স্কুলে। শ্রীচন্দ্রপুরের দেবেন্দ্র মোহন দে মহাশয় ছিলেন আমার শিক্ষক। আপন ছেলের মতো স্নেহ করতেন আমায়। তাঁর ছেলে দেবেন্দ্র ও ভাতিজা পরেশের সঙ্গে স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। […] খেলাধুলা প্রায়ই ওদের সঙ্গে চলত। […] তিনি [দেবেন্দ্র মোহন দে] আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলে এলেন গোরারাই স্কুলে।

এগারো বছর বয়সে নাজমুন নেসা চৌধুরীর ইচ্ছে অনুযায়ী আব্দুর রউফ চৌধুরী ইংরেজি শিক্ষার অভিপ্রায়ে ভর্তি হন শেরপুর মধ্য ইংরেজি স্কুলে, তৃতীয় শ্রেণীতে। বাড়ি থেকে এই স্কুলে যাওয়া-আসা তাঁর পক্ষে সুবিধা না-হওয়ায় পিঠুয়া চৌধুরী বাড়িতে (পিতার মাতুলালয়) আশ্রয়গ্রহণ করেন। এই পরিবারের সদাসয়তা, অকৃপণ সাহায্য এবং সহযোগিতা আব্দুর রউফ চৌধুরীকে নবজীবনে উদ্দীপ্ত করে। তারপর সাধুহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সাধুহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সময়ের কথা বলতে গিয়ে আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

আমি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। একদিন সাজিদ ভাইয়ের সঙ্গে গণক-ঠাকুরের বাড়ি এলাম। বলদকে কেউ বলৎকার করে নিয়েছে কিনা তা জানার উদ্দেশ্যে। উপস্থিত হতেই দেখলাম এক ভদ্রলোক বাম হাতে এক কোষ জল নিয়ে পৈতাকে ডান কানে জড়িয়ে বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত মোর্তা বনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সাথীর কাছ থেকে বামন-ঠাকুরের পেশাব-পদ্ধতির কথা জেনে অবাক হলাম।

সাধুহাটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই তিনি উচ্চপ্রাথমিক ও ছাত্রবৃত্তির পাঠ সমাপ্ত করে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এই পরীক্ষায় ইংরেজি ও সাহিত্যে বিশেষ পারদর্শিতার জন্য তিনি শিক্ষকমন্ডলীর কাছে বিশেষ স্নেহভাজন ছাত্রের গৌরব লাভ করেন। কালা দত্ত পন্ডিত, প্রমোদ দে, ননী রাগের মতো আদর্শ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষকরাই তাঁর মনের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেন।  এরই মধ্যে তাঁর শিক্ষাজীবনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে। ১৩ জুলাই ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে, আব্দুর রউফ চৌধুরীর পিতা আজহর চৌধুরীর অকাল প্রয়াণ ঘটে।

আজহর চৌধুরী ও নাজমুন নেসা চৌধুরী ছিলেন আব্দুর রউফ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও সমীরণ চৌধুরীর জনক ও জননী। এই শৈশবকালেই আব্দুর রউফ চৌধুরী জীবনসংগ্রামের আস্বাদলাভ করেন। আজহর চৌধুরীর অকাল প্রয়াণে সংসারটি আর্থিক অনটনে পতিত হয়। তাই তাঁর কিশোরজীবন স্বাচ্ছন্দ্যে অতিবাহিত হয়নি। পিতৃহীন হয়ে অসহায় সম্বলহীন বিধবা-মাতার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে তিনি রূঢ় জীবন সংগ্রামের সম্মুখীন হন। জীবনের এই পূর্বে তিনি আত্মীয়-স্বজনের আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হন। জননীর দুঃখলাঘব করা দূরের কথা এই পরিবারের সদস্যদের বঞ্চিত করার মতো নিকট আত্মীয়ের অভাব ছিল না। এই দুঃসময়ে, সংসার বাঁধার নতুন স্বপ্নে নয়, অভাবের তাড়নায় নাজমুন নেসা চৌধুরী তাঁর দেবর সোনাহর চৌধুরীর আশ্রয় গ্রহণ করেন। নাজমুন নেসা চৌধুরী ও সোনাহর চৌধুরী ছিলেন বসুরণ চৌধুরী, কালাম চৌধুরী ও কাইয়ূম চোধুরীর জনক ও জননী। নাজমুন নেসা চৌধুরী ও সোনাহর চৌধুরীর উৎসাহ, সাহচর্য, ইচ্ছা ও অনুপ্রেরণা দ্বারা লেখাপড়ায় আব্দুর রউফ চৌধুরীর আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। তিনি ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে, হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে কলা-বিভাগে প্রবেশ করেন। এখানে তিনি কোহিনুর হোটেলে থাকা শুরু করেন; কিন্তু মাসিক ত্রিশ টাকা হোটেল ভাড়া দেওয়া তাঁর পরিবারে পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অনেক চেষ্টা করে জালালাবাদের বিত্তশালী ব্যবসায়ী কিন্তু শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব উসমান গণি সাহেবের বাড়িতে জায়গির জোগাড় করেন তাঁর চাচা। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে, আব্দুর রউফ চৌধুরী আই.এ. পরীক্ষায় সকল বিষয়ে পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, সোনাহর চৌধুরীর মানসিক ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ দেখা দিলে, চৌধুরী পরিবারটি আর্থিক সংকটে পতিত হয়, ফলে আব্দুর রউফ চৌধুরীকে আর্থিক সংকট ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে বি.এ. দ্বিতীয় বর্ষে, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে, চাকুরিতে যোগদান করতে হয়। তাঁর প্রথাবদ্ধ ছাত্রব্রতের পরিসমাপ্তি এখানেই ঘটে।

  কর্ম ও সংসার

কর্মজীবন শুরু হয় ব্যবসা দিয়ে, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে, জনৈক ব্যবসায়ীর সঙ্গে মৌলভীবাজারের সরকার-বাজারে, ‘ছয়-আনা-দশ-আনা’ শর্তে। কয়েক মাসের মধ্যে, ব্যবসার ইচ্ছা ত্যাগ করে শিলচরের এক দোকানে চাকুরি নেন। কিছুদিনের মধ্যেই মহাজনের মেয়েকে পড়ানোর দায়িত্ব তাঁর উপর পড়ে। এরপর বিয়ের প্রস্তাব, সঙ্গে শ্বশুরের প্রচুর সম্পত্তিসহ ঘর-জামাই হওয়ার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

ঘরজামাই হয়ে বাকি জীবন শ্বশুরের সম্পত্তির প্রাচুর্য্যরে মধ্যে কাটাতে রাজি কী না জানাতে হবে আগামীকাল। রাত অনেক হয়েছে। চোখে ঘুম নেই। বিড়ি খাচ্ছি একটার-পর-একটা। তন্দ্রার মাঝে ভেসে উঠল, চোখের সামনে, ভাবি শ্বশুরের কচি মুখখানি। মনে হল, সাতরাজার ধন তুচ্ছ আমার বোনের মুখখানির কাছে। আমার অন্তরপুরুষ চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘ভাইবোনদের ম্লান মুখের হাসি ফুটিয়ে তোলা যার জীবনব্রত তার কী সাজে ঘরজামাই হওয়া? শ্বশুরের ঐশ্বর্যের আলসে বিলাস জীবন তোমার কাম্য নয়। দুঃখ দারিদ্র্য অবসান অভিযানে অসীম ধৈর্য্য কঠোর পরিশ্রম, সর্বোপরি সততা ও নিষ্ঠা একান্ত প্রয়োজন। তাই ফিরে চল ঘরে।

১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দেই, শিলচর থেকে ফিরার কিছুদিনের মধ্যে তিনি যথার্থ অর্থে চাকুরিতে যোগদান করেন, শিক্ষক হিসেবে আউশকান্দি হাই স্কুলে; কিন্তু শিক্ষকতার বেতনে সংসার চালানো দুষ্কর হওয়ায়, ১৮ মার্চ ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে, পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়ে পাকিস্তানে চলে যান।

আব্দুর রউফ চৌধুরী বিয়ে করেন অনেকটা আকস্মিকভাবেই। লেখাপড়া ছেড়ে চাকুরিতে প্রবেশের কারণ যেমন ছিল সংসারের প্রতি দায়বদ্ধতা, তেমনি হঠাৎ করে বিয়েরও কারণ ছিল ঋণে জর্জরিত সোনাহর চৌধুরী ও পরিবারকে উদ্ধার করা। কর্মসূত্রে পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে। পেশোয়ার ও কোয়েটায় কিছুদিন থাকার পর এক বৎসরের প্রশিক্ষণে তাঁকে প্রেরণ করা হয়। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে, ছুটিতে বাড়ি এলে, আব্দুল খালেক সাহেব, আব্দুর রউফ চৌধুরীর শিক্ষাজীবনের এক সময়ের ত্রাতা উসমান গণি সাহেবের ছোটভাই, তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে নাজমুন নেসা চৌধুরীর কাছে উপস্থিত হন। জীবনের একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রাককালে আব্দুর রউফ চৌধুরীর দোদুল্যমানতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং হৃদয়ে রক্তক্ষরণের বেদনার্ত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর স্মৃতিচারণে,

মাইজি বললেন, ‘দেখ বাবা, কুবলিয়ৎপত্র-ব্যাপারে পিঠুয়ার কতক লোকের আক্রোশ আছে তোমার চাচার উপর। এখন এ-ঋণের অজুহাতে তারা যদি তোমার চাচাকে পথে-ঘাটে-হাটে-মাঠে বেইজ্জত করে- এ আশঙ্কায় আমার অন্তর কাঁপে দুরুদুরু অনুক্ষণ। আমার মনে হয় আল্লাই আমাদের এ-বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য তাঁকে পাঠিয়েছেন, নতুবা এত বছর পর হঠাৎ করে এমনি সময় হবিগঞ্জ থেকে আসবেন কেন? তুমি আর আপত্তি করো না। […] মাইজির কথাগুলো যেন সহ্য করতে পারলাম না। দাদার  কবরের কাছে গিয়ে বসে পড়লাম। আমার নীতির কুরবানী দিতে হয় চাচাজির শান্তির জন্য। মাইজির সান্ত¦নার জন্য।

১৪ আগস্ট ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে, তিনি শিরীণ চৌধুরীকে বিয়ে করেন। বিয়ে করে বাড়িতে ফিরে শ্বশুরের দেওয়া তিন শত টাকা সোনাহর চৌধুরীর হাতে তুলে দিয়ে করাচির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তখন স্ত্রী থেকে যান তাঁর পিতৃগৃহে। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে, তিনি যখন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে চাকুরিরত তখন তাঁর পিতৃতুল্য চাচার মৃত্যু হয়। তখন তিনি দেশে ফিরে তাঁর স্ত্রীকে নিজ বাড়িতে তুলে আনেন। দাম্পত্য-জীবনে তাঁরা ছিলেন খুবই সুখী। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল শিরীণ চৌধুরীর। তিনি অত্যন্ত গুণবতী, দয়াবতী, সর্বোপরি আদর্শ গৃহিণী। পিতার সংসার থেকেই এই গুণগুলো তিনি অর্জন করে এসেছিলেন। শ্বশুর-বাড়ির দারিদ্র্যের তীব্র কষাঘাত তাঁর মুখের অনাবিল হাসিকে কোনোদিনই মলিন করতে পারেনি। বিত্তবান পিতৃপরিবার থেকে এসে এই দরিদ্র পরিবারে পড়ে হয়তো শিরীণ চৌধুরী মনে মনে শঙ্কিত হয়েছিলেন, কিন্তু তা কখনই আচরণে প্রকাশ করেননি; উপরন্তু স্বামীকে সবসময়ই সাহস যোগাতেন, বলতেন, ‘চিন্তার কোনো কারণ নেই, আমাদের দিন একদিন ফিরবেই।’  স্ত্রীর সাহস, সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা আব্দুর রউফ চৌধুরীর জীবনপথে সহায়ক হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, দু’বছর পর-পর দু’মাসের ছুটি কাটানোর পর, ১৯৫৭ খিস্টাব্দের প্রথম দিকে, স্ত্রীর সাহসে ও অনুপ্রেরণায় তিনি তাঁর পরিবারকে পাকিস্তানে নিয়ে যেতে রাজি হন। আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

যতই অসুবিধের কথা তুলে ধরলাম ওর সামনে ততই একই কথা- তুমি যেখানে যেভাবে বাস করো, আমি সেখানে সে অবস্থায় থাকতে পারব না কেন?

তারপর উথাল-পাতাল সাগর পাড়ি দিয়ে কলম্বো হয়ে কারাচি পৌঁছেন। তারপর চক্করকোট পাঠান-পল্লীর একটি বাড়িতে তাঁদের সংসার পাতা হয়। আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

পাকিস্তানেই আমার সংসার পাতা হয়। প্রথম দুই সন্তানের জন্ম সেখানেই। তবে পাকিস্তানিদের বাঙালি-বিদ্ধেষ-মনোভাবে অতিষ্ট হয়ে পেনশন পর্যন্ত ঠিকে থাকতে পারিনি। […] ছোট-বড় বিরূপ ঘটনার সমষ্টি, মানসিক শান্তি নষ্ট করা আমার পাকিস্তান জীবন: একদিন বিকালে, ছয়-মাসের শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে বান্দবীসহ আমার স্ত্রী বাসার সামনের রাস্তায় হাঁটছিল। একপাষ- পাঞ্জাবিটি তখন তার সাইকেলের ধাক্কায় বাচ্চাসহ ওকে রাস্তায় ফেলে দেয়। আমার স্ত্রী আর সন্তানকে রাস্তা থেকে না-তুলেই সাইকেল চালিয়ে পাঞ্জাবি উধাও হয়ে যায়। আমার স্ত্রী অবশ্য আমাদের ছেলেকে কংক্রিটের রাস্তার ওপর পড়তে দেয়নি, তবে নিজের হাঁটুতে ভীষণ চোট পেয়েছিল।

করাচিতেই, ২২শে ডিসেম্বর ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে, প্রচ- শীতের মধ্যে তাঁদের প্রথম সন্তান আব্দুল বাসিত চৌধুরীর জন্ম হয়। আর কোহাটে, ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে, পারভীন নাহার চৌধুরীর জন্ম হয়। পাকিস্তানেই দুই সন্তান নিয়ে তাঁদের একান্ত নিজস্ব সংসার গড়ে ওঠে। পাকিস্তান তাঁর ভবিষ্যৎ মানস-গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পাকিস্তানে এসেই তিনি অনুধাবন করেন তাদের বৈষম্যমূলক নীতি। আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

একই ব্যারাকে একপাশে বাঙালি আর অন্যপাশে পাঞ্জাবি। একরাতে অন্যপাশের পাঞ্জাবি এয়ারম্যানদের সঙ্গে অনেকক্ষণ পাঞ্জাবি ভাষায় গল্প-সল্প করে আমাদের কাছে আসতেই তার মেজাজ বিনা কারণে বিগড়ে গেল। পাঞ্জাবির প্রতি যেমন অগাধ আশা-ভরসা, তেমনি বাঙালির প্রতি অপরিসীম সন্দেহ-ভয়। তার ধারণা অপদার্থতায় পাকিস্তানে বাঙালির সমকক্ষ আর কেউ নেই। তাই মনে মনে বাঙালির সদগতির উপায় নির্ধারণ করে একদিন সে বলল, ‘ডুন’ট স্পিক ইন গ্রীক।’ তার সকল সংকল্প অকস্মাৎ ধ্বস্ত-বিধ্বস্ত করে জানিয়ে দিলাম, ‘বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা, তদুপরি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা।’ সে উত্তর খুঁজে না-পেয়ে ‘মাই বলস্’ বলে বেরিয়ে গেল।

১২ বছর পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে চাকুরি করার পর ইংল্যান্ডে আসার চেষ্টা করেন, কিন্তু করাচি থেকে পাসপোর্ট করতে না পেরে স্বদেশে স্বপরিবারে, পাকিস্তানের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ নিয়ে, ফিরে আসেন, ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু পাকিস্তান বসবাস তাঁকে যোগিয়ে ছিল সাহিত্যের রসদ এবং মাতৃভূমির প্রতি অপার ভালোবাসা। কিছুদিনের জন্য আবার আউশকান্দি হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। প্রথমবার শিক্ষক হয়ে নিজে তাঁর কাক্সিক্ষত-শিক্ষক হওয়ার সাধনায় নিয়োজিত হন। স্বল্প সময়ের শিক্ষকতা জীবনে একজন আদর্শ ও জনপ্রিয় শিক্ষককে পরিণত হন বলেই দ্বিতীয়বার একই স্কুলে চাকুরি পেতে তাঁকে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু দায়িত্ববান পুত্র, ভ্রাতা ও পিতা হিসেবে সেসময়ে অর্থের প্রয়োজন ছিল তাঁর প্রচুর, কাজেই সাধের শিক্ষকতা ছেড়ে, জীবিকার অন্বেষণে, ১০ই জানুয়ারি ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে, তিনি ইংল্যান্ড আসেন। ইংল্যান্ডে এসেই তিনি প্রথমে, ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দ থেকে কিছুদিনের জন্য সাইন এ্যান্ড ডিসপ্লে¬ ইন্ডাজট্রিজস্ লিমিটেড-এ এ্যাসেম্বোলার হিসেবে চাকুরি করেন। তারপর, ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দেই, ব্রিটিশ সরকারের মিনিস্ট্রি অফ এ্যাভিয়েশনের গবেষণা কেন্দ্রে চাকুরি নেন। চার বছর এখানে চাকুরি করে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে দেশে ফিরেন। দুই বৎসর স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করেন। এসময়, ৮ই অক্টোবর ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে, তাঁদের তৃতীয় সন্তান হাসনীন চৌধুরী (ড.)-র জন্ম হয়। আর ১২ই ডিসেম্বর ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁদের চতুর্থ সন্তান মুকিদ চৌধুরী (ড.)-র জন্ম হয়। দুই বৎসর দেশে পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে, তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং রেলওয়েতে যোগ দেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকারের ডাক বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মাতা পরলোকগমণ করেন। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে শিরীণ চৌধুরী বিলাতে আসেন, এবং আবারও প্রবাসে নিজস্ব সংসার গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রবাসে জীবনের সবচেয়ে মধুময় সময় তাঁরা অতিবাহিত করেন। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে, ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস থেকে অবসরের মাধ্যমে আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর ৪২ বৎসরের সংগ্রামমুখর কর্মজীবনে ইতি টেনে সস্ত্রীক বাংলাদেশে ফিরে আসেন, এবং হবিগঞ্জেই তিনি তাঁর শেষ আবাস তৈরি করেন।

সংসার জীবন যেমন ছিল অত্যন্ত মায়াময় ও সুখের তেমনি তিনি তাঁর কর্মজীবনে ছিলেন সৎ, কর্মঠ ও পরিশ্রমী। চাকুরিক্ষেত্রে তিনি কোথাও কর্তব্য-কর্মে অবহেলা করেননি। আর্থিক প্রচ- অসচ্ছলতার মধ্য-দিয়েও কর্মজীবনে প্রবেশ করে, পরিজনদের সুখের কথা বিবেচনা করে, অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন অর্থের জন্য। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাঁর পরিশ্রমের মাত্রার পরিমাণ প্রকাশ পেয়েছে সহকর্মীর সঙ্গে তাঁর কথোপকথনে,

আচ্ছা চৌধুরী সাব, আমরা এখানে যে বাংলাদেশীরা আছি, সবারই চেয়ে আপনি বয়স্ক এবং আপনার চেয়ে আমরা সবাই স্বাস্থ্যবান ও রোগমুক্ত। আর তদুপরি আপনি ভুগছেন ডায়াবেটিস-এ, তবু আপনার মতো আমরা কেউই দৈনিক ষোল ঘণ্টা করে কাজ করতে পারি না।  আর আপনি দিনের-পর-দিন, সপ্তাহের-পর-সপ্তাহ, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর একই গতিতে কী করে চালিয়ে যাচ্ছেন বুঝতে পারছি না। এমনকি এক দিনের জন্যও কাম কামাই দিচ্ছেন না।

জমিদার-বংশে জন্মগ্রহণ করেও জমিদারির প্রতি আগ্রহ তাঁর কোনোদিন প্রকাশ পায়নি। অর্থবিত্ত যা সংগ্রহ করেছেন তা নিজের চেষ্টায় এবং সেগুলো ব্যবহার করেছেন পরিবার-পরিজনের শিক্ষা-দীক্ষায়, নিজের মনের সুকুমারবৃত্তি প্রকাশ-বিকাশের জন্য এবং সামাজিক কল্যাণে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তীব্র আকাক্সক্ষা তাঁকে তাড়িত করে দেশ থেকে দেশান্তরে। নিরন্তর চেষ্টা ও ঐকান্তিকতা তাঁকে দিয়েছে প্রতিষ্ঠা, যা স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

 

  দেশব্রত ও মুক্তিযুদ্ধ

জাতীয় জীবনের অগ্রগতির সঙ্গে মিলিয়ে আমি আমার জীবনের পরিমাপ নিতে পারি। যখন আমার জন্ম হয়, তখন দেশ ব্রিটিশদের অধীনে। আমি যখন বিদ্যালয়ের ছাত্র তখন ব্রিটিশদের বিতাড়ন করার যুদ্ধে লিপ্ত।

ছাত্রজীবনে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সময় কংগ্রেসী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন আব্দুর রউফ চৌধুরী। গ্রামে গ্রামে গিয়ে লোকজনকে বোঝাতে শুরু করেন; কর-দেওয়া বন্ধ করতে পরামর্শ দেন; শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন এবং রাতে স্কুল-প্রাঙ্গণে স্বাধীন ভারতবর্ষের পতাকা তুলে আন্দোলনে শরিক হন। আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

একদিন আমরা ছোটবড় সব ছাত্র সারি বেঁধে চলছি সড়ক দিয়ে, শ্লোগান দিয়ে দিয়ে। বেকামুরার কাছে যেতেই একদল গোরা সেপাই আমাদের পথ আগলে দাঁড়ায়। ‘ইউনিয়ন জ্যাক ডাউন ডাউন, ন্যাশনেল প্লাগ আফ আফ’- বলার সঙ্গে সঙ্গে তাদের রক্ত গরম হয়ে যায়। কয়েকজনকে বন্দুকের বাঁট দিয়ে গুঁতিয়ে ফেলে দেয় সড়কের নীচে, অনেককে ধরে নিয়ে যায় শ্রীমঙ্গলের ওধারে, গ্রাম থেকে বহু দূরে, ফেলে দেয়, রাত-দুপুরে। অনেকক্ষণ পর খবর পেয়ে, কংগ্রেসের গাড়ি আমাদের উধার করে।

তিনি ভারতবর্ষের অর্থনীতি নিয়েও চিন্তা করতেন, তাই তো বলেছেন,

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অনেকেই ভেবেছিলেন যে, ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক অবস্থা আশ্চর্যভাবে লাভজনক হবে, কারণ, তখন ভারতর্বষ ছিল পাটশিল্পে সকল দেশের উপরে, সেচব্যবস্থায় বৃহত্তম, রেলব্যবস্থায় তৃতীয়, বস্ত্রশিল্পে চতুর্থ। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। যদি ঘটত তাহলে আমার ছেলেবেলায় গ্রামাঞ্চলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আকার ধারণ করত না, শিশু অপুষ্টিতে ভোগত না, মানুষের স্বাস্থ্যসম্মত শৌচ ব্যবস্থার অভাব হত না, গড় আয়ু তেষট্টি বছরের নীচে নামত না, দারিদ্র্যসীমা উপরের দিকে উঠত না।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর ছেলেবেলায় ভারতবর্ষের জাতীয় আন্দোলন ছিল নরম ও চরমপন্থী নেতৃত্বে দ্বিধাবিভক্ত। জাতীয় জীবনের ভিতকার দ্বন্দ্ব ও স্ববিরোধিতা জাতীয় আন্দোলন মাঝেমধ্যে স্তিমিত হলেও কখনই একেবারে বন্ধ হয়নি। কংগ্রেসী নরম ও চরমপন্থী দল, মুসলিম লীগ, শ্রমিকশক্তি নিজ-নিজ ক্ষেত্রে আন্দোলন চালিয়ে যায়; তবে জাতীয় আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকে। একদিকে গান্ধী-আরউইন এ্যাক্ট স্বাক্ষরিত হয়, নেহরু তা পছন্দ করেননি; আর অন্যদিকে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও অন্যান্য বিপ্লবাত্মক কর্মকা- ঘটতে থাকে। এসব ঘটানার পেছনে ছিল নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ভারতবর্ষের পূর্ণ-স্বাধীনতার দাবী (১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ, কলকাতা কংগ্রেস)। সুভাষচন্দ্র বসু সম্বন্ধে আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

আমি মনেপ্রাণে নেতাজীর ভারতবর্ষে বিশ্বাস করতাম- সে দেশ হবে আধুনিক ও ন্যায়নিষ্ঠ, এক পূর্ণ-স্বাধীন ভারতবর্ষ।

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক বোধ তাঁর অন্তরে ছিল দৃঢ়মূল। গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও গান্ধীবাদের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য থাকেনি আব্দুর রউফ চৌধুরীর। আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

সৈন্যসুলভ শৃঙ্খলা ব্যতীত ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াই করা অসম্ভব জেনেও মধ্যপন্থীর প্রতীক গান্ধীজী যেন রাগী শিক্ষকের মতো ভারতবর্ষের অধিবাসীকে তিরস্কার করছেন। তিনি তো কেবল বারংবার অনশন, হরিজন সমস্যা বা মন্দির প্রবেশাধিকার নিয়ে মেতে আছেন। তিনি জানেন ক্ষমতার চাবিকাঠি তাঁর হাতে, তাই তো অহিংসার পথ ধরে দেশের মুক্তি আনতে চান। তবে তিনি ইচ্ছা করেই ভুলে আছেন, হিংসা আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই হিংসার পথই অপরিহার্য। ভয় পাওয়ার কোনো অর্থ নেই। এছাড়া অখ- ভারতবর্ষের সৃষ্টি সম্ভব নয়। জাগ্রত তারুণ্যশক্তি আজ বিদ্রোহ প্রকাশ করছে গান্ধী-নেতৃত্বের; কারণ তারা চায় না জাতীয় মুক্তির আন্দোলন বিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিতর্ক সভায় পরিণত হোক; বরং তারা চায়, শক্তিবলে অবিলম্বে ব্রিটিশ শক্তিকে অপসারণ করে একটি অখ- ভারতবর্ষের জন্ম দেওয়া।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি স্থগিত রাখা হয়। গান্ধী ও নেহরু উভয়েই কারান্তরালে (১৯৪২-৪৫)। তখনই পেছনের দরজা দিয়ে ভারতবর্ষ বিভাজনের ব্যবস্থা শুরু হয়। জিন্নাহর ক্রমশ দাবি বাড়াতে থাকে-আলাদা জাতি, সাম্প্রদায়িক বিষয়ে ভিটো, শাসনতান্ত্রিক সংস্কারে ভিটো, জাতীয় সংহতিতে ভিটো। ১৯৪৫-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগ ভালো ফল লাভ করে; আর নেহরু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার অধিকার স্বীকার করে নেন। জিন্নাহ দাবী করেন তাঁকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হোক। কিন্তু ঐক্যবব্ধ ভারতবর্ষ সম্বন্ধে শেষ পরিকল্পনা থেকে জিন্নাহকে পিছলে যেতে পথ করে দেন নেহরু। জিন্নাহ প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পথ নেন। ভ্রাতৃরক্তে ভেসে যায় ভারতবর্ষ। এরই প্রেক্ষাপটে নেহরু চান ভারতবর্ষের (ইউনিয়ান) শাসনতন্ত্র হোক, পরে কোনো প্রদেশ চাইলে তাকে ইউনিয়ন থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। কিন্তু জিন্নাহ ও ব্রিটিশ-শক্তি কংগ্রেসকে সবদিক থেকে কোণঠাসা করে রাখে। এই সময় ভারতবর্ষে উদয় হন মাউন্টব্যাটেন। পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগ করার কথা ওঠে। জিন্নাহ তা চাননি, বলেন, ‘কলকাতা বাদ দিয়ে পাকিস্তান গড়া যেন মানুষকে তার কলিজা বাদ দিয়ে বাঁচতে বলা।’ আর নেহরু বলেন, ‘বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ অতি স্পষ্ট ও জরুরি প্রয়োজন।’ আর বড়লাট বলেন, ‘বাংলা ভাগ হবে ও পূর্ব-বাংলাকে হিন্দুস্থান বা পাকিস্তানের একটা বেছে নিতে হবে।’ আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

অখ- বাংলার স্বপ্ন মিলিয়ে যায়; জিন্নাহ ও নেহরু উভয়েই বাংলা চান। এই দুই নেতার কারণেই রক্তপিচ্ছিল কুরুক্ষেত্রের শেষে বাংলা ও পাঞ্জাব খ-িত হয়। আর অসহায় বাঙালির ও পাঞ্জাবির দীর্ঘশ্বাস চিরদিনের জন্য জিন্নাহ ও নেহরুর আত্মার অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে।

সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তানের। আব্দুর রউফ চৌধুরী লিখেছেন,

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্টের মধ্যরাতে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ঘটে রক্তপাত, পারস্পরিক ঘৃণা ও ধর্মীয় ছলনাময়ী তথাকথিত ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’-এর ভিত্তিতে; সৃষ্টি হয় ‘পাকিস্তান’ ও ‘ভারত’ নামের দুটো রাষ্ট্র। ভারতবর্ষের বিভাজনের কোলাহলের মধ্য-দিয়ে জন্ম নেওয়া, অযোগ্য রাজনীতিবিদ ও অপরিণামদর্শী সমরনায়কদের নেতৃত্বে খুঁড়িয়ে চলা, জিন্নাহের সৃষ্টি, অস্বাভাবিক ও মৃতপ্রায় রাষ্ট্র হিসেবে ‘পাকিস্তান’ বিশ্ববাসীর কাছে আত্মপ্রকাশ করে।

পাকিস্তান যুগে, পাকিস্তানে চাকুরিসূত্রে অবস্থান-কালে, আব্দুর রউফ চৌধুরী বাঙালির প্রতি পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর শোষণ নির্যাতনের ভয়াবহতা এবং তাদের বাঙালি-বিরোধী মানসিকতাকে প্রত্যক্ষ করেন, তাই লিখেছেন,

রেলগাড়িটি ড্রিগরোড স্টেশনের ইংরেজি ও উর্দুতে বড় বড় অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ডটি ফেলে গেল। তার পরই ক্যান্টনমেন্ট। রেললাইনের প্রায় সমান্তরালে বয়ে চলেছে মালীর রোড। কিছু দূর এগিয়ে যেতেই মালীর হাবভাব পরিণত হল শাহ্জাদায়, রাজকীয় জাঁকজমকে; এখানেই মালীর রোড পরিবর্তন হল ফয়সল রোডে। নাসিম উভয় পাশে তাকিয়ে দেখল, কেমন করে করাচি ফুলে ফেঁপে বড় হচ্ছে, ফুলছে তো ফুলছেই, অজগরের মতো আস্ত পেটে ঢুকিয়ে নিয়েছে ড্রিগরোডটিকে; মনে হচ্ছে এয়ারপোর্ট ও মালীর ক্যান্ট পর্যন্ত মেলে দিয়েছে তার ডানা, হয়তো-বা আরও দূরে। যতদূর দৃষ্টি পৌঁছোয় ততদূরই দেখা যাচ্ছে দালান আর দালানের সারি-পাঁচতলা, দশতলা; এরমধ্যে এক-একটি দালান অন্যগুলোর সঙ্গে আড়ি ধরে এমনভাবে ওপরে ওঠে গেছে যেন পাহাড়চূড়া। দেশবিভাগের সময় করাচির লোকসংখ্যা ছিল চার লাখ, এখন সত্তর লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ছিন্নবস্ত্রধারী ভিখারির দল নাসিমের নজরে পড়ল না। সে সত্যি সত্যি উপলব্ধি করছে যে, প্রফেসর রেহমান সোবহানের মন্তব্যগুলো সঠিক। পরীক্ষানিরীক্ষার অজুহাতে ঢাকা-দেহ-ধমনীর রক্ত শাসকগোষ্ঠী শোষণ করে এনে করাচির শিরা-উপশিরায় নবজীবন সঞ্চার করছে। ক্লাইভের খঞ্জর তারা উত্তরাধিকারের সূত্রে পেয়েছে বলেই হয়তো এমন করছে! তারা এর উপযুক্ত জবাব পাবে যদি বাঙালি জাতি একদিন জেগে ওঠে। নিজেকে আশ্বাস দিল নাসিম, সেই জাগরণের আমি হব নাবিক।

প্রসঙ্গত, বিশাল বিশ্বের মানুষের মুক্তিই ছিল আব্দুর রউফ চৌধুরীর চেতনাবোধের ভিত্তি এবং এরজন্যে সমাজতন্ত্রকেই তিনি যথার্থ দর্শন বলে বিবেচনা করেন।

রাষ্ট্র হবে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমাজ দ্বারা গঠিত সমাজতান্ত্রিক। কারণ, ‘সমাজ-বিকাশের একটি বিশেষ স্তর হচ্ছে রাষ্ট্র। আর এই রাষ্ট্রের পুরোভাগে নেতৃত্ব দেবে শ্রমীজীবী শ্রেণী বা সর্বহারা শ্রেণী।’  এরসঙ্গে শর্ত থাকবে- এই রাষ্ট্রে উৎপাদন প্রণালীর সামাজিক প্রকৃতির পূর্ণ উন্নয়ন; ভোগ্যপণ্যের ও পরিষেবার প্রাচুর্য। জয়ী হবে শ্রমিক-সর্বহারার ঐক্যশক্তি। কিন্তু ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে এমন রাষ্ট্র সৃষ্টি করা চিন্তাতীত।

আব্দুর রউফ চৌধুরী মানুষ, সমাজ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, আচরণ ও অভ্যাস ইত্যাদি ব্যাপারে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ শ্রমিক দলে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে, এবং পরে ব্রিটিশ ওয়ার্কাস দলে যোগ দেন। তখন থেকেই বিশ্ব-বিপ্লবী সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের রচনা পড়তে থাকেন-সৃজনশীল সাহিত্য, সাহিত্যালোচনা, দর্শন সবই। কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো ও মাকর্স-এঙ্গেলসের রচনার সঙ্গে পরিচিত হন। তাই হয়তো সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনে তাঁকে ব্যথাহত করে।

সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনে তাঁকে ব্যথাহত হতে দেখেছি। তিনি সমাজতন্ত্রী বা কমিউনিস্ট ছিলেন না। হতেও চাননি কোনওদিন; তবু তাকে বলতে শুনেছি- ‘সমাজতন্ত্র তো মানুষকে দারিদ্র্য আর অত্যাচার উৎপীড়ন থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়। মানুষকে মুক্ত করার এর কী কোনো বিকল্প আছে? মানুষের মঙ্গল আর কল্যাণ চাইতেন বলেই তিনি পূর্ব-ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির জন্য ব্যথাহত হয়েছিলেন। আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির ভূমিকার কথা তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেন। নেলসন ম্যা-েলাকে তিনি মনেপ্রাণে শ্রদ্ধা করতেন, তাঁর অকুতোভয় সংগ্রামী ভূমিকার জন্য। ইয়াসির আরাফাত তাঁর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার মানুষ।

পাকিস্তানে অবস্থান-কালেই পাকিস্তানিদের প্রতি তীব্র ঘৃণা, ক্ষোভ এবং প্রতিবাদের স্পৃহা তাঁর মধ্যে জন্ম নেয়। সেই অবদমিত ইচ্ছার প্রথম সুযোগ আসে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে, তাই ৭ই মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার পর থেকেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে লন্ডনে কাজ শুরু করেন। ২৫শে/২৬শে মার্চের রাতের  পৈশাচিকতার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তির পক্ষে সোচ্চার হয়ে উঠেন। বিশ্বজনমত গঠনের জন্য ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহর ভ্রমণ করেন ও বক্তৃতা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের জন্য তহবিল সংগ্রহে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। এমনকি জুতো-পলিশ করে অর্থ সংগ্রহ করেন। ব্রিটেনের রাষ্টীয় পর্যায়ে সরকারি সাহায্য সহযোহিতার জন্য আবেদন জানিয়ে চিঠিপত্র প্রেরণ করেন। এছাড়াও সর্বাবস্থায়ই কলকাতাস্থ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এসময়ে ইংল্যান্ডে তিনি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর অন্যতম সহকারী হিসেবে কাজ করেন।

আব্দুর রউফ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধকে একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করেননি। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও বিশ্বাস অন্তরে লালন করেন সর্বদাই। দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন যেমন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তেমনি তাঁর কাছে মূল্যবান ছিল বাঙালির সার্বিক মুক্তির স্বপ্ন। সে-কারণে বাঙালির ওপর পাকিস্তানিদের নির্যাতনকে প্রেক্ষাপট হিসেবে নিয়ে দেশ, জাতি ও জাতির জনকের কথা ফুটিয়ে তুলেছেন ‘’৭১-এর কবিতা’-য় ও প্রবন্ধে (‘একটি জাতিকে হত্যা’, ‘১৯৭১’, ‘স্মৃতিতে একাত্তর’ ইত্যাদি গ্রন্থ)। এসব আংশিকভাবে ‘জনমত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। শুধু ১৯৭১-এর কবিতা ও প্রবন্ধেই নয়, প্রায় সকল গ্রন্থেই তিনি দেশমাতৃকার কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। এ-প্রসঙ্গে সৈয়দ শাহান উদ্দিনের মন্তব্য স্মর্তব্য,

মৃত্যুমুখী বৃদ্ধ বয়সেও আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর কলম থেকে দ্রোহের কালি ঝরিয়েছেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে। মওদুদীবাদী, রাজাকার, আল-বদরদের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই ছিল আমৃত্যু। তাঁর লেখা পড়লে মনে হয় তিনি, ফুল, পাখি, প্রেম নিয়ে গল্প লিখতে অভ্যস্ত নন। সাহিত্যে আদিম প্রবৃত্তি জাগিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন নারাজ। তিনি নিরন্তর লড়াই করেছেন বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান প্রতিবন্ধকতা মৌলবাদ ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে। তিনি ফেটে পড়েছেন প্রতিবাদে। জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন জাতির বিবেকী সত্তা।

মুক্তিকামী জনতার লেখক আব্দুর রউফ চৌধুরী ছিলেন একদিকে সমাজসেবক, লেখক, রাজনীতিবিদ অন্যদিকে উন্নত-জীবনের সন্ধানে ব্যাকুল হৃদয়ের একজন অসাধারণ মানুষ। যে-হৃদয় সংকীর্ণ দলাদলির রাজনীতির কথা বলে না, সে-হƒদয়ে উচ্চারিত হয় শোষণের কবল থেকে মুক্ত-পাওয়ার ঘোষণা। দুর্বার উচ্চারণ। সাহসী উচ্চারণের অপরনামটিই হচ্ছে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী। সত্য-প্রকাশে উজ্জীবিত তাঁর রচনাবলী। আব্দুর রউফ চৌধুরী এসেছিলেন তরুণ-তরুণীকে তাদের পিতৃ-পুরুষের সবলতার গৌরবময় কাহিনী আর দূর্বলতার কলঙ্ক মুছে দেওয়ার কথা শোনাতে। তিনি বলেছেন,

‘সমস্যাকে আমি ধামাচাপা দিতে চাই না, চাই তার সমাধ্যান।’  […] ‘আমি স্বপ্ন দেখি সেই বাংলাদেশের যেখানে মুক্তচিন্তার ব্যাপক চর্চা বিদ্যমান, যেখানে সেগুলোর মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে প্রগতিশীল চিন্তাধারার বিকাশ নির্বিঘেœ প্রকাশ পাচ্ছে।’

ন্যায় পরায়ণতা ও স্পষ্টবাদিতা ছিল আব্দুর রউফ চৌধুরীর বড় গুণ। আর সেজন্যেই তিনি নিঃসংকোচে এবং গর্বোদ্ধত শিরে সত্য-প্রকাশ করে গিয়েছেন, ফলে তাঁর সাহিত্য অকৃত্রিম দরদে পাহাড়ী ঝরণার মতো বহমান এবং সংগ্রামী অনুপ্রেরণার এক বিরাট উপাদান। আব্দুর রউফ চৌধুরী জানতেন প্রতিক্রিয়াশীল শাসকের ক্ষমতা অসীম। তাদের টাকা, তাদের সম্পত্তি, তাদের প্রতিপত্তি, তাদের ভাড়াটে গু-াবাহিনী, তাদের প্রচার মাধ্যম, তাদের অস্ত্র ব্যবহার- এককথায় কোনোকিছুরই কমতি নেই; তবুও তিনি যে-আশায় বুক বেঁধে শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন, শোষণ-অবসানের স্বপ্ন দেখতেন তা শুধু তরুণ-সমাজের শক্তির জোরে। তিনি বিশ্বাস করতেন তরুণ-সমাজের সম্মিলিত সচেতন দৃঢ়-ঐক্যবব্ধ বিপ্লবের মাধ্যমে একদিন অনৈক্যের পাহাড় সমান অন্যায়ের সমাপ্তি ঘটাবেই। সমাপ্তি ঘটাবে তরুণ-সমাজ তাদের নিজের স্বার্থেই। ড. মুনতাসীর মামুন বলেছেন,

‘মানুষের মঙ্গল কামনা আব্দুর রউফ চৌধুরী মানবিক দর্শন থেকেই করেছিলেন- আমরা তাঁর রচনায় সবসময় দেখি।’

তরুণ-সমাজের প্রতি আব্দুর রউফ চৌধুরীর আস্থা ছিল অবিচল। এই সমাজের শক্তির প্রতি অসীম আস্থা ছিল বলেই তিনি তাঁর ‘প্রবন্ধগুচ্ছ’-এ পৃথিবী বদলানোর কথা বলতে পেরেছিলেন। প্রবল বিশ্বাসে তিনি এই-সমাজের উপর নির্ভর করতে পেরেছিলেন বলেই বলেছেন,

‘আমি স্বপ্ন দেখতেই চাই এমন এক বাংলাদেশের যেখানে উৎপীড়নের দৌরাত্মা নেই, শাসকের শোষণ ও নির্যাতন নেই, ধন-বণ্টনে বৈষম্য নেই, জাতপাতের বালাই নেই।’

দুনীর্তি ও শোষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সত্রিকারের স্বাধীনতার সুফল প্রত্যেক মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার দৃঢ়-সংকল্প গ্রহণ করতে তরুণ-সমাজের প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন,

‘হে নব যুগের কিশোর-কিশোরী তরুণ-তাজা-প্রাণ, ছিন্ন করো বন্ধনের এই অন্ধকার।’

শোষকের রক্তচক্ষুকে ভ্রুকুটি হেনে উপেক্ষা করার প্রেরণাও আছে আব্দুর রউফ চৌধুরীর সাহিত্যে। তাই নিন্দি¦ধায় বলা যায় যে, লেখক হিসেবে, মানুষ হিসেবে একজন তরুণ-সমাজের কর্মী হিসেবে আব্দুর রউফ চৌধুরী ছিলেন মাটি ও মানুষের আপন মানুষ। আজ কোনো ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর সার্টিফিকেটের প্রয়োজন নেই; ইতিহাসই তার কষ্টি পাথরে যাচাই-বাছাই করেই বলবে- আব্দুর রউফ চৌধুরী মানুষের লেখক, তরুণ-সমাজকে জাগিয়ে তোলার লেখক, তিনি দ্রোহী কথাসাহিত্যিকই বটে। চির তরুণ-লেখক আব্দুর রউফ চৌধুরী ছিলেন বঞ্চিত সকল তরুণদের অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি তাঁর চিন্তাচেতনায় সর্বকালের সকল তরুণ-বিপ্লবীদের সঙ্গী। তাঁর বক্তব্যের স্পষ্টতাই তাঁকে এনে দিয়েছে এই দ্বিবিধ গুণ। যে-সাহিত্য তরুণদের কাজে আসে না, সে-সাহিত্য তিনি রচনা করেননি। চিরন্তন রস আস্বাদনের সাহিত্য তিনি সৃষ্টি করেছেন কী না তা জানা নেই, তবে চিরাচরিত অকেজো-অসুস্থ সমাজ ভাঙার ডাক তিনি ঠিকই দিয়েছেন তাঁর গবেষণায়, তাঁর গল্পে, তাঁর উপন্যাসে, তাঁর প্রবন্ধে, তাঁর কবিতায়; যে-ডাক তাঁর নিজস্ব, যে-ডাক গ্রহণ করলে বাংলা-সাহিত্য আরো প্রাণশক্তি পাবে, আরো বেগবান হবে।

 

  সাহিত্য ও সামাজ সাধনা

প্রবাস জীবনে জনাব আব্দুর রউফ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, মুক্তিযুদ্ধের সফলতার জন্য নানাভাবে কাজ করেন, অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২২শে নভেম্বর, দেশে ফিরে, কলেজ কোয়ার্টারস্থ ‘নাজমুন কুটির’, নিজ বাসভবনে, নীরবে সাহিত্য সাধনা শুরু করেন। সমাজের নানাবিধ কুসংস্কার, ধর্মীয় ভন্ডামি, রাজনৈতিক ও নৈতিক অবক্ষয় দেখে তিনি বিচলিত হতেন। এসবের বিরুদ্ধে তিনি লেখনী  ধারণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরার জন্য তিনি লেখনীর মাঝে স্বাধীনতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর মুখোশ উন্মোচন করেন। এক সময় নিজের সন্মোহনী শক্তি দিয়ে তিনি কাছে টেনে নেন হবিগঞ্জের সাহিত্য অনুরাগী তরুণদের। তরুণদের নিয়ে তিনি ভাবতেন, ভাবাতেন। নানা অসঙ্গতি ও জিজ্ঞাসা তিনি তরুণদের সামনে তুলে ধরতেন। নতুন চেতনায়, নতুন ভাবনায় তরুণদের মনকে আলোড়িত করতেন। হবিগঞ্জের তরুণদের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘সংযোজন’ নামে একটি সংগঠন, তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। নিজে সমুদয় টাকা দিয়ে সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশে উৎসাহ দিতেন। সংগঠনের শ্লোগান নির্ধারণ করে দেন ‘জয় নব উত্থান’। এভাবেই আব্দুর রউফ চৌধুরী সবার অলক্ষ্যেই হয়ে উঠেন হবিগঞ্জের তরুণ সমাজের নয়নমণি। তরুণদের সঙ্গে নিয়ে আগামী দিনে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে তিনি সারাক্ষণ বিভোর থাকতেন।

আব্দুর রউফ চৌধুরী নিজে ছিলেন সাহিত্যিক-কঠিন-কঠোর জীবনের উপস্থাপক। সবার উপরে মানুষ এই সত্যের প্রতিধ্বনি তাঁর সাহিত্য-ভা-ার। শুধু সাহিত্য সৃজনই করেননি, পড়াশোনাও করেছেন একই মাত্রায়। বিলাতে ও হবিগঞ্জে সমৃদ্ধ পারিবারিক পাঠাগার গড়ে তুলেন, যা অনেক শিল্পী-সাহিত্যিকদের আকৃষ্ট করে। অন্যদিকে হবিগঞ্জের তরুণ সাহিত্যসেবীদের তিনি ছিলেন পৃষ্ঠপোষক। দীপুল কুমার রায় বলেছেন,

একথা বলতে দ্বিধা নেই- দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী হবিগঞ্জের সাহত্য অনুরাগী তরুণ সমাজকে সাহসী করে গেছেন। জ্ঞানচক্ষু দান করে গেছেন। বক্তৃতার মঞ্চে নবীন প্রবীণ সকলেই আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদে ও সত্য উচ্চারণে ভীরু ও ক্ষীণকণ্ঠ ছিলাম। আব্দুর রউফ চৌধুরীই আমাদেরকে সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলার সৎ সাহস দিয়ে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের স্বপক্ষে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাঁর সেই মাথা নত না করার দ্রোহী চেতনাই তরুণদের আগামী দিনের পথ চলার পাথেয়। দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী যখন বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়াতেন তখন থরথর করে কাঁপতেন। কাঁপতেন তিনি ক্ষোভে, দুঃখে। তাঁকে তখন মনে হত বাইশ বছর বয়সী বাংলা মায়ের এক প্রতিবাদী যুবক। দেশের জন্য যেকোনো মুহূর্তে তিনি মরতে প্রস্তুত। বুক পেতে দিতে প্রস্তুত। তর্জনী উচিয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি তরুণদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কথা বলতেন, বলতেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের, ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা। তিনি স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিকে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তরুণদের আহ্বান জানাতেন।

জীবনের শেষ-পর্যায় তাঁকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জে গড়ে ওঠে সাহিত্যের আসার। নির্লোভ, নিরহঙ্কারী সানুষটি সহজেই আপন করে নিতে পারতেন সকলকে, তাই তরুণরা ছিল তাঁর ভক্ত। ‘হবিগঞ্জ সাহিত্য পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি ছিলেন। ‘খেলাঘর’, ‘পায়রা’ ও ‘শ্বেত পায়রা’সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। এমনকি ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে মুকিমপুর মাদ্রাসার সভাপতি ও ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে ‘হবিগঞ্জ ইসলামিয়া এতিমখানা’-র প্রতিষ্ঠাতা অবৈতনিক কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। আর প্রবাসে, ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের ‘বেডফোর্ড পাকিস্তান সোসাইটি’র সাধারণ সম্পাদক, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ‘সেন্ট আলবানস বাংলাদেশ এ্যাকশন কমিটি’-র আহবায়ক, ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ‘কিংস ক্রুস মস্ক ও ইসলামিক সেন্টার’-এর সভাপতি ছিলেন।

 

  শেষজীবন ও মৃত্যু

২১ নভেম্বর ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসেন। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পর অগাধ অবসর জীবনের সূচনা হয় তাঁর। কিন্তু তিনি অবসরকে বিশ্রামের সময় হিসেবে গ্রহণ করেননি, করেন সাহিত্য ও সমাজসেবার সুযোগ হিসেবে। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেন সাহিত্য-সৃষ্টি ও প্রগতিশীল সমাজ-মানস গঠনে। এইসময় তিনি সর্বাধিক গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেন। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে, ‘গুণীজন ও শ্রেষ্ঠ লেখক’ হিসেবে সংবর্তিত হন।

আব্দুর রউফ চৌধুরী সমাজের দশজনের একজন নন, তিনি এগারো জন। বয়সে প্রবীণ হলেও চিন্তাচেতনায় তিনি ছিলেন চির নবীন। আব্দুর রউফ চৌধুরীর মৃত্যু বৃদ্ধদের গতানুগতিক জীবনাবসান নয়। এই সদালাপি দেশপ্রেমী মানুষটি ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে, সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে তাঁর প্রিয় সংগঠন ‘হবিগঞ্জ সাহিত্য পরিষদ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত হবিগঞ্জ মুক্ত স্কাউট ভবনে মহান একুশ স্মরণে আয়োজিত আলোচনা মঞ্চে বক্তৃতারত অবস্থায় হঠাৎ করে হৃদয়যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। প্রকৃতপক্ষে এইদিন তিনি মৃত্যুবরণ করেননি, মৃত্যুর মাতৃগর্ভ থেকে লাভ করেছেন নবজন্ম। অন্ধকার ও অজ্ঞানতার জঞ্জালস্তূপে দাঁড়িয়ে তিনি সেদিন এই মঞ্চে দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন সত্য ন্যায় ও মানবতার দুর্জয় বাণী। উত্তেজিত হলে যেকোনোমুহূর্তে তাঁর হƒদপি- বন্ধ হয়ে যাবে- ডাক্তরের এ সতর্কবাণী তাঁর জানা ছিল। তবুও সত্য উচ্চারণে, সত্যের প্রচারে তিনি নিজের জীবনকেও তুচ্ছ মনে করেন। হবিগঞ্জের বিভিন্ন সভা মঞ্চে গর্জে উঠতেন এই চিরতরুণ। সেদিনের এই আলোচনা চক্রে যখন বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙলা ভাষা নিয়ে বিতর্ক উঠে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী তখনই অকাট্য যুক্তি তুলে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। মাতৃভাষা অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে করতে আলোচনার মঞ্চে বীরের মতো আব্দুর রউফ চৌধুরী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

আমি বলবো আব্দুর রউফ চৌধুরী আসলে মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেও আমাদেরকে বাঁচাতে চেয়েছেন মৃত্যুদশা থেকে। হবিগঞ্জের সবচেয়ে সাহসী তরুণের নাম আব্দুর রউফ চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অকুতোভয় সৈনিকের নাম আব্দুর রউফ চৌধুরী। তিনি আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে নিজের মাঝে লালন করেছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ ধারক ও বাহক। খুব কাছে থেকে তাঁকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার, তাঁর মধ্যে কোনো ভন্ডামি ছিল না, ছিল না কোনো দোদুল্যমানতা। উচ্চারিত বিশ্বাস ও আদর্শের সাথে তার জীবনাচরণের কখনো বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম ছিল না।

ভাষা-শহীদদের স্মরণ করতে করতেই তাঁর মৃত্যু। এই মৃত্যু গৌরবের। মৃত্যুকালে অনেক সুধীজন তাঁর পাশে ছিলেন। লেখকের মৃত্যুতে হবিগঞ্জে গভীর শোকের ছায়া নেসে আসে। হবিগঞ্জের নিজ বাসভবনে, ‘নাজমুন কুঠির’, ২৭ কলেজ কোয়ার্টারে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে সমাগত হয়। একই দিন বিকেল পাঁচটায় স্থানীয় শিরিষতলায় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, এবং পরে জন্মস্থান মুকিমপুরে রাত ৭টায় আবারও নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এই মুকিমপুরেই তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁর মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ১লা মার্চ ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে হবিগঞ্জ টাউন হলে নাগরিক শোকসভায় সর্বস্তরের মানুষ তাঁদের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেন।

দ্রোহী আব্দুর রউফ চৌধুরী যতক্ষণ বক্তৃতা করতেন আমরা উদ্যোক্তরা ততক্ষণ শঙ্কিত থাকতাম। না জানি কখন কী অঘটন ঘটে যায়। কিন্তু তাঁকে বারণ করার সাহস আমাদের কারও ছিল না। সাহস করে কেউ অনুরোধ করলে তিনি ভীষণ ক্ষেপে যেতেন। বলতেন, তোমাদের সাহস না থাকলে আমি মরবো, আক্রান্ত হলে আমি হবো, তবু যা সত্য তা আমাকে বলতেই হবে। দ্রোহী কথাসাহিত্যিক  আব্দুর রউফ চৌধুরী স্বভাবে শান্তশিষ্ট, খুবই অমায়িক ও সদালাপী ছিলেন। কিন্তু এই শান্ত মানুষটির ভিতরে ছিল দ্রোহের আগ্নেয়গিরি। যখনই যে স্থানে বাংলা মাকে, বাংলা ভাষাকে, বাঙালির সংস্কৃতিকে কটাক্ষ করা হত, সেখানেই তিনি তাঁর প্রতিবাদের ঝা-া ঊর্ধ্বে তুলে ধরতেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী বিদ্রোহী কেন? বড় মাপের প্রেমিক ছিলেন বলেই তিনি দ্রোহী। বাংলা মাকে, বাংলার মানুষকে, বাংলা ভাষাকে গভীরভাবে ভালবাসতেন বলেই তিনি দ্রোহী। বড় প্রেমিকের বড় জ্বালা। তাই তিনি দ্রোহে গরগর করতেন। গভীর ভালবাসাই তাঁকে প্রবল বিদ্রোহী করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন শোষণ বঞ্চনামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য। কিন্তু স্বাধীনতার পঁচিশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হওয়ায় এক গভীর ব্যাথা তাঁর অন্তরকে সারাক্ষণ পীড়িত করত। তাই লেখনীর মাধ্যমে আবার তিনি নতুন করে মুক্তিসংগ্রাম শুরু করেছিলেন।

 সাহিত্যকথা

  সাহিত্য-সাধনা

আব্দুর রউফ চৌধুরী কখনোই সাহিত্য-কর্ম বা লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেননি। তাই তাঁর লেখকজীবন অপরাপর অনেক জনপ্রিয় ও কলমপেশা লেখকের মতো ধারাবাহিক নয়। তাঁর প্রায় সকল রচনাই মনের আনন্দের বা ক্ষোভের ফসল। সামাজিক সংস্কার, অর্থনৈতিক দুরাবস্থা, প্রবাসী জীবনযাপন এবং বৈচিত্র্যময় কর্মজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁকে লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশে তাড়িত করে। সচরাচর কোনো শিল্পী-সাহিত্যিকের জীবনের ঊষালগ্নে- তাঁর শৈশবেই ভবিষ্যৎ সৃষ্টি-সম্ভাবনার উন্মেষ লক্ষ্য করা যায়- আব্দুর রউফ চৌধুরীর ক্ষেত্রে ঠিক তেমনি ঘটেনি। তবে তাঁর প্রথম লেখা কৈশোরেই, যখন তিনি সাধুহাটি স্কুলের ছাত্র। বিষয়বস্তু ছিল নৌকা। এই লেখা তাঁর শিক্ষকদের চমৎকৃত করে। এরপর দীর্ঘদিন তাঁর রচনার আর কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে তাঁর সাহিত্যিক-জীবনের স্ফূর্তি ঘটে ইংল্যান্ডে; প্রবাসে। পাকিস্তানে অবস্থানকালে পাকিস্তানি ও বাঙালিদের মধ্যে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য এবং ধর্মের নামে পাপাচার তাঁকে ক্ষুব্ধ করে, ফলে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর চাকুরি ছেড়ে দেওয়ার পর থেকেই পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে প্রবাসী হওয়ার পর থেকে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, ধর্ম ও দর্শনভিত্তিক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন; যেমন ‘নাম মোছা যায় না’ (১৯৬৩), ‘বাইবেলে সত্য নবী মুহাম্মদ (সা.)’ (১৯৬৮), ‘ধর্মের নির্যাস’ (১৯৬৫) ইত্যাদি গ্রন্থের পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেন, পরে এসব গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও লিখেন বিজ্ঞান ও ধর্মকে নিয়ে ‘যে কথা বলা যায় না’ ও ‘বিপ্লব ও বিপ্লবীদের কথা’ গ্রন্থ দুটির পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেন, এখনো অপ্রকাশিত। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে, বিলাত ফিরে, ‘নতুন দিগন্ত’-এর পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেন, প্রথম খসড়ার সমাপ্তি ঘটে ১৯৮৩-তে, তবে পরিপূর্ণতা লাভ করে ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে। ‘নতুন দিগন্ত’ উপন্যাসকে কেন্দ্র করে তাত্ত্বিক ও রসবেত্তাদের শিল্পচিন্তায় ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ’ দেখা দেয়। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে ‘পরদেশে পরবাসী’-র পান্ডুলিপির নকশা প্রস্তুত করেন, তবে এর পরিপূর্ণতা লাভ করে ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে। আর ১৯৬৮-১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা’ গ্রন্থের পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানিদের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখেন, যা আংশিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘জনকণ্ঠ’ পত্রিকায়, ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে ‘একটি জাতিকে হত্যা’ শিরোনামে। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের সময়সীমায় তিনি শেষ করেন দুই খ-ে ‘১৯৭১’ গ্রন্থটি; আর ‘আমি মুহাম্মদ আলী বলছি’, যা ধারাবাহিকভাবে ‘জনমত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, তবে গ্রন্থ হিসেবে অপ্রকাশিত। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি কথাসাহিত্যের পাশাপাশি কিছু কবিতাও রচনা করেন, তখন ও পরে এসব ‘জনমত’ ও ‘সুরমা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বেশকিছু ছোটগল্পও রচনা করে, এর মধ্যে কয়েকটি ‘জনমত’ ও ‘সাগরপাড়ে’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি শেষ করেন আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘লিখে যাচ্ছি আমার জীবন কাহিনী’, এ-বছরই লেখকের মা নাজমুন নেসা চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন। ৯ই সেপ্টম্বর ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে স্ত্রীকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার পর লেখকের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও আনন্দঘন জীবনের সূচনা ঘটে। এই সময়েই তাঁর উপন্যাস ‘মা’-র পান্ডুলিপি সমাপ্ত করেন।  লন্ডনের ‘কিংসক্রস মস্ক ও ইসলামিক সেন্টার’ প্রতিষ্ঠানকালীন সভাপতি হন ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে, আর তখনই বিভিন্ন সমস্যা-প্রতিবন্ধকতা, প্রবাসী মানুষের আশা-নিরাশা, দ্বিধা-দ্বন্দ¦, আত্মকলহ এবং দোদুল্যমানতায় ব্যতিত হন। সেই বেদনারই কথাভাষ্য রচনা করেন ‘সাম্পান ক্রুস’ ও ‘অনিকেতন’ উপন্যাস দুটোর মাধ্যমে, ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ‘রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত জগৎ’ ও ‘নজরুলের সঙ্গীত জগৎ’ এই দুটি গ্রন্থের এবং ১৯৮৭-৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘রবীন্দ্র-নজরুল’ গ্রন্থের পান্ডুলিপিগুলো প্রস্তুত করেন। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি দেশে ফেরার পর নিরঙ্কুশ অবসর জীবনে সমাজসেবা ও সাহিত্য রচনায় মেতে ওঠেন। ১৯৯০-৯৬ এর মধ্যে প্রস্তুত করেন ‘গল্পসম্ভার’, ‘গল্পভুবন’, ‘ইসলাম ও সমাজতন্ত্র’, ‘যুগে যুগে বাংলাদেশ’, ‘বিদেশী বৃষ্টি’, ‘ইংল্যান্ডের দিনগুলি’, ‘প্রবন্ধগুচ্ছ’, ‘মহান একুশে’, ‘বাঙালির উৎস সন্ধানে’, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, ইত্যাদি। এছাড়াও পূর্ব-লিখিত কয়েকটি গ্রন্থ, সংক্ষিপ্ত আকারে, এ-সময়ে প্রকাশ করেন। লেখকের বেশির ভাগ গ্রন্থ ও তাঁর দিনলিপিকা আর্থ-সামাজিক ও সাহিত্যের দিক থেকে খুবই মূল্যবান সম্পদ।

 

  সাহিত্য-ধারা

ড. মনিরুজ্জামানের বিন্যাস অনুযায়ী আব্দুর রউফ চৌধুরীর সাহিত্য-ধারা এইভাবে বিভক্ত করা হয়-

 

১. ইসলাম বিষয়ে মৌল ও অনুবাদ মূলক রচনা

ক. মৌলিক : ‘নাম মোছা যায় না’ (১৯৮৯), ‘বাইবেলে সত্য নবী মুহাম্মদ (সা.)’ (২০০০), ‘ধর্মের নির্যাস’ (১৯৯০), ‘ইসলাম ও সমাজতন্ত্র’ (অপ্রকাশিত), ‘পথ’ (অপ্রকাশিত)।

খ. অনুবাদমূলক : ‘মুহাম্মদ (স.) ইসলামের নবী’ (১৯৯০); মূল: কে. এস. রামকৃষ্ণ রাও।

 

২. মননশীল গদ্য রচনা

ক. প্রবন্ধ : ‘প্রবন্ধগুচ্ছ’ (১৯৯৭), ‘রবীন্দ্র-নজরুল’ (আংশিক প্রকাশ ১৯৯৮, সম্পূর্ণ গ্রন্থ অপ্রকাশিত), ‘রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত জগৎ’ (২০০০), ‘নজরুলের সঙ্গীত জগৎ’ (২০০০)।

খ. গবেষণা ও ইতিহাস: ‘একটি জাতিকে হত্যা’ (২০০৩), ‘স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা’ (২০০৯), ‘১৯৭১’ (প্রথম খ- ২০১২, দ্বিতীয় খ- ২০১৩), ‘যুগে যুগে বাংলাদেশ’ (২০০৩), ‘মহান একুশে’ (২০০৮), ‘স্মৃতিতে একাত্তর’ (আংশিক প্রকাশিত), ‘সিপাই বিদ্রোহ’ (অপ্রকাশিত), ‘বাঙালির উৎস সন্ধানে’ (অপ্রকাশিত), ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ (অপ্রকাশিত), ‘বিপ্লব ও বিপ্লবীদের কথা’ (অপ্রকাশিত)।

৩. সৃষ্টিশীল রচনা

ক. কবিতা : ‘’৭১-এর কবিতা’ (১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত), ‘কবিতাগুচ্ছ’ (অপ্রকাশিত)।

খ. উপন্যাস : ‘পরদেশে পরবাসী’ (২০০৩), ‘নতুন দিগন্ত সমগ্র’ (তিন খ-: ২০০৫), ‘সাম্পান ক্রুস’ (১৯৯৩), ‘অনিকেতন’ (অপ্রকাশিত), ‘মা’ (অপ্রকাশিত)।

গ. ছোটগল্প : ‘গল্পসম্ভার’ (২০১২), ‘বিদেশী বৃষ্টি’ (২০০১), ‘গল্পভুবন’ (২০১৩), ‘গল্পসল্প’ (২০০৫)।

 

৪. বিবিধ

ক. স্মৃতিকথা: ‘ইংল্যান্ডে দিনগুলি’ (১৯৯৫)।

খ. আত্মজীবনী: ‘লিখে যাচ্ছি আমার জীবন কাহিনী’ (অপ্রকাশিত)।

গ. চিঠিপত্র: ‘চিঠি-পত্রাবলী’ (অপ্রকাশিত)।

ঘ. অন্যান্য: ‘যে কথা বলা যায় না’ (অপ্রকাশিত), ‘আমি মুহাম্মদ আলী বলছি’ (‘জনমত’ পত্রিকায় আংশিক প্রকাশিত, ১৯৭১-১৯৭৫)।

 

 

সাহিত্য-মূল্যায়ন

 

 ইসলাম বিষয়ে মৌল ও অনুবাদ মূলক রচনা

দ্রোহী কথাসাহিত্যিক ও গবেষক আব্দুর রউফ চৌধুরী সম্পর্কে অনেকই খুব একটা জানেন বলে মনে হয় না। কারণ, তিনি বিদেশেই বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন। আপন মনে কাজ করে গেছেন, প্রচারের কথাটি ভাবেননি। তিনি যা লিখেছেন জীবনভরে, নিজের উদ্যোগে, নিজের প্রচেষ্টায়। মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, কুসংস্কারের কথা জানানোর এবং লেখার অদম্য উৎসাহ ছিল তাঁর। সে উৎসাহে যে ক’টি বছর লিখেছেন, পুরোদমে লিখে গিয়েছেন। কখনো কলম থামেনি। লেখা প্রকাশ করার দায়িত্বও নিজে নিজে নিয়েছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে। কে না জানেন, প্রকাশনার ব্যাপারটার সঙ্গে আর্থিক স্বচ্ছলতা-অস্বচ্ছলতার ব্যাপারটাও জড়িত থাকে। তাই লেখককে প্রকাশের কাছে দৌড়াতে হয়। তারপর কিছু শর্ত মেনে নিয়েও পান্ডুলিপি চুরি হয়ে যায় বা মাঝেমধ্যে ঠিকমতো ছাপানো হয় না। আব্দুর রউফ চৌধুরী নিজের গাঁটের পয়সা দিয়ে ইসলাম বিষয়ে মৌল ও অনুবাদ মূলক রচনাগুলো ছাপিয়ে ছিলেন। বইয়ের দাম ওঠে এল কি না তা নিয়ে চিন্তা করেননি। জ্ঞান লোকের মধ্যে প্রকাশিত হোক, জ্ঞান সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়–ক, এই ছিল তাঁর মধ্যে বড় বিবেচনা। বিশ বছর আগে তাঁর সঙ্গে হৃদ্যতার সুযোগ নিয়ে এক সাংবাদিক তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এত ভালো লিখেন কিন্তু আপনার রচনাগুলো খুব একটা প্রচার করা হয়নি কেন? তিনি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন,

‘আমার অবস্থাটা তো দেখবেন, আমি লিখি, আমিই ছাপাই আমার টাকায়, আমিই বই বিক্রেতাদের কাছে দেই আর লেখা প্রচার করতে হলে তা করতে হবে আমাকেই।’  আজ দেশের ভিতরে এবং বাইরে আব্দুর রউফ চৌধুরীকে যেভাবে প্রচার করা উচিত ছিল তা করা হয়নি। অথচ করলে বাঙালির সম্মান বাড়তো। এ-প্রসঙ্গে ড. রাজীব হুমায়ূনের একটি কথা তুলে ধরা উচিত, ‘আমি একবার আশ্চর্য হয়েছিলাম যখন আমরা খুঁজে বের করেছিলাম আরজ আলী মাতুব্বরকে, এখন দ্বিতীয়বার আশ্চর্য হলাম আমরা যখন আবিষ্কার করলাম আব্দুর রউফ চৌধুরীকে। তাদের মতো দার্শনিক বাংলাদেশে বিরল।’

আব্দুর রউফ চৌধুরী প্রচুর পরিশ্রম করে ইসলামের উপর যে গবেষণা করেছেন এবং বই ছাপিয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাস যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন বেঁচে থাকবে। কিন্তু তাঁর রচনাগুলো বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেওয়াই হবে বাঙালির কাজ, রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সারাজীবন ধরে নানা উৎস থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদানের কথা যে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখেছেন এবং সংগ্রহ করেছেন তিনি হচ্ছেন আব্দুর রউফ চৌধুরী।

‘অষ্টম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সুদীর্ঘ পাঁচ শত বৎসর দুনিয়ার সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান মুসলমানের হাতে ছিল। জুনদিশপুর থেকে বাগদাদ-কায়রো, সিসিলি-স্পেন থেকে ক্রমবিস্তৃত বিশ্বের সর্বত্র। সত্যি কথা হচ্ছে―জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে ইসলামের অবদানকে অতিরঞ্জন করা অসম্ভব। পাশ্চাত্ত্য জগৎ যে বিজ্ঞান, কলা ও কারিগরি বিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করেছে তার মূলে ছিল ইসলামের জ্ঞান-পিপাসু প্রবৃত্তি। গ্রীসের চিকিৎসাবিদ্যা ভুলে যায় মধ্যযুগীয় ইউরোপবাসী। মুসলিম প-িতগণ তা পুনরুদ্ধার করেন। তারপর প্রচার করেন। পূর্ব-ভারতীয় অর্থাৎ বাঙালির সংখ্যা নির্দেশক চিহ্ন শূন্য, পরবর্তীতে আরবি বলে পরিচিত, যা বে-মানান রোমান পদ্ধতিতে, তাকে অপসারিত করে, অঙ্কশাস্ত্রে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে দৈনন্দিন জীবনে বিপ্লব সৃষ্টি করে মুসলমানরা। মুসলমানরা চীন থেকে আহরণ করে কাগজ প্রস্তুতকরণ বিদ্যা, যা পরবর্তীতে শিক্ষাজগতে আমূল পরিবর্তন সাধন করে। তেমনি আড় ধনুর প্রবর্তন সমরাঙ্গণে নতুন মাত্রা যোগ করে। নকশা করা রেশম, স্বচ্ছ রঙ মিশ্রিত কাচ, স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত ইস্পাত, শামিয়ানা সমন্বিত বিছানা, গালিছা, অভিনব রঙের বাহার, ধনুরাকৃতি খিলান সংযুক্ত অট্টালিকা তৈরির কৌশল, কাচের আয়না, সাধারণের জন্য ¯œানাগার, বীণা বাদ্য, নাকড়া, চমকপ্রদ গল্পগুজব ইত্যাদি চিত্তবিনোদন সামগ্রী―এসবই হচ্ছে মুসলমানের সার্থক বাস্তবায়ন।’

ইসলাম বিষয়ে মৌল ও অনুবাদ মূলক রচনাগুলো হচ্ছে বিষয়ের দিক থেকে প্রধানত- এক. ধর্ম ও দর্শন; দুই. সমাজসংস্কার। সন্দেহ নেই প্রাবন্ধিক হিসেবে আব্দুর রউফ চৌধুরী একটু বেশি দুরূহ, অতিরিক্ত উচ্চ ও গভীর ভাবনাকে আশ্রয় করেছেন; এসব গ্রন্থ  বিষয়ের ভারে গভীর হলেও যে যুক্তি ও বস্তুনিষ্ঠ ভঙ্গি তিনি স্থাপন করেছেন প্রাবন্ধিকের কাছে তা আদর্শরূপে বিবেচিত হওয়ার মতো। যুক্তি, বিচারপ্রণালী, তীক্ষèবুদ্ধি ও দীপ্ত ভাবনার পরিচায়ক। ভাষা ও রচনানীতি অনেক উন্নত ও প্রাণবন্ত।

 

 পথ (অপ্রকাশিত)

সহজ সরল নিরহঙ্কার এই প-িত গবেষক নিষ্ঠার সঙ্গে যা রচনা করেছেন তা মুসলিম সভ্যতার একটি মূল্যবান অঙ্গনের কথা। তাঁর ইসলাম বিষয়ে ‘পথ’ গ্রন্থটি যে-ই পাঠ করবেন তারা বুঝতে পারবেন মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে কী উন্নতই না ছিলেন, কিন্তু আজ তাদের করুণ অবস্থা। একটি গভীর আক্ষেপ থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর এই গ্রন্থটি এবং অন্যসব ইসলাম বিষয়ে মৌল ও অনুবাদ মূলক রচনাগুলোর কাজ।

‘বর্তমানে শিখরহীন ও বাতিলকৃত ধর্মগুলো একযোগে আক্রমণ চালাচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে, নাইজেরিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া তক সারা বিশ্বে। এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য আল্লাহ-বিশ্বাসীদের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝির নিরসন আবশ্যক। মুসলমানদের একতাবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনের তাগিদে আকীদা বিশ্বাস সঠিক খাতে প্রবাহিত হওয়া বাঞ্ছনীয়, যাতে ইসলামি ধারা খরস্রােতা ও বলবতী হতে পারে। সে মহতী উদ্দেশ্য সাধনে মহান প্রচেষ্টা সমূহের সঙ্গে আমার এই গবেষণা সামান্য সহায়ক হতে পারে বলেই আমি ইসলাম বিষয়ে রচনাগুলো প্রকাশ করেছি।’

আব্দুর রউফ চৌধুরী সাহিত্য জীবনে যে কাজ করেছেন, তার একটি শাখা হচ্ছে এই গ্রন্থটি এবং অন্যসব ইসলাম বিষয়ে মৌল ও অনুবাদমূলক রচনাগুলো, এসব দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন মুসলমানদের অবদান। মধ্যযুগ সম্পর্কে লেখক একটি চমকপ্রদ সঠিক তথ্য তুলে ধরেছেন। ড. মনিরুজ্জামান বলেছেন, ‘[…] আব্দুর রউফের আবির্ভাব ঘটে ধর্মের নামে ভন্ডামি রোধ করতে ও ইসলাম সম্পর্কে অপরাপর ধর্মের গোঁড়া লোকদের অপপ্রচার ও ভ্রান্তধারণার বিষ ছড়ানোর প্রতিবাদ জানাতে।’

মধ্যযুগ সম্পর্কে লেখক একটি চমকপ্রদ সঠিক তথ্য তুলে ধরেছেন। পাশ্চাত্ত্যের বহু ইতিহাসবিদ মধ্যযুগকে ‘অন্ধকার যুগ’  বলে অভিহিত করেন; কিন্তু আব্দুর রউফ চৌধুরী ‘অন্ধকার যুগ’ বলতে বুঝিয়েছেন বার্টান্ড রাসেলের সূত্র ধরে, ইউরোপ ধ্যানধারণায় একেবারেই অন্ধকারচ্ছন্ন ছিল। বস্তুত, সভ্যতার ইতিহাসে মুসলমানদের মধ্যযুগের অবদান অত্যন্ত উজ্জ্বল। শত শত বছর ধরে মুসলমান বিজ্ঞানীরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে যে অসামান্য অবদান নিয়ে আধুনিক সভ্যতার বুনিয়াদ রচনা করে গিয়েছেন তার অনেকটাই ছিল মধ্যযুগ জুড়ে। প্রায় হাজার বছর ধরে মুসলমানরা সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে মধ্য এশিয়া ও স্পেনে শৌর্য-বীর্য-প্রতাপের সঙ্গে যে শাসন করেছিলেন তাও সম্ভব হয় জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাদের অসাধারণ দক্ষতার ফলে। নানা কারণে যেদিন থেকে মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা থেকে সরে পড়ে সেদিন থেকেই তারা হারাতে শুরু করে তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি। আজ ধরাপৃষ্টে একশ’ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা সম্বলিত যে মুসলিম জনপদ, তার দুরাবস্থার কারণ মূলত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে জড়িত না থাকা। অথচ এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তাদের দক্ষতার কারণে তারা বহুদিন সমস্ত পৃথিবীকে ‘পথ’ দেখিয়েছে।

‘পাশ্চাত্ত্যের বহু ইতিহাসবিদ মধ্যযুগকে ‘অন্ধকার যুগ’  বলে অভিহিত করেন’- এই দৃষ্টিভঙ্গিকে খন্ডন করতে আংশিক ও খন্ডিত ভাবে বিজ্ঞানের বিশেষ বিশেষ বিভাগ নিয়ে আলোচনা করেছেন।  পাশ্চাত্ত্যের ‘অন্ধকার যুগ’-এর প্রচলিত ধারণা, বিশ্বাসের ভিত্তিকে খ-াতে চেয়েছেন মুসলমানদের বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা, যৌক্তিকতার বিচার-বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করে। মরিস বুকাইলির ‘বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান’ গ্রন্থের কথা উল্লেখ করে আব্দুর রউফ চৌধুরী বলেছেন, ‘বিজ্ঞানের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণত সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহানবী বলেছেন যে, জ্ঞান-বিজ্ঞান আহরণের জন্য যদি চীনদেশে যেতে হয়, তাহলেও পিছু পা হয়ও না। এমনকি জ্ঞান আহরণ প্রত্যেক মুসলমান নারী ও পুরুষের জন্য ফরজ।’  অন্য স্থানে বলেছেন, ‘খ্রিস্টান জগৎ যখন বিজ্ঞান-চর্চার বিপক্ষে বা কঠোর তখন মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানের ব্যাপারে ব্যাপক অনুশীলন চলে; ফলে বিজ্ঞানের প্রায় সবক’টি শাখায় অমূল্য অবদান আবিষ্কৃতও হয় সেইসময়।’  আব্দুর রউফ চৌধুরী আরও লিখেছেন,

পাশ্চাত্ত্যের ‘অন্ধকার যুগ’-এ মুসলমানরা বিজ্ঞানের যেসব শাখায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন সেগুলো হচ্ছে: গণিতবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, উদ্ভিদবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, মনোবিদ্যা ইত্যাদি। পূর্ব-ভারত (অর্থাৎ বিশাল বাংলা অঞ্চল থেকে) আরবরা যে শূন্যের ব্যবহার শিখেছেন তা তারা পরে ইউরোপে প্রচলন করে। বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি, অঙ্কপতন পদ্ধতির ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান এখনো বিশ্ব জুড়ে স্বীকৃত। গণিতবিদদের মধ্যে আল-খোয়ারিজমি, ওমর খৈয়াম, আল-সামাওয়াল, শারাফ আল-দ্বীন আল-তুসি প্রমুখ অন্যতম। […] চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মধ্যে ইবনে সিনা ছিলেন অন্যতম। তিনি যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা ও গণিতে পা-িত্য অর্জনও করেন। দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যা সম্বন্ধে তিনি কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘কানুন’-নামাক একটি বিখ্যাত বিশ্বকোষ, যা ইউরোপের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পঠিত হয়। এছাড়া ইবনে বাজা ও ইবনে রুশদ চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবেও অন্যতম। আল-রাজিও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বাধিক খ্যাতিমান ও প্রামাণিক লেখক ছিলেন। […] রসায়নবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে জাবির ইবনে হ্য়াানের অবদান অসামান্য। তিনিই রাসায়নিক অধ্যয়ন ও গবেষণার উপর গুরুত্ব দেন। […] দর্শন ও বিজ্ঞান অধ্যয়নে আল-কিন্দি ছিলেন আরবীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম।’

 

 নাম মোছা যায় না

আব্দুর রউফ চৌধুরীর প্রথম (প্রকাশিত) গ্রন্থ ‘নাম মোছা যায় না’। পাদরী ড. ওয়াসনের সঙ্গে লেখকের ধর্ম বিষয়ক বির্তকমূলক কথোপকথন সূত্রে ও উপন্যাসিক ঢং-এ এ উপস্থাপিত। এর ভাষা ও সংলাপ সমূহ সরল, আকর্ষণীয় এবং গ্রন্থটি অত্যন্ত রস সঞ্চারী ও মনোজ্ঞ ভঙ্গিতে রচিত। এর বিষয়, বির্তক উপস্থাপনের কৌশল, ভাবের গভীরতা, প্রামাণ্য তথ্যের নির্দেশ ও যুক্তি খ-ন প্রণালী এবং বস্তনিষ্ঠতা বিস্ময়কর। এখানে উদ্দেশ্য ও বিষয়-বাহন তথা মাধ্যমরূপে ভাষারও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শৈল্পিক উৎকর্ষ বোধ ও আশ্চর্য মনাকর্ষক। সামান্য উদাহরণ উদ্ধৃ করা যেতে পারে, যেমন-

ডিক গম্ভীর হয়ে গেল। হৃষ্টপুষ্ট এক ঝাঁক সোনালী চুলওয়ালা ডিককে খুব বিজ্ঞের মতো দেখাল। বলল, তোমার মন্তব্যগুলো আমি বেশ সিরিয়াসলি নিচ্ছি।

-ধন্যবাদ। তুমি অবশ্যই উপলব্ধি করছো আমি বাহাদুরী দেখানোর জন্য আবোল-তাবোল কিছু বলছি না।

-হ্যাঁ সত্যি। তথ্য নির্ভর তোমার কথাবার্তা।

সহানুভূতির ঢেউ আমার দিকে বইছে দেখে খুশি হলাম।

ইসলামের বিষয়ে ধর্মান্ধ মমতা না নিয়েও যে এর ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও ধর্মীয় গুরুত্বের যথাযখ উপস্থাপন সম্ভব এবং তাতে উপন্যাসের সম্মিলন ঘটিয়ে মনোজ্ঞ আকারে তা ব্যক্ত করা যায় এবং তদ্বারা একজন বিধর্মী ও অবিশ্বাসীকে পর্যন্ত কনভিনস্ড করা সম্ভব হয় এ গ্রন্থে তার অসাধারণ পারঙ্গমতার পরিচয় রেখেছেন লেখক। গ্রন্থের শেষে ডিকের সম্মোহিত উচ্চারণে পাঠকও তখন সম্মোহন প্রাপ্ত, লক্ষণীয়-

ডিক প্রশ্ন করল, পৃথিবীতে প্রধান ধর্ম কটি? সনাতন ধর্ম কোনটি? একটু বুঝিয়ে বলো তো রাফ।

-নিশ্চয়ই বলবো, যাতে শেষ সন্দেহ নিঃশেষ হয়ে যায়। […] পৃথিবীতে সনাতন ধর্ম, সত্য ধর্ম একটি। কারণ সত্য একাধিক হতে পারে না।

ডিক বলল, আমি নিশ্চিত হলাম।

আমি স্মিত মুখে চেয়ে দেখলাম একবার হেলেনের বদনপানে, আরেকবার ডিকের দিকে। তারপর বললাম, সুতরাং হে জ্ঞানী দম্পতি আমার সাথে বলো, ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ। […]

ফেরেস্তা আনন্দিত চিত্তে এ বার্তা পৌঁছে দিলেন মা’বুদের দরবারে।

এই কঠিন কাজটি কোনো যাদুতে অনায়াস সম্পন্ন হয়নি। ধর্মের নামে ভীতি বিহ্বলতা ঘটিয়েও তা নিষ্পন্ন করা হয়নি। এটি করতে ইঞ্জিল-তৌরীত-যবুর ও অন্যান্য ধর্ম পুস্তকের ভেতর-বাইরের আদ্যোপান্ত খবর তাঁকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে বের করে এনে যথাযথ ভাবে উপস্থাপন করতে হয়েছে এবং এর মধ্যে যেখানে যেখানে বৈপরীত্যতা, উদ্দেশ্যমূলক সংযোজন এবং বিকৃতিসমূহ দেখা দিয়েছে- যাকে পান্ডুলিপি পাঠ-বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় পাঠ-বিচ্যুতি, পাঠ-বিকৃতি ও লিপিকার কর্তৃক সংযোজ বা প্রক্ষিপ্ত-পাঠ প্রভৃতি ঘটেছে, তা ধরিয়ে দেওয়ার মতো জ্ঞানেরও সুপ্রয়োগ করতে হয়েছে লেখককে। এতে লেখকের কেবল অধীত জ্ঞানই নয়, আন্তরিক প্রয়াসটিও প্রশংসা ধন্য হয়েছে। পাঠক সেখানে এই কথোপকথনে শুষ্ক বায়স কণ্ঠাচারে আহত হওয়া দূরে থাক, মনের অগোচরেও তখন এক মুগ্ধকর রসনিস্পন্নতা ও বিমোহন ভাব-পরিণতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। আগাগোড়া এমন সুপাঠ্য বির্তক-গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বাংলাভাষায় তুলনামূলক ভাবে আধুনিক। সেই দিক থেকে জনাব চৌধুরী তার অন্যতম পথিকৃৎ।

 

 বাইবেলে সত্য নবী মুহাম্মদ (সা.)

খ্রিস্টান পাদ্রী কর্তৃক ইসলাম ধর্ম ও কুরআন শরিফের ভুল কিংবা বিকৃত ব্যাখ্যা, লেখককে মর্মাহত করেছিল। সেই মর্মপীড়া থেকেই এই গ্রন্থের উৎপত্তি। মুসলিম মৌলবিগণ কুরআন থেকে উদ্ধৃতির মাধ্যমে খ্রিস্টানদের প্রচারিত ভ্রান্ত মন্তব্যগুলোকে বাতিল করার চেষ্টা করে থাকেন; কিন্তু যিনি কুরআন শরিফকেই মানেন না তিনি কি করে তার উদ্ধৃতিকে সহ্য করবেন। কাজেই সেই তর্কে মৌলবিদের পরাজয় হয়ে যায় নিশ্চিত। লেখক তাই ভিন্ন-পথ সন্ধান করেছেন, ‘ভেবে দেখলাম বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি যদি দেওয়া যায়, নাসারাদের ভ্রান্তি দূর করার জন্যে, কুরআন শরীফের আয়াত সমূহের সমর্থনে, তাহলে খ্রিস্টানদের কাবু করা সম্ভব হতে পারে।’  তারই ফলে এই গ্রন্থের সৃষ্টি। যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে এবং কথপোকথনের ঢঙে লেখক খ্রিস্টান ধর্মমতের তুলনায় ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। এক খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকের সঙ্গে ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ে লেখকের যে তর্ক হয় তারই বাণীবদ্ধ রূপ এই গ্রন্থটি। যীশু, বাইবেল, ইঞ্জিল, হযরত মুহাম্মদ (স.), কুরআন ইত্যাদি প্রসঙ্গকে এক-একটি অধ্যায়ে বিভক্ত করে বাইবেলের অসারতা এবং কুরআনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রমাণ করেছেন। গ্রন্থটি সংলাপ ও প্রতি-সংলাপ নির্ভর হওয়ায় সুখপাঠ্য এবং তথ্যসমৃদ্ধ। খ্রিস্টান ধর্ম এবং বাইবেল সম্পর্কে জ্ঞানান্বেষণে বইটি সহায়ক ভূমিকা পালনে সক্ষম। লেখকের মতে, তাঁর গ্রন্থে ‘বাইবেল-পুস্তকগুলোর ভুল-ভ্রান্তি উদ্ঘাটন করে সত্যকে উদ্ধারের চেষ্টার মাধ্যমে প্রমাণ করার প্রয়াস পেয়েছি যে স্রষ্টার আসল নাম আল্লাহ এবং হযরত মুহাম্মদের (সা.) আগমন সংবাদ।’  এবং তিনি এ সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন, ‘যীশু একজন নবী ছাড়া অন্য কিছু ছিলেন না।’  তাঁর বিশ্বাস এই গ্রন্থ খ্রিস্টান ও অমুসলিমদের চোখ খুলতে সহায়ক হবে এবং কুরআন অমান্যকারীদের আক্রমণ মোকাবেলায় মুসলমানদের সত্য ও সঠিক উত্তর দিতে সাহায্য করবে।’

আবুল বাশার, ইসলামিক ফাউডেশন, বাংলাদেশের উপ-পরিচালক, বলেছেন,

সত্য-অসত্যের চিরন্তন দ্বন্দ্ব সবারই জানা। স্ব^ার্থান্বে^ষী মহল তাদের হীনস্ব^ার্থ চরিতার্থ করার জন্য সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার অপকৌশল আবিষ্কারে এতটুকু কুণ্ঠিত হয়নি। স্ব^ার্থসিদ্ধির অন্ধ আবেশে মোহাছন্ন হয়ে খ্রিস্টান পাদ্রী ও ইয়াহূদী পুরোহিতদের কুট কৌশলের কাহিনী সুদূর প্রসারী। এরা আসমানী কিতাব তৌরীত, যবুর ও ইঞ্জিল বিকৃতি ঘটানোর ক্ষেত্রে মোটেও কার্পন্য করেনি। নবীকুল শিরোমণি হযরত মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর আগমনী বার্তা সৃষ্টির সূচনা কাল থেকেই নবী-রসুলদের মুখে ধ্বনিত হয়ে আসছে এবং বিভিন্ন আসমানী কিতাবে তাঁর সবিস্তার বর্ণনাও রয়েছে। কিন্তু জ্ঞানপাপী ধর্ম যাজক ও তথা-কথিত পুরোহিতদের কালো থাবার ফলে কুরআন পূর্ব নাযিলকৃত আসমানী কিতাব সমূহ আসল অবয়বে দুনিয়ার বুকে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেনি। নানা কৌশল ও রকমারী পদ্ধতি উদ্ভাবন করে জ্ঞান-পাপীরা চির অনুসন্ধিৎসু মনের খোরাক মেটাতে দেয়নি। সত্যানুরাগী যুব মানস ও সত্য প্রেমিক সুস্থ বিবেককে প্রতারণা করে তারা তাদের স্ব^ার্থসিদ্ধির পাঁয়তারায় বিভোর। নতুন প্রজন্মকে আসল সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার দূরভিশক্তিতে মশগুল এসব বুদ্ধিজীবীরা। তাই আজকের বিশ্বে ওল্ড টেস্টামেন্ট (পুরাতন নিয়ম) বা নিউ টেস্টামেন্ট (নতুন নিয়ম) সম্পর্কিত বাইবেলের কোথাও নবী মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামটি পর্যন্ত পাওয়া যায় না। তবে বার্ণাবাসে লেখা বাইবেলে এই সংক্রান্ত কিছু তথ্য বর্তমান রয়েছে।

জনাব আব্দুর রউফ চৌধুরী তার দীর্ঘদিন খ্রিস্টান জগতে বসবাস করার বাস্তব অভিজ্ঞতা সামনে রেখে সর্বজন গ্রাহ্য যুক্তিতর্ক ও প্রামাণ্য তথ্য নির্ভর উপান্ত সংগ্রহ করে সত্য সন্ধানীদের জন্য যে উপহার পেশ করেছেন তা সত্যিই ধন্যবাদর্হ। লেখক কেবল মাত্র কুরআনিক দলীল প্রমাণাদি দিয়ে খ্রিস্টানদের অভিমত খ-ন করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন এবং তাদের ধর্মগ্রন্থের তথ্যাদি সংগ্রহসহ উল্লেখ পূর্বক তাদের ভ্রান্ত মতামতের মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। লেখকের এই কৌশলে সময়োচিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থা বটে।

ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত বইখানি পাঠকের দৃষ্টি কেড়ে নেবে স্ব^াভাবিক ভাবেই। নিরপেক্ষ বিচারে চুলচেরা বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, জাতি-ধর্ম বর্ণ-গোত্র পুরুষ-নারী যুবা-বৃদ্ধ নিবিশেষে সকল শ্রেণীর পাঠকদের খোরাক রয়েছে এতে। বর্তমানে সারা বিশ্ব জুড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি আগ্রাসন চলছে। ইসলামী তাহযীব, তমদ্দুুন, কৃষ্টি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির উপর অমুসলিমদের কালো থাবা হায়েনার ছোবলের মত গ্রাস করছে। লোভ লালসা ও ক্ষমতার মোহ দেখিয়ে ধর্মান্তরিক করার অপপ্রয়াস চলছে মুসলিম দেশগুলোতে। এই তমসাঘন পরিস্থিতিতে একজন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তির জন্য বইখানি একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে বলে বলা চলে।

কবি আল মাহমুদ বলেছেন,

জনাব আব্দুর রউফ চৌধুরী বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তাবিদ যুক্তরাজ্যে পেশায় নিয়োজিত থেকেও ইসলামী জ্ঞানচর্চার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বাইবেল ও পবিত্র কুরআনের তুল্যমূল্য আলোচনায় তাঁর মতো গবেষক আমাদের দেশে অত্যন্ত বিরল। জনাব চৌধুরীর গবেষণার একটি প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল বাইবেলের সূত্র থেকে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণ করা। এ ধরনের কাজ মূলত শুরু হয়েছে গত শতাব্দীর শেষাংশে এসে। এ বিষয়ে যাঁরা জনাব চৌধুরীর পূর্বসূরি তাঁদের মধ্যে আফ্রিকার ইসলামী ব্যক্তিত্ব আহমদ দিদাত চমকপ্রদ যুক্তি প্রদর্শন এবং গভীর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধিৎসার পরিচয় দিয়েছেন। এই পুস্তকের রচয়িতা জনাব আব্দুর রউফ চৌধুরীকে একই মিশনের লোক বলে মনে হয়। এ পর্যন্ত জনাব আব্দুর রউফ চৌধুরীর যে কয়টি বই বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তাঁর ইসলাম সম্বন্ধে যে পরিচ্ছন্ন জ্ঞানের পরিচয় তিনি রেখে গেছেন তা বিস্ময়কর। এই মহান লেখক তাঁর নিজ দেশে যতটা পরিচিতি পাওয়ার দরকার ছিল তা পাননি। এর একটা প্রধান কারণ হল- তিনি সারাজীবন প্রবাসেই কাটিয়ে দিয়েছেন। অন্য কারণটি হল তাঁর স্বল্পয়ু। অথচ ইতিপূর্বে বাংলা একাডেমীও তাঁর গ্রন্থ অত্যন্ত মর্যাদার সাথে প্রকাশ করেছে। অনেক মুল্যবান অনুজ্ঞ এবং চিন্তার খোরাক গ্রন্থটিতে রয়েছে। মুলতই এমন একটি বই অচিন্তনীয়।

 

 ধর্মের নির্যাস

নামকরণেই বোঝা যায় গ্রন্থটির বিষয়বস্তু হচ্ছে ইসলাম ধর্মের সার অংশ। আব্দুর রউফ চৌধুরীর সাহিত্যাদর্শ ও জীবনাদর্শের মূলভিত্তি যুক্তিবাদিতা, এবং তা এখানেও প্রখর। যুক্তিতর্কের মাধ্যমে লেখক ‘ধর্মের নির্যাস’ গ্রন্থে ইসলাম ধর্মের অনন্যতা, মুহাম্মদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করেছেন। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ এবং ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআন থেকে উদ্ধৃতি চয়ন করে ইসলামের মূল ভিত্তি এবং ¯্রষ্টার স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা প্রদানে সচেষ্ট হয়েছেন। ইসলামের উদ্দেশ্য, মানব সৃষ্টি, মানবের আচরণিক সাধারণ প্রবণতা, সত্যাসত্য বিষয়ে সঠিক ধারণা এবং ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের উপায় প্রসঙ্গে লেখকের জ্ঞাগর্ভ মন্তব্য রয়েছে এ গ্রন্থে।

এই গ্রন্থে লেখক যথার্থ, নিরপেক্ষ ও নিঃসংশয় মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছেন এবং প্রচারিত ভ্রান্তমত বা ধারণাগুলো খ-ন করে প্রশ্ন ও চিন্তা উদ্রেককারী বিষয়ের আলোকে এবং ঐতিহাসিক প্রমাণ ও বাস্তব সম্মত ব্যাখ্যা দ্বারা লক্ষ্যবস্তুগুলো তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। পাঠকের তৃপ্তি সাধনে উপশিরোনামগুলো হয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ, যথা-‘স্রষ্টা ও ইচ্ছা’, ‘জ্ঞান ও সত্যের অনুসন্ধান’, ‘অনন্ত ও অসীম বাণী’, ‘¯্রষ্টার পার্থিব প্রতিনিধি’, ‘অন্তকালের পথ-প্রদর্শক’, ‘সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন ধর্ম’।

লেখক গ্রন্থটি শুরু করেছেন প্রফেসর ম্যাকস ফুলার -এর বক্তব্য দিয়ে, ‘Religion is not a new invention. It is, if not as old as the world, at least as old as the world we know. There never was a false God nor was there ever a false religion, unless you call a child a false man. All religion, so far as I know them, had the same purpose. All were links in a chain which connects Heaven and Earth, and which held, and always was held, by one and the same hand.’[1] তারপর লেখক এই মন্তব্যকে ইসলাম ধর্মে গ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে, আল-কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে, বলেছেন, ‘এমন কোনো গোত্র বা জাতি নেই যার মধ্যে আল্লাহর প্রেরিত সতর্ককারী বসবাস করেননি।’ […] ‘প্রত্যেক জাতির জন্যে পয়গম্বর প্রেরিত হয়েছেন।’ তারপর উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক চার্লস গিনবাট-এর খ্রিস্টধর্মগ্রন্থ বাইবেল সম্বন্ধে যা বলেছেন তা, ‘The Bible has suffices such deep seated corruption that in many places the original meaning has been lost with scant hope of its restoration. […] There are degree of variations amounting in some cases in to contradiction.’  তারপর লেখক এই মন্তব্যকে ইসলাম ধর্মে গ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে, আল-কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে, বলেছেন, ‘এমন কোনো গোত্র বা জাতি নেই যার মধ্যে আল্লাহর প্রেরিত সতর্ককারী বসবাস করেননি।’ […] ‘প্রত্যেক জাতির জন্যে পয়গম্বর প্রেরিত হয়েছেন।’ তারপর উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক চার্লস গিনবাট-এর খ্রিস্টধর্মগ্রন্থ বাইবেল সম্বন্ধে যা বলেছেন তা, ‘The Bible has suffices such deep seated corruption that in many places the original meaning has been lost with scant hope of its restoration. […] There are degree of variations amounting in some cases in to contradiction.’  লেখক এই মন্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, ‘কিন্তু দুষ্কৃতকারীরা ধর্মগ্রন্থের আদি অর্থ বদলে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা এমনকি নবীকে পর্যন্ত বদলে দিয়েছে […]। এমনকি ব্রিসলি লা পো ট্র্যাঞ্চও লিখেছেন, ‘Most of the religions practices and most of the idea observed in Christianity today, in any form, are manifestly not the practices or ideas observed by Jesus.’  অতীতে বিভিন্ন দেশে প্রেরিত, প্রত্যেক জাতির মধ্য থেকে উত্থিত, নবী-রসুলের অবস্থা অনেকাংশে হযরত ঈসা (আ.)-এর মতোই ছিল। যদি আসল পরিচয়কে আবর্জনা মুক্ত করা সম্ভব হত তবে মুসলমান সম্প্রদায় এদের প্রতি আস্থা ও সম্মান প্রদর্শনে দ্বিধাবোধ করত না।’

প্রথম অধ্যায় : ‘স্রষ্টা ও ইচ্ছা’। বিষয়বস্তু: একদিকে ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্তা এবং অন্যদিকে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা। ‘আল্লাহ প্রকাশ করেছেন মানবজাতির উদ্দেশ্যে দুটি আলো- মহাগ্রন্থ আল-কুরাআন ও মহামানব মুহাম্মদ (স.), যাঁর মাধ্যমে স্রষ্টা প্রদান করেছেন মহাসত্য- সত্যজ্ঞান।’  এই সত্যজ্ঞানের মাধ্যমে ¯স্রষ্টা মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন, সত্য-মিথ্যা বোঝার জ্ঞান ও শক্তি দিয়েছেন। বিচার-বুদ্ধি-সম্পন্ন মানুষ তার মনকে সে-পথেই পরিচালিত করে, যে-পথে তার পক্ষে খুব উপকারী বলে সে মনে করে, বিরত থাকে সেসব জিনিশ থেকে যেগুলো তার পক্ষে ক্ষতিকর বলে সে মনে করে এবং সবশেষে মানুষ নিজের বুদ্ধি, ইচ্ছা-শক্তি ও ইচ্ছার স্বাধীনতা প্রয়োগ দ্বারা চূড়ান্তভাবে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করতে পারে। ‘সবকিছু আল্লাহ যেমনি সৃষ্টি করেছেন মানবজাতির কল্যাণের জন্য তেমনি আইন জারী করেছেন মানবজাতির সর্বমঙ্গলের উদ্দেশ্যে।’  লেখক বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইসলাম অনুসারে মানুষ সৃষ্টির সেরা, এবং মানবজীবন কিছু মহৎ আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর এসব আদর্শ অনুসারে কাজ করা এবং রূপায়ণের প্রচেষ্টাই একজন প্রকৃত মানবের ধর্মকর্ম।

দ্বিতীয় অধ্যায় : ‘জ্ঞান ও সত্যের অনুসন্ধান’। বিষয়বস্তু : এক ঈশ্বরে বিশ্বাসই হচ্ছে ইসলাম ধর্মের প্রথম ও প্রধান। গ্রন্থকার বলেছেন যে, আল্লাহ শুধু এক ও অদ্বিতীয়ই নন, তিনি স্বয়ম্ভু ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। ‘তাঁর কোনো অংশীদারও নেই। তিনি আদি স্রষ্টা, বিশ্বব্রহ্মা-ের চালক ও নিয়ন্তা। তিনি পরমসত্তা। তিনি একাধারে জগতের অন্তর্গত ও বিশ্বাতিগ।’   তারপর এগিয়ে গেছেন ইসলাম ধর্মের মূলনীতির দিকে, যথা-ঈমান , ইসলাম , ইহসান , সালাত  ও শরীয়ত । এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক অহঙ্কারকে নিন্দা করেছেন, করেছেন এজন্য যে, তা প্রত্যেক মানুষকে জ্ঞান আহরণ করা ও কর্মতৎপর হওয়া থেকে বিরত রাখে।

তৃতীয় অধ্যায় : ‘অনন্ত ও অসীম বাণী’। বিষয়বস্তু : আল-কুরআন। লেখক বলেছেন, ‘আল-কুরআন মানুষকে অধ্যয়নের মাধ্যমে জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করার নিদের্শ দান করেছে […]।’  আল-কুরআন প্রকাশ করে আল্লাহ মানুষকে জানতে দেয়েছেন কিভাবে মানবজীবনকে সঠিকভাবে যাপন ও উপভোগ করার যায়, সংযম ও সুনিয়ন্ত্রিত কর্মের মাধ্যমে; এমনকি সবরকম উগ্রতা পরিহার করে জীবনের সর্বত্র মধ্যপথ অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন। মানুষকে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ, পার্থিব ও পারলৌকিক কাজকর্মের ওপর সমান গুরুত্ব আরোপের পরামর্শ দিয়েছেন। এই অধ্যায়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আব্দুর রউফ চৌধুরীর সংখ্যার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ, অর্থাৎ সংখ্যাতত্ত্ব। মহা-বিজ্ঞানী আল্লাহ তা’আলার বৈজ্ঞানিক কৌশলের অতি-অল্প-অনুভব করার জন্যই তিনি ৭, ১১ ও ১৯ সংখ্যার বিশ্লেষণ করছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘ভেদাভেদ পূর্ণ সংঘাত সংঘর্ষে জর্জরিত পৃথিবীর প্রাণ হচ্ছে ইসলামের মাধ্যমে স্রষ্টার শান্তিবাণীর প্রকাশ- আল-কুরআন- বিকাশিত জ্যোতি। সত্যকে মিথ্যা থেকে, পূণ্যকে পাপ থেকে পৃথকীকরণের ব্যাপারে আল-কুরআনের বিচক্ষণতার সঙ্গে অন্যকিছুর তুলনা হয় না; গতিকে এর অপর নাম ফুরকান।’  লেখক যুক্তি প্রয়োগ করে বোঝাতে চেয়েছেন যে, আল-কুরআনের বাণী একটি বিশেষ সময়ে সৃষ্ট কালিক ব্যাপার নয়। আল-কুরআনের বাণী অনন্ত ও অসীম। তাই তো ‘বিশ্বপরিচালনার সুন্দরতম নিয়ম এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবন থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নির্ভুল বিধান বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র, সৌরজগৎ, মহাবিশ্ব, পৃথিবী, সমুদ্র, জীব-বিজ্ঞান, উদ্ভিদ-বিজ্ঞান; এমনকি রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতির সকল দিকের পথনির্দেশ সম্বলিত এমন সমাহার বিশ্বের অন্যকোনো আশমানী কিতাবে দেখা যায় না।’

অধ্যায় চার : ‘¯্রষ্টার পার্থিব প্রতিনিধি’। লেখক বলেছেন, ‘ইসলাম ধর্ম হিসেবে আল্লাহ ও মানুষের সর্বাত্মক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের-বিশেষ করে বুদ্ধি, ইচ্ছা, বাচন ও ভারসাম্যের- উপর প্রতিষ্ঠিত।’  এই অধ্যায়ে লেখক বলেছেন যে, মানুষ কোনো পাপ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না, বরং আল্লাহর কাছ থেকে এমন কিছু সুবিধা লাভ করেছে যা তাকে সাহায্য করে সহজেই অগ্রসর হতে, ন্যায় ও কল্যাণের পথে। ‘তবে সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় মানুষ ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় গ্রহণ বা বর্জন করার ক্ষমতার অধিকারী।’  কারণ ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ দুষ্কৃতির জন্য নিজেই দায়ী থাকবে […]।’  এই অধ্যায়ে লেখক আরবি ভাষায় ‘আল্লাহ’ শব্দটিওর বর্ণনা করেছেন,

আরবি ভাষায় ‘আল্লাহ’ শব্দ লিখতে সমতল লাইনের সঙ্গে দাঁড় করাতে হয় ‘আলিফ’ ও ‘লাম’কে; তারপর চক্রকার অবশেষে একটি বৃত্তে রূপায়িত করা হয়। এ তিনটি অংশ তিনটি দিক নির্দেশনা বলা যেতে পারে। প্রথমটি- সমতল রেখা, শান্তির প্রতীক এবং ঐক্য নির্দেশক, যেন ধূসরবালি ঢাকা মরুভূমি বা শুভ্র বরফাবৃত দীর্ঘ প্রান্তর। দ্বিতীয়টি- আলিফ ও লাম দ্বারা তৈরি উল¬ম্বস্থির পর্বতের মতো মর্হিমময়। তৃতীয়টি- বৃত্তচক্রকারে অলৌকিকতা গুপ্ত, যা গভীরতায় সমৃদ্ধ, আল্লাহর নৈকট্যলাভকারীদের কাছে পরলোকে উন্মুক্তের অপেক্ষায় সংরক্ষিত।

অধ্যায় পাঁচ : ‘অন্তকালের পথ-প্রদর্শক’। বিষয়বস্তু: মনুষ্যকুল-শিরোমণি হযরত মুহাম্মদ (স.)। আল্লাহ যুগে যুগে নবী পাঠিয়েছেন পৃথিবীর মানুষকে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা থেকে নিয়ম ও শৃঙ্খলার দিকে পরিচালনার জন্য। তবে মুহাম্মদ (স.)-এর পর আর কোনো নবী আসবেন না- ইসলামের এই নির্দেশ এতই স্পষ্ট যে, এ নিয়ে মতদ্বৈধের কোনো অবকাশ নেই। একে যেই অন্যভাবে ব্যাখ্যা করবে সেই পরিগণিত হবে অবিশ্বাসী বলে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নবীর মাধ্যমে আল্লাহ পৃথিবীতে যে ধর্মীয় সত্য বা ভাবাদর্শ প্রেরণ করেছেন এবং যা নিয়ে ধর্মবিশ্বাস গঠিত, তা-ই পূর্ণতা ও চূড়ান্ততা লাভ করেছে মহানবী মুহাম্মদ (স.)-এ। মহানবী সম্বন্ধে লেখক বলেছেন,

হযরত মুহাম্মদ (স.) জিহাদ করেছেন অসত্য, অন্যায়, অবিচার ও মানুষের অজ্ঞতাপ্রসূত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, কিন্তু উৎপীড়ন করেননি। যদিও আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র ধারণ করতে হয়েছিল দস্ত-মোবারকে, তবুও অতি মানবের আত্মার উদারতা প্রদর্শন করেছেন পরাজিত শত্রুকে ক্ষমা দানে ও ব্যবহারে। মহামানবের কৃপা পরাণতার সাক্ষ্য দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ।

অধ্যায় ছয় : ‘সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন ধর্ম’। লেখক বলেছেন যে, ইসলাম আল্লাহর সর্বশেষ এবং সে-কারণেই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধুনিক ধর্ম। ইসলাম দেশ-কালের সীমানায় সংকীর্ণ ধর্ম নয়; আর তা নয় বলেই একে দেখা চলে না খন্ডিত দৃষ্টিতে। এ ধর্মের ব্যাপ্তি ও প্রয়োগ বিশ্বজনীন, সর্বকালীন।

 ইসলাম ও সমাজতন্ত্র (অপ্রকাশিত)

কেউই অস্বীকার করতে পারেন না যে, ‘ইসলাম ও সমাজতন্ত্র’ একটি বিশ্ব-আলোচিত বিষয়; বিশেষ করে, বস্তুবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অর্থনৈতিক বিবর্তনবাদকে কেন্ত্র করে এক অভ্যুত্থান চলছে। ফলে বিশ্ব সমাজতন্ত্রের বিপ্লবে ও ইসলামিক আন্দোলনে যে সমস্ত মতাদর্শগত বিতর্ক চলছে, সেগুলো সম্বন্ধে স্বাধীনভাবে নিজস্ব সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্যই এই গ্রন্থটি প্রস্তুত করা হয়েছে। নামকরণেই বোঝা যায় গ্রন্থটির বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘ইসলাম ও সমাজতন্ত্র’। এরই আলোকে মাকর্সবাদী দর্শন, মাকর্সবাদী অর্থনীতি, মাকর্সবাদী রাষ্ট্র ও বিপ্লব, এবং ইসলামিক আর্থ-সামাজিক পদ্ধতি নিয়ে আলোকপাত করেছেন গ্রন্থকার।

কোনো একজন ব্যক্তির দ্বারা সমাজতন্ত্র সৃষ্টি হয়নি, কিন্তু কার্ল মাকর্সকে কোনো অবস্থায়ই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বের কোটি-কোটি দারিদ্র্য-নির্যাতিত-নিরন্ন-নিঃস্ব-আর্ত মানুষের যন্ত্রণাকাতর পরিস্থিতি তাঁকে ব্যথিত করে। মানুষের প্রতি মানুষের, শ্রেণীর প্রতি শ্রেণীর এমন মাহান্যায়-অবিচার ও বৈষম্যের চিরাবসানের জন্য তিনি স্বার্থপর-নির্মম-নৃশংস বুর্জোয়দের সঙ্গে আপোসহীন ছিলেন। তিনি মহাপ-িত, মনীষা, জ্ঞান-তপস্বী। তিনি দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজতন্ত্রী। […] কার্ল মাকর্স একটি রূপরেখা দিয়েছেন, যার ইচ্ছে সে তা গ্রহণ করতে পারে; এই রূপরেখায় বলা হয় যে, সামন্ত ও স্বৈরশাসন শক্তির উৎখাত ঘটিয়ে নিম্নস্তরের সার্বজনীন জনগণের পক্ষে সমাধিকার প্রতিষ্ঠিত করা; ফলে একদিন সমাজে আর ধর্ম-অর্থ-রাষ্ট্র-যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-সংঘাত থাকবে না, সৃষ্টি হবে এক নতুন মানব-সমাজের-‘শ্রেণীহীন সমাজ’। […] ইসলামও জোর দিয়ে এই সমাজের কথা বলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১. যখন একপ্রতিবেশী উপোস থাকে এবং অন্যপ্রতিবেশী সুখে-আনন্দে-আহারে-বিলাসে সময় কাটায়, তখন দ্বিতীয় প্রতিবেশী আর মুসলমান থাকে না। ২. সম্পদ ৪০ দিনের বেশি মওজুদ করা ইসলামে হারাম। ৩. সুশিক্ষিত-সুদক্ষ-গুণযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধান হতে হবে (সামন্ত ও স্বৈরশাসন ভিত্তিক নয়)। ৪. ‘আকাশ ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সবই আল্লাহরই। […] হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা সুদ খেয়ো না […]।’  ‘[…] আত্মীয়স্বজন, অভাবগ্রস্ত আর মুসাফিরকে তাদের প্রাপ্য দেবে […] মানুষের ধনসম্পদ বৃদ্ধির জন্য তোমরা যা সুদে দিয়ে থাক তা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না।’  […]।

এভাবেই গ্রন্থকার ‘ইসলাম ও সমাজতন্ত্র’-এর মতাদর্শগত ঐক্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। মাকর্সবাদী মতাদর্শ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি দৃঢ়ভাবে অনুগত থেকে ইসলামিক ভাবধারার সঙ্গে পার্থক্যও অতি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন শান্তিধর্ম ও বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের উপর আলোচনা। বর্তমান যুগের দ্বন্দ্বসমূহ প্রসঙ্গে পর্যালোচনা, মূল্যায়ন, উপলব্ধি ইত্যাদিও। গ্রন্থকার বলেছেন,

মৌলিক সামাজিক দ্বন্দ্বগুলো হচ্ছে-(১) সমাজতান্ত্রিক মহল ও পুঁজিবাদী মহলের মধ্যে দ্বন্দ্ব; (২) পুঁজিবাদী দেশগুলোতে সর্বহারাশ্রেণী ও বুর্জোয়াশ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব; (৩) সা¤্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো ও নিপীড়িত দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব; (৪) বিভিন্ন সা¤্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের মধ্যে ও একচেটিয়া পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক (নিপীড়িত) ব্যবস্থা ও সা¤্রাজ্যবাদী (নিপীড়ক) ব্যবস্থার  মধ্যে দ্বন্দ্বটিই হচ্ছে মূল-দ্বন্দ্ব। এর সমাধানের উপরই অন্যান্য দ্বন্দ্বের সমাধান নির্ভরশীল। আর এর সমাধানের একমাত্র পথই হচ্ছে শান্তিপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা।

তারপর গ্রন্থকার অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা ও প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আলোচনা করেছেন, একদিকে, কার্ল মার্কসের ‘পুঁজি’-নামক গ্রন্থটি নিয়ে, আর অন্যদিকে, ইসলামে উল্লেখিত দারিদ্র্য-নির্যাসের পন্থাগুলোর। গ্রন্থটি শেষ হয়েছে ‘নৈতিকতা ও সমাজতন্ত্র’ দিয়ে। এরই মধ্যে বলা হয়ে যায়, পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ লোক অধ্যুষিত দেশগুলোতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্য, একটি শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন, অধিকাংশ পূর্বতন ঔপনিবেশিকা দেশগুলোর রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ, বহু দেশে শক্তিশালী শ্রমিকশ্রেণীর দলের উদ্ভব ইত্যাদি।

 

 মুহাম্মদ (স.) ইসলামের নবী

অনুবাদমূলক গ্রন্থটির মূল লেখক দক্ষিণ ভারতের মহিশূর মহিলা কলেজের দর্শন  বিভাগের বিখ্যাত অধ্যাপক ইসলাম-দর্শনে বিশেষজ্ঞ ড. কে এস রামকৃষ্ণ রাও। তাঁর গ্রন্থ ‘মুহাম্মদ দি প্রফেট অফ ইসলাম’-এর লেখককৃত শিরোণাম ‘মুহাম্মদ (স.) ইসলামের নবী’। অমুসলমান বহু প-িত ইসলাম ও শেষ নবীকে নিয়ে বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করে খ্যাতি অর্জন করেছেন, যেমন মার্টিন লিঙ্গস্, আলফের্ড গুইলাওমে, জে এন ডি এ্যান্ডারসন, টি ডাবলিউ এ্যান্ডারসন এবং আরো অনেক। এমনকি তারিফ খালিদী ও এডওয়ার্ড সাইদ সহ মধ্যপ্রাচ্যের আরো বেশ কয়েকজন পন্ডিতের কথাও এখানে মনে পড়বে। আইন, পর্দাপ্রথা, নারীর অধিকার ও মর্যাদা, বহুবিবাহ, সমানাধিকার ও গণতন্ত্র (যার অন্যতম প্রবজ্ঞা জন কীন প্রমুখ) প্রভৃতি দিকে তো আরো বহু বিশেষজ্ঞ ও অধিকারীর নাম জানা যায়। ভারতীয়দের মধ্যেও বি আর বর্মা, কে পি সাকসেনা, এইচ এম ভাটিয়া প্রমুখের অবদান মুসলিম জগতে যথেষ্ট স্বীকৃত ও আলোচিত। দ্রাবিড়দের মধ্যেও কৃষ্ণা আয়ার প্রমুখগণ ইসলাম প্রসঙ্গে উদার আলোচনা করেছেন। ড. রাও তাঁদেরই একজন। এই প্রসঙ্গে ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি সারাপল্লী রাধাকৃষ্ণের নামও মনে পড়বে, যাঁর প্রিয় তত্ত্বই দর্শনের উত্থানপতনের জোয়ার-ভাঁটা রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন ও অবক্ষয়ের দোলকে নির্দিষ্ট। অবক্ষয়টি আভ্যন্তরীণ, বহিঃরাক্রমণ এই প্রপঞ্চের পরিণাম। আরবের নব্য দর্শন ও ৬ষ্ঠ শতকের নব উত্থান (মহান ধর্মান্দোলন) আভ্যন্তরীণ অবক্ষয়ের প্রতি সময়োচিত শুশ্রুষার প্রয়াস বা সংস্কারমাত্রই নয়, তা ছিল একই সাথে শাশ্বত দিগনির্দেশন এবং সাম্যবাদ ও নারীর অধিকারের প্রতি চিরকালীন সম্মান ও নিশ্চয়তা। স্যার মুইর, গিবন প্রমুখ প্রখ্যাত সমাজ-চিন্তাবিদ ও ঐতিহাহিকগণও এ সত্য স্বীকার না করে পারেননি।

ড. রামকৃষ্ণ রাও প্রথমে খানিকটা দ্বিধান্বিত হলেও পরে নিশ্চিত ধারণা ও নিজস্ব অবস্থান থেকে দৃঢ়তার সাথে পরম ¯্রষ্টা আল্লাহ-তায়লার পেয়ারা ও নূর নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর ভূমিকাকে স্পষ্ট করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসেন। তিনি দেখান যে নবীজীর কর্ম, উক্তি ও বিশ্বাসের মধ্যে এবং সত্যপ্রচারের মধ্যে আশ্চর্য মিল ছিল। বর্তমান গ্রন্থে লেখক তারই যথার্থ, নিরপেক্ষ ও নিঃসংশয় মূল্যায়ন উপস্থাপন করেন এবং এতদসংক্রান্ত বিষয়ে প্রচারিত ভ্রান্তমত বা ধারণাগুলো খ-ন করে ছোট ছোট ঘটনা, প্রশ্ন ও চিন্তা উদ্রেককারী বিষয়ের আলোকে এবং ঐতিহাসিক প্রমাণ ও বাস্তব সম্মত ব্যাখ্যা দ্বারা লক্ষ্যবস্তুগুলো তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। অনুবাদও যথাযোগ্যতায় তা উপস্থাপন করে পাঠকের তৃপ্তি সাধনে সমর্থ হয়েছেন। এই ভাবে উপশিরোনামগুলো হয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ, যথা- ‘ইসলাম পতনোম্মুখ পৃথিবীর জন্য জ্যোতি’, কিংবা ‘নারী স্বাধীনতায় ইসলাম’, ইত্যাদি। তৃতীয় অধ্যায়ে ‘আল-আমীন’ পর্যায়ে একটি শিরোনাম শুধু ‘পরীক্ষা’, কিন্তু তা আল্লাহ-র রসুলকে উপলব্ধি করা ও উপস্থাপন করার একটি চমৎকার প্রয়াস। তেমনি চতুর্থ অধ্যায়ে পাই- ‘মানব শ্রেষ্ঠ মুহাম্মদ (স.)’, বা ষষ্ঠ অধ্যায়ে ‘ইসলাম- একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান’, ইত্যাদি।

এই গ্রন্থের শেষ অধ্যায় (ষষ্ঠ) সঙ্গতভাবেই তাই ইসলাম সম্পর্কিত মূল কথাগুলোও যোগ করতে হয়েছে তাঁকে। মোট কথা, মহানবী জীবন প্রসঙ্গ, চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য ও তাঁর প্রচারিত শান্তির ধর্ম সম্পর্কে অল্প কটি পৃষ্ঠায় নির্মেদ অথচ পুষ্ট আলোচনায় বিষয়টি তিনি উপস্থিত করেছেন মুন্সিয়ানার সাথে। কোথাও অতিরেক নেই। স্খলনও নেই। অত্যুৎসাহও দেখা যায় না, আবার অনহেতু ভ্রান্তদর্শন-প্রিয়তার প্রতিফলন বা নিন্দাবাদ ও হেয় প্রতিপন্ন করার কোনো কদর্য প্রবণতার প্রকাশ ঘটেনি। সর্বত্র একটা বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলাযুক্ত চিন্তার উন্মীলন বা সরল প্রবাহযুক্ত উদ্ভাসন বিষয় ও উপস্থাপনাকে করেছে মহনীয় এবং সিদ্ধান্তমুখী। যুক্তিশাস্ত্রগত প্রস্তাব বাক্য (‘প্রমিজ’) ও সিদ্ধান্তবাক্যরাশি এখানে আরোহী ও অবরোহী উভয়-প্রক্রিয়াতেই সাধিত ও সিদ্ধ। আব্দুর রউফ চৌধুরী অনুবাদে তাকে অনচ্ছ করেননি, অধিকন্তু তার প্রতি তাঁর স্বাভাবিক আকর্ষণ ও যথাযথ প্রকাশের আন্তরিক প্রয়াসটি স্পষ্ট। এক কথায়, তাঁর অনুবাদ স্বচ্ছ, ভাষা সরল অথচ জ্ঞান ও তথ্যভার বহনোপযোগী এবং একই সাথে তা মনোবিহারী। অর্থাৎ মনের মাধুরিও তাতে বিমিশ্রিত। উদাহরণ-

মানবের শেষ লক্ষ্য হল এক দিকে সৌরজগৎ সমূহের আধিপত্য লাভ, অপরদিকে মা’বুদের মাঝে তার আত্মার বিশ্রাম লাভ। ¯্রষ্ঠা সন্তুষ্ট হবেন তার ওপর, তেমনি সেও পূর্ণ সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবে।

অথবা,

দরিদ্র কঠোর পরিশ্রমী, অল্প সংস্থানের মানুষ ছিলেন তিনি। কাজেই যে কোনো বলবতী স্পৃহার চেয়েও ভালো বস্তু ইসলামের নবীর মধ্যে ছিল। নতুবা আরবের দৃষ্ঠান্ত পুরুষগুলো যারা সংযত হল ও সংগ্রাম করল তেইশটি বছর তাঁর পাশে থেকে- সর্বদা অতি কাছে থাকত সহচরের মতো, তাঁরা এত সম্মান করতে পারত না।

উপসংহার : উপসংহারে বলা যায় যে, আব্দুর রউফ চৌধুরীর ইসলাম বিষয়ে মৌল ও অনুবাদ মূলক রচনার সবদিক বিবেচনার আলোকে, ইসলামিক ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে তিনি ছিলেন মধ্যপন্থি, এবং ধর্মীয় আগ্রহ কখনো তাঁর গভীর মুক্ত চেতনা ও অনুভূতিকে ক্ষুণ বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন করতে পারেনি। আব্দুর রউফ চৌধুরীর চিন্তাচেতনায় সঙ্গতি ছিল, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পুরোমাত্রায় যুক্তিবাদী, এবং যুক্তির ক্ষমতা ও ফলপ্রসূতায় ছিল তাঁর অগাধ আস্থা। এজন্যই তিনি কুসংস্কার-মুক্ত, এবং নিজের অভিমত প্রকাশ করতে পেরেছেন সবরকম ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে। তিনি মানুষের অস্তিত্ব, অধিকার, স্বাধীনতা ও প্রগতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। জ্ঞানানুশীলনে নিয়োজিত থেকেছেন শেষদিন পর্যন্ত।

 

 মননশীল গদ্য রচনা (প্রবন্ধ)

 প্রবন্ধগুচ্ছ

নব্বই-এর দশকে ‘ভোরের কাগজ’, ‘জনকণ্ঠ’, ‘যুগভেরী’, ‘খোয়াই’ ও ‘সুরমা’ (ই-ল্যান্ড) পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধসমূহের সংকলন হচ্ছে ‘প্রবন্ধগুচ্ছ’। বাঙালির কৃষ্টি, সংস্কৃতি, স্বাধীনতা; ইসলামের মহান আদর্শের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, কুসংস্কার ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যার প্রতিবাদ; বহু-বিয়ে, তালাক-প্রথা, বোরকা-প্রথা ইত্যাদি প্রসঙ্গে লেখকের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই গ্রন্থে।

এই গ্রন্থের প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনার প্রারম্ভে সম্পর্কিত দু’চারটি কথা বলা প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। আধুনিক বাংলা গদ্যের অন্যতম মুখ্য সাহিত্য রূপ প্রবন্ধ। বাংলা সাহিত্যে অপেক্ষাকৃত গম্ভীরভাবে অনুশীলিত গদ্যরীতির সহায়তায় যে বিষয় বা ভাবের অভিব্যক্তি ঘটে, তাই সাধারণত প্রবন্ধ নামে অভিহিত হয়। রাজা রামমোহন রায়ই সর্ব প্রথম বাংলা গদ্য রচনাকে ধর্মীয় ও সামাজিক সমস্যা আলোচনার বাহন করে তুলেন। তাঁর প্রধান কৃতিত্ব এই যে, তিনিই প্রথম প্রবন্ধ সাহিত্যের মধ্য-দিয়ে বাঙালির চিত্ত ক্ষেত্রে অন্ধ-বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির আলো ফেলার প্রয়াস চান এবং এ ধারাটি আজও বিদ্যমান।

নব্বই-এর দশকে বাংলা জনপদে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক হিসেবে আব্দুর রউফ চৌধুরী নিজেকে কেবল গল্প ও উপন্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি তথ্য নির্ভর ‘প্রবন্ধগুচ্ছ’ গ্রন্থটি রচনা করেছেন। তাঁর প্রবন্ধ পর্যালোচনায় বলা যায় যে, এগুলো তাঁর তীক্ষè সমাজ মনস্কতার ফসল। এই গ্রন্থটি বিশাল নয়, কিন্তু তথ্যে সমৃদ্ধ। এতে লেখকের বহু পঠিত মনের পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। যে জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন প্রজ্ঞার আকারে তাই তিনি পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর লেখা থেকে আবিষ্কার করা যায়, একজন আধুনিক ব্যক্তিকে। তিনি কুসংস্কার আর কুপ্রথায় জর্জড়িত এই অনালোকিত সমাজে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন, নিরন্তর। তাঁর লেখায় হীরক দ্যুতির মতো জ্বলজ্বল করছে তাঁর মুক্তবুদ্ধি আদর্শ।

গ্রন্থটির উৎসর্গেও আব্দুর রউফ চৌধুরীর একান্ত নিষ্ঠা প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায়। ‘বাঙালি জাতির উদ্দেশ্যে’ উৎসর্গকৃত এই সংকলনটিতে ১৬টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে; যথা: ‘জনৈক বুদ্ধিজীবী প্রসঙ্গ’; ‘গণ-আদালতে দরখাস্ত’; ‘অপশক্তি’; ‘আমাদের ভাষা ও সাহিত্য’; ‘মহান একুশে ফেব্রুয়ারি’; ‘বাঙালির উৎস সন্ধানে’; ‘মহিলা ও মসজিদ’; ‘ইসলামে অদৃষ্টবাদ’; ‘বহু বিয়ে ও ইসলাম’; ‘তিনবার ‘তালাক’ বলেই সম্পর্ক চুকে যায় কী?’; ‘ইসলামের তৌহিদ’; ‘বোরকা-প্রথার ঘানি’; ‘পারিশ্রমিক’; ‘সমাজের উন্নতি’; ‘স্বাধীন চিন্তাধারা’; ‘ছিন্ন কর বন্ধনের এই অন্ধকার’।

বাঙালির কৃষ্টি, সংস্কৃতি, স্বাধীনতা; ইসলামের মহান আদর্শের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, কুসংস্কার ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যার প্রতিবাদ- ‘মহিলা ও মসজিদ‘, ‘ইসলামে অদৃষ্টবাদ’, ‘ইসলামের তৌহিদ’, ‘বহু বিয়ে ও ইসলাম’, ‘তিনবার ‘তালাক’ বলেই সম্পর্ক চুকে যায় কী!’ ও ‘বোরকা-প্রথার ঘানি’। ইসলামিক চিন্তা, মানুষের ধর্মের সন্ধান এবং কুসংস্কারে নিমিজ্জিত মানুষের হাহাকারকে ছাপিয়ে এ গ্রন্থে প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের ভাষা-আন্দোলন, বাঙালি জাতিসত্তার উৎস সন্ধান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নতুন বাংলা শতাব্দীর আগমনের প্রাক্কালে বাঙালির নব মূল্যবোধের আহ্বান।

‘জনৈক বুদ্ধিজীবী প্রসঙ্গ’ : ‘প্রবন্ধগুচ্ছ’ গ্রন্থটিতে ব্যক্তি বিশেষের কোনোউক্তি বা কটুক্তির জবাবে যে কয়টি লেখা আছে এরমধ্যে এটি হচ্ছে একটি। রাজনৈতিক চেতনাপুষ্ট আব্দুর রউফ চৌধুরীর একটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ। পাকিস্তান-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালির স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, বাঙালির প্রতি পাকিস্তানিদের মনোভাব, পাকিস্তানি শাসক-শোষকগোষ্ঠীর সুবিধাবাদি চরিত্র- এসবই একান্তভাবে চিত্রিত করেছেন লেখক। নানা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তিনি প্রমাণ করেছেন ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে ‘পাকিস্তান’-নামে যে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল, এর পূর্বখ- পরিণত হয় পশ্চিম-খন্ডের শোষণের চারণ ভূমিতে।

বাংলার সম্পদই বাঙালির ভাগ্যে বারবার দুর্ভোগ টেনে এনেছে; এ বিষয়ে কোনো বির্তকের অবকাশ নেই। জিন্নাহ প্রথমে চান ‘পাকিস্তান’ তার পর অন্য কথা, এবং এই ‘পাকিস্তান’ আদায়ের জন্য তিনি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল রূপটি বেছে নিতেও দ্বিধাবোধ করেননি। সাধারণ মানুষের এতে উপকার হবে কী না তা নিয়ে তার ভাবনা ছিল না, ছিল হিন্দু-মুসলমান দুই পক্ষে লড়াই বাধিয়ে, রক্তপাত ঘটিয়ে ‘পাকিস্তান’ লাভ করা। ইসলাম ধর্মকে সুকৌশলে তিনি ব্যবহার করে নিজস্ব স্বার্থ উদ্ধারের জন্য নতুন দেশ সৃষ্টি করেন; যদিও তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বা চিন্তাচেতনায় ইসলামের কোনো স্থানই ছিল না, তবুও রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ইচ্ছা করেই ধর্মকে সংযুক্ত করেন, কারণ আত্মনিয়ন্ত্রণ নীতির ভিত্তিতে ভারতবর্ষের মুসলমান-সম্প্রদায়ের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি- ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র- প্রতিষ্ঠিত না-করলে তার বাবুগিরি করার কোনো অধিকার থাকে না। […] জিন্নাহ’র সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অভিভাষণে মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’-এর উপর জোর দেওয়াই স্বাভাবিক ছিল, তবে এসব বিষয়ে তিনি কিছুই বলেননি, কারণ তিনি জানতেন ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’-এর উপর ভিত্তি করে- রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক চিন্তায়- রাষ্ট্রকে বিভাজন করা যায়, কিন্তু শাসন করা যায় না, তাই মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ একটি ভ্রান্ত মতবাদ হিসেবে তার কাছে উন্মুক্ত হয়। জিন্নাহ ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ সম্পর্কে তার ভুল বুঝতে পারে এবং অন্যকোনো উপায় না-পেয়ে ‘একজাতিতত্ত্ব’-এর স্বপ্নে বিভোর হন; ‘একজাতিতত্ত্ব’-এর দুটি প্রধান লক্ষণ হচ্ছে- ভাষা ও সাহিত্যের একত্ববোধ; কিন্তু এ দু’অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে তা অবর্তমান ছিল, এ সত্য উপলব্ধি করে তিনি ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভে পূর্ব-বাংলা সফরকালে দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ কারণ তিনি বিলাতে থাকাকালীন সময়ে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন ইংরেজের দমন নীতির কলাকৌশল। কিভাবে ইংরেজ বশে এনেছিল সাহসী স্কচ-জাতিকে, এবং বুদ্ধিমান ওয়েলস-জাতিকে; প্রথমেই ইংরেজ খতম করে দেয় তাদের ভাষা। […] পূর্ব-বাংলায় সুপরিকল্পিতভাবেই শিল্পায়নকে অনুপস্থিত রাখা হয়। করাচি, লাহোর, পি-ি ও ইসলামাবাদ হয়ে ওঠে শিল্পোন্নয়নের কেন্দ্র। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব-বাংলায় ‘ল্যান্ড টেনান্সি এ্যাক্ট’ পাস করে ধনতান্ত্রিক উন্নয়নের পথগুলো রুদ্ধ করা হয়, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এর ছোঁয় লাগতে দেওয়া হয়নি পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে। ফলে ইচ্ছাকৃতভাবেই পূর্ব-বাংলায় ভূস্বামী ও পুঁজিপতি শ্রেণীর বিকাশ ঘটতে দেওয়া হয়নি, বরং পূর্ব-বাংলাকে পাকিস্তানের উৎপাদিত দ্রব্যের একচেটিয়া বাজারে ও উপনিবেশে পরিণত করা হয়। পূর্ব-বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসন-ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য পাকিস্তান-সরকার তার তথ্য ও প্রচার বিভাগ- সরকারি বেতার, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকাসহ সরকারের বিভিন্ন প্রচার-মাধ্যমকে ব্যবহার করে। এমনকি বাংলা একাডেমীকেও ব্যবহার করে তার স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে। ‘পাকিস্তান কাউন্সিল’, ‘জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা’, ‘নজরুল একাডেমী’ প্রভৃতি সরকারি, আধা-সরকারি ও সরকারি সাহাস্যপুষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগ্ন-নির্লজ্জ-উলঙ্গরূপে ব্যবহার করে পাকিস্তান-সরকার।

‘গণ-আদালতে দরখাস্ত’: এই বিবৃতি মুখ্য প্রবন্ধটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ নিয়ে কুখ্যাত এক রাজাকারের কটুক্তির প্রত্যুত্তরে লেখা। প্রতিবাদমূলক রচনা হলেও লেখক প্রবন্ধের মধ্য-দিয়ে পাকিস্তানি দ্বারা বাংলাদেশে যে গণহত্যা, ধষর্ণ, লুণ্ঠনের রাজত্ব চালিয়েছিল এর একটি তথ্যমূলক বর্ণনা দিয়ে তিনি ধর্মের লেবাসধারী ভ-, প্রতারক, দেশদ্রোহী রাজাকারদের বিরুদ্ধে বিচারের দাবী তুলেছেন। বলাই বাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেখানে লাঞ্ছিত সেখানে লেখক মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ। তাঁর অভিধানে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে আপোস বলে কোনো শব্দ ছিল না। তাঁর ব্যাখ্যা সত্য ও তথ্য-নির্ভর আলোচনায় পরিপূর্ণ। ‘অপশক্তি’ প্রবন্ধটিও স্বাধীনতা বিরোধী দালাল নিয়ে ব্যঙ্গরচনা।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়- সম্প্রতি ঢাকার প্রকাশ্য জনসভায় জৈনক পাকিস্তানপন্থী বাংলাদেশি বলেছেন, ‘গুটিকতক ইংরেজি শিক্ষিত গাদ্দাররা পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ করেছে।’ এ-ধরনের কথা যে বলে সে অবশ্যই বাংলাদেশ-বিরোধী এবং দেশদ্রোহীর বিচার করা যেকোনো সরকারের প্রাথমিক কর্তব্য; কিন্তু তা সরকার করেনি। কিন্তু উক্তবক্তার কথা মিথ্যা, কারণ বাংলাদেশের গুটিকতক মীরজাফর-রাজাকার ব্যতীত সমগ্র বাঙালিজাতি মুক্তিসংগ্রামে লিপ্ত ছিল, এবং তাদের পরিশ্রমের ফসলই হচ্ছে বাংলাদেশের স্বধীনতা। তার কথা যে মিথ্যা এর প্রমাণ জনসম্মুখে তোলে ধরছি, আপনাদের বিবেচনার জন্য, কারণ আমি জনগণ-আদালতে এই মিথ্যাবাদী-রাষ্ট্রদ্রোহীর বিচার প্রার্থী। […] ১৯৭১-এর যুদ্ধ শুরু করার অনেক আগেই পাকিস্তান তার আগ্রাসনমূলক রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য পরিস্থিতি ও পরিবেশ গড়ে তুলে। পাকিস্তানের শাসক-সমরগোষ্ঠী জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করার অজুহাতে নিজের স্বার্থে মানববিদ্বেষী ভাবাদর্শের ভিত্তিতে পূর্ব-বাংলায় ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ ফিরিয়ে এনে ‘নতুন ব্যবস্থা’ গড়ার জন্য প্রয়াসী হয়ে ওঠে। বাঙালি জাতির প্রতি বিদ্বেষ প্রচার করে, নির্বাচিত বাঙালি গণপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কঠোর নির্যাতন চালিয়ে, নিজের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ‘বিচ্ছিন্নবাদী আন্দোলন’ দমনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা। মার্চ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের শাসক-সমরগোষ্ঠী ও পাকিস্তানপন্থীরা বাঙালির উপর অত্যাচার, সর্বরকম গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতা ধ্বংস করে পাকিস্তানের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পাগলের মতো সশস্ত্রীকরণ ও আক্রমণাভিযানের আয়োজন করে; তবে এর আগেই বাঙালিরা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়কদের কাছে পূর্ব-বাংলার পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী জানায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা সর্বশক্তি দিয়ে পাকিস্তানের আধিপত্য রক্ষার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নেয়। সমরবাদী পাকিস্তান তার সক্রিয়-শক্তি ও সহায়ক-শক্তিকে সংগঠন এবং অস্ত্রসজ্জিতকরণের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করে তার আগ্রাসনমূলক পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত করতে থাকে। […] ‘দি অবজারভার’ (১৩ই জুন ১৯৭১) লিখে, ‘[…] পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়কদের ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করে, শক্তি দ্বারা পূর্ব-বাংলার সঙ্কটকে প্রতিরোধ করার অপচেষ্টা। তারা ভেবেছিল যে, ব্রিটিশের নিষ্ঠুর দমন-নীতি অবলম্বন করে পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশের জঙ্গী সৈন্য ও অফিসারদের ব্যবহার করে বাঙালির ‘বাংলাদেশ আন্দোলন’-কে মোকাবেলা করবে, কিন্তু বাস্তবে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য হওয়ায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা দ্বিতীয় পর্বের অভিযান শুরু করায়, একে প্রতিরোধ করতে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছে।’ […] ‘টাইমস ম্যাগাজিন’ (২রা আগস্ট ১৯৭১) লিখে, ‘[…] হয়তো-বা তারা যে-স্থান থেকে পালিয়ে এসেছে তা আরও ভয়ঙ্কর। প্রত্যেকেরই বলার অনেক কাহিনী আছে- নিজেদের বিভীষিকাময় জীবনের, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা সংগঠিত ধর্ষণের, হত্যার, অত্যাচারের গল্প। একজন দম্পতি বলেন, পাকিস্তানি সেনারা তাদের দুই ছেলেকে বাড়ির বাইরে নিয়ে গিয়ে ব্যায়নেট দিয়ে পাকস্থলী ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কেউ ছেলেদের কাছে যেতে চাইলে তাদের হুমকি দেয় হত্যা করবে বলে। কয়েক ঘণ্টা পর, বিনা চিকিৎসায় ছেলে-দুটো মারা যায়। আরেকজন বলেন, পাকিস্তানি সেনাদের আগমনের ইঙ্গিতে আমি আমার সন্তানদের নিজের বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখি। কিন্তু সেনারা ঘরে প্রবেশ করে গুলি ছুঁড়তে থাকে। এতে আমার দুই সন্তান নিহত ও একজন আহত হয়।’ […] যুদ্ধের প্রাথমিক পর্বের সামরিক অসুবিধাগুলো অতিক্রমের জন্যে এবং বাঙালির বিরুদ্ধে বিজয় লাভের লক্ষ্যে শক্তি বৃদ্ধিকরণের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের সমরনায়করা আধা-সামরিক বাহিনী হিসেবে একটি দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলে। রাজাকার বাহিনী (সদস্য সংখ্যা ৫০ হাজার), আল-বদর বাহিনী (সদস্য সংখ্যা ১০ হাজার), আল-শামস বাহিনী (সদস্য সংখ্যা আড়াই হাজার), পুলিশ বাহিনী (সদস্য সংখ্যা আট হাজার), ইপিআর (সদস্য সংখ্যা ১২ হাজার) ও ইন্ডাস্ট্রিয়্যাল সিকিউরিটি র্ফোস (সদস্য সংখ্যা ২৪ হাজার) এর সমন্বয়ে আধা-সামরিক বাহিনী গঠিত হয়। […] প্রথম পর্যায়ে ‘রাজাকার-বাহিনী’ ছিল শান্তিকমিটির নেতৃত্বাধীন। তারপর জেনারেল টিক্কা খান ‘রাজাকারস অর্ডিন্যান্স-১৯৭১’ জারি করে আনসার বাহিনীকে ‘রাজাকার বাহিনী’তে রূপান্তরিত করে, তবে এর নেতৃত্বে ছিল পাকিস্তানপন্থী স্থানীয় নেতারা। […] ‘রাজাকার’ বলে পরিচিত ব্যক্তিবর্গ মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে পঞ্চম-বাহিনীর ভূমিকা পালন করে। […] পাগলা কুকুর দেখলে মানুষের মনে যেমন ঘৃণামিশ্রিত ভয়ের সঞ্চার হয়, সেরকম ভয় ঘৃণা তাড়িত হয়ে সমগ্র বাঙালিজাতি এক হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুধু জারজ বাঙালিই রাজাকার নামীয় পশুতে পরিণত হয়, এই নরপশুদের কুকর্মের কিছু উল্লেখ পাওয়া যায় ২০শে জুন ১৯৭১-এর ‘দি সানডে টাইমস’ পত্রিকায়: (১) পাকিস্তানি সেনা-অফিসারদের সহযোগিতায় রাজাকাররা স্বাধীনভাবে কাজ করতে থাকে। কিছু কিছু পরিবারের কাছে রাজাকাররা মুক্তিপণ দাবীও করছে। টাকা দেওয়ার পরও আশারূপ ফল পাওয়া যায় না। (২) রাজাকাররা হত্যাকা- থেকে পতিতা-সরবরাহ পর্যন্ত তাদের কর্মকা- বিস্তার করেছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তারা একটি ক্যাম্প স্থাপন করে, তাদের ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের যৌনতৃষ্ণা মিটানোর জন্য বাঙালি মেয়েদের অপহরণের মাধ্যমে বন্দি করে রাখে। রাতের বেলায়, তারা অল্পবয়েসী মেয়েদের সিনিয়র পাকিস্তানি অফিসারদের কাছে পাচার করে। এই ক্যাম্প থেকে কোনো মেয়েই ফিরে আসতে পারেনি। (৩) একজন প্রথম সারির গায়িকা ফেরদৌসীর বাসায় রাজাকাররা একদিন হামলা করে; তবে তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। তারপর ফেরদৌসীর মা তাদের পরিচিত একজন জেনারেলের কাছে ফোন করেন। জেনারেল তাদের নিরাপত্তার জন্য মিলিটারি পুলিশ নিয়োগ করে। (৪) রাজাকাররা মেজর খালেদ মোশাররফের ছয় ও চার বয়সের দুই সন্তানকে আটক করে, তবে তার স্ত্রী রক্ষা পাওয়ায় তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। (৫) সেনাবাহিনীর নির্দেশে রাজাকাররা ঢাকার কয়েক শত পাট-শ্রমিকদের উপর তাদের নিয়োমিত কাজে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। (৬) ২৯শে মে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে রাজাকারদের দিয়ে তিনজন ট্রেড ইউনিয়নের নেতাকে অপসরণ করা হয়, তবে তারা পরে পালিয়ে যান। (৭) ১লা জুন ১৯৭১, সামরিক-আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খানের প্ররোচনায় কিছু শিক্ষক কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে গেলে তারা রাজাকারদের হাতে নিপীড়িত হন। রাজাকারদের এসব কর্মকা- সম্বন্ধে সেনাপ্রশাসন অবগত আছে।

‘আমাদের ভাষা ও সাহিত্য’ : এই প্রবন্ধে লেখক বাংলাভাষার ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধান করেছেন। আর সহ¯্রবর্ষব্যাপী বাংলাভাষার ক্রম-বিকাশের ধারাটি তুলে ধরতে প্রয়াস পেয়েছেন। এ হচ্ছে একটি শেকড় সন্ধানী প্রবন্ধ। চিন্তার সূক্ষ্মতা, স্বচ্ছতা, যুক্তিনিষ্ঠা এবং সিদ্ধান্তের মৌলিকতা এই প্রবন্ধকে চিন্তাপ্রধান প্রবন্ধের মধ্যে বেশ উচ্চ স্থান দিয়েছে। ‘একটি শিশু কাঁদে রাতের আঁধারে আলোর জন্যে; কান্না দিয়ে যে বোঝাতে চায় তার আলোর প্রয়োজন, অর্থাৎ এক্ষেত্রে ইচ্ছাপ্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে কান্না। কিশোরীর পরিচ্ছন্ন পরিচ্ছদে আবৃত দেহলতাই সুন্দরের অভিব্যক্তি-এখানে কান্না নয়, বুদ্ধিদীপ্ত মুখম-লটিই ইচ্ছাপ্রকাশের মাধ্যম। ভাষার জন্ম হয়তো-বা শিশুর জন্মের মতো নয়, তাই বাংলাভাষা কোন খ্রিস্টাব্দে জন্মলাভ করেছিল তা অনুসন্ধান করা সুকঠিন। তবে এইটুকু বলা যায় যে, বাংলাঞ্চলের অধিবাসীরা (সাঁওতাল, দ্রাবিড়, অসুর প্রভৃতি উপজাতিসমূহ গোষ্ঠীর লোক) যে ভাষায় কাঁদে শিখেছিল তা হচ্ছে অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও আলপিয় নরগোষ্ঠীর ভাষায়। যদিও আলপিয় নরগোষ্ঠী আর্যভাষাভাষী ছিল, তবুও তাদের ভাষা বৈদিক আর্যদের থেকে ছিল ভিন্ন। উদাহরণ স্বরূপ: পতঞ্জলি বলেছেন যে, প্রাচ্যাঞ্চলের [অর্থাৎ প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্র নিয়ে গঠিত বিশাল বাংলাঞ্চলের] লোকরা ‘র’ বর্ণটির পরিবর্তে ‘ল’ বর্ণটি ব্যবহার করে। এরূপ ব্যবহার ‘অসুর’ জাতির উচ্চারণের বৈশিষ্ট্য। তাহলে মনে হয় যে, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও আলপিয় নরগোষ্ঠীর মিশ্রিত ভাষারূপই হয়ে ওঠে অনার্য প্রাচ্যভাষা। তাহলে স্বীকার করা যায় যে, বাঙালির আদিভাষাই হচ্ছে অনার্য প্রাচ্য (যা সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত হয়নি); আর এর লিপি থেকেই আধুনিক বাংলা, আসামী, উড়িয়া ও মৈথিলী লিপির উদ্ভব। প্রাচীনকালে মৈথিলী ও বাংলা লিপির মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা ছিল; কিন্তু পরবর্তী কালে দেবনাগর লিপির আগমনে ও প্রভাবে মৈথিলী প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ে; বর্তমানে তা হিন্দী হরফেই লেখা হয়। এককালে নেপালেও বাংলা লিপির প্রভাব ও সমাদর ছিল। উড়িয়া ও বাংলা লিপি তো প্রায় একই; শুধু উড়িয়া বর্ণের মাত্রা গোল এবং বাংলা বর্ণের মাত্র সরল; আর আসামী বর্ণমালা বাংলা লিপিতেই লিখিত হয়। […] বাংলাঞ্চলের অধিবাসী যখন কিশোরী হয়তো তখনই সংস্কৃত ভাষা এই অঞ্চলে প্রবেশ করে, তবে সংস্কৃত-চর্চায় বিশেষ উৎকর্ষ ঘটে লক্ষ্মণ সেনের আমলে। বাঙালি কবি জয়দেব লক্ষ্মণ সেনের রাজসভা অলঙ্কৃত করেন, তাঁরই হাতে রচিত হয় ‘গীতগোবিন্দ’।’

‘মহান একুশে ফেব্রুয়ারি’ : আমাদের জাতীয় চেতনাকে আসার করে রাখার জন্য বাঙালির ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির অসাড় বিরুদ্ধে পাকিস্তানিরা যে ষড়যন্ত্র করেছিল এই প্রবন্ধে লেখক সেই ইতিহাস বিধৃত করেছেন। এ হচ্ছে আরেকটি ইতিহাস ভিত্তিক প্রবন্ধ। ১৯৪৮-এর গোড়া থেকেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এদেশের মানুষকে বঞ্চিত করার নানা উদ্যোগ নেওয়া ধরে। প্রথমে কেড়ে নিতে চায় এ ভূখ-ের মানুষের মাতৃভাষাকে। জিন্নাহ ১৯৪৮-এর গোড়াতেই ঘোষণা দিয়ে বসেন যে, উর্দুই হবে পূর্ব ও পশ্চিম- এই দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্র্রভাষা। অথচ তখন পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। মাতৃভাষা হরণ করার বন্দোবস্ত করেই থেমে থাকেনি ওই শাসকগোষ্ঠী, তারা ধ্বংস করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় এ জাতির সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ওই ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে এদেশের সংগ্রামী মানুষ, বহু জীবনের বিনিময়ে। আসে ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি। এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন হচ্ছে এক গভীর মাইল ফলক। ‘[…] ‘ধর্মভিত্তিক’ পাকিস্তান রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই রাষ্ট্রভাষার সমস্যা তীব্রভাবে প্রকাশ পায়, বিশেষ করে পূর্ব-বাংলার ছাত্র-শিক্ষক মহলে আশঙ্কা দেখা দেয় যে, বাংলা ভাষা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দ্বারা উপেক্ষিত হতে বাধ্য। আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নই যখন শাসকগোষ্ঠীর মনমগজকে প্রবলভাবে দুর্বল করে দিয়েছে, তখন অস্বাভাবিকই দেখায় যদি বাংলা ভাষার উপর তারা আঘাত না করে, অবশ্য একদল গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বাংলার মুসলিম বুদ্ধিজীবী পাকিস্তানে বাংলা ভাষা উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কাকে অমূলক বলে নাকচ করে দেন, তাদের মতে পাকিস্তানের গণপরিষদে বাঙালি-সদস্যবৃন্দ সংখ্যগুরু আর পাকিস্তান রাষ্ট্রে জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার দাবী মূলত ওঠে গণতান্ত্রিক নিয়মে, শতকরা ৫৬.৪০ ভাগ লোক যেদেশে বাংলায় কথা বলে সেখানে বাংলার দাবীই নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য হওয়া উচিত, এছাড়া পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মধ্যে মাতৃভাষা হিসেবে ২৮.৫৫% পাঞ্জাবি, ৫.৪৭% সিন্ধি, ৩.৪৮% পস্তু ও ৩.৩৭% উর্দু; আর শুধু পশ্চিমাঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৭.০৫% এর কথ্যভাষা উর্দু। উর্দু ভাষায় খুব কম মানুষই কথা বলতে পারে, উর্দু ভাষা পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেরই মাতৃভাষা নয়। সিন্ধি, পাঞ্জাবি, পুস্তু, বেলুচি পাকিস্তানের কোনো কোনো প্রদেশের মাতৃভাষা হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে এসব ভাষায় অল্প লোকই কথা বলতে পারে।’

‘বাঙালির উৎস সন্ধানে’ : এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় হল ইতিহাস, বাঙালির শৌর্যবীর্য ও বাণিজ্য সম্বন্ধে আলোচনা। বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিপন্থী আদর্শের সঙ্গে সংঘাতের ফলে বাঙালি জাতীয়ভাব বিনষ্ট হচ্ছে, তাকে কিভাবে রক্ষা করা যায়-তাই আলোচ্য বিষয়। এমনকি পশ্চিমা-কৃষ্টি থেকেই-বা কতটুকু গ্রহণ করা যায় তাও বলেছেন। বাঙালি জাতীয়তার নানা দিক সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণী দৃষ্টি লক্ষ্য করার মতো। ‘বর্তমানে রাজনীতির সংজ্ঞায় আমরা বাংলাদেশী হলেও আমাদের আসল পরিচয়-আমরা বাঙালি ও বাংলা-ভূমির অধিবাসী। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। আমাদের সংস্কৃতি বাংলা ভাষাভাষীর সাংস্কৃতিক পরিচয়। ভাষাতাত্ত্বিক এই জাতীয়তা আমাদের এক এবং একমাত্র পরিচয়। এই পরিচয় মুছে ফেলা আত্মহত্যার সামিল। […] বাঙালি জাতি হিসেবে কত প্রাচীন, এর অনুসন্ধান করতে হলে ‘প্রাগৈতিহাসিক যুগ’-এ যেতে হয়; কারণ এই যুগেই মানুষের আবির্ভাব ঘটে। […] প-িতরা মনে করেন যে, ‘প্লাইস্টোসীন যুগ’-এই বাংলাদেশে মানুষের বসবাস শুরু হয়, কারণ তাদের ব্যবহৃত আয়ুধসমূহ আবিষ্কার করা গেছে। […] সিন্ধু-উপত্যকায় মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা প্রভৃতি যেভাবে সভ্যতার প্রতীক ঠিক তেমনি বাংলাদেশের সভ্যতার নিদর্শন হচ্ছে পা-ুরাজার ডিবি (১২০০-১০০০ খ্রি.পূ.)। […] ‘আরগনটিকা’ গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, বাঙালি বীরেরা বিশেষ বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল, ১৫০০ খ্রি.পূ., কৃষ্ণসাগরের উপকূলে কলচিয়ান ও জেসনের অনুগামীদের সঙ্গে। প্রাচীন-কাল থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরীয় দেশসমূহের সমৃদ্ধশালী বাণিজ্য-সম্পর্ক যে ছিল তাও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দ্বারা সমর্থ করা যায়।  […] ৩২৬ খ্রি.পূ. আলেকজান্ডার যখন পাঞ্জাবকে পরাহত করে তখনকার বিশাল বাংলাদেশ (প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্র)-এর দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা করেন তখন তিনি জানতে পান যে, প্রাচ্য (প্রাসিওই) ও গঙ্গারাষ্ট্র (গঙ্গারিডি) যৌথভাবে তখনকার বিশাল বাংলাদেশকে রক্ষা করতে বিপুল সৈন্যবাহিনী ও বিশাল রণসম্ভার নিয়ে প্রস্তুত। আলেকজান্ডার প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্রের অধিবাসীদের শৌর্যবীর্য ও পরাক্রমের কথা শুনে তখনকার বিশাল বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হতে অস্বীকার করেন। তাই তিনি বিপাশা নদীর পশ্চিম তীর থেকেই পারস্যে প্রত্যাবর্তন করেন। পরবর্তীকালে প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্র (তখনকার বিশাল বাংলাদেশ)-এর অধিবাসীদের শৌর্যবীর্য ও বাণিজ্য সম্বন্ধে অনেককিছু লিখে গেছেন গ্রীক, রোমান ও মিশরীয় লেখকরা। মিশরের এক নাবিক প্রণীত ‘পেরিপ্লাস’ গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, বাণিজ্য উপলক্ষে বাঙালিরা ক্রীটদেশে গিয়ে উপনিবেশ স্থাপন করে।’

‘মহিলা ও মসজিদ’ : এই প্রবন্ধে তিনি সংকীর্ণ চিত্ত এক শ্রেণীর ফতোয়াবাজ আলেমের ধর্মীয় অপব্যাখ্যাগুলো খ-ন করে প্রমাণ করেছেন নারীদের মসজিদে জামাতে সামিল, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা প্রভৃতি পুরুষের ন্যায় অংশগ্রহণের পূর্ণ-অধিকার আছে। ‘সমাজ গঠনে নারী-পুরুষের সমান অবদান রাখার জন্যে উৎসাহ ব্যঞ্জক বহু আয়াত রয়েছে পাক-কুরআনে। তেমনি মসজিদে ইবাদতের সমান অধিকার দিয়েছে ইসলাম, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, সকলকে। স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর ইমামতিতে নারীরা একই জামাতে পুরুষের সঙ্গে নামাজ পড়তেন-এ হল ঐতিহাসিক সত্য।’

‘ইসলামে অদৃষ্টবাদ’ : এ হচ্ছে একটি ধর্ম ভিত্তিক প্রবন্ধ। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অনগ্রসরতার অন্যতম কারণ হচ্ছে ভাগ্যের উপর নির্ভরশীলতা- লেখকের কাছে এ প্রতীয়মান হওয়ায় তিনি কুরআনিক দলীল ঘেঁটে ও যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা রয়েছে। স্বাধীন-ইচ্ছা ও স্বাধীনভাবে কার্য নির্বাচনের ক্ষমতা রয়েছে বলেই মানুষ তার সম্পাদিত কাজের জন্য সে নিজেই দায়ী। ‘ইসলামের অদৃষ্টবাদ নিয়ে অনেক অমুসলিম প-িত যে বাকবিত-ার তুফান তুলেন তার মূলে রয়েছে কয়েক আলেমের ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অভিমত, প্রতিকূল চিন্তাধারার প্রভাব। তাকদীর বিশ্বাসী হয়েও ইসলাম ইচ্ছা-স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে না। মানুষ তাকদীরের আয়ত্বাধীন, কারণ মানুষ আল্লাহ নয়, তবুও সে স্বাধীন। স্বাধীন এজন্য যে, স্রষ্টার গুণাবলীর প্রকাশ ঘটেছে মানুষের মাধ্যমে, বিকাশের জন্যে স্বাধীনতার প্রয়োজন, তাই সৃষ্টিকর্তা মানুষকে দিয়েছেন নিজের ভালোমন্দ, উচিতানুচিত নির্ধারণ ও নির্বাচন করার ইচ্ছা-শক্তি ও ইচ্ছা-স্বাধীনতা। ‘পরিষ্কার বলে দাও, এ মহাসত্য তোমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে। এখন যার ইচ্ছা মেনে নেবে, আর যার ইচ্ছা অমান্য বা অস্বীকার করবে।’  আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, মহাসত্য গ্রহণ করা বা না-করা মানুষের ইচ্ছাধীন, তবে ‘যে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হবে, তার গোমরাহী তার জন্যই ক্ষতিকর’ ; কারণ, আল্লাহ মানবের ওপর কোনো কতৃত্বধারী নন্। মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন বলেই সে স্ব-ইচ্ছায় যা কিছু করে সেজন্য সেই দায়ী ; অবশ্য একদিন মানুষকে তার নিজ কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। স্বকীয় মঙ্গল সাধন করার পথে তাকদীর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় কোথায়? নিজের দুর্বলতা, অক্ষমতার জন্য তাকদীরকে দোষারূপ করা অনুচিত।’

‘বহু বিয়ে ও ইসলাম’ ও ‘তিনবার ‘তালাক’ বলেই সম্পর্ক চুকে যায় কী?’ : এ দুটি হচ্ছে বাস্তববাদী সমাজ সচেতন আব্দুর রউফ চৌধুরীর সামাজিক কুপ্রথা বিষয়ক প্রবন্ধ। নারী নিগ্রহ মূলক কুপ্রথাগুলো থেকে বাংলার সমাজ-জীবনকে মুক্ত করতে রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষীরা ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন, মানবতার আদর্শে অনুপ্রাণিত আব্দুর রউফ চৌধুরী বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেও একই কুপ্রথা থেকে স্ব-সমাজকে মুক্ত করতে পূর্বসুরীদের অসমাপ্ত আন্দোলনে অবতীর্ণ হন শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যামূলক প্রবন্ধের মধ্য-দিয়ে। প্রবন্ধগুলোতে লেখক অল্প কথায় সুষ্ঠুভাবে ধর্মীয় ব্যাখ্যাটি তুলে ধরেছেন। এটি তাঁর ধর্ম-বিষক প্রবন্ধগুলোর একটি বিশেষ গুণ। ‘সমগ্র কুরআন শরীফে একটি মাত্র স্থানে বহু বিয়ের কথা এসেছে। তাও এতিম প্রসঙ্গে, যখন অহূদ যুদ্ধে বহু বীর পুরুষের শহীদ হলেন, সৃষ্ট হল এতিম ও বিধবা সমস্যা, সমাজ একে সামাল দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তখন নাযিল হল সূরায়ে নিসার তিন নম্বর আয়াত, ‘[…] তোমরা যদি আশঙ্কা করো যে, পিতৃহীনদের ওপর সুবিচার করতে পারবে না তবে বিয়ে করবে [স্বাধীন] নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে, দুই, তিন বা চার জনকে। আর যদি আশঙ্কা করো যে, সুবিচার করতে পারবে না তবে একজনকে বা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকে। এভাবেই তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার সম্ভাবনা বেশি।’ […] কিন্তু দুঃখের বিষয় আলেমরা উক্ত আয়াতের অর্থ করেছেন যে, যদি তুমি ভয় করো যে এতিমদের প্রতি ন্যায় বিচার ঠিক রাখতে পারবে না, তবে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী দুই, তিন, চারি [অন্য] নারীদের বিয়ে করো। কিন্তু ‘অন্য’ শব্দটি যোগ করা যুক্তিসঙ্গত নয়; কারণ এ আয়াতের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়; উদ্দেশ্য এতিমের সঙ্গে বহু বিয়ের সর্ম্পক স্থাপন এবং মানবতায় সর্বোচ্চ গুণাবলীর বাস্তবায়িত করণ, একমাত্র এতিমদের খাতিরে।’

‘ইসলামের তৌহিদ’ : লন্ডন থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা ‘সুরমা’য় ছাপা হয়। খ্রিস্টান মৌলবাদীদের প্রচারিত মুসলিম ধর্মর প্রতি বিরূপতার প্রেক্ষিতে লন্ডনবাসী প্রবাসী প্রগতিশীল বাঙালি মুসলিম সমাজের একজন হয়ে এই প্রবন্ধটি লিখেন। ‘আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসের ধারণাটি পরিণত হয়েছে ‘তৌহিদ’ নামে। তিনি এক, অদ্বিতীয়, স্বয়ম্ভু ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি নিজে জন্মগ্রহণ করেননি, অন্য কাউকে জন্মও দেননি। তাঁর কোনো অংশীদারও নেই। তিনি আদি স্রষ্টা, বিশ্বব্রহ্মা-ের চালক ও নিয়ন্তা। তিনি পরমসত্তা। তিনি একাধারে জগতের অন্তর্গত ও বিশ্বাতিগ।’

‘বোরকা-প্রথার ঘানি’ : এ হচ্ছে একটি ধর্ম ভিত্তিক প্রবন্ধ। বোরকা-প্রথাটি যেভাবে বর্তমানে পালন করার কথা বলা হয়, তা কিন্তু ইসলামিক নয়। কুরআন বা হাদিসের কোথাও বলা নেই যে, প্রকৃতির যে দান, যেমন-মুক্তবায়ু ও সূর্যকিরণ বা আলো থেকে নারীদের বঞ্চিত করে চার-দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা; বা মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো কাপড়ে দেহকে বন্দি করে রাখা। এমনকি নারীদের মুখ ঢেকে চলাফেরার কথা কুরআন-হাদিসে উল্লেখ নেই। বোরকা-প্রথার ব্যবস্থা ইসলামিকও নয়। এমনকি এটা আরবীয়ও নয়। এসব কথাই লেখক বলেছেন। ‘বোরকা-প্রথা জোরস্ট্রীয় পারসিক এবং বাইজানটাইন খ্রিস্টিয় প্রথা। এ-প্রথা পারস্যে, মিশরে বা বাইজানটাইনে প্রচলিত থাকলেও আরবে ছিল না। এসব দেশ জয় করার পর উমাইয়া ও আব্বাসীয়ারা তাদের দরবারে এই প্রথা চালু করে; তখন মুসলমান খলিফাদের অন্তঃপুরে হেরেম-প্রথা চালু হয়। […] এথেনীয় সভ্যতায় নারীরা অন্তঃপুরেই থাকত। সেখানে বাইরের লোকের প্রবেশ সম্ভব ছিল না।’

‘পারিশ্রমিক’; ‘সমাজের উন্নতি’ ও ‘স্বাধীন চিন্তাধারা’ : অনিবার্যভাবেই প্রগতি-প্রতিক্রিয়ার দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্য-দিয়ে শ্রেণীবিভক্ত সমাজব্যবস্থায় একজন লেখকের দায়বদ্ধতা, সার্থকতা বা প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রমাণিত হয়ে থাকে। আলোচ্য প্রবন্ধগুলোতে আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর সময় ও কালের প্রচলিত আর্থ-সামাজিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে প্রচলিত সংস্কার, নিয়ম-নীতি ও ধ্যান-ধারণাকে যুক্তি, প্রমাণ, বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়ে তা বোধসম্পন্ন পাঠকসমাজের কাছে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা ব্যক্তি-সমাজ, মন-মননকে উজ্জীবিত এবং মুক্তচিন্তা বিকাশের ক্ষেত্রে অভিনব মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা যায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে অভিনব হচ্ছে, আলোচ্য প্রবন্ধগুলোতে লেখকের প্রখর যুক্তি এবং চিন্তাচেতনার প্রকাশ, যা লেখকের নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলন। একগুচ্ছ উদাহরণ:

‘পারিশ্রমিক’ : ‘শ্রমিকরা যা উৎপাদন করে এবং মজুরি রূপে যা লাভ করে-এই দুয়ের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে তার দ্বারাই অতিরিক্ত সম্পদ গড়ে ওঠে; আর পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের বঞ্চিত করে সমুদয় অতিরিক্ত সম্পদ নিজের পকেটে পুরে। ফলে শ্রমের উপলব্ধি এতই উপলব্ধিহীন হিসেবে আবির্ভূত হয় যে, শ্রমিকের উপলব্ধিহীনতা অনাহারে মৃত্যুর বিন্দুতে পৌঁছে। শ্রমিকের জীবন এতই জীবনহীন হিসেবে আবির্ভূত হয় যে, তার জীবন ধারণের- এমনকি তার কাজের বিনিময়ে- আবশ্যকীয় ন্যূনতম জিনিসগুলোও তার থেকে লুণ্ঠিত হয়। আসলেই, শ্রম নিজেই এমন একটি বিষয় হয়ে পড়ে যা শ্রমিক পেতে পারে কেবল তার সর্বোচ্চ চেষ্টা আর চূড়ান্ত অনিয়মিত বিঘেœর মধ্য-দিয়ে। এ বিষয়ের অধিকারকরণ এতই বিচ্ছিন্নতা হিসেবে প্রতিভাসিত হয় যে, শ্রমিক যত বেশি উৎপন্ন করে ততই কম সে নিজের জন্য রাখতে পারে, আর তত বেশি সে তলিয়ে যায় সমুদয় অতিরিক্ত সম্পদের পাকে। পুঁজিপতির কাছে শ্রমিক হচ্ছে একজন দাস; কারণ, প্রথমত: সে শ্রমের বিনিময়ে কাজ পেয়েছে; দ্বিতীয়ত: বেঁচেবর্তে থাকার একটি উপায় ওরা করে দিয়েছে। এই দাসত্ব-শৃঙ্খলের চূড়ান্ত হচ্ছে এই যে, শ্রমিক যত বেশি উৎপাদন করে তত কম সে ভোগ করতে পারে; আর সে যত অধিক মূল্য সৃষ্টি করে, ততই সে অর্থহীন, অকেজো হয়ে পড়ে। শ্রমের মধ্যে তাই শ্রমিক নিজেকে স্বীকৃতির বদলে অস্বীকৃতিই জানায়, তৃপ্তির বদলে অতৃপ্তি বোধ করে, দৈহিক ও মানসিক শক্তির সুূষ্ঠু ও স্বাধীন বিকাশ তো দূরের কথা, দেহ-মনকে তিলে তিলে ধ্বংস করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। তাই এই শ্রম কোনো অভাবের তৃপ্তিসাধন নয়; বরং সে নিজেই শ্রমের দখলে; তাই সে দাসত্ব-শৃঙ্খলে আবদ্ধ। একজন শ্রমিক যখন একজন পুঁজিপতির কাছে দাসের চাইতে বেশি কিছু নয়, তখন তার মানবিক গুণাবলী কেবল ততদূর পর্যন্তই অস্তিত্বমান যতদূর পর্যন্ত পুঁজির স্বার্থ জড়িত। তাই এসব পুঁজিপতিরা বুদ্ধি-দায়িত্ব-জনস্বার্থের আড়ালে তাদের উন্নতির অক্ষমতা, লোভী স্বপরিতোষণ, স্বার্থপরতা, গোষ্ঠীস্বার্থ ও কু-অভিপ্রায়সমূহ গোপন করে নির্দ্বিধায় অতিরিক্ত সম্পদ লুটে নেয়।’

‘সমাজের উন্নতি’ : ‘যেমন করে সমাজ নিজে মানুষকে মানুষ হিসেবে উৎপাদন করে, তেমনি সমাজও মানুষ দ্বারা উৎপাদিত হয়; অর্থাৎ সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ সমাজের বাস্তব জীবনের সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করে; ঠিক তেমনি তার কার্যকলাপের মধ্য-দিয়ে ক্রমে-ক্রমে সমাজের বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়। মার্কসবাদীরা মনে করেন যে, মানুষের সামাজিক ব্যবহারই বহির্জগৎ সম্পর্কে জ্ঞানের সত্যতার একমাত্র মাপকাঠি। যে-সমাজ উন্নত, সে-সমাজের মানুষের জ্ঞান ধীরে-আস্তে নিম্নতর থেকে উচ্চতর স্তরে, অর্থাৎ অগভীর জ্ঞান থেকে গভীর জ্ঞানে, একমুখী জ্ঞান থেকে বহুমুখী জ্ঞানে, বিকাশ লাভ করে। তবে একথা স্বীকার করতেই হয় যে, শোষকশ্রেণীর দুষ্ট মতামত ও ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদন-ব্যবস্থা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে সীমিত করে রাখে, আর সেখানে সমাজও নিশ্চল হয়ে পড়ে, সৃষ্টি হয় বৈষম্যদুষ্ট সমাজ। তাই বলা যায় যে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান মানুষের অর্জন করাই হচ্ছে সমাজের উন্নতির একমাত্র সোপান; আর তা সাধিত হলে দুর্নীতিপরায়ণ সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী, স্থানীয় উৎপীড়ক এবং ভদ্রবেশী বদমাসকে সমাজ থেকে ঝেঁটিয়ে গোরস্থানে পৌঁছানো সম্ভব।’

‘স্বাধীন চিন্তাধারা’ : ‘স্বাধীন চিন্তাধারাপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন মানুষই শুধু পারে বিবেক-বিবেচনা ও যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা চালিত হয়ে অন্যায়-অত্যাচার পরিহার করতে। জীবন-জীবিকা স্বাতন্ত্র্যভাবে চালাতে। আচরণে তারা নিন্দা-ঘৃণা-অপমান ভীরু নন। মান-যশ-শ্রদ্ধা-ভক্তি-খ্যাতির লোভ তাদের মনে স্থান পায় না।’

‘ছিন্ন কর বন্ধনের এই অন্ধকার’ : বাংলা নতুন শতাব্দীকে স্বাগত জানিয়ে তরুণদের উদ্দেশ্যে লেখা একটি উপদেশমূলক প্রবন্ধ। বাঙালি সাহিত্যাঙ্গনের দুই পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ধর্মীয় অনাচার বিরোধী বক্তব্য মানবতাবোধ চেতনার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে লেখক এই প্রবন্ধটি লিখেছেন। কবিদ্বয় এবং নারী-আন্দোলনের মানসকন্যা বেগম রোকেয়া, দার্শনিক আরজ আলী প্রমুখ গুণীজনের ধর্মীয় অনাচার বিরোধী বক্তব্যগুলো উল্লেখ করে তিনি জরাগ্রস্ত এই দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য যত বন্ধন আছে সমাজে তা ছিন্ন করতে তরুণদের প্রতি আকুল আহ্বান জানিয়েছেন। লেখক মনে করেন ধর্মীয় গোঁড়ামীর কারণেই বাঙালি প্রযুক্তিগত সমাজ তৈরি করতে নৈরাশ্যবাদী। আব্দুর রউফ চৌধুরী স্বপ্ন দেখেন যাবতীয় দুর্বিপাক, দুরাচার আর দৈন্যদশা কাটিয়ে তাঁর প্রিয় স্বদেশ একদিন জেগে উঠবেই। তাঁর স্বপ্নের বাক্যমালা দিয়েই ‘প্রবন্ধগুচ্ছ’ গ্রন্থটির আলোচনা শেষ করা যায়। লেখক বলেছেন :

আমি স্বপ্ন দেখতে চাই এমন এক বাংলাদেশের যেখানে উৎপীড়নের দৌরাত্মা নেই, শাসনের শোষণ ও নির্যাতন নেই, ধনবণ্টনে বৈষম নেই, জাতপাতের বালাই নেই। […] আমি স্বপ্ন দেখি সেই বাংলাদেশের যেখানে মুক্তচিন্তার ব্যাপক চর্চা বিদ্যমান, যেখানে সেকুলার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত, সেখানে প্রগতিশীল চিন্তাধারার বিকাশ নির্বিঘ্ন। স্বপ্ন দেখি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে নতুন শতাব্দীতে।

 রবীন্দ্র-নজরুল

‘রবীন্দ্র-নজরুল’ গ্রন্থে লেখক উদার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রবীন্দ্র ও নজরুল প্রতিভার মূল্যায়ন করেছেন। তাঁদের বহুমাত্রিক এবং বিচিত্র সৃজনী ক্ষমতার অনন্যতাকে লেখক বিমুগ্ধ বিস্ময়ে অবলোকন করেছেন; বিশেষ করে তাঁদের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টি, রাজনৈতিক দৃষ্টি, সামাজিক দৃষ্টি, মানুষের ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদযোগ, নারী-অধিকার প্রসঙ্গে বলিষ্ঠ অভিমত, সর্বোপরি বাঙালির মুক্তির জন্য তাঁদের কবিতা ও গান বাঙালির পরাধীন চিত্তে সঞ্চারিত অনিঃশেষ আশাবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলোই ছিল লেখকের আলোচনার মূল উপজীব্য। প্রাবন্ধিকের মেধা, মনন ও পঠন-পাঠনের সমন্বয় ঘটেছে আলোচ্য প্রবন্ধগুলোতে। তারুণ্যের প্রতি উভয় কবির যে বিপুল প্রত্যাশা তারও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নজরুল ইসলামের প্রতিভার সার্বিক বিশ্লেষণ এই গ্রন্থে না থাকলেও তাঁদের প্রধান প্রবণতাগুলোর আলোচনা যথেষ্ট হৃদয়গ্রাহী। গ্রন্থটি দুটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে; ১. ‘আমাদের জাতীয় কবি সম্বন্ধে কিছু কথা’; ও ২. ‘চির-নূতনের দিল ডাক, পঁচিশে বৈশাখ’। প্রথম পর্বে আছে: ‘আমাদের জাতীয় কবি সম্বন্ধে কিছু কথা’; ‘নজরুলের কথাসাহিত্যের জগৎ: গল্প-উপন্যাস-নাটক’, ‘নজরুলের প্রবন্ধের জগৎ’, ‘বিদ্রোহী ও কয়েকটি কবিতা প্রসঙ্গে’ ও ‘নজরুলের শিশু-কিশোরের জগৎ’। আর দ্বিতীয় পর্বে আছে: ‘চির-নূতনেরে দিলো ডাক, পঁচিশে বৈশাখ’; ‘একতারা’; ‘ভগবৎসন্ধান’; ‘রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা’ ও ‘নৃত্যের তালে তালে: সুরপ্রকৃতি, বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবপ্রকৃতি’।

প্রথম পর্ব : নজরুল চেতনা¯œাত আব্দুর রউফ চৌধুরীকে আবিষ্কার করা যায়, নজরুলের প্রভাবও। নজরুলের মতো সমাজচেতনাকেন্দ্রিক অন্তরপ্রেরণায় সহধার্মিকতাও লক্ষ্য করা যায়। আন্তরিক উপলব্ধি ও বেদনা-বোধে নজরুল চেতনা¯œাত আব্দুর রউফ চৌধুরীও নির্যাতিত মানুষের জাগরণকেই বড় করে দেখেন। স্পষ্টই বোঝা যায় সজরুলের সঙ্গে তাঁর সাহিত্য ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। নজরুলের মানবতার ও সাম্যের বাণী ধ্বনিত হয়েছে এই পূর্বে বারবার। তাঁর চিত্তে পরিপূর্ণ প্রতিবাদ। বাঙালি জনসাধারণের পূর্ণ-অধিকার সম্বন্ধে তাদেরকে জাগিয়ে তুলতেই, মনে হয়, এই পূর্বটি লিখেছেন; লিখেছেন ধর্ম-সমাজ-রাষ্ট্রের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে একজন স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক বাঙালি হিসেবে। নজরুল চেতনা¯œাত আব্দুর রউফ চৌধুরীর চেতনায় স্থান করে নেয় অবহেলিত, শোষিত বাঙালি জনতা। প্রকাশিত হয় নজরুলের মাধ্যমে বেঁচে থাকার অধিকার; অন্যায়, অবিচার ও ধর্মীয় কুসংস্কারের শৃঙ্খল ভেঙে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দ্রোহ। একমুঠো উদাহরণ:

‘আমাদের জাতীয় কবি সম্বন্ধে কিছু কথা’ : ‘কাজী নজরুল ইসলাম একজন সারা জাগানো কবি। ‘বিদ্রোহী’ কবি বলে কাজী নজরুল ইসলামের যে পরিচয় পাওয়া যায়, এতে তার সর্বব্যাপক প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছে অতি সামান্য, এক আনার চেয়েও কম, পনেরো আনারও বেশি তার প্রতিভার প্রয়োগ দেখা যায় বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য অঙ্গণে। সর্বক্ষেত্রে তার পারদর্শীতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বিদ্যমান, প্রাণরসে পুষ্ট। নজরুল স্বীয় প্রতিভার আনন্দ-ধারায় বর্ণাঢ্য, হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘কাজীর প্রতিভা অষ্টভেদী, গিরিশৃঙ্গে তার স্থিতি, গগনচারী বর্ণাঢ্য লঘুপক্ষ মেঘকে যেমন তার সদা আমন্ত্রণ, ভয়াল বজ্রগর্ভ মেঘের আবির্ভাবেও তেমনি তার শৈলচূড়ায় এনে দেয় বাক্যালাপের আনন্দ, সমারোহ। […] সত্যিকারের বিরাট সাহিত্যস্রষ্টা ও সংষ্কৃতির এক বিশিষ্ট অগ্রদূত হিসাবে নজরুলের আবির্ভাব ঘটে ছিল বলেই রাজনীতিকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি।’ […] আমাদের দুর্ভাগ্য যে এই মহান কবিকে কর্মময় অবস্থায় আমরা পাইনি; তাঁর জীবনের শেষ দিকে। তবু তিনি জাতিকে যা দিয়েছেন তা যেন শ্রদ্ধার সঙ্গে আমরা মনের মণিকোঠায় সঞ্চয় করে রাখি এবং কবির কামনা সফল করার জন্যে সচেষ্ট হই।’

‘নজরুলের কথাসাহিত্যের জগৎ: গল্প-উপন্যাস-নাটক’ : ‘নজরুল এক আবেদনশীল ও চমৎকার, কথাসাহিত্যের জগৎ সৃষ্টি করেছেন- সমকালীনতা, চিরন্তনতা ও চিরকালীনতার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে; অর্থাৎ সমসাময়িক কাল, সমাজ, পরিবেশ ও জীবন তাঁর রচনায় ইরানি গোলাপের মতো পরিস্ফুটিত। সমকালীনতা বা সাময়িক ছাপ অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বজনীন রূপও নিয়েছে। কথাসাহিত্যের বিষয়, কাহিনী বা চরিত্র সংগ্রহের ব্যাপারে নজরুলের শক্তি অবশ্যই স্বাতন্ত্র্যধর্মী; ফলে সামগ্রীক শিল্পরূপ নিয়ে নজরুলের কথাসাহিত্যের জগৎ হয়ে উঠেছে আবেদনশীল ও চমৎকার।’

‘নজরুলের প্রবন্ধের জগৎ’ : ‘নজরুল ভারতবর্ষের মানুষের কথা ভাবতে গিয়েই সমাজনীতির কথা ভেবেছেন; ভেবেছেন তাঁর স্বদেশ ও স্বজাতির মুক্তি-উন্নতি-মঙ্গল কামনার সূত্র ধরে আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতির কথা; তবে তিনি রাজনৈতিক-কর্মী বা পেশাদার রাজনীতিক ছিলেন না; তবুও তাঁর প্রবন্ধের জগৎ নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমে তাঁর সময় ও দেশকে জানা বাঞ্ছনীয় […]।’

‘বিদ্রোহী ও কয়েকটি কবিতা প্রসঙ্গে’ : ‘নজরুলের বিদ্রোহ হচ্ছে পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার, সকল আইন-কানুনের বিরুদ্ধে উচ্চৈঃকণ্ঠ, ইতিহাস-নিন্দিত চেঙ্গিসের মতো নিঙ্কুরের জয়গানে মুখর, ভৃগুর মতো ভগবানের বুকে পদাঘাত-উদ্যত, মানবধর্ম-প্রতিক্ষায় দৃঢ়-সংকল্প, ধ্বংসের আহ্বানে উচ্ছ্বসিত, সুন্দরের প্রতিক্ষায় আন্দোলিত। […] কবিতা রচনায় বাংলা কবিতার ঐতিহ্যকে বদলে দিয়েছিলেন নজরুল। একাধারে তিনি মুসলিম ও হিন্দু ঐতিহ্যের ধারক। রবীন্দ্রশাসিত বাংলা কবিতার ভাব, ভাষা ও ছন্দে তিনি এমন ব্যতিক্রধর্মী কবিতা রচনা করলেন যা ছিল অভাবিত। প্রমাণ করে দিলেন যে, বাংলা কবিতার হাজার বছরের গড়ে ওঠা ধারা হবে ব্যতিক্রমধর্মী ও নতুন।’

‘নজরুলের শিশু-কিশোরের জগৎ’ : ‘শিশুকে নিয়ে নজরুল যে সাহিত্য রচনা করেছেন সেগুলোর উৎস হচ্ছে শিশুর প্রাণের সঙ্গে তাঁর আজীবন- নাড়ীর টান; সম্পন্দন। সর্ম্পক। এখানে নজরুল স্বতন্ত্র নন্। সৃষ্টির আভিজাত্য নিয়ে তিনি মোটেই ভাবেননি, ভাবার প্রয়োজনও পরেনি তাঁর। শিশুর সহজ সরল প্রাণের সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে যান শিশুদের সঙ্গে এই সাহিত্য-শাখায়। এই সাহিত্য-শাখা এমনভাবে রচনা করেছেন যে, তা যেন হয়ে উঠেছে মধুর-মোলায়েম ভাষা, নিরভিমান সম্মান, ছেলেখেলার রূপ, বিদ্রোহী জীবনদর্শনের পরিচয়, উদার সাহস, সহজ অথচ বলিষ্ঠ জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত ও শিশু-রসবোধে ভরপুর। নজরুলের শিশু-কিশোর সাহিত্য যেমন একদিকে কল্পনা-শক্তিতে তাদের উপযুক্ত ক্ষেত্রে উত্তোলন করে অন্যদিকে বাস্তবের রকমারি ভালো-মন্দ ফসল কুড়িয়ে তাদের মনুষ্যত্বকে সজাগ করে। ফলে নজরুলের সৃষ্ট শিশু-কিশোর সাহিত্যে রয়েছে ভবিষ্যতের ও নবপথের ইঙ্গিত।’

দ্বিতীয় পর্ব : ইতিহাসচেতনা, সমাজ-অভিজ্ঞতা ও কালজ্ঞান-এসব বোধ যখন কোনো ব্যক্তিমানস সংবেদনার স্তর থেকে চেতনাপ্রবাহের নিগূঢ় আবেগ ও বিশ্বাসের ঐক্যবিন্দুতে সুগঠিত করতে সমর্থ হয়, সৃষ্টিক্ষমপ্রজ্ঞা হিসেবে তখনই তাঁর সিদ্ধি লাভ ঘটে। সাহিত্যিক-প্রতিভার জন্য এ সাফল্য অনিবার্য শর্ত; কারণ সাহিত্যিকের জীবনার্থের রূপান্বিত রূপকই হচ্ছে তাঁর সাহিত্য। জীবনার্থে সমৃদ্ধ হওয়া এই সাহিত্যিক-প্রতিভার পক্ষেই তখন সম্ভব জাতির সমগ্রতা সন্ধানে উদ্যোগী হওয়া, সদাসর্তক থাকা, আত্মবিশ্বাসী-সংবেদনশীল হওয়া। সুতরাং সাহিত্যিকের চেতনালোকের গৌরব, মহত্ত্ব ও ব্যতিক্রমিতার সঙ্গে জৈবিক ঐক্যের সম্পর্ক জড়িত। সঙ্গত কারণেই তখন কোনো সাহিত্যিকের সৃষ্টিকর্ম বিবেচনার পূর্বে, সেই প্রতিভার প্রাণচঞ্চল নির্যাসশক্তি আবিষ্কার ও তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা একান্ত আবশ্যক। এতে তথ্য ও সংকেত-আলোকে সেই প্রতিভার আত্মস্থ অভিজ্ঞতাকেন্দ্র এবং বিকশিত আবেগময় বিস্তৃতির সীমান ও তার আভ্যন্তর বৈচিত্র্যসমূহ আবলোকন করা সম্ভব হয়। এত কথা কেন বলা হচ্ছে; কারণ আব্দুর রউফ চৌধুরীর সাহিত্য-সাধানার চেতনালোক ও শিল্পগৌরব বিবেচনার প্রয়োজনীয় শর্ত হিসেবে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে আব্দুর রউফ চৌধুরীর প্রতিভার নির্যাসশক্তির উৎস সন্ধান, তার পরিধির সীমানা নির্ধারণ এবং তার বিস্তৃতি ও বিকাশের বৈচিত্র্য অনুধাবন করা। আব্দুর রউফ চৌধুরীর প্রতিভার স্বরূপ অন্বেষণ করলেই দেখা যায় যে তাঁর প্রতিভার নির্যাসশক্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে রবীন্দ্রমানসক্রিয়ার সৃষ্টিশক্তিতে ও তাঁর জিজ্ঞাসুশক্তিতে। এই দ্বিতীয় পর্বটিই তার প্রমাণ। একমুঠো উদাহরণ:

‘চির-নূতনেরে দিলো ডাক, পঁচিশে বৈশাখ’ : ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পঁচিশে বৈশাখ ১২৬৮ বাংলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে বাক্য সমাপ্ত করতে মন চায় না, বরং ভাবতে ভালো লাগে এ-দিন বারবার আসে- সোনার বাংলার শ্যামল গাঁয়ে, রূপালী-গাঙের জলে, বোলে-ভরা ডালের ছায়ে, বিহঙ্গের শ্রান্ত স্বরে, রজনীগন্ধার গন্ধে, কোকিল-ডাকা আম্রকাননে। […] বাঙালি জীবনের খ-, ছিন্ন, অপূর্ণ অনুভূতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের আত্মা- নবদৃষ্টি ও নূতনভঙ্গির ছোঁয়ায় ও স্পর্শে-ক্ষুদ্রতার সীমা অতিক্রম করে পূর্ণতা লাভ করেছে। তাঁর স্পর্শে উদ্ভাসিত হয়েছে বাঙালি জীবনের নানা দিকদিগন্ত। কবির সৃষ্টিতে, তাঁর কবিমানসের যে অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যায় তা বাঙালি জীবনে বয়ে আনে বিশেষ সার্থকতা। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে বাংলার সৌন্দর্যে আপ্লুত হয়ে কবি যে-ছবি, যে-রূপ, যে-রস, যে-সুন্দর, যে-সুধা সঞ্চয় করেছেন এই পরিপূর্ণ পাত্র থেকে উপচে পরা অমৃত পান করে আমরা, বারবার তাঁর জন্মদিনে, হই আলোকিত, হই পুলকিত। কবি তাঁর পরমসন্ধ্যালগ্ন পর্যন্তও বাংলার ‘পরশ’ পাওয়ার জন্য ছিলেন ব্যাকুল; তাঁর হৃদয়াত্মা ছিল যেমনি একদিকে বাংলার স্থলে-জলে, কাছে-দূরে, ছন্দে-সুরের স্পর্শ পাওয়ার জন্যে আকুলিত, আন্দোলিত তেমনি অন্যদিকে বাংলার চাঁদের আলো, ডিঙিতে মাঝির ভাটিয়ালি সুর, নৌকার গায়ে থেমে-থেমে ওঠা ঢেউয়ের শব্দ, সন্ধ্যার মেঘমালা, অযুত-নিযুতভাবে বয়ে যাওয়া জলতরঙ্গানুভূতির গূঢ় আনন্দধারায় আপ্লুত; তাই ত বাংলার দৃশ্যাবলী, গ্রামীণ ভূদৃশ্য ও পল্লীবাংলার শব্দমঞ্জরি তাঁর পঙক্তিমালায় এসেছে বারবার। বাংলার লীলাচাঞ্চল্য, আনন্দবেদনা, আবেগানুভব, দুঃখসন্তাপ, আশাযন্ত্রণা, দ্বন্দ্বসংগ্রাম অনুরণিত হয়েছে তাঁর অবিস্মরণীয় বীণার তারে, আর তা রূপান্তরিত হয়েছে তাঁর শুদ্ধতম সৃষ্টিনিদর্শনে।’

‘একতারা’ : ‘রবীন্দ্রনাথ বঙ্গীয় ‘বাউলতত্ত্ব’-এর বাস্তবসত্যটি উপলব্ধি করে অবহেলিত পল্লীজীবনের সীমাবদ্ধ নিরক্ষর বাউলকে একটি বিশেষ মর্যদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাউলের একতারা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল বলেই ত তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘গোরা’ উপন্যাসে, বিনয় চরিত্রের মাধ্যমে, তাঁর মনের ইচ্ছাপূরণের জন্য বাউলকে ডেকে এনে ‘অচিন পাখি’র গানটি শুনেছিলেন। নবীন বয়সে রবীন্দ্রনাথ ‘অচিন পাখি’র গানটি শুনেছিলেন বাউলের একতারায়। […] রবীন্দ্রনাথ প্রথম জীবন থেকেই বাউল সঙ্গীতের ভাব ও ভাষার প্রতি গভীরভাবে উদ্দাম-উল্লাসে অনুরণিত হয়েছেন, যা তাঁর জীবনব্যাপী উন্মুক্ত মনেমগজে, চেতনায় সুদৃঢ় প্রভাব ফেলেছে। বাউলের গান শুনে ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের আবেগে রবীন্দ্রনাথ আপ্লুত হয়েছেন, তাই তিনি বিশ্বাস করেছেন বাঙালির ভাব ও বাঙালির ভাষা আয়ত্ত করতে হলে বাঙালি ‘যেখানে হৃদয়ের কথা’ বলে সেখানে অনুসন্ধান করতে হবে, এতে ‘[…] যেমন জ্ঞানের তত্ত্ব তেমনি কাব্যরচনা, তেমনি ভক্তির রস মিশেছে।’  জ্যোর্তিময় নাড়ীর আকষর্ণ, মানুষের সমস্ত ক্ষুধাতৃষ্ণা, সমস্ত অর্জনবর্জন, জগতের রহস্যাগারের মধ্যশক্তি, মহাসমুদ্রের বিজ্ঞান, সমস্ত আনন্দ, সত্যরূপ-এসবই খুঁজে পেয়েছেন বাউলের মাঝে রবীন্দ্রনাথ।’

‘ভগবৎসন্ধান’ : ‘ধরা-অধরার লুকোচুরি, বিশ্বাসের পরশে প্রাণ পেয়ে রবীন্দ্রনাথের মন সদা এক অনির্বচনীয় স্পন্দনালোকে উদ্ভাসিত হয়, নিরাকার আনন্দময়ের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রাণ নিবেদন করে পরিপূর্ণ ভাব, তিনি সহসা কোলাহলের মাঝে শুনতে পান নিরাকার আনন্দময়ের আহ্বান-তাঁর অরূপবাণীর সন্ধান, শুনতে পান নিভৃত হৃদয়ের মাঝে মধুরগভীর শান্তিরূপের শান্তবাণী। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস-কাব্যের সঙ্গে ভাবের সঠিক মিলন সৃষ্টি হলে মানব-মনের নিগূঢ়তম অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়, তাই ভাবজগতের উত্তুঙ্গশৃঙ্গে আরোহণ করে শিহরণ জাগানো সম্ভব হয়।’

‘রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা’ : ‘রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তার প্রকাশ মূলত তাঁর স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত হয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট অর্থনীতির চিন্তাচেতনাও এর অন্তর্ভুক্ত। তাঁর স্বদেশভাবনার মূলবিষয়গুলি হচ্ছে- স্বাদেশীকতা, ‘হিন্দু’ জাতীয়তাবাদ, স্বরাজ, বড়ো-ইংরেজ ছোট-ইংরেজ তত্ত্ব- স্বদেশে বিদেশী শাসন ও সাম্রাজবাদী ইংরেজের স্বরূপ, দেশহিত ও লোকহিত রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা প্রভৃতি।’

‘নৃত্যের তালে তালে : সুরপ্রকৃতি, বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবপ্রকৃতি’ : ‘রবীন্দ্রনাথের বিশাল সাহিত্য, কাব্য, দর্শন ও কর্মভাবনার জগতের একটা বিশেষ দিক হচ্ছে তাঁর সৃষ্ট সুরে নাটিকা ও নৃত্যনাট্যগুলো। সুরে নাটিকা ও নৃত্যনাট্যগুলোতে যেভাবে রবীন্দ্রনাথ নিজের অনুভূতিতে স্বকীয় ভাবনাকে রূপ দিয়েছেন তা অন্য কোনো ভাবে করা সম্ভব ছিল না। […] বিলেতে এসে রবীন্দ্রনাথ কবি ম্যূরের ‘আইরিশ মেলডিজ’-এর গান শিখেন। তারপর দেশে ফিরে বিলেতি সঙ্গীতের সুর ব্যবহার করে বেশ কিছু গান রচনায় মেতে উঠেন। দেশী ও বিলেতি সুরের সাহায্যে ‘সুরে নাটিকা’ লিখতে শুরু করেন। সৃষ্টি হতে থাকে ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’, ‘কালমৃগয়া’ ও ‘মায়ার খেলা’; এগুলো দেশী ও বিলেতি সুরে প্রভাবিত। […] সত্যকে জীবনে একান্তভাবে উপলব্ধি করার জন্য, নিজের অন্তরে অমৃতরস গ্রহণ করার জন্য শান্তিনিকেতনে এসে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণরূপে বিশ্বপ্রকৃতির সন্ধানে মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। খাঁচার পাখি যেমন ছাড়া পেলে তার পায়ের শিকল খসে পড়ে তেমনি তিনি এখানে এসে প্রকৃতির মাঝে বৃহৎ মুক্তির আহ্বান পান। শুধু চলার স্বাধীনতাই নয়, মনের স্বাধীনতাও। এ স্বাধীনতা তাঁকে মানব জীবনের বিকাশ সম্বন্ধে বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মিলনের সত্য ও আনন্দকে পূর্ণতায় প্রজ্বলিত করে তুলে। বিশ্বপ্রকৃতির আহ্বানই উন্মুক্ত নিখিলের øিগ্ধতা, নির্মলতা, পবিত্রতা, সমস্ত সৌন্দর্য সৌগন্ধ্যতা তাঁকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে। এর যথার্থ তাৎপর্যতা মানুষের মধ্যে নেই, ছড়িয়ে আছে শুধু প্রকৃতির মাঝেই- ফলে রবীন্দ্রনাথ তারই সন্ধান করেন। তিনি জানতেন বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত না-হতে পারলে নিজেকে আবিষ্কার করা যায় না। আত্মাকে সর্বত্র উপলব্ধি করাই হচ্ছে প্রকৃতির মধ্যে আত্মার সন্ধান করা। নিজেকে মুক্ত করার জন্যই তিনি সত্যের সন্ধান করেন, আনন্দের সন্ধান করেন। স্বার্থকে, প্রয়োজনকে, আত্মপরের ভেদকে কঠিন সংকোচকে শিথিল করে আনন্দের প্রকাশ সৌন্দর্যের মাধ্যমে ঘটানোর জন্য সাধনা করেন সৌন্দর্যলোকে স্বাধীনতা। […] মাবনপ্রকৃতি সন্ধান করতে হলে রবীন্দ্রনাথকে দেখতে হবে প্রতিবাদী কবি রবীন্দ্রনাথ হিসেবে, কিন্তু তাঁকে শুধু প্রতিবাদী কবি বললেই তাঁর সম্বন্ধে সবকথা বলা হয় না, তিনি অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন কবি, তবে একথা সত্য যে, তিনি ভেঙে দেন-মিথ্যা, জীর্ণ, অসুন্দরকে সবলে; তারপর একটি সুন্দর বাস্তবসত্যের সৃষ্টি করেন। তিনি পরাধীন দেশের কবি, তাই তাঁর সর্বাঙ্গে শৃঙ্খলের ছাপ থাকাই সম্ভব, কবির কাছে ভাঙার বাণীই উচ্চারিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। পরাধীন দেশের কবির সব চেয়ে প্রিয়স্বপ্নই ছিল বাঁধনছেঁড়ার আহ্বান- রাজভয়, মৃত্যুভয় পরিহার করে, অন্যায়কে সকল শক্তি দিয়ে আঘাত করে প্রতিবাদ প্রকাশের ছায়াছবি তৈরি করা; আঘাত যত গুরুতর, বেদনা যত নিবিড়, অত্যাচার যত দুঃসহ অবিচার ও অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হয় তত প্রকট […]। […] ‘তাসের দেশ’-এর ভিতর দিয়ে পরাধীন দেশবাসীকে ইচ্ছেমন্ত্রই প্রদান করেছেন। বলেছেন যে, আমরা আমাদের ইচ্ছেশক্তিকে কোনওশক্তির কাছে বলি দিতে রাজি না, হোক সেশক্তি রাষ্ট্রশক্তি, শাষকশক্তি, নিয়মশক্তি, আইনশক্তি বা সমাজপতিদের শক্তি। আত্মপ্রকাশের পথে রবীন্দ্রনাথ কোনো বন্ধনকেই স্বীকার করতে চান নি, কারণ তিনি যেমনি ছিলেন দুঃসাহসিক, তেমনি অভিনব চিন্তার নায়ক- জীবনবোধের গভীরতা ও ব্যাপকতা থেকেই এর জন্ম, এবং এবোধ অনেক পরিমাণে বাস্তবজীবনদর্শনের খুব কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। রবীন্দ্রনাথের কাছে মানুষ, জীবন ও শিল্প অভিন্ন। তিনি যেমনি নিজের জীবনকে ভেঙে ভেঙে নূতনভাবে গড়ে এক অনুপম শিল্প সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, তেমনি বাস্তব ক্ষেত্রে শিল্পসাধনার মাধ্যমে নূতন দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই জীবন ও শিল্প তাঁর কাছে অভিন্নার্থক। অহিংসা, শান্তি ও মানুষে মানুষে সৌভ্রাত্র ও প্রেমসম্পর্কের আর্দশ ঘোষিত হয়েছে তাঁর শিল্পসাধনার বাণীতে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে, যৌবনের আনন্দে ভয়হীন সজীবনবীন তরুণরা নূতনের আহ্বানে জীর্ণপুরাতনকে ভেঙে দেবে। এ ‘তাসের দেশ’ হচ্ছে সনাতনপন্থী বাংলাদেশ। কতবার কত রাজা-মহারাজার আবির্ভাব ঘটেছে এদেশে। তারা বাঙালির কানে কানে বলে গেছেন, ভাঙতে হবে এখানকার সব অলসতার বেড়া, ভাঙতে হবে নির্জীবের গ-ি, রাজাকারের আস্তানা, ঠেলে ফেলতে হবে এসব নিরর্থক আবর্জনা, ছিঁড়ে ফেলেতে হবে কুসংস্কারের আবরণ টুকরো টুকরো করে। হে তরুণ মুক্ত করো, শুদ্ধ করো, পূর্ণ করো বাংলাদেশ। […] ‘শাপমোচন’-এ পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলন সম্ভবপর করে তুলেন রবীন্দ্রনাথ। এখানে এ-ই প্রমাণিত হয় যে, যে-সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে মোহগ্রস্ত ও অহংকারী করে তুলে, অসত্য ও অশুভবোধ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে; তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ‘শাপমোচন’ লিখেন। […] ‘চিত্রাঙ্গদা’র মুখ্য বিষয় হচ্ছে আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্ববোধের মাধ্যমে প্রতিবাদ প্রকাশ করা। এতে রবীন্দ্রনাথ নরনারীর অন্তরের ভাবানুভূতি ও যৌবন সমস্যাকে আকাক্সক্ষা, তৃপ্তি, দেহ সম্ভোগ নতুনভাবে রূপ দেন। দেহ ও হৃদয়ের মিলনের মধ্যমে যে প্রকৃত প্রেম লাভ করা তারই সন্ধান করা। […] সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ যেমনি প্রতিবাদ প্রকাশ করেছেন তেমনি ‘চ-ালিকা’র মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন-জয় হয় পুণ্যের, জয় হয় সংযমের, জয় হয় করুণার, জয় হয় ক্ষমার, জয় হয় প্রীতির ও সাম্যবোধের। […] রবীন্দ্রনাথ ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যের মাধ্যমে প্রকাশ করতে চেয়েছেন যেখানে ক্ষান্তি নেই সেখানে প্রীতি ও শান্তি থাকতে পারে না। এ-সত্যই তিনি ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যে বারবার প্রকাশ করেছেন। উত্তীয়ের প্রেম শ্যামার প্রতি যদিও জয়লাভ করেছে; তবুও বজ্রসেনের যে কামনা শ্যামাকে ঘিরে সে প্রেমের মর্যাদা পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হয়নি। কারণ, বজ্রসেন ক্ষমা-সুন্দর অন্তরে, নিজেকে বিসর্জন দিয়ে, শ্যামার প্রেমকে গ্রহণ করতে পারেনি।’

 রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত জগৎ

কবিগুরু বরীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র বাঙালির কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিশ্বকবি, বিশ্বের কবি চূড়ামণিদের মধ্যে অন্যতম। শতাব্দীর-পর-শতাব্দী তাঁর সৃষ্ট কাব্য-পুষ্প ও সুরলহরী চয়ন করে নবীন কবি-সাহিত্যিক-সঙ্গীতরসিকবৃন্দ নিজেদের সঞ্জীবিত করে চলমান জীবনে নবমূল্যায়নের সোপান খুঁজে পাবেন; কারণ, যা শাশ্বত-সত্য-সুন্দর তার কোনো অবস্থাই মৃত্যু নেই। ‘রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সৃষ্টি যেমন বিপুল, অফুরন্ত ও বিশাল; তেমনি তাঁর সঙ্গীত সৃষ্টিও পরিমাণে বিস্তর। সমস্ত জীবনব্যাপী, বৈচিত্র্যে অভিনব। নূতন রীতিকলায় বিস্ময় জাগায়। বাণী আর সুরের এক নূতন মিশ্রণে যৌগিক রসায়ন ঘটিয়ে নব প্রত্যূষ জগতের সৃষ্টি করছেন রবীন্দ্রনাথ; এতে শিল্পের এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত। সুতরাং, তাঁর সৃষ্ট সঙ্গীত নিয়ে যখন আলোচনা করতে হয় তখন দেখা যায় বাণী আর সুরের মারফতি খেলায় এ-জগৎ ভরপুর। এই মহাবিস্ময়কর অসাধ্য বিশাল বিষয়টির বিশ্লেষণ সহজে করা যায় না, সাধারণ বা গতানুগতিক কোনো আলোচনার পরিধিতে এই ধারণাতীত বিষয়টি যথাযথ উপস্থাপন করাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।’

তবুও আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত জগৎ’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে তাঁর সঙ্গীতকে শ্রেণীবিন্যাস করেছিলেন সেই পথেই অগ্রসর হয়ে ‘আভাস’ পর্বে আলোচনা করেছেন। ‘রবীন্দ্রনাথপ্রদত্ত তালিকাটি হচ্ছে: ১. ‘পূজা’ (উপবিভাগ: ‘গান’, ‘বন্ধু’, ‘প্রার্থনা’, ‘বিরহ’, ‘সাধনা ও সংকল্প’, ‘দুঃখ’, ‘আশ্বাস’, ‘অন্তমুর্খে’, ‘আত্মবোধন’, ‘জাগরণ’, ‘নিঃসংশয়’, ‘সাধক’, ‘উৎসব’, ‘আনন্দ’, ‘বিশ্ব’, ‘বিবিধ’, ‘সুন্দর’, ‘বাউল’, ‘পথ’, ‘শেষ’ ও ‘পরিণয়’), ২. ‘স্বদেশ’, ৩. ‘প্রেম’ (উপবিভাগ: ‘গান’ ও ‘প্রেম-বৈচিত্র্য’), ৪. ‘প্রকৃতি’ (উপবিভাগ: ‘সাধারণ’, ‘গ্রীষ্ম’, ‘বর্ষা’, ‘শরৎ’, ‘হেমন্ত’, ‘শীত’ ও ‘বসন্ত’) আর ৫. ‘বিচিত্র’ ও ‘আনুষ্ঠানিক’। তাছাড়া ‘প্রবাহিণী’ গ্রন্থে ছয় বিভাগে বিভক্ত করা হয়; যথা ‘গীতগান’, ‘প্রতাশ্যা’, ‘পূজা’, ‘অবসান’, ‘বিবিধ’ ও ‘ঋতুচক্র’। আর ‘ঋতু-উৎসব’ গ্রন্থে ‘সুন্দর’ নামে গীতগুচ্ছ সংবদ্ধ করা হয়।’

তারপর আব্দুর রউফ চৌধুরী অগ্রসর হন রবীন্দ্রনাথের ‘বিলেতি ভাঙা গান’-এর দিকে। যে সঙ্গীতিক আবহাওয়ার মধ্য-দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ছেলেবেলা অতিবাহিত করেছিলেন- সেখানে প্রাচ্য (বিশাল বাংলাঞ্চল) এবং পাশ্চত্ত্যের (বিলেতি) সঙ্গীতধারা উভয়ই সমানভাবে প্রবাহিত হত। কাজেই নিজের সঙ্গীতের ভা-ার বৃদ্ধি করার তাগিদে বাংলা-সঙ্গীতের সাহায্য যেমন নেন তেমনি পাশ্চত্ত্য-সঙ্গীতের সুরের মাধুর্য তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তাই বিলেতি ভাঙা সুরের অনুকরণে বেশকিছু গান তিনি রচনা করেছিলেন। এগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়- ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’, ‘মায়ার খেলা’ ও ‘কালমৃগয়া’ গীতিনাট্যের অনেক গানে। এই গানগুলো নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর এই গ্রন্থের ‘বিলেতি ভাঙা গান’ পর্বে। তারপর অগ্রসহ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ‘রাগভিত্তিক সঙ্গীত’-এর দিকে। কিশোর রবীন্দ্রনাথ মহর্ষি পিতার অনুপ্রেরণায় ধ্রুপদ-ধামার সঙ্গীতের অনুকরণে অনেক ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা করেন, যা সেইসময়ে গুণীজন দ্বারা বিশেষ প্রশংসিত হয়। যদিও রবীন্দ্রনাথ ধারাবাহিকভাবে কোনো ধ্রুপদ-ধামার সঙ্গীত শিক্ষাগ্রহণ করেননি, তবুও তাঁর ক্ষমতার গুণে সৃষ্ট রাগভিত্তিক সঙ্গীত অনিন্দ্য-সুর-গীত রবীন্দ্রপ্রতিভার অপূর্ব সাক্ষ্য বহন করে। ‘রাগভিত্তিক সঙ্গীত’ নিয়ে বিশদভাবে আলোচনার পর আব্দুর রউফ চৌধুরী অগ্রসর হন রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট ‘লোক-সঙ্গীত’-এর দিকে। তারপর ‘নৃত্য-নাট্য’ ও ‘অন্যান্য প্রসঙ্গ’-এ। ‘অন্যান্য প্রসঙ্গ’-এ আব্দুর রউফ চৌধুরী আলোচনা করেছেন নাটকের প্রয়োজনে বরীন্দ্রনাথ যেসব গান রচনা করেছিলেন সেগুলো নিয়ে; এছাড়াও স্থান পেয়েছে ‘নাট্য অভিনয় ও তারিখ’, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট ‘তাল’, ‘রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে গানের রেকর্ড’ ইত্যাদি। এই গ্রন্থে আব্দুর রউফ চৌধুরী ‘রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত জগৎ’ নিয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ যথেষ্ট তথ্যপূর্ণ আলোচনা যেভাবে করেছেন, এতে শুধু সঙ্গীত প্রভাকর, বিশারদ, সুধাকরই নয়, যেকোনো সঙ্গীত-অনুরাগীর কাছেও সবিশেষ আদৃত হওয়ার কথা।

 

 নজরুলের সঙ্গীত জগৎ

কাব্য, সাহিত্য, কবিতায় মানসের ভাবরূপটি বাণী নিঃসৃত হয়ে নজরুল ইসলামকে করে অদ্বিতীয়। সেই ভাবরূপে সুরারোপ তাঁর সৃজনীতে নান্দনিক স্পর্শ দিয়ে অমরাবতীর সুরধ্বনির স্পন্দনে এই মর্র্তধূলোকে করে তীর্থবতী। কবি নজরুল ইসলাম প্রাচ্যের বহু ধারার সঙ্গীতকে নিজের সঙ্গীতে সংযোজনের মাধ্যমে ভারতবর্ষের সঙ্গীত ধারাকে করেছেন সমৃদ্ধ। নজরুল-সঙ্গীত ধারা ছন্দে-বর্ণে-সুরে লীলায়িত হয়ে বিশেষ একটি ধারার প্রবর্তন করেছে। নজরুলের উদ্দাম-প্রাবল্য দেশাত্মবোধক গানে ও প্রেমের গভীরতম স্পন্দনে সুরের ছোঁয়ায় তাঁর প্রেম-সঙ্গীতকে নানা রঙে-ঢঙে-বর্ণে রূপায়িত করে এক অনির্বচনীয় শৈল্পীক গানের ধারা ভারতবাসী তথা বাঙালিকে উপহার দিয়ে গেছেন। ‘নজরুলের সঙ্গীত জগৎ সুর সুধায় সিক্ত। সুরের রত্নগর্ভখনি ছিলেন নজরুল। সুরের উপর অসাধারণ দখল ছিল বলেই তার সঙ্গীত রচনার পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। সুরের কাঠামো ঠিক হয়ে গেলেই তিনি সে অনুযায়ী বাণী বসিয়ে দিতেন। আর সেই বাণী, সুরের স্পর্শে ঝঙ্কৃত হয়ে উঠত। ফলে তাঁর বেশিরভাগ গানই মূলত সুরনির্ভর। সুরের উপর কাজ করতে করতে সুরেরই প্রয়োজনে তিনি শব্দ সংগ্রহ করেছেন। শব্দকে শুধু গ্রন্থিবদ্ধ করেছেন যেন। আবার কোনো কোনো গানে সুরসৃষ্টি ও বাণীনির্মাণ সমানভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।’

নজরুল-সঙ্গীতকে-‘রাগ-সঙ্গীত’, ‘দেশ ও মানুষ’, ‘ধর্ম-ভক্তি’ ও ‘প্রেম-কাব্য ও অন্যান্য-সঙ্গীত’-শ্রেণী-বিন্যাসে বিভক্ত করে আব্দুর রউফ চৌধুরী আলোচনায় ধাবিত হন। তিনি যেভাবেই নজরুলের সঙ্গীত নিয়ে বিদশভাবে আলোচনা করেছেন তার সারমর্ম হচ্ছে : ১. ‘রাগ-সঙ্গীত’ অর্থাৎ রাগ-প্রধান বা রাগ-আশ্রয়ী সঙ্গীত; যেমন: লক্ষ্মণগীতি, ধ্রুপদ, ঠুমরী, খেয়াল, গজল প্রভৃতি; এছাড়া লুপ্ত বা আধ-লুপ্ত রাগ-রাগিণীকে অবলম্বন করে ‘হারামণি’ পর্যায়ের গান; এবং নতুন সৃষ্ট রাগ-রাগিনীর উপর নির্ভর করে ‘নব-রাগ’ শ্রেণীর গানগুলো নজরুল ইসলামের সঙ্গীত প্রতিভার অসামান্য কৃতিত্বের নিদর্শন; ২. ‘দেশ ও মানুষ’ অর্থাৎ দেশাত্মবোধক-সঙ্গীত; যেমন: মার্চ-সঙ্গীত, জাগরণী-সঙ্গীত, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান, নারী জাগরণের গান, কৃষক-শ্রমিকের গান, ধীবরের গান, ছাদ-পেটার গান, তরুণ বা ছাত্রদলের গান, স্বদেশ-প্রেমের গান, ঋতু সঙ্গীত, ব্যাঙ্গাত্বক গান ইত্যাদি; এসব গানে বিদ্রোহী কবির স্বদেশ-প্রেম, বিদেশী জাতির শৃঙ্খল হতে মুক্তির আকাক্সক্ষা, বৈপ্লবিক মানসিকতা, সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী এবং সাম্যবাদী চিন্তাধারার জ্বলন্ত প্রকাশ ঘটেছে; ৩. ‘ধর্ম-ভক্তি’-মূলক সঙ্গীত; যেমন: ইসলামী গান, মুর্শেদী, শ্যামা সঙ্গীত, কীর্তন, ভজন, হোলি, বৈষ্ণব পদাবলী, বাউল প্রভৃতি; পরিণত জীবনে এবং দুঃখের কালান্ত জ্বালায় নজরুলের ভক্তমুখী মনে যে ঈশ্বর উপলব্ধি জন্মেছিল তা থেকে এসব গানের সৃষ্টি; ৪. ‘প্রেম-কাব্য’-সঙ্গীত; যেমন: আধুনিক, প্রেম, বিরহ, হাসির গান প্রভৃতি; প্রেম-সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিরহ-ব্যর্থতা-আশা-নিরাশা-মিলন-অভিসার এবং মানবিক প্রেমের মধুর জটিলতায় সৃষ্ট অনিন্দ্য-সুন্দর রূপ, আর কাব্য-সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য সুরের সৌকর্যের পাশে পাশে ভাষারও সৌন্দর্য, অর্থাৎ ভাষাকে খর্ব করে সুর নয়, আবার সুরকে খর্ব করে ভাষা নয়; ৫. ‘অন্যান্য-সঙ্গীত’; যেমন: পাহাড়ী, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, সাম্পানের গান, ঝুমুর, লাউনী, কাজরী প্রভৃতি; এসব গান যেমন মাটির সোঁদা গন্ধে ও গ্রাম্য জীবনের ঘ্রাণে ভরপুর, তেমনি প্রকৃতির মায়া ঘেরা অনাবিল সৌন্দর্যের দ্যোতক; এছাড়াও নৃত্য-সঙ্গীত, দ্বৈত-সঙ্গীত, চলচ্চিত্র ও নাটকের গান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন বিদেশী সুরের আদলেও সৃষ্ট, যেমন: ইরানি, আরবি, তুর্কি, কিউবান প্রভৃতি গানের প্রসঙ্গও এনেছেন। নজরুল-সঙ্গীত ‘জিপসী’ সুরের অনুপ্রবেশে আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধের দ্যোতক। আব্দুর রউফ চৌধুরী যে নজরুলের প্রতি নিবেদিত, তাঁর স্পন্দনে স্পন্দিত, তাঁর ভক্তমনের ভক্তি, তন্ময়তার এক অভিনব, অবিস্মরণীয়, অনিন্দ্য-সুন্দর রূপায়ণে ভাস্কর এই গ্রন্থের প্রতিটি পৃষ্ঠায়।

 

 মননশীল গদ্য রচনা (গবেষণা ও ইতিহাস)

 যুগে যুগে বাংলাদেশ

‘যুগে যুগে বাংলাদেশ’ লেখকের স্বদেশ অন্বেষার পরিচয়বাহী তাৎপর্যপূর্ণ একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ। মূল বিষয় ইতিহাস পুননির্মাণ। বঙ্কিমচন্দ্রের আক্ষেপ ছিল বাঙালির ইতিহাস নেই, সেই ইতিহাস সকলের সহযোগে লিখিত হওয়া আবশ্যক। দীনেশ সেন, ড. নীহাররঞ্জন রায় থেকে রমেশচন্দ্র দত্ত কিংবা ড. হাবিবুল্লাহ, আব্দুর রহিম, ড. আব্দুল করিম তো বটেই, এমনকি ড. আহমদ শরীফ. ড. অজয় রায়, ড. আনিসুজ্জামান, ড. কামরুদ্দিন আহমদ প্রমুখের রচনায় বা সম্পাদনায় সেই ইতিহাস আজ অনেকখানি পুনর্লিখিত হয়েছে। আব্দুর রউফ চৌধুরীর নাম এই তালিকায় নবতর সংযোজন। তবে তাঁর তথ্য সংযোজন ও বিশ্লেষণ প্রণালী, ইতিহাসের সূত্রসন্ধান ও তত্ত্ব ব্যাখ্যা কতখানি ঐতিহাসিকের অধিকার প্রসূত বা ইতিহাস তত্ত্বে গ্রাহ্য তা নিয়ে প্রশ্ন হতে পারে বৈ কি। কিন্তু এটা সত্য যে, আব্দুর রউফ চৌধুরীর এই গ্রন্থে যেমন ইতিহাস অন্বেষণ আছে, তেমনি আছে স্বদেশের পরিচয়টি প্রতিষ্ঠার অকৃত্রিম আকুতি ও প্রয়াস। এ যেন এ দুয়ের মিলিত দৃষ্টির মননী ফসল। ফলত তিনি এই ইতিহাসকে পূর্ববর্তী কোনো আদর্শের ছাঁচে ঢেলে পুননির্মাণ করেননি। তাঁর এই ছক বা কাঠামো-পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য এবং তথ্য প্রমাণাদি সংগ্রহ একেবারেই স্বকৃত কৃতিত্ব; সবটুকুই তাঁর নিজস্ব চিন্তা ও উদ্ভাবন প্রসূত। এর পেছনে দেশপ্রেম ছাড়াও রয়েছে একটি মানবিকদর্শন, যার আলোকে প্রাক-বৈদিক সমাজ, আর্য অভিযান ও জনপদ স্থাপনা, আলেকজান্ডার ও গঙ্গারিড্রাই তথ্য, মৌর্য থেকে গুপ্ত হয়ে শশাঙ্কের কাল, পাল ও পালপরবর্তী অর্থাৎ সেন ও মুসলিম যুগ (সুলতানি-পাঠানী-মোগলাই-নাবুবী) ও কোম্পানির শাসনপর্ব, ব্রিটিশ ও উত্তর-উপনিবেশি-কাল (পাক-কাল), এরপর ভাষা-আন্দোলন, ছয়দফা, ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন পেরিয়ে, স্বাধীনতার ঘোষণা ও ২৫ মার্চের ভয়ানক রাত এবং ফলদায়ক পরিণতিতে স্বাধীনতা অর্জন ও পরিশেষে বাঞ্ছিত পরিবর্তনের কামনার কথা টেনে এই ইতিহাস সন্ধানের পথ নির্মিত হয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস বর্ণনায় যেমন তিনি যথাসম্ভব আকার গ্রন্থাদি ব্যবহার করেছেন, যথা বেইজিং প্রকাশিত ফা-হিয়েন এর বিবরণ পঞ্জি বা গবেষক জেমস জে. নোভাকের বাংলা ইতিবৃত্ত ইত্যাদি, তেমনি অপেক্ষাকৃত আধুনিককালের তথ্য সংগ্রহে ব্যবহার করেছেন ডব্লু. ডব্লু. হানটারের ‘ভারতীয় মুসলমান’, জেমস লঙ-এর মামলার নথিপত্র, শিবনাথ শাস্ত্রী, যোগেশ বাগল, সুপ্রকাশ রায়, রমেশ মজুমদার, কমরেড মুজাফফর আহমদ, এ. আর. মল্লিক (ব্রিটিশনীতি সংক্রান্ত গবেষণা) ইত্যাদি এবং সেই সাথে ১৯-২০ শতকের অপর তথ্যাদির উৎস স্বরূপ বিনয় ঘোষ, বদরুদ্দিন উমর, আনিসুজ্জামান প্রমুখের গবেষণা। আবার, এই সময়ের সাহিত্য (যথা বিদ্যাসাগর রচনাবলী, রবীন্দ্র রচনাবলী ও পত্রাবলী)-কেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দেখতে পাই। এমনকি তিনি সাম্প্রতিক গবেষক এম. আর. আখতার মুকুল ও দ্রোহী লেখক প্রয়াত আহমদ ছফার সূত্র ব্যবহারেও উদারতা প্রদর্শন করতে কার্পণ্য করেননি কিছু মাত্রই। আকার তথ্যের প্রয়োজনে পত্র-পত্রিকা (ক্যালকাটা রিভ্যু, হিন্দু প্যাট্রিয়টিক, দি ইংশম্যান, অমৃত বাজার পত্রিকা ইত্যাদি এবং ঢাকার কিছু জাতীয় দৈনিকের) সূত্র যেমন নির্দেশ করেছেন, তেমনি সমসাময়িক কালের একাধিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ভাষণাদি ও আত্মজীবনীও তিনি ব্যবহার করেছেন। এইভাবে বিশাল তথ্যভা-ার উপস্থাপিত করে ও তার সাথে নিজস্ব ব্যাখ্যা, উপলব্ধি  ও বিশ্লেষণাদি যুক্ত করে লেখক কাল ও কালান্তরের গতি-অগ্রগতির ধারা ও গতিপরিপন্থী সঙ্কটের কথা নির্দেশ করতে চেষ্টা করেছেন। বাংলার ইতিহাস অবশ্যই অসামান্য ও দূর বিস্তৃত। কিন্তু লেখক তাঁর লক্ষ্য স্থির রেখেই সে ইতিহাস অনুসন্ধান তথা পুনর্নির্মাণে প্রবৃত্ত হয়েছেন। আর সেই লক্ষ্যটি গ্রন্থের সর্বশেষ অধ্যায়ে (পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) গিয়ে স্থির হয়েছে। এখানে বাংলাদেশকে আলাদা করে তার পটভূমি বা স্বাধীনতা পরবর্তী অবস্থা বা সঙ্কটের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়নি। লেখকের উদ্দেশ্যও তা নয়। কিন্তু তার মধ্যেই যা বাস্তব অর্থাৎ যেমন গণ-অসন্তোষ, আর্থ-সাংস্কৃতিক সঙ্কট, রাজনৈতিক ক্ষমতা তথা ঔপনিবেশকতার উত্তরপ্রবাহ এবং সেইসব সমস্যার ঘণীভূত কেন্দ্রসমূহ পরিষ্কার ভাবেই উপস্থিত করেছেন লেখক। একটি ঐতিহাসিক নির্লিপ্ততার বোধ এখানে সবসময়ই ক্রিয়াশীল থেকেছে।

এই ইতিহাস নির্মাণে, অতএব স্বভাবতই, প্রতিষ্ঠিত কোনো তত্ত্বেরই প্রাধান্য নেই। লেখক প্রাচীন অংশের বর্ণনায় যেমন আর্যবাদ বা অর্যশ্রেষ্ঠত্ববাদকে এড়িয়ে গেছেন, তেমনি আধুনিক কালের বর্ণনায় পাশ্চত্ত্যবাদ তথা ইংরেজ-শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা দ্বিজাতিতত্ত্বের মতো অপ্রমাণিত ধারণামাত্রকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে বরং প্রশ্নাক্ত করেছেন। তাঁর বর্ণনা যেমন নিরপেক্ষ, তেমনি তাঁর উপাত্ত বা তথ্যাদিও প্রামাণ্য। তাঁর বক্তব্য পূর্ব সিদ্ধান্তমূলকতা রহিত। এই ভাষাও বর্ণনাধর্মী, যৌক্তিক, ঘটনা-উম্মীলক। তাঁর দৃষ্টি ও দর্শন এভাবেই ঐতিহাসিকের কাছেও হয়েছে দুর্লভ। ‘যুগে যুগে বাংলাদেশ’ এই সময়ের ইতিহাস-সন্ধানীদের একটি আদর্শ স্বরূপ। তথ্যগত দিক থেকেও তা একটি আকর গ্রন্থ রূপে উল্লেখ লাভের যোগ্য। বইটি পাঠযোগ্যতা ও সর্বদিক থেকে এর গ্রহণযোগ্যতা লেখককে একজন খাঁটি ঐতিহাসিকের মর্যাদায় ভূষিত করবে সন্দেহ নেই।

 

 স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা

আব্দুর রউফ চৌধুরীর স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা শীর্ষক গ্রন্থটি তিন পর্বে বিভক্ত বাংলাদেশ বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। লেখক বইটিকে প্রধান তিনটি পর্বে বিন্যন্ত করেছেন। এই তিনটি পর্ব হলো যথাক্রমে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন (১৯৪৭-৫৪), স্বাধিকার আন্দোলন (১৯৫৫-৭০) ও স্বাধীনতার আন্দোলন (১৯৭১)। লেখক এই প্রধান তিনটি পর্বকে আবার কতগুলি উপবিভাগে ভাগ করে আলোচনা করেছেন। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, পাকি দখলদার বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের গণহত্যা এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের ইতিহাসও এ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যাঁরা  বাংলাদেশ আন্দোলনের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণসমূহ এবং আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়কে অনুপুঙ্খভাবে জানতে চান তাদের জন্য বইটি খুবই উপযোগী বিবেচিত হবে।

লেখক ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে একটি ‘অস্বাভাবিক রাষ্ট্র’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এর স্বপক্ষে যুক্তি উত্থাপন করে তিনি বলেছেন: ‘ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সংস্কৃতির দিক থেকে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ- পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসীদের পাঞ্জাব-সিন্ধু-বেলুচিস্তান-সীমান্তপ্রদেশের জাতিসত্তা, গোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র থাকা সত্ত্বেও চৌদ্দআনাই এক, অন্যদিকে বাংলার সঙ্গে পনেরআনাই ভিন্ন, একআনা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের সূত্রে বাঁধা […]। পাকিস্তানের আপন বিশেষত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে জনগণকে একসূত্রে বাঁধার জন্যে যে জাতীয় গাথা ও প্রতীকের একান্ত প্রয়োজন তা দুই অঞ্চলে মিলিতভাবে ছিল না […]।’ (প্রাককথন পৃ. ১৬-১৭)।  লেখকের এ উক্তিসমূহ যর্থাথ। এবং ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘একআনা’ ঐক্য নির্ভর অস্বাভাবিক রাষ্ট্র পাকিস্তান যে টিকতে পারে না সেকথা আব্দুর রউফ চৌধুরী পাকিস্তানের দুই অংশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সভ্যতা-সংস্কৃতি-সাহিত্য, লোকজ শিল্পকলা-আচার-অনুষ্ঠান উৎসব, নিসর্গ ও ভূপ্রকৃতি এবং নদী-নালা, খাল-বিলের আলাদা বৈশিষ্ট্য ও বৈপরীত্যজনিত প্রভাবে দুই অংশের মানুষের মানসনির্মিতিতে (Mindset) শত সহ¯্র বছর ধরে যে স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করেছে তার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। তাছাড়া বাঙালিরা মধ্যযুগের সূচনা-পর্ব থেকেই গণতন্ত্র চর্চার ইতিহাস সৃষ্টি করেছে অষ্টম শতকে গোপাল নামের এক সজ্জন সাধারণ মানুষকে রাজা নির্বাচন করে। সেই ধারায় শত শত বছরে বাংলার সামন্ততান্ত্রিক ভূমি ব্যবস্থার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে গণতান্ত্রিক চেতনার পাটাতন। আর গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তি তৈরি হলে পরমত সহিষ্ণুতা, ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার বিকাশ এবং মানবিক চৈতন্যের বিকাশও অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে সেটাই ঘটেছে হাজার হাজার বছর ধরে। সেজন্যেই বাংলার কবি মধ্যযুগেই বলতে পেয়েছেন:

‘কলিযুগে বিষম ধর্মের মায়াবাজি।/ কেহবা ফকির হল্য কেহ মর্দ গাজী।

কেহ কর্ণদাতা কেহ ভিক্ষা মাগি খায়।/ এসব ধর্মের লীলা বলা নাঞি যায়।’

– কবি রূপরাম : ধর্মমঙ্গল।

এভাবেই কয়েকশ বছরে বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবিতার ধারা এবং মধ্যবিত্ত্ সমাজের চিন্তন-প্রক্রিয়া। বর্তমান পাকিস্তানের লোককবি ও সুফি সাধকেরা যে মানবতার পক্ষে কাজ করেননি এমন নয়, তবে ওই অঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থায় ও সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো এতটাই শক্তিশালী ও অনড় ছিল যে সেখানে শাসন ব্যবস্থা গণতান্ত্রিকতা ও উদারতাবাদের (Liberalism) কোনো পরিসর তৈরি হতে পারেনি। সামন্তবাদ ভেঙ্গে তার ভেতর থেকে তৈরি হয়নি সামাজিক সচলতার প্রতিনিধিত্বকারী শক্তিশালী মধ্যবিত্ত সমাজ ও তাদের অগ্রবাহিনী (Vanguard) বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালন করেন সামন্ত প্রভূ, ভূস্বামী ও সিভিলী-মিলিটারী বুরোক্রাসির একটি প্রবল আধিপত্যবাদী ও প্রভুক্তকামী চক্র। এদের কাছে পূর্ব পাকিস্তানীদের রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক অধিকার এবং ন্যায়সঙ্গ দাবীদাওয়ায় কোনো মূল্য ছিল না। ফলে পূর্ব-বাংলার জনগণ চরমভাবে শোষিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার এই অসমধারা, অবিবেচনা এবং রাষ্ট্রের এক অংশের মানুষের প্রতি অন্য অংশের শাসকদের ঔপনিবেশিক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী ও শাসননীতি পাকিস্তানের পূর্বাংশের জাতিগত স্বকীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সচেতন মানুষকে কেন্দ্রীয় সরকারের জুলুম ও দুঃশাসনে ক্ষুব্ধ করে তোলে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই গণপরিষদে এর প্রকাশ ঘটে তৎকালীন পূর্ব-বাংলার তরুণ জনপ্রতিনিধি শেখ মুজিবুর রহমানের সংসদীয় বক্তৃতায়। ১৯৫৫ সনেই তিনি পাকিস্তান গণপরিষদে বলেন :

ক. Donot play with fire […] Give us autonomy with three powers in the centre. (২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫)

খ. I know this that the ruling clique-the ruling junta of Pakistan, is just like a knife while the people of East Pakistan are considered to be fish. (ঐ)

গ. Zullum mat Karo bhai […] otherwise a time is coming when you will realise the consequences of this wrong actions. (২২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫)

ঘ. Bengal has a history, has a tradition of its own. (২৫ আগস্ট ১৯৫৫)

ঙ. We would like to be called ourselves as Bengali. (২১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫)

পূর্ব বাংলার বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনাই শুধু উপর্যুক্ত বক্তব্যসমূহে বিধৃত হয়নি, আমাদের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাও এতে বীজাকারে সুপ্ত রয়েছে।

দুই

আব্দুর রউফ চৌধুরীর বইটিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভদের আনুপূর্বক ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। তবে এর পটভূমি হিসেবে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তান আন্দোলনকেও তিনি তাঁর আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি তাঁর বিষয় বিভাজনে স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসাবে চিহ্নিত না করে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দানের অংশভুক্ত করেছেন। ফলে তা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের বিষয় হয়েছে। প্রথম পরিচ্ছদের সূচনায় ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তান প্রস্তাব’ শিরোণামে লেখক ১৯১৭ সালে স্টকহলমে নাম না জানা দুই ভারতীয় ছাত্রের ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাগের প্রস্তাব থেকে শুরু করে কবি ইকবাল, চৌধুরী রহমত আলী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্, এ. কে. ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখের এতদসংক্রান্ত চিন্তা এবং দ্বিজাতিতত্ত্ব ভাবনার নানা পর্যায়কে লেখক তাঁর বইয়ে তুলে এনেছেন।

এমনকি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মৌল রাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বক্তব্যে (১১.৮.৪৭) গণপরিষদে দেয়া পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতি সংক্রান্ত চিন্তার ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তনের বিষয়টিও বইয়ে মুদ্রিত করে দেয়া হয়েছে। এবং তৎকালীন অর্থসচিব ও পরে গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের এই অসামান্য বক্তব্যটিও আব্দুর রউফ চৌধুরী উদ্ধৃত করতে ভোলেননি। গোলাম মোহাম্মদ একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলকে বলেছিলেন : ‘আমি আপনাদিগকে সুনির্দিষ্টভাবে জানাইতেছি যে, পাকিস্তান ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, ইহা ধার্মিক রাষ্ট্র নহে এবং নাগরিক হিসেবে আপনাদের প্রত্যেকেরই রাষ্ট্রের কর্ণধার স্বয়ং কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র অনুরূপ অধিকার ও সুযোগ আছে।’ (দৈনিক আজাদ, ৯ অক্টোবর ১৯৪৭ থেকে উদ্ধৃত, পৃ. ৩৭-৩৮)। কিন্তু গণতান্ত্রিক ও ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের বহুজাতিক ফেডারেল রাষ্ট্র ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রনীতি অনুসরণ না করে জিন্নাহ্ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার স্বৈরাচারী ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানে ‘একজাতিতত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেন। জিন্নাহ্র এই প্রস্তাবকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শেষের সূচনা (নবমরহহরহম ড়ভ ঃযব বহফ) হিসাবে আখ্যাত করা যায়।

 

তিন

আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর বইয়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছদের নামকরণ করেছেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও ভাষা-আন্দোলন। লেখক বহুভাষার জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটির রাষ্ট্রভাষা কী হবে তার ওপর রাজনৈতিক নেতাদের নানা বক্তব্য বিবৃতি এবং সংস্কৃতি ক্ষেত্রের তাত্ত্বিকদের নানা তর্ক-তদন্ত বিধৃত বক্তব্য যেমন উপস্থাপন করেছেন তেমনি গোটাভারতের সাধারণ ভাষা (খরহমঁধ ঋৎধহপধ) কী হতে পারে তা নিয়ে যে এক সময়ে বিতর্ক চলছিল সে বিষয়টিকেও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করায় উপমহাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতার অব্যবহিত পথে পাকিস্তানের ভাষা বিতর্কের বেশ বিস্তৃত ও তথ্যপূর্ণ বিবরণ সমকালীন বইপত্র এবং পত্রিকা, পুস্তক, লিফলেট, সরকারি দলিলপত্র ঘেঁটে তাঁর বইয়ে উপস্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বিভিন্ন ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সভাসমিতি সংগঠনের মতামত এবং ভূমিকাও বইয়ে বেশ বিশদভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা বিতর্কও এতে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। পূর্ব বাংলার ভাষা-আন্দোলন সংক্রান্ত বই পুস্তকে পাওয়া যায় না এমন কিছু তথ্যও এ বইয়ে আছে। ফলে বইয়ের এ অধ্যায়টি বংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা এবং ভাষা আন্দোলনের যে তথ্যপূর্ণ ও প্রতিনিধিত্বশীল বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে বাঙালির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ন্যয্যতা এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে জিন্নাহার কয়েকটি ইংরেজি বক্তৃতার পূর্ণ পাঠ অন্তর্ভুক্ত করায় তাঁর বক্তব্যের অসারতা এবং জবরদস্তিমূলকতা পরিস্ফূট হওয়ায় বইটির গুরুত্ব বেড়েছে। তাছাড়া ১৯৪৮ ও ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা প্রবাহের আনুপূর্বক বিবরণ, শহীদদের পরিচিতি এবং ওই দিনের ঢাকা শহর ও গোটাদেশের যে-চিত্র বইয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পাঠক তা পড়ে অভিভূত হবেন। লেখক ভাষা-আন্দোলনকে বাঙালির জাতিসত্তা রক্ষার আন্দোলন হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করায় তাঁর উরংপড়ঁৎংব-এ পবহঃৎব হিসাবে ভাষা-আন্দোলনের ওপর বিশেষ আলো ফেললেও চবৎরভবৎু-র বিষয়সমূহ যে পবহঃৎব কে শক্তি জুগিয়েছে তাও বিশেষভাবে দেখিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৪৮ সালের সাহিত্য-সম্মেলন, নব প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনসমূহের কার্যক্রম, আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের প্রয়াস, আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ও তার প্রথম ম্যানিফেস্টার পূর্ণ বিবরণ এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বর্জন করে পূর্ব-বাংলার রাজধানীতে যে নব গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলদেশ আন্দোালনের সূচনা হয় তার তথ্যপূর্ণ ও টীকাভাষ্য যুক্ত দলিল বা তার অংশ যুক্ত করায় বইটি বাঙালির রাষ্ট্রভাষা তথা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রামাণ্য গ্রন্থ হয়ে উঠেছে। এছাড়া রাজনৈতিক আন্দোলনের সমান্তরালভাবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং প্রতিবাদী সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন গণ আন্দোলনকে এক ভিন্নতর স্তরে উন্নীত করে। ওইসব আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ যেমন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে তেমনি সুচিন্তিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলনের অর্জনসমূহ চিরকালীন মর্যাদা পেয়ে গেছে।

 

চার

১৯৫৪-র রাজনৈতিক আন্দোলনের গভীরতা, যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং ওই বছরের পূর্বে বাংলার সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ১৯৪৮-৫২ ভাষা-আন্দোলনের ফলে বাঙালি জাতিসত্তার যে ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল তার একটি মৌলিক রাজনেতিক ভিত্তি অর্জিত হয়ে যায়। এই বিষয়টি উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট যে-কারণে ভেঙে পড়ে তার ব্যাখ্যাও আছে আব্দুর রউফ চৌধুরীর বইয়ে। তবে এই ভেঙ্গে পড়ার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী ও নতুন রণকৌশল যে গড়ে উঠে তারও কিছু ব্যাখ্যা আছে এ বইয়ে এবং আছে তাঁর সংগ্রামের নানা পর্যায়ের বিবরণও। একদিকে সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী নীতি, অন্যদিকে মুজিবের স্বায়ত্ত্বশাসন থেকে স্বাধিকারের আন্দোলন, অন্যান্য রাজনৈতিক মহলের ভূমিকা এবং শেষ পর্যন্ত বহু নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে শেখ মুজিবের বিপুল জনসমর্থন ধন্য বীর নায়কে পরিণত হওয়া এবং তারই বীরত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার  এক চমৎকার দলিল হিসাবে বইটি সুধী পাঠককে বিপুলভাবে আকৃষ্ট করবে। কারণ এ বই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার এক তথ্যনির্ভর, অনুপুঙ্খ ও আকর্ষণীয় দলিল। আমরা বইটি বহুল প্রচার কামনা করি।

 

 মহান একুশে

‘১৯৪৮, ১৯৫২ ও ১৯৬১’-র/ রাষ্ট্রভাষা, বাংলাভাষা ও বরাক উপত্যকার/ ভাষা-আন্দোলনের কর্মী ও শহীদবৃন্দের উদ্দেশ্যে/ এবং/ নব-প্রজন্মের যারা দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ/ তাদের মনে রাষ্ট্রভাষা ও ভাষা আন্দোলন উদ্দীপ্ত করে রাখার বাসনায়’- উৎসর্গকৃত এই বইটির বিষয়ক্রম হচ্ছে : (১) ভাষা-আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তারিখ ভিত্তিক কিছু দুলর্ভ চিত্র; (২) একটি রক্তপিচ্ছিল পথ; (৩) দুষ্ট নীতির গোপন নকশা; (৪) মেঘহীন আকাশে তা-ব ঝড়; (৫) রাজার দাপটে কাঁপে ধরণী; (৬) ধর্মরাজের দ-; (৭) শিঙ্গার হুঙ্কার; (৮) ফাল্গুন- খুনে-রাঙা জয়-নিশান; (৯) ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতিস্তম্ভ; (১০) ভাষা-আন্দোলনের গান; (১১) ভাষা-আন্দোলনে বরাক উপত্যকা।

আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর ‘মহান একুশে’ বইয়ে বহুভাষার জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটির রাষ্ট্রভাষা কী হবে তার ওপর রাজনৈতিক নেতাদের নানা বক্তব্য বিবৃতি এবং সংস্কৃতি ক্ষেত্রের তাত্ত্বিকদের নানা তর্ক-তদন্ত বিধৃত বক্তব্য যেমন উপস্থাপন করেছেন তেমনি গোটাভারতের সাধারণ ভাষা (খরহমঁধ ঋৎধহপধ) কী হতে পারে তা নিয়ে যে এক সময়ে বিতর্ক চলছিল সে বিষয়টিকেও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করায় উপমহাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতার অব্যবহিত পথে পাকিস্তানের ভাষা বিতর্কের বেশ বিস্তৃত ও তথ্যপূর্ণ বিবরণ সমকালীন বইপত্র এবং পত্রিকা, পুস্তকা লিফলেট, সরকারি দলিলপত্র ঘেঁটে তাঁর বইয়ে উপস্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বিভিন্ন ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সভাসমিতি সংগঠনের মতামত এবং ভূমিকাও বইয়ে বেশ বিশদভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা বিতর্কও এতে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। পূর্ব-বাংলার ভাষা-আন্দোলন সংক্রান্ত বই পুস্তকে পাওয়া যায় না এমন কিছু তথ্যও এ বইয়ে আছে। ফলে বইয়ের এক-একটি অধ্যায় বংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা এবং ভাষা আন্দোলনের যে তথ্যপূর্ণ ও প্রতিনিধিত্বশীল বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে বাঙালির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ন্যয্যতা এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে জিন্নাহার কয়েকটি ইংরেজি বক্তৃতার পূর্ণ পাঠ অন্তর্ভুক্ত করায় তাঁর বক্তব্যের অসারতা এবং জবরদস্তিমূলকতা পরিস্ফূট হওয়ায় বইটির গুরুত্ব বেড়েছে। তাছাড়া ১৯৪৮ ও ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনা প্রবাহের আনুপূর্বক বিবরণ, শহীদদের পরিচিতি এবং ওই দিনের ঢাকা শহর ও গোটাদেশের যে-চিত্র বইয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পাঠক তা পড়ে অভিভূত হবেন। লেখক ভাষা-আন্দোলনকে বাঙালির জাতিসত্তা রক্ষার আন্দোলন হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করায় তাঁর উরংপড়ঁৎংব-এ পবহঃৎব হিসাবে ভাষা-আন্দোলনের ওপর বিশেষ আলো ফেললেও চবৎরভবৎু-র বিষয়সমূহ যে পবহঃৎব-কে শক্তি জুগিয়েছে তাও বিশেষভাবে দেখিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৪৮ সালের সাহিত্য-সম্মেলন, নব প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনসমূহের কার্যক্রম, আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের প্রয়াস, আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ও তার প্রথম ম্যানিফেস্টার পূর্ণ বিবরণ এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বর্জন করে পূর্ব-বাংলার রাজধানীতে যে নব গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলদেশ আন্দোলনের সূচনা হয় তার তথ্যপূর্ণ ও টীকাভাষ্য যুক্ত দলিল বা তার অংশ যুক্ত করায় বইটি বাঙালির রাষ্ট্রভাষা তথা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রামাণ্য গ্রন্থ হয়ে উঠেছে। এছাড়া রাজনৈতিক আন্দোলনের সমান্তরালভাবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং প্রতিবাদী সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন গণ-আন্দোলনকে এক ভিন্নতর স্তরে উন্নীত করে। ওইসব আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ যেমন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে তেমনি সুচিন্তিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলনের অর্জনসমূহ চিরকালীন মর্যাদা পেয়ে গেছে।

 

 একটি জাতিকে হত্যা

বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবজনক ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে এ গ্রন্থটি রচিত। একাত্তরের বাংলাদেশে পাকিস্তানি দুঃশাসনের ভয়াবহতার পরিপ্রেক্ষিতে লেখকের মানস প্রতিক্রিয়ার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে এই গ্রন্থে। বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রামের প্রতি প্রবাসী বিবেকমান বাঙালির দৃষ্টি আকর্ষণ ও সমর্থনের জন্য এই গ্রন্থের বেশকিছু লেখা লেখক রচনা করেন ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে; যা ইংল্যান্ডের সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়। নব্বই-এর দশকে এইসব রচনা আংশিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘ভোরের কাগজ’, ‘জনকণ্ঠ’, ‘যুগভেরী’ ও ‘খোয়াই’ পত্রিকায়। ‘একটি জাতিকে হত্যা’ গ্রন্থে আব্দুর রউফ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানত বিদেশী পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশে গণহত্যার যথার্থ প্রতিফলন ঘটে সেগুলোর মধ্যে কিছু প্রতিবেদনের কখনো হুবহু অনুবাদ উপস্থাপন করেছেন অথবা কোনো রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। এরকম বিশটি লেখা এ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে; যথা-‘বাঙালি নিধন পর্ব’; ‘স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা’; ‘হত্যা-ব্যবস্থা সম্পন্ন’; ‘পাকিস্তান- ভয়াবহতায় পরিপূর্ণ’; ‘আমি দেখেছি মুক্তিবাহিনী’; ‘মুবিজনগর- স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার’; ‘খান আব্দুল গাফ্ফার খান’; ‘মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে বেঈমানদের ত্রাহি-ত্রাহি রব’; ‘ধ্বংস-অগ্নি নিশান’; ‘কুরুক্ষেত্রের ধ্বংসলীলা’; ‘তবে তারা চায়নি এমন হোক’; ‘দেউলিয়া হওয়ার পথে ইয়াহিয়া খানের জঙ্গী সরকার’; ‘বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি-সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’; ‘মুক্তিযুদ্ধে চীনের ভূমিকা’; ‘রাজাকার, আল-বদর’; ‘ভাসানী’; ‘রণাঙ্গণের খবর’; ‘বাঙালি পিতা’; ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ’।

এসব প্রবন্ধের মধ্য-দিয়ে পাকিস্তানি-কর্তৃক বাঙালি নিধনের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ সময়ের দাবী পূরণ করতেই, ‘একটি জাতিকে হত্যা’ গ্রন্থে প্রবন্ধগুলোর মাধ্যমে আব্দুর রউফ চৌধুরী শুরু করেন তাঁর প্রতিবাদ প্রকাশের যাত্রা। দ্রোহী চেতনা সিক্ত আব্দুর রউফ চৌধুরীর হাতে রচিত হতে থাকে বোধিসত্তা- যা সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মনপ্রাণের বাসনা ও আকাক্সক্ষা; পরাধীন বাংলাকে শৃঙ্খলমোচন করার অভিলাষ; বিত্তহীন-সর্বহারাকে অন্নহারা, বস্ত্রহারা, শোষণ ও বঞ্চনার হাত থেকে চিরমুক্ত করার দুর্মর প্রতিজ্ঞা। আব্দুর রউফ চৌধুরী, একদিকে যেমন বাংলাদেশের অধিবাসীর নিদারুণ দারিদ্র্যতা, দুঃখ ও আত্ম-লাঞ্ছনার জন্য পাক-সরকারকে সীমাহীন শোষণ-লিপ্সাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তেমনি অন্যদিকে নিজেদের সমস্যা নিজেরা মিটিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্যে উদ্বুদ্ব করেছেন। এর প্রমাণ মিলে ভূমিকায় :

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ অবলম্বনে আমি লিখেছি এই গ্রন্থটি, যাতে আমাদের অন্তরে সৃষ্ট একাত্তরের দগদগে ‘ঘা’গুলো মাঝেমধ্যে নাড়াচাড়া দিয়ে তাজা রাখতে পারি। সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে পারি বাঙালি জাতির সর্বস্তরের মানুষের মনে; শোষণহীন অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করার লক্ষ্যে সুষ্ঠু অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রবর্তনে ও বাঙালি সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধিত করে। আর এসব করতে পারলে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবো, পারবো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশি দোসরদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করতে। এর উপরই নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধের চিন্তাচেতনাকে সমুন্নত রাখার নতুন প্রজন্মের মানসিক প্রস্তুতি।

এই গ্রন্থের প্রবন্ধগুলিতে লেখকের পাকিস্তান-বিরোধী ক্ষোভ ও সাহিত্য-সুলভ দ্রোহের পরিচয় বর্তমান। যুক্তি, তর্ক ও বিশ্লেষণ দিয়ে তাঁর শক্তিকাম্যের স্বাক্ষর এইসব রচনায় উপস্থিত, ফলে সবগুলো প্রবন্ধই মর্মস্পর্শী, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই গ্রন্থে লেখকের ভাষা ও গদ্যশৈলী যথেষ্ট সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয়। সর্বদিক থেকে এই গ্রন্থটিকে মুক্তিযুদ্ধের একটি উল্লেখযোগ্য দলিলে পরিণত করেছে।

 

 ১৯৭১ (দুই খ-)

আব্দুর রউফ চৌধুরীর ‘১৯৭১’-শীর্ষক দু-খ-ে বিভক্ত গ্রন্থটি বাংলাদেশ বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ: প্রথম পর্ব (নভেম্বর ১৯৭০-আগস্ট ১৯৭১); দ্বিতীয় পর্ব (সেপ্টম্বর ১৯৭১-ফেব্রুয়ারি ১৯৭২)।

‘১৯৭১/ প্রথম পর্ব’-এ আছে পাঁচটি অধ্যায়; যথা-‘দুর্দশা ও দুর্যোগ’; ‘নিধনযজ্ঞ ও গণহত্যা’; ‘জয়বাংলা ও বাংলাদেশ’; ‘শরণার্থী ও দেশত্যাগ’ ও ‘জিন্দাবাদ ও পাকিস্তান’। ১৯৭০-এর বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাসে ভোলা-হাতিয়া-সন্দ্বীপসহ পূর্ব বাংলায় যে-বিপর্যয় ঘটে এর কথা উল্লেখ করেই লেখক শুরু করেছেন তাঁর ‘১৯৭১’-এর প্রথম পর্বটি। ক্রমশ দুই অঞ্চলের বৈষম্যের বাস্তবতার চিত্রটি তুলে ধরেছেন। লেখক সেই ৪৭-এর পাকিস্তানী স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসা স্বপ্নভঙ্গের বিস্তৃত পরিচয় দিয়েছেন। দেখিয়েছেন কেমন অবিচার ও বৈষম্য দূর কাল থেকে শুরু হয়েছিল; বিশেষ করে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শোষণ; সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা; ভূপ্রকৃতি-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-কৃষ্টি-ভাষা-খাদ্যাভ্যাসের অমিল; মনমেজাজে-চিন্তাচেতনার আকৃতি-প্রকৃতি নির্ণয়ে দ্বিধাবিভক্ত। লেখক প্রমাণ করেছেন যে, ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপৃত হওয়ার আগে এ জাতিকে পার হতে হয়েছে দীর্ঘ এক সংগ্রামসংকুল সময়। ওই সংগ্রাম-পরিকীর্ণ সময়ে আমাদের ঝরাতে হয়েছে অঢেল রক্ত, করতে হয়েছে বিপুল ত্যাগ, সহ্য করতে হয়েছে নানারকম পীড়ন নির্যাতন ও অবমাননা। এই সংগ্রামের সূচনালগ্ন বলে চিহ্নিত করা যায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরবর্তী সময়পর্বকে। সেই সময় থেকেই অর্থাৎ ১৯৪৮-এর গোড়া থেকেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এদেশের মানুষকে বঞ্চিত করার নানা উদ্যোগ নেওয়া ধরে। প্রথমে কেড়ে নিতে চায় এ-ভূখ-ের মানুষের মাতৃভাষাকে। জিন্নাহ ১৯৪৮-এর গোড়াতেই ঘোষণা দিয়ে বসেন যে, উর্দুই হবে পূর্ব ও পশ্চিম- এই দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্র্রভাষা। অথচ তখন পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। মাতৃভাষা হরণ করার বন্দোবস্ত করেই থেমে থাকেনি ওই শাসকগোষ্ঠী, তারা ধ্বংস করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় এ জাতির সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর ওই ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে এদেশের সংগ্রামী মানুষ, বহু জীবনের বিনিময়ে। আসে ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি। এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন হচ্ছে এক গভীর মাইল ফলক। ভাষাগত নিপীড়নের সাথে সাথে শাসকগোষ্ঠী চালানো ধরে জাতিগত নিপীড়ন। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-শিল্প বাসস্থান প্রভৃতি উন্নয়ন খাতে অগ্রাধিকার পেতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তান। কর্ম নিয়োগে প্রাধান্য থাকে তারই। বেসরকারি বা সরকারি কর্মপ্রকল্পে আধিপত্য বিস্তারের সকল সুযোগ থাকে পশ্চিম পাকিস্তানের। সামরিক বাহিনীতে তীব্ররকম প্রাধান্যও ওই অঞ্চলেই থাকে। পূর্ব-বাংলার জনগণ বাস করা ধরে কলোনীবাসী দুঃস্থ শোষিতের জীবন। পেশাগত বঞ্চনা একটি প্রতিষ্ঠিত প্রপঞ্চ হয়ে দাঁড়ায় সে-সময়। পাকিস্তানী শাসকেরা প্রতিপন্ন করে যে, যা কিছু উৎকৃষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ তার বড়ো অংশটাই যাবে পশ্চিম পাকিস্তানের দখলে, তারপর খুদকুঁড়ো অবশিষ্টাংশ বাঙালির জোটে তো জুটুক। তখন কাঁচামাল উৎপাদিত হয় এদেশের মাটিতে আর কলকারখানা গড়ে ওঠে পশ্চিম পাকিস্তান জুড়ে। এই দেশ দেখেনি উন্নয়নের আলো, অথচ এখানকার টাকায় সর্ব অর্থেই গড়ে ওঠে পশ্চিম পাকিস্তান। একদিকে যখন চলছে রাষ্ট্রীয় শোষণ ও অত্যাচার, আর অন্যদিকে তখন এদেশের মানুষ গড়ে তুলেছে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের ব্যারিকেড। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পড়ে এদেশের জনগণ চুয়ান্নর রাজনৈতিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট সরকার। চলতে থাকে এই দেশবাসীর স্বাধীনতা সংগ্রাম। আসে আটান্নর সামরিক শাসন-জনগণকে দমনের জন্য ক্রূরতম বিধি ব্যবস্থা সক্রিয় ও কার্যকর করে যাওয়া ধরে সামরিক শাসক। সেইসব পীড়ন নির্যাতন উপেক্ষা করে এই দেশবাসী অটল প্রাণে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে তাদের সংগ্রাম- আন্দোলনের ধারাকে। তারা থাকে অকুতোভয় আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এদেশীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা অমান্য ও অগ্রাহ্য করে এই দেশবাসী পালন করা ধরে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী, উদযাপন করা ধরে বাংলা নববর্ষ এইসব কিছু দিয়ে এ জাতি প্রাণে প্রাণে বাঁধে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের গভীর রাখীবন্ধন। আর, দৃঢ়চিত্তে এগোতে থাকে সংগ্রামের পথে। এই ষাটের দশকেই জাতির প্রাণের দাবী প্রকাশ পায় ছয় দফা হয়ে। ছয় দফায় যে স্বায়ত্ত্বশাসনের কথা ধ্বনিত হয়, তা ক্রমে নবজাগ্রত করে তোলে জনগণকে। গণ জাগরণের উত্তাল সময়পর্বকে অনিবার্য করে তোলে ছয় দফা দাবী। তারপর আসে ১৯৭০-এর নির্বাচন। মানুষ তাদের দ্বিধাহীন ও বলিষ্ঠ রায়ে জানিয়ে দেয় কী তাদের চাওয়া! তবে সেই চাওয়াকে কিছুমাত্র মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় না শাসকেরা বরাবরের মতোই করা ধরে উপেক্ষা ও অবহেলা ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য। ফলে শুরু হয় ‘সহিংসতা ও সঙ্কট’। ‘সহিংসতা ও সঙ্কট’ [১:৪]- লেখক বলেছেন,

কট্টরপন্থী পাঞ্জাবি দ্বারা প্রভাবিত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যদি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন-তারিখ ঘোষণা করেন তাহলে শেখ মুজিবুর রহমান নির্ধারিত তারিখে এতে অংশগ্রহণ করবেন। ভুট্টো সংসদে ‘বিরোধীদলীয় নেতা’ হিসেবে পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। সংবিধান প্রণয়নের কাজে যুক্ত হতে আগ্রহী সামান্য কয়েকজন পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের গণপ্রতিনিধি নিয়ে পূর্ব-বাংলার ইচ্ছানুসারে সংবিধান প্রণীত করতে পারবেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যদি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন-তারিখ ঘোষণা না করেন তাহলে পাকিস্তানে মারাত্মক সঙ্কট সৃষ্টি হবে। ইয়াহিয়া খানের প্রশাসনের সামরিক পর্যবেক্ষরাই স্বীকার করেন, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ ঠেকানো অসম্ভব এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পূর্ব-বাংলার ৭৫ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীকে শক্তির দাপটে দমিয়ে রাখা চিন্তাতীত।’  কারণ শক্তিপ্রয়োগ করলে যে সঙ্কট সৃষ্টি হবে তা হবে পাঞ্জাব প্রদেশের সঙ্গে পূর্ব-বাংলাসহ উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ, বেলুচিস্তান ও সিন্ধুর।

নির্বাচনের মাধ্যমে যখন পাকিস্তানের সঙ্কটের সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হল না তখন বাংলাদেশে নেতা ১৯৭১-এর মার্চের গোড়ায় ডাক দেন অসহযোগ আন্দোলনের। এই অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীনই সময়েই শুরু হয় ‘নিধনযজ্ঞ ও গণহত্যা’ (দ্বিতীয় অধ্যায়), পাকিস্তানি সমরনায়করা পরিকল্পনার মাধ্যমে তৈরি করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ [২:১]; শুরু হয় ‘উত্তাল মার্চ’-এর ঘটনাগুলো [২:২]; এরই অংশ হিসেবে আমরা ২৫শে মার্চ রাতে আক্রান্ত হই, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী দ্বারা; শুরু হয় ‘গণহত্যা’ [২:৩] আর ‘গোপন চক্রান্ত’ [২:৪]। এ জাতিকে আবার দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য প্রাণ উৎসর্গের সংগ্রামে নিজেকে সপে দিতে হয়। সৃষ্টি করতে হয় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার- ‘জয়বাংলা ও বাংলাদেশ’ (তৃতীয় অধ্যায়)। প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা, আর অপ্রত্যক্ষ যুদ্ধে শামিল হয় এদেশের প্রতিজন। প্রতিটি লোকালয়। শুরু হয় বাঙালির ভোগান্তি, নিজেকে রক্ষা করার পন্থা, দেশত্যাগ ও পরদেশে আশ্রয়- ‘শরণার্থী ও দেশত্যাগ’ (চতুর্থ অধ্যায়); তবুও শাসকগোষ্ঠী থেমে থাকেনি; শুরু করে তার আগ্রাসনমূলক রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য পরিস্থিতি ও পরিবেশ গড়ে তোলা-‘জিন্দাবাদ ও পাকিস্তান’ (পঞ্চম অধ্যায়)। ‘সোনার বাংলা বিধ্বস্ত’-শীর্ষক প্রবন্ধ দিয়ে লেখক প্রথম খ-টি সমাপ্ত করেছেন। লেখক বলেছেন,

পূর্ব-বাংলায় রক্তগঙ্গা বয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি সেনারা। পাকিস্তানি সেনাদের গোলাবর্ষণে এবং বোমা বিস্ফোরণে পূর্ব-বাংলা বিধ্বস্ত। খালিসপুরে উলঙ্গ শিশুরা ও ক্ষুদার্থ মহিলারা বাড়িঘর ও দোকানপাটের ধ্বংসস্তূপ খুঁজে বেড়াচ্ছে খাবারের জন্য। চট্টগ্রামের হাজারি লেইন এবং মওলানা সওকাত আলী সড়কের অধিবাসীদের কোনো চিহ্ন রাখেনি পাকিস্তানি সেনারা। যশোরের প্রধান বাজারটিকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। ৪০-হাজার জনগোষ্ঠীর শহর কুষ্টিয়াকে মনে হচ্ছে, যেমন বিশ্ব-ব্যাংক দলের প্রতিবদনে বলা হয়, ‘নিউক্লিয়ার বোমার আক্রমণে আক্রান্ত এক ধ্বংস ভূমি’। পুরাতন ঢাকায় পাকিস্তানি সৈন্যরা অগ্নিসংযোগে ও গুলিবর্ষণে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। ২৫টি ব্লককে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে। বিদেশীদের চোখ এড়ানোর জন্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলাবারুদের চিহ্নগুলো, সেখানে হাজার হাজার ছাত্রদের হত্যা করা হয়, পাকিস্তানিরা মেরাতম করেছে। পাকিস্তানি ট্যাঙ্কগুলোর আক্রমণে রাজারবাগ পুলিশ ব্যারকগুলো বিধ্বস্ত, যেখানে এক হাজার বাঙালি সদস্য যুদ্ধ করে তাদের প্রাণ দিয়েছে।/ হাজার হাজার বেশিরভাগ পাটজমি পরিত্যক্ত। পাট তোলার সময় হলেও এখন পাট জলে পচতে শুরু করেছে। অল্প যা তোলা হয়েছে তা পাটমিলে পৌঁছানো সম্ভব নয়। অল্প পরিমাণের চা রপ্তানি যোগ্য। তিনশত-হাজারের মতো আমদানি-কৃত চাল চট্টগ্রাম ও চালনা সমুদ্রবন্দরে অযতেœ পড়ে আছে। খাদ্য-বাজার আকাশ ছোঁয়া। গত চার মাসে চালের দাম ২০-ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।/ বাঙালিদের মনে পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা আর ভয় প্রদর্শিত হচ্ছে। অল্পসংখ্যক বাঙালিই বিদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে, কিন্তু চিঠিপত্র ঠিকই হোটেল ইন্টার-কন্টিনেন্টলের সংবাদ অফিসগুলোতে জমা হচ্ছে। গণহত্যা, গণ-আক্রমণ, গ্রামের-পর-গ্রাম ধ্বংস হওয়ার কাহিনীই এসব পত্রের মূল বিষয়বস্তু। একজন কূটনৈতিক বলেন, ‘পাকিস্তানের এই গণ-অভিযান ভিয়েতনামের চেয়েও ভয়ঙ্কর, কিন্তু আমাদেরই শেষ পর্যন্ত জয় হবে।’ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মার্চের আভিযানে দুইশত-হাজার থেকে ১০-লাখের মতো বাঙালিকে হত্যা করেছে; তবে সঠিক সংখ্যা জানা অসম্ভব; কারণ অসংখ্য মৃতদেহ নদীর জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে; আবার কুয়া ও বনজঙ্গলে গণকবর দেওয়া হয়েছে।

‘১৯৭১/ দ্বিতীয় পর্ব’-এ আছে পাঁচটি অধ্যায়; যথা-‘মুক্তিযুদ্ধ ও রণাঙ্গন’; ‘শত্রুপক্ষ ও শত্রুকৌশল’; ‘বিশ্ববাসী ও বিশ্বশক্তি’; ‘চূড়ান্তাভিযান ও বিজয়’ ও ‘জাতীয় চরিত্র ও আদর্শ’। এই খ-ে গ্রন্থকার পুঙ্খানুপঙ্খরূপে তুলে ধরেছেন যে, বাংলাদেশের অভূতপূর্ব স্বাধীনতার লড়াই চমকে দেয় সারা বিশ্বকে। পৈশাচিক শক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দৃঢ় মনোবল, সর্বস্ব ত্যাগের অকুতোভয় মানসিকতা মুক্তিযুদ্ধকে বলবান করে। প্রথম অধ্যায়: ‘গণবাহিনী,  মুক্তিবাহিনী’ [১:১]; ‘রণনীতি, রণকৌশল’ [১:২], ‘রণাভিযান, রণাঙ্গন’ [১:৩]। প্রথম অধ্যায়ে এসবের ইতিহাস তুলে ধরে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বেগবান হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিকামী বাঙালির সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যুদ্ধের পরিবেশ যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এর বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা যে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হন; পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাকা-ের মুখে যে এককোটি অসহায় মানুষ ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে আশ্রয়প্রার্থী হয়; বাংলার মানুষের অসহনীয় মানবিক দূর্যোগের মুখে ভারত সরকার যে মুক্তিবাহিনীকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করে- এসব যুক্তি ও প্রমাণ সহকারে মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতে যে নতুন মাত্রা দেয় তা উল্লেখ করেছেন। সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী বিশাল পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে নিয়মিত পদ্ধতিতে যুদ্ধ পরিচালনা করার যে সম্ভব ছিল না, এরসঙ্গে গেরিলা পদ্ধতি ব্যবহার করা যে অনির্বায হয়ে পড়ে, তাই ‘নিয়মিত’ ও ‘অনিয়মিত’ (গেরিলা) পদ্ধতিতে মুক্তিযুদ্ধ এমনভাবে পরিচালিত করা হয় যাতে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি মধ্যেই বাংলাদেশকে মুক্ত করা যায়- এসব তন্ন তন্ন ভাবে তথ্য সহকারে আলোচনা করেছেন। তৃতীয় পরিচ্ছেদ-এ লেখক বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য সংগ্রহ করে বাঙালির গৌরবময় বিজয়ের প্রমাণে তৎপর। কিভাবে এই বিজয় বিশ্বে প্রচার হতে থাকে সেকথাও বলেছেন; যেমন- পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা দখলকৃত এলাকায় ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ বিরাজ করছে একথা প্রমাণ করার জন্য যখন বিদেশী সাংবাদিকদের অধিকৃত এলাকায় প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় তখন তাদের উপস্থিতিতে বাঙালি সশস্ত্র যুবকরা পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে তৎপরতা শুরু করলে স্বাধীনতার জন্য পূর্ব-বাংলায় ব্যাপক গেরিলাযুদ্ধের কথা সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে পাকিস্তানি শক্তি-পক্ষ-কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে ও বিপক্ষে বিশ্বশক্তির অবস্থান ও বিশ্ববাসীর অভিমত প্রকাশ পেয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে কিভাবে বাংলাদেশের, গভীর অর্থে, সকল দেশবাসীর গভীর মুক্তিযুদ্ধের ফসল অর্জিত হয় তাই বলা হয়েছে। আব্দুর রউফ চৌধুরী দেখাতে চেয়েছেন যে, বাঙালি বহু বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের ও কৌলশের মধ্য-দিয়ে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করেছে। পঞ্চম অধ্যায়ে-‘চরিত্র ও আদর্শ’-এ গ্রন্থকার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়ে বলতে চেয়েছেন যে, মুক্তিযুদ্ধকে, কোনো দল বা গোষ্ঠীর চেয়ে, অনেক অনেক বিশাল একটি সাধারণ উত্তরাধিকার হিসেবে গণ্য করতে হবে। সে সমস্ত মানুষেরা এই মুক্তিযুদ্ধে নানা ভূমিকায় যুক্ত ছিলেন তাঁদের মূল্যায়ন কালে এই অনুভবটি থাকা প্রয়োজন যে, তাঁরা সকলেই পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। জনসাধারণের মধ্যে একটি প্রধান বিষয় হিসেবে মওলানা ভাসানী যখন স্বাধীনতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও তার নিরসনের প্রশ্নটি তুলে ধরেন তখন তিনি শত-সহ¯্র বাঙালির মনের কথাই বলেছিলেন। স্বাধীনতা লাভের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান কোটি কোটি মানুষকে একত্রিত করে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির কাজটিতে সফল হয়েছিলেন; আর তাজুদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার সংগঠনের মাধ্যমে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলেন। বাঙালি জনসাধারণের ভাবনায় পূর্ণ তাঁদের এইসব অবদান অমর। তাঁদের চরিত্র ও আদর্শ থেকে বাঙালি জনগণ গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের পতাকা বহন করে নিয়ে যেতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের ফসল হিসেবে তারাই হয়ে উঠতে পারে যোগ্যতম উত্তরাধিকারী।

আব্দুর রউফ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস ‘১৯৭১’ গ্রন্থের মাধ্যমে আলোচনা করেছেন তাতে স্বদেশানুরাগ ও ঐতিহাসিকের নিরপেক্ষ বস্তুতন্ময় দৃষ্টি সমন্বিত হয়েছে। তিনি মৌলিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তিনি পাঠক-মনে সাহিত্য রস সঞ্চার করতে সমর্থন হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্তরগুলোকে, প্রত্যেকটির নির্দিষ্ট বিশিষ্টতাসহ, স্বতন্ত্রভাবে গ্রন্থাকার তুলে ধরেছেন ‘১৯৭১’ গ্রন্থে; বিশেষ করে সাধারণ আলোচনায় যেসব অসংখ্য বিষয় কোনোভাবে দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে, এসবও হিসেবের মধ্যে রেখে আলোচনা করায় গবেষণারত কর্মীরা, যারা এ-বিষয়ে কথা বলার পক্ষে অধিক শিক্ষিত, তাদের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা পুনর্নির্মাণে সাহায্য করতে এই গ্রন্থটি (উভয় খ-) উদ্বুদ্ধ করবে। এই গ্রন্থে আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর সময়ে প্রকাশিত নিবন্ধগুলোর বহু সূত্রকে একত্রিত করেছেন এবং আরও নতুন তথ্যের সংযোজনা করেছেন। পাশাপাশি গ্রন্থকার তুলে ধরেছেন বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের বিশদ ইতিকথা, জানিয়েছেন বিবিধ গণ-আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি স্তরের তন্ন তন্ন ইতিহাস। তথ্য ও উপাত্তসহ এ জাতির রাজনৈতিক জীবন-ইতিহাস এমন তুমুল অন্তরঙ্গভাবে আর কখনো কোনো বইয়ে উঠে আসেনি।

 

 স্মৃতিতে একাত্তর (আংশিক প্রকাশিত)

পাকিস্তানে অবস্থান-কালেই পাকিস্তানিদের প্রতি তীব্র ঘৃণা, ক্ষোভ এবং প্রতিবাদের স্পৃহা আব্দুর রউফ চৌধুরীর হৃদয়ে জন্ম নেয়। সেই অবদমিত ইচ্ছার প্রথম সুযোগ আসে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে, তাই ৭ই মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার পর থেকেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে লন্ডনে কাজ শুরু করেন। ২৫-২৬ মার্চের রাতের পৈশাচিকতার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তির পক্ষে সোচ্চার হয়ে উঠেন। বিশ্বজনমত গঠনের জন্য ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহর ভ্রমণ করেন ও বক্তৃতা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের জন্য তহবিল সংগ্রহে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। এমনকি জুতো-পলিশ করে অর্থ সংগ্রহ করেন। ব্রিটেনের রাষ্টীয় পর্যায়ে সরকারি সাহায্য সহযোহিতার জন্য আবেদন জানিয়ে চিঠিপত্র প্রেরণ করেন। এছাড়াও সর্বাবস্থায়ই কলকাতাস্থ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এসময়ে ইংল্যান্ডে তিনি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর অন্যতম সহকারী হিসেবে কাজ করেন। ‘স্মৃতিতে একাত্তর’ গ্রন্থটি হচ্ছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের বহু পেপারকাটিং, দিনলিপি, ডকুমেন্ট, চিঠি, ট্রেলিগ্রাম, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সার্কুলার, প্রকাশনা ইত্যাদির সংকলন। ১৯৭১-এর ঘটনাগুলোকে বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে, সঠিক ও সজীবভাবে উপস্থাপনের চেষ্টায় আব্দুর রউফ চৌধুরী এই সংকল্পটি গ্রন্থনা করেছেন। এক কথায় একে স্বাধীনতার যুদ্ধের একটি অজানা দলিল বলা যায়।

 

 সিপাই বিদ্রোহ  (অপ্রকাশিত)

ভারতবর্ষের ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের জাতীয় মুক্তির প্রথম সশস্ত্র সংগ্রামকে আব্দুর রউফ চৌধুরী ‘সিপাই বিদ্রোহ’ গ্রন্থে আবদ্ধ করেছেন। ইংরেজের স্বৈরাচার, কুশাসন, শোষণ, হত্যা, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে ভিক্ষুব্ধ জনমতের বহিঃপ্রকাশই ছিল। এই স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রাম দু-বছর চলে। সে-সময় ইংরেজ-শাসকগোষ্ঠী সংগ্রামী ও নির্লিপ্ত জনসাধারণের উপর যে অমানুষিক অত্যাচার চালায়, এর উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সেইসঙ্গে বিপ্লবের প্রাক্কালে ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের পরিস্থিতি কেমন ছিল সে-সম্বন্ধেও মার্কসের লেখা ‘ভারতীয় ইতিহাসের কালপঞ্জী’ থেকে কিছু উদ্ধৃতি এবং অভ্যুত্থান বিষয়ে মার্কসবাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পত্রাংশ তথ্যসংগ্রহে ব্যবহার করেছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসের ওপর বহু প্রামাণ্য রচনা খুঁটিয়ে পর্যালোচনার ভিত্তিতে লেখক এই গ্রন্থটি লিখেছেন। এরসঙ্গে উপনিবেশিকতার প্রসঙ্গে মার্কসের আপোসহীন বিরোধিতা, জাতীয় উপনিবেশিক সমস্যা প্রসঙ্গে তাঁর রচনা এতে স্থান পেয়েছে। বস্তুতপক্ষে, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের অভ্যুত্থান যে কারণেই হোক অনিবার্য হয়ে পড়–ক না কেন, এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পূর্বপ্রতিজ্ঞা এতে অনুসন্ধান করা যায়।

ব্রিটেনের শাসক চক্রতন্ত্রের সমৃদ্ধির একটি প্রধান সূত্র ছিল ভারতবর্ষের উপনিবেশিক লুণ্ঠন এবং ভারতবর্ষীয় অর্থনীতির এক-একটি শাখাকে ভেঙে দেওয়া; যাতে চূড়ান্তভাবে দরিদ্র হয়ে পড়ে এই সুবিশাল, সমৃদ্ধশীল ও সুপ্রাচীন জনপদের অধিবাসীরা। ব্রিটিশ শাসকচক্র অবহেলা করে ভারতবর্ষের জলপ্রবাহের পদ্ধতিপন্থা- নদী-জলাভূমি সংরক্ষণ ইত্যাদি- ফলে কৃষির ধ্বংস সাধন করে। স্থানীয় শিল্প, বিশেষ করে তাঁত ও চরকাকে ধ্বংস করে তারা লক্ষ লক্ষ ভারতবর্ষের অধিবাসীকে অনশনে নিক্ষেপ করে, ভারতবর্ষীয় বাজার ছেয়ে ফেলা ব্রিটিশ সূতীমালে; এই অল্পমূল্যের সূতীমালের সঙ্গে পেড়ে ওঠা ভারতবর্ষের অধিবাসীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। উপনিবেশিকরা গোষ্ঠীগত ভূমি-মালিকানার পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোও ভেঙে ফেলে। সেইসঙ্গে জমিদারি ও রায়তোয়ারি- এই দুই ধরনের ভূমি খাজনা ও ভূমি বন্দোবস্ত প্রবর্তন চালু করে তারা ভারতবর্ষীয় সমাজ ব্যবস্থায় সামন্তবাদ জিইয়ে রাখে, এতে এ দেশটার অগ্রবিকাশ মন্দীভূতি হয়, ভারগ্রস্ত হয়ে পড়ে ভারতবর্ষীয় কৃষকরা। রায়ত কৃষকদের উপর ভারতের ব্রিটিশ কর্তাচক্র অসহ্য চাপ চালিয়ে ছিল, বিশেষ করে, স্থানীয় সামন্ত অভিজাত ও উপনিবেশিক রাষ্ট্র দুটোর জোয়ালের তলে রেখে। অতি গুরুভার কর আদায়, জবরদস্তি ও নিষ্ঠুর নির্যাতন সইতে হয় ভারতবর্ষীয় কৃষকদের। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসকচক্র লুঠেরা কর্মনীতি ও উপনিবেশিক শোষণের বর্বর পদ্ধতি চালু করার ফলেই ভারতবর্ষীয় বিদ্রোহ জাগিয়ে তুলে। […] ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র-সংগ্রাম শুরু হয় ভারতবর্ষের সিপাহীদের মধ্যে; যাকে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বলা হয়ে থাকে। এই মহাবিদ্রোহের সূচনা ঘটে বর্তমান বাংলাদেশেই। ২৯শে মার্চ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের বহরপুর ও ব্যারাকপুরে সিপাহী বিদ্রোহের সুত্রপাত ঘটে। কার্ল মার্কস একে ভারতবর্ষের প্রথম ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন যে, বেঙ্গল আর্মির এই বিদ্রোহ ফরাস্য ও চীন যুদ্ধের প্রায় সমতুল্য শৌর্যবীর্য পরিলক্ষিত হয়। ১৮শে নভেম্বর চট্টগ্রামে ও ২২শে নভেম্বর ঢাকাতে সিপাইরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

‘সিপাই বিদ্রোহ’-এর বিশ্লেষণে সুগভীর মৌলিকতা দেখিয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিতে আছে সমগ্রতা, বিশ্লেষণ-নৈপুণ্যের মধ্য-দিয়েই তিনি তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। ‘সিপাই বিদ্রোহ’ সম্পর্কেই তাঁর আলোচনা গভীর ও মৌলিক, এতে বিস্মত হতে বাধ্য। ইতিহাসের ব্যাখ্যানে তিনি বিস্ময়কর কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, আবার বিশ্লেষণ-সৌন্দর্যেও তাঁর রচনার মূল্য অপরিসীম।

 বাঙালির উৎস সন্ধানে  (অপ্রকাশিত)

হিমালয় থেকে বিন্ধ্যপর্বত পর্যন্ত ছিল আর‌্যাবর্ত (আর্যাঞ্চল), নাগপুর মালভূমির পশ্চিম ও বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিণ দিকের ভূভাগ ছিল দাক্ষিণাত্য (দ্রাবিড়াঞ্চল), আর ছোট-নাগপুর মালভূমির পূর্ব দিকের উচু-নিচু সমতলভূমি, পূর্বাঞ্চলীয় গাঙ্গেয় ব-দ্বীপাঞ্চলসহ ছিল আদি বাংলা (বঙ্গাঞ্চল)। কোনো একসময় এ-আর্যবহির্ভূত-বাংলাঞ্চলের মহেশ্বর (মহা-মহারাজা) ছিলেন বলি। তার পত্নী সুদেষ্ণার গর্ভে পাঁচটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে। রাজা বলি তিনি তার পাঁচপুত্র অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্ক, পু-্রু ও সুহ্ম-এর মধ্যে রাজ্যকে পঞ্চপ্রদেশে বিভক্ত করে তাদের নামানুসারে পঞ্চাঞ্চলের নামকরণ করেন-অঙ্গ (ভাগলপুর থেকে আসামের সমতলভূমি), বঙ্গ (পূর্ববঙ্গ), কলিঙ্ক (উড়িষ্যা), পু-ু, (মালদহ) ও সুহ্ম (রাঢ়); আর রাজা বলির পাঁচ পুত্রই পরবর্তীকালে এই পঞ্চাঞ্চলের গোত্রপতি (রাজা) হন।  পরবর্তীকালে এসব অঞ্চলই, নানা উত্থানপতন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গোত্রীয় আধিপত্য সূত্রে বিভিন্ন যুগে বিভিন্নভাবে, বঙ্গ-সমতট (বর্তমান বাংলাদেশ), রাঢ়-সুহ্ম (বিহারের অংশসহ বর্তমান পশ্চিম বাংলা), বরেন্দ্র-পু-্র (বর্তমান উত্তর-বঙ্গ), গৌড়ম-ল (অঙ্গ, পু-্র ও সুহ্ম) প্রভৃতি নামে পরিচিতি লাভ করে; আবার একসময় প্রাচীন বাংলাকে পাঁচটি ভুক্তিতে বা প্রদেশে বিভক্ত করে নামকরণ করা হয়- পৌ-্রবর্ধনভুক্তি, প্রাগজ্যোতিষভুক্তি, বর্ধমানভুক্তি, দ-ভুক্তি ও কঙ্কগ্রামভুক্তি। বিহারের দ্বারভাঙ্গাকেও একসময় বলা হত দ্বার-বঙ্গ, বাংলাঞ্চলের পশ্চিম-সীমানায় অবস্থিত প্রবেশ পথ। স্পষ্টভাবেই বলা যায় যে, বাংলাঞ্চল সবসময়ই ছিল এক বিস্তৃত ভূখ-, যদিও এই ভূখ-ের মধ্যে বিভিন্ন ভৌগোলিক নামের অবস্থিতি ছিল। এই ভূখ-ের ভৌগোলিক সীমারেখা ছিল- পূর্বে পার্বত্য-ত্রিপুরার উচুপাহাড় ও গারো-লুসাই পর্বতমালা, পশ্চিমে ছোটনাগপুরের পবর্তরাজির উচ্চভূমি, উত্তরে হিমালয়ের অন্তর্ভুক্ত দার্জিলিং-এর শৈলশৃঙ্গ, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষায়, ‘এই ভূখ-ই ঐতিহাসিক কালের বাঙালির কর্মকৃতির উৎস এবং ধর্ম-কর্ম-নর্ম ভূমি। একদিকে সুউচ্চ পর্বত, দুইদিকে কঠিন শৈলভূমি আর একদিকে বিস্তীর্ণ সমুদ্র; মাঝখানে সমভূমির সাম্য- ইহাই বাঙালির ভৌগোলিক ভাগ্য।’  তাই এই বিশাল বাংলাভূখ-ই এ-গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়। বাংলাঞ্চলের ‘ভূতাত্ত্বিক গঠন’ সম্বন্ধে লেখক বলেছেন,

প্রায় ৪৫০ কোটি বছরেরও আগে ভারতবর্ষ ছিল উত্তপ্ত মৌলিক ভূতাত্ত্বিক স্তরে আবৃত; ক্রমে এ-স্তর শীতল হয়ে শিলায় রূপান্তরিত হয়, যাকে বলে শিলাস্তরবিন্যাস বা ‘আর্কিয়ান’ শিলাবিন্যাস। ‘আর্কিয়ান’ শিলাবিন্যাসের এক পর্যায়ে ভারতবর্ষের মধ্যাঞ্চলে বিন্ধ্যপর্বত মাথা তুলে দাঁড়ায়। এর মধ্যে এক দিকে সৃষ্টি হয় মালভূমি অঞ্চল, যা দাক্ষিণাত্যের প্রাচীনতম অংশ। আর অন্যদিকে উপত্যকা, যা প্রাচ্যোঞ্চল বা আদি বাংলাঞ্চল। ভারতবর্ষ যখন আফ্রিকা ও অষ্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল তখনো এই দু-অঞ্চল একসঙ্গেই ছিল। এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার পর সৃষ্টি হয় হিমালয়ের পর্বতমালা। গঠিত হয় রাজমালা থেকে শুরু করে গারো ও নাগা পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত শিলাস্তরবিন্যাস। হিমালয় ও বিন্ধ্যপর্বতের অন্তর্বতী অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে গঙ্গা। গঙ্গা পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে বাংলার উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত রাজমহল-শৈলে প্রতিহত হয়ে দক্ষিণপথে বঙ্গোপসাগরে দিয়ে মিশে যায়। এসব ভূতাত্ত্বিক আলোড়ন ও রূপান্তর ঘটতে কোটি কোটি বৎসর লাগে। লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরে নিম্ন-বাংলা সমুদ্রের জলরাশি-দ্বারা প্লাবিত হয়, আর সমুদ্রের জল যখন ভাটি পড়ে তখন দিয়ে যায় পলিমাটি, আর এ বিস্তারের পরিসমাপ্তি ঘটে প্লাওসিন-যুগে। এসব বিস্তারের ফলে, বাংলাঞ্চলের মূলাংশের যে ভূতাত্তিক গঠনের সন্ধান পাওয়া যায় তা ‘বাংলা ব্যাসিন’-এর গবেষণার কারণেই জানা যায়। বাংলা ব্যাসিনের উত্তরে অবস্থিত হিমালয় আর পূর্বে ইন্দো-বার্মা র‌্যাঞ্জ, উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত রাজমহল পর্বতমালা, এছাড়া গারো-খাসিয়া-জয়ীন্তা পর্বতমালা ‘বাংলা ব্যসিন’ বহির্ভূতাঞ্চল আর নিম্ন-আসাম অন্তর্ভূতাঞ্চল।

এভাবেই লেখক শুরু করেছেন বাঙালির উৎস সন্ধানের কাজটি। তারপর ‘নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ নিয়ে আলোচনা শেষ করে আস্তে-ধীরে এগিয়ে যান ‘বাংলা নামের উদ্ভব ও বিবর্তন’-এ, বিভিন্ন সময়ের ‘বাংলা জনপদের পরিচিতি ও সীমারেখা’-এ, ‘প্রাগৈতিহাসিক পটভূমি’-তে, ‘প্রত্নপ্রস্তর, নবপ্রস্তর, তাম্রশ্ম, বৈদিক, প্রার্কবৌদ্ধ-যুগ’-এ, ‘পা-রাজার ঢিবি’-তে, ‘প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্র’ হয়ে ‘প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগ’-এ। এরই মধ্যে বলা হয়ে যায়, যুক্তি-তর্ক-তথ্যের পথে রাষ্ট্রীয় ইতিহাস, ধর্ম-সমাজ-ভাষা-জীবন-সংস্কৃতির ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য-স্থাপত্য-ভাস্কর্যের ইতিহাস। এ-গ্রন্থ শুধু আলোচনামূলক নয়, সেসঙ্গে আছে গবেষণার উপযোগী তথ্য, তবে সহজপাঠ্য। ইতিহাসের কলেবর অযথা বৃদ্ধি না করে, গবেষণার উপযোগী তথ্য নির্দিষ্ট পরিধির মধ্যে সীমিত রেখে, প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন নির্বাচিত ঘটনা ও বিষয়ের উপর যথোপযুক্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই গ্রন্থে ঐতিহাসিক মূল্যায়ন হয়ে দাঁড়ায়নি কোনো বিতর্কিত অপব্যাখ্যা। এখানেই এই গ্রন্থের অভিনবত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব।

 

 বাঙালি জাতীয়তাবাদ  (অপ্রকাশিত)

এই গ্রন্থের আলোচনার বিষয় হচ্ছে বাঙালির ঐক্য- ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ অবশ্যই অনুভূতির-চেতনার-উপলব্ধির ব্যাপার, কিন্তু কোনো অনুভব-চেতনা-উপলব্ধি  স্বয়ভূ নয়, কারণ-পেছনে থাকে যুক্তিতর্ক, থাকে ঘটনার তৎপরতা- ইতিহাস। বাঙালি জাতীয়তাবাদী অনুভবের পেছনে দুটি বিষয় জড়িত- একটি আত্মপরিচয়ের, অপরটি সমষ্টিগত ঐক্যের; তবে উভয়ই আত্মপরিচয় লাভ ও দানের স্পৃহার সঙ্গে বাধা। কিন্তু ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে সমষ্টিগত পরিচয়ের প্রশ্নটি জড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, ভিন্নজাতির পাশে যখন স্বজাতিকে দাঁড় করাতে হয়। একজন ব্যক্তি তখন একা থাকে না, হয়ে যায় সমষ্টির অংশ, সমষ্টির গৌরবে তার গৌরব, গ্লানিতে তার গ্লানি। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আকাক্সক্ষা যে আত্মসচেতনতার ফল, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধই এর জ্বলন্ত উদাহরণ। জন্মছাপ বাঙালি মুছতে পারেনি বলেই, আত্মপরিচয়ের খুঁজে, প্রথমে আত্মরক্ষা এবং পরে বিদেশীশক্তিকে প্রতিরোধের অবলম্বন হিসেবে, বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্তদৃঢ় ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে, সমস্বার্থ বোধ জাগিয়ে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিশাল বাংলার একটি খ-কে স্বাধীন করতে সক্ষম হয়েছিল।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভাষাভিত্তিক, কারণ, বাঙালি জাতির জন্য ঐক্যের মূল সূত্রই হচ্ছে ভাষা; যদিও কেউ কেউ হিন্দু-মুসলমানের ব্যবধানটিকে উল্লেখ করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেন, তবে বাস্তাব সত্য হচ্ছে এই ব্যবধান কালের প্রবাহে বিলীন হয়নি বলেই বাঙালি সমৃদ্ধশালী একটি জাতি হিসেবে বিশ্বের মাঝে মাথা উঁচু করে আছে। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে যে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব হয়েছিল তাও ইতিহাস-প্রমাণিত। ইতিহাস, ঐক্য, সমাজ, শিক্ষা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ শক্তিশালী উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্য- এসব কথাই আব্দুর রউফ চৌধুরী বলেছেন তাঁর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ গ্রন্থে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটিই পর্যালোচনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ, যেটিকে ভিন্ন-ভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন: বাঙালির ভাষা ও জাতিসত্তা সম্বন্ধে বিস্তারিত বক্তব্য স্থান পেয়েছে ‘ভাষা ও জাতিসত্তা’ অধ্যায়ে। ভাষার ইতিহাসসহ ভূতাত্ত্বিক-নৃতাত্ত্বিক-জাতিগত দিকগুলোও আলোচনা করেছেন; তবে তিনি বলেছেন, ‘জাতি গঠনে অনেক উপাদান কাজ করলেও ভাষাই হচ্ছে এর প্রধান উপাদান।’  ‘জীবন ও সমাজ’ অধ্যায়ে বাঙালির ঐক্য সন্ধানে আব্দুর রউফ চৌধুরী প্রমাণ করেছেন যে, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-আদিবাসী নির্বিশেষে বাঙালির পক্ষে সমন্বিত সামাজিক জীবনযাপন করা ছাড়া অন্যকোনো বিকল্প পথ নেই; বরং দৈনন্দিন বাস্তব জীবনে সমন্বয় সাধিত হতে বাধ্য, কারণ- একই মাঠে হালচাষ, এই ধরনের ফসল ফলানো, এই ধরনের খাদ্যগ্রহণ, একই হাটে বাজার, একই ঘাটে ¯œান ইত্যাদি। এরই সঙ্গে স্থান পেয়েছে বাঙালি সমাজে নারীর স্থানও। ‘শিক্ষা ও দর্শন’ অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে বৈদিক হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, ইসলামধর্ম, লোকধর্মসহ চৈতন্যদেব ও বৈষ্ণববাদ, মধ্যযুগের মুসলিম দর্শন, বাউলবাদ, যুক্তিবাদ ইত্যাদি; প্রচীনকাল থেকে সমকাল পর্যন্ত। ‘রাজনীতি ও অর্থনীতি’ অধ্যায় শুরু ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীতে যুদ্ধের প্রহসনে বাঙালির দীর্ঘ প্রায় দুই শতাব্দীব্যাপী পরাধীনতার ইতিহাস দিয়ে। আব্দুর রউফ চৌধুরী বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করেছেন- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাস, কৃষক-তাঁতি-বণিকদের উপর অত্যাচারে ইতিহাস, চাষী-বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ, কৃষক-বিদ্রোহ, পাইক-বিদ্রোহ, আদিবাসী-বিদ্রোহ, সাঁওতাল-বিদ্রোহ, তিতুমীর-বিদ্রোহ, ফারাজি-আন্দোলন (দুদু মিঞা বিদ্রোহ), সিপাহী-বিদ্রোহ, নীলচাষী-বিদ্রোহ, বঙ্গভঙ্গ, স্বরাজ ও স্বদেশী আন্দোলন, খিলাফত-আন্দোলন, অসহযোগ-আন্দোলন, বিশাল বাংলার বিভাজন ও বাংলাদেশের সৃষ্টিসহ লেখকের জীবনের শেষকাল পর্যন্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস। আব্দুর রউফ চৌধুরী সমগ্র বাঙালি জাতির কথাই বলেছেন, খ-ের বা অংশের নয়; তাই ভৌগোলিক-বিভাজন ডিঙিয়ে একটি অভিন্ন জাতির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানই জানিয়েছেন ‘বাঙালির ঐক্য: বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ অধ্যায়ের মাধ্যমে, ‘রাষ্ট্রের ভাঙাগড়া আছে, অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে; কিন্তু বাঙালি জাতি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ অমর- চিদম্বর; তবে তার চরিত্র হওয়া আবশ্যক- গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্যভিত্তিক। আর এ হলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বঞ্চিত মানুষ, প্রকৃতভাবে মুক্তি লাভ করবে; পাবে মানবিক চাহিদা পূর্ণের নিশ্চয়তা; রুখে দাঁড়াতে পারবে অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন, বৈষম্য ও সংঘর্ষের বিরুদ্ধে। […] বাঙালি জাতীয়তাবাদ শুধু বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবলম্বনই নয়, সর্ব মুক্তির হাতিহারও বটে, ঐক্যবব্ধ হওয়ার একমাত্র বেদবাণী।’  ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ নিয়ে আলোচনা কখনই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না; সেই অর্থে এই গ্রন্থটিও পরিপূর্ণ নয়; কারণ অনেক প্রশ্ন জাগবে, উত্তরও পাওয়া যাবে না, মতদ্বৈত ঘটবে। তেমনটিই ঘটা প্রয়োজন; কারণ উপজীব্য বিষয়গুলো উপেক্ষণীয় নয়, মোটেই; তবে আব্দুর রউফ চৌধুরী ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এ আপোসহীন; বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শোষণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে বাঙালির সহায়তায় গণনীতি হিসেবে রূপান্তরিত করার পক্ষে, কারণ এই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-ই পারে জাতীয় পার্থক্য মুছে দিতে, ভৌগোলিক বেড়া ভেঙে দিতে সমর্থন করতে পারে- এমন সবকিছু যা একে-অন্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধন স্থাপন করে মিলনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়; তবে বোধ-জ্ঞান-বুদ্ধিহীন উগ্র-জাতীয়তাবাদীতে অবশ্যই তিনি বিশ্বাসী নন। তাই এই গ্রন্থে পাওয়া যায় বাঙালির ঐক্যের প্রশ্নে তাঁর গভীর আগ্রহ, কৌতূহল ও তথ্যানুসন্ধান। এছাড়াও তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য যে অনানুষ্ঠিকতা, প্রবহমনতা ও যুক্তিযুক্ততা তা এই গ্রন্থের পাতায় পাতায় প্রকাশ পেয়েছে।

 

 বিপ্লব ও বিপ্লবীদের কথা  (অপ্রকাশিত)

আব্দুর রউফ চৌধুরীর পারিপার্শ্বিক জীবনে অমানুসিক নির্যাতন ও নিপীড়ন তাঁর মন-মানসকে বিচলিত ও বিগলিত করে তুলেছিল, একে উৎখাত করার জন্য তিনি সমাজতন্ত্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নতুন সাফল্য অর্জন করার কথা বিশ্বাস করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সমাজতন্ত্রই পারে সমাজের নীচুতলার যুগ-যুগ ধরে মুখ থুবড়ে পড়ে-থাকা কোটি সর্বহারা মানুষের মুক্তির পথকে অবারিত করে তাদের জীবনমান উন্নত করতে। সমাজতন্ত্রই পারে মেহনতী মানুষকে অর্থনৈতিক শোষণ এবং সামাজিক দাসত্ব-শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিতে। তাই তিনি বলেছেন যে, সমাজতন্ত্র নির্মাণের মাধ্যমেই মানুষের উপর সকল প্রকার শোষণের অবসান ঘটিয়ে শ্রেণীহীন-শোষণহীন সমাজ-ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি এও বিশ্বাস করতেন যে, নিপীড়িত জনগণ যুগ-যুগ ধরে যে শোষণমূলক ব্যবস্থার কালোফণার ছুঁবলে ধ্বংস হচ্ছে, তার থেকে মুক্তির একমাত্র পথই সর্বহারার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া অন্যকোনো উপায় নেই। যদিও আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সঙ্গে পূর্ব-ইউরোপের দেশগুলো ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সক্রিয় তৎপরতা সারা বিশ্বের সর্বহারা জনগণের মধ্যে বিপ্লবী সংগ্রামের সম্ভাবনা ও সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বেশকিছুটা হতাশা ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল; তবুও আব্দুর রউফ চৌধুরী জানতেন যে, এই হতাশা এবং সন্দেহ সা¤্রাজ্যবাদী ও সামাজিক সা¤্রাজ্যবাদী প্রচার-মাধ্যমগুলোর একতরফা প্রচারণার ফলে বিশ্বের দেশে-দেশে বিপ্লবী-আন্দোলন ও সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করলেও, বাস্তবে এইসব ঘটনাবলী ছিল সা¤্রাজ্যবাদের অবক্ষয় ও ধ্বংসের পর্যায়, তার বিকাশের কোনো পর্যায় অবশ্যই নয়; বরং পুঁজিবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদের নিজস্ব আভ্যন্তরীণ চরিত্রগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ, যা ক্ষণস্থায়ী হতে বাধ্য। তিনি এও বিশ্বাস করতেন যে, ‘মাও সেতুঙ’-এর বিপ্লবের লাল পতাকা তলে বিশ্বের সমস্ত অত্যাচারিত শ্রেণী মিলিত হবে; সমাজতান্ত্রিক চীন হবে সর্বহারা জনগণের পথপ্রদর্শক, যা হবে দীর্ঘ-স্থায়ী। চীনই হবে সা¤্রাজ্যবাদকে নিপাত করার শক্তি।

‘বিপ্লব ও বিপ্লবীদের কথা’ গ্রন্থকে আব্দুর রউফ চৌধুরী কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে সমাজতন্ত্রের আলোচনা করেছেন। যথা: প্রথম অধ্যায়: ‘ফরাসী বুর্জোয়া বিপ্লব’ ; দ্বিতীয় অধ্যায়: ‘কার্ল মার্কস  ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস’ (‘অর্থনৈতিক ও দার্শনিক খসড়া’, ‘ডেমোক্রেটিয় ও এ্যপিকিউরিয় প্রকৃতি দর্শনের পার্থক্য’,  ‘ইউটোপীয় ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’, ‘কম্যুনিস্ট পার্টির ইশতেহার’, ‘দ্বান্দ্বিক-বস্তুবাদ’, ‘প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা’ ইত্যাদি); তৃতীয় অধ্যায়: ‘লেনিন-স্ট্যালিন ও রাশিয়া’ ; চতুর্থ অধ্যায়: ‘মাও সেতুঙ ও চীন’ , পঞ্চম অধ্যায়: ‘বাংলাদেশ ও সমাজতন্ত্র’।

প্রথম অধ্যায় : ‘ফরাসী বুর্জোয়া বিপ্লব’। ‘রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য দার্শনিক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা-ভলতেয়ার, রুশো, দিদরো প্রমুখ- জনগণকে বিপ্লবের পথে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হন। সেইসময়ের ফরাসী রাষ্ট্রীয় ও সমাজ কাঠামোতে বিদ্যমান ছিল প্রচুর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দ্বিন্দ্ব; ফলে সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রবর্তন বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়ে। কৃষক-শ্রমিক-কারিগর ও বুর্জোয়া রা এই বিপ্লবের মূলশক্তি ছিল। এই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্সে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ ঘটে বটে, কিন্তু স্বাধীনতা-সমতা-ভ্রাতৃত্বের মন্ত্রে আপ্লুত হয়ে যে প্রজাতন্ত্র-রাষ্ট্রের সৃষ্টি করার কথা ছিল তা না-হয়ে পরিণত হয় একটি বুর্জোয়া-রাষ্ট্রে; পুঁজিমালিক বুর্জোয়াশ্রেণী ও শ্রমশক্তি বিক্রি করে-খাওয়া শ্রমশ্রেণীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষটি- অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ- ঠিকই বহাল থাকে; ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করলেও শ্রমিক-কৃষক-কারিগরশ্রেণীকে অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তাকে-ধনীশ্রেণীর প্রতি শ্রমশ্রেণীকে অনুগত রাখার একটি কার্যকরী কৌশল হিসেবে- রাজনীতিতে নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বুর্জোয়াশ্রেণী। কিন্তু ধর্মকে রাজনৈতিক কাজে যেই ব্যবহার করুক না কেন, সেই শ্রেণী অবশ্যই শোষকশ্রেণী। কারণ, ধর্ম নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো গরজ থাকা উচিত নয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত না-থাকাই বাঞ্ছনীয়, এতে সকলের ধর্মবিশ্বাস, ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার হিসেবে, থাকবে সম্পূর্ণ স্বাধীন। ধর্মপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণই হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক সর্বহারাদের দাবী। […] বুর্জোয়ারা সামন্ততন্ত্র ভেঙে ফেলে তার ধ্বংসের উপর সৃষ্টি করে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা- অবাধ প্রতিযোগিতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের চোখে সমস্ত পণ্য-মালিকদের সমানধিকার ইত্যাদি পুঁজিবাদী আশীর্বাদের রাজত্ব। […] উৎপাদন হয়ে দাঁড়ায় একটি সামাজিক কাজ। […] সামাজিক উৎপন্ন দখল করে ব্যক্তি পুঁজিপতি। […] শ্রমিকদের জন্য আজীবন মজুরিশ্রমের ব্যবস্থা।’

দ্বিতীয় অধ্যায় : ‘কার্ল মার্কস  ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস’। আব্দুর রউফ চৌধুরী এই পর্বে ‘দ্বান্দ্বিক-বস্তুবাদ’ নিয়েও আলোকপাত করেছেন, যেমন, ‘মার্কসবাদী দর্শনের ‘দ্বান্দ্বিক-বস্তুবাদ’-এর দুটো উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: (এক) শ্রেণী-প্রকৃতি; অর্থাৎ দ্বান্দ্বিক-বস্তুবাদ সর্বহারাশ্রেণীর সেবায় নিয়োজিত; (দুই) বাস্তব-প্রকৃতি; অর্থাৎ তত্ত্ব অনুশীলনের উপর নির্ভরশীল এবং তত্ত্বের ভিত্তি হচ্ছে অনুশীলন। জ্ঞান বা তত্ত্বের সত্যতা নির্ধারিত হয়, শুধুমাত্র, সামাজিক ব্যবহারে তার বাস্তব ফলাফলের উপর। […] সর্বহারাশ্রেণীর শিক্ষা-বিস্তারের জন্যে মার্কস ও এঙ্গেলস বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান আহোরণের কথা বলেছেন।’  কার্ল মার্কসের ‘অর্থনৈতিক ও দার্শনিক খসড়া’-সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে আব্দুর রউফ চৌধুরী বলেছেন, ‘১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে কার্ল মার্কসের পরবাসী জীবনকালে রচিত ‘অর্থনৈতিক ও দার্শনিক খসড়া’  রচনাটিতে মোট তিনটি পান্ডুলিপি আছে; যথা-(এক) প্রস্তুতিমূলক নথিপত্র, বুর্জোয়া ও পেটি-বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্রীদের রচনার উদ্ধৃতি এবং মার্কেসের বিশ্লেষণী মন্তব্য। এর বিষয়বস্তু হচ্ছে: শ্রমের মজুরী, পুঁজির মুনাফা, ভূমির খাজনা এবং বিচ্ছিন্ন করা শ্রম। শেষের বিষয়টি মাকর্সের স্বতন্ত্র রচনা। (দুই) চার-পৃষ্ঠা যুক্ত এই রচনায় পাওয়া যায়- এখানে পুঁজি ও শ্রমের এন্টিথিসিস। ভূ-গত সম্পত্তি ও পুঁজি শিরোনামে অনুদিত। (তিন) ব্যক্তি সম্পত্তি ও শ্রম, ব্যক্তি সম্পত্তি ও কম্যুনিজম, বুর্জোয়া সমাজে অর্থের দাপট-বিষয়ে মাকর্সের প্রায় সম্পূর্ণ লেখা। এই অংশের একটি বিশাল অংশ সমগ্রভাবে হেগেলীয় ডায়ালেকটিক এবং দর্শনের পর্যালোচনার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।’

তৃতীয় অধ্যায় : ‘লেনিন-স্ট্যালিন ও রাশিয়া’। আব্দুর রউফ চৌধুরী বলেছেন, ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সারা বিশ্বকে তা-বলীলায় পরিণত করেছিল; কিন্তু ‘অক্টোবর-বিপ্লব’ [নভেম্বর মাসে] সম্পাদন করে রুশরা বিশ্বে সর্বপ্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলে। লেনিন ও স্ট্যালিন-এর নেতৃত্বে রাশিয়ার মহান সর্বহারা ও মেহনতী জনগণের বিপ্লবী শক্তি, হঠাৎ, আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ছড়িয়ে পড়ে; এবং বিশ্ববাসী এই বিপ্লবকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। বিশ্বের প্রগতিশীল জনগণের চিন্তা এবং জীবনপথ সম্পূূর্ণ এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। সর্বহারা-শ্রেণীর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে তারা পেয়ে যায় বিশ্বজনীনভাবে, মাকর্সবাদ-লেনিনবাদ, প্রযোজ্য সত্য; পালটাতে থাকে বিশ্বের চেহারা।’  এছাড়াও আছে লেনিন-স্ট্যালিনের রাশিয়া সম্বন্ধে বিস্তর আলোচনা।

চতুর্থ অধ্যায় : ‘মাও সেতুঙ ও চীন’। মাও সেতুঙ-এর চীনে বিপ্লব সাধনের আগে চীন ছিল একটি চরম গরীব দেশ, বেকারের রাষ্ট্র, ভিক্ষুকের জনপদ, দুর্ভিক্ষের বিরাণভূমি, সামন্তশ্রেণীর ও সা¤্রাজবাদের দালালদের শোষণ-নির্যাতনের ভূখ-, সামাজিক অপরাধী অধ্যুষিত অঞ্চল। আর এসব থেকে মুক্তির দিশারী হিসেবে মাও সেতুঙ-এর আভির্ভাব। তিনি যেমন ছিলেন মাকর্সবাদী-লেনিনবাদী তাত্ত্বিক, তেমনি ছিলেন বিপ্লবী দল-সংগঠক, কৌশলবিদ, সমরবিদ, সমাজতান্ত্রিক গঠন কার্যের নেতা। এই শ্রেষ্ঠ পুরুষের অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন ও কীতি সম্বন্ধে এই অধ্যায়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এরইসঙ্গে চীনের জনগণের অবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, চিকিৎসা-শিক্ষা, জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

পঞ্চম অধ্যায় : ‘বাংলাদেশ ও সমাজতন্ত্র’ পর্বে-১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ভারতবর্ষের ‘প্রবাসী কম্যুনিস্ট পার্টি’ গঠনের প্রসঙ্গসহ বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, বামপন্থী রাজনীতির সমস্যা, সমাজতান্ত্রিক সংগঠন সৃষ্টি করা ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

বিশ্ব ইতিহাসে ও সমাজবাদী সাহিত্যে গভীর জ্ঞানের অধিকারী আব্দুর রউফ চৌধুরী, একজন মানবতাবাদী তাত্ত্বিক হিসেবে, এই গ্রন্থে তাঁর বলিষ্ঠ চিন্তাধারার চমৎকার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।

 

 সৃষ্টিশীল রচনা (কবিতা)

সমাজ পারিপার্শ্বিকতা এবং স্বনির্মিত মনোভূমি- এই দ্বৈত বিষয়ের প্রক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পী-সাহিত্যিকদের জন্য বৈপরীত্যসূচক। কিন্তু যখন জনজীবনের সমগ্রতায় একটা সামাজিক আকাক্সক্ষার সর্বময় বিকাশ সাধিত হয়, তখন শিল্পীর চেতনালোকের নৈঃসঙ্গ্যবোধ ও আত্মপরায়নতাও বিপন্ন হতে বাধ্য। সেখানে তাঁরা, প্রত্যক্ষ ভূমিকা থেকে বিচ্যুত, সেখানেও তাঁদের দ্বারা নির্মিত হয় সংক্ষোভ এবং বিদ্রোহের নেপথ্যশক্তি। কিন্তু যে ব্যক্তি ১৯৪৬-১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ঘটে-যাওয়া রাজনৈতিক কর্মকা-ে সচেতন, এই জীবনকাল যিনি প্রত্যক্ষ করেছেন বাঙালি জীবনের প্রতিটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পর্যায়, তার বিকাশ, প্রতিক্রিয়া এবং পরিণতিকে, তিনি স্বাভাবতই অভিজ্ঞতার বিশালতায় অনিবার্য ভবিষৎকে ঘোষণা করবেন প্রকাশ্যে। ’৪৬-এর ভারতবর্ষ বিভাজনের আন্দোলন, ’৪৮-এর বাংলাভাষা আন্দোলন, ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সূচিত বাঙালির সাংস্কৃতিক নবজাগরণের সূত্র ধরে আব্দুর রউফ চৌধুরীও কলমের সাহায্যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সমান্তরাল ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। রচনা করলেন প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস ও কবিতা। ভারতবর্ষ বিভাজনোত্তর সময়প্রবাহে বাংলাদেশের সচেতন কবি-সাহিত্যিকরা দ্বিধান্বিত হলেও তিনি ছিলেন পাকিস্তানবাদী জীবনভাবনা ও মূল্যবোধের বিপরীত; বরং নবজন্ম ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন। তাই তো তাঁর গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্য-আঙ্গিকের ছত্রে ছত্রে দেখা যায় পাকিস্তানের প্রতি বিক্ষোভের চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। বাঙালি মূল্যবোধের অনুসারী ছিল তাঁর জীবন ও ভাবনা। বিক্ষোভের চূড়ান্ত অভিব্যক্ত প্রকাশ করতেই সমাজ-কাল-জীবনকে তুলনামূলকভাবে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে চিহ্নত করায় সচেষ্ট হলেন-তাঁর কাব্যভাবনায়, চিত্রকল্পে, রূপকে, উপমায় আর স্বাতন্ত্র্যকামী কণ্ঠস্বরে-‘’৭১-এর কবিতা’ ও ‘কবিতাগুচ্ছ’-এর মাধ্যমে।

 ’৭১-এর কবিতা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই, তেমনি নেই কবিরও। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কাব্যচর্চায় মনোযোগী হননি এমন সংখ্যা খুবই কম। সবার কবিতা হয়তো একইভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি কালের বিচারে, কিন্তু তাদের প্রসঙ্গ ছিল একটিই ‘মুক্তিযুদ্ধ’। ঠিক তেমনি প্রবাসে বসে মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যাঁরা কবিতা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে একজন হলেন দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী। শামসুজ্জামান খানের ভাষা, ‘[…] তিনি একজন মহৎ মানুষ, বড়ো মাপের মানুষ। তাঁর চেতনার সাথে যুক্ত হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী হিসেবে অংশগ্রহণ।’  আর ড. মুনসতাসীর মামুনের ভাষায়, ‘আব্দুর রউফ চৌধুরীর জীবনের মূল পরিবর্তন করেছে, তাঁর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং দেশের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা: যে দেশ ত্যাগ করেছেন, কিন্তু তারপরও সে দেশের জন্য ভালোবাসা ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত হয়েছে, সেটারই প্রতিফলন দেখি মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে।’

আব্দুর রউফ চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কবিতার সংখ্যা অজ¯্র নয়, তবে প্রবাসে থেকে সরেজমিনে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও তিনি বিশ্বজনমত গঠনের জন্য ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহর ভ্রমণ করেছেন ও বক্তৃতা দিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের জন্য তহবিল সংগ্রহে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। এমনকি জুতো-পলিশ করে অর্থ সংগ্রহ করেন। ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সরকারি সাহায্য সহযোহিতার জন্য আবেদন জানিয়ে চিঠিপত্র প্রেরণ করেন। এছাড়াও সর্বাবস্থায়ই কলকাতাস্থ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এসময়ে ইংল্যান্ডে তিনি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর অন্যতম সহকারী হিসেবে কাজ করেন। বাঙালির জীবনধারা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর সামাজিক বৈশিষ্ট্যের আলোকে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে বিচার করেছেন, প্রকাশ করেছেন নিজস্ব ধারায় কবিতা, যা হাতের রেখার মতোই একান্ত মৌলিক। তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় বিষয় তিনি দেশকে, দেশের আত্মাকে ভালোবেসে ছিলেন। এসব কবিতায় আছে গন্ধ। বারুদের গন্ধ। ঘামের গন্ধ। রক্তের গন্ধ। মুক্তির গন্ধ। তিনি দেশকে কখনো দেখেছেন দেবী সমতুল্য আবার অনাহার ক্লীষ্ট, শীর্ণ জননী রূপে। কয়েকটি উদাহরণ :

(১)

উদ্ভাসিত জ্যোতির্ময় আভা, দেবী সমতুল্য প্রভা

অবাক বিস্ময়ে চেয়ে দেখি, মুখখানি মধুময়ী

মনোহর, চিনি, তুমি জননী মোদের জন্মভূমি

কিন্তু একি দেখি, রাত-বিন্যাস-পথে

তোমারই পদতলে রক্ত-নখের ছাপ

একি শুনি, রাতের অন্ধকারে

তোমার সন্তানদের আর্তনাদ।

(২)

অনাহার ক্লীষ্ট শীর্ণ হাতে ক্ষীণ প্রদীপ লয়ে আঙিনাতে

অতি জীর্ণ স্থানে স্থানে ছিন্ন বস্ত্র পরিহিতা পল্লী জননী

অবসন্ন-বিষণœ বদনে, নিঃশেষ রাতে, মিনতি মাখা মুখে

সজল দুটি আঁখি তারায় সকালের নব সূর্যের অপেক্ষায়।

(৩)

দেবী তুমি মন্দিরেই বসে থাকো, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি

তুমি তো জান না আমি আর কোনো কালেই ফিরছি না

 

পুকুরটা শুকিয়ে গেল, মন্দিরটা ধ্বংস হল

সপ্তাহ কাটল, মাসও কয়েকটা

আষাঢ়ের জলে

গেরিলাদের পথের দাগ মুছে গেল

রাস্তার ঘাস মরে পাথর হল

 

তারপর….

রক্ত ছড়াতে লাগল আগ্নেয়গিরির লাভার মতো

নিরীহ মানুষ সব মরতে মরতে বাঁচতে চাচ্ছে

ভৈরব হুঙ্কারে তুমুল কালাগ্নি জ্বলছে বাংলা জুড়ে

বাড়ি-বারান্দা, গাছ-পালা, পাতা-পত্তর, মাঠ-কোঠা

সবকিছু পুড়ে ছাই, শুধু সর্বত্র কালো রক্তের দাগ

 

কিন্তু, তুমি, হে দেবী, এখনো বেঁচে আছ

নব নিশাকান্ত-কান্তি নিয়ে অস্থায়ী দেবালয়ে

কী লজ্জা! কিভাবে দেবী মুখ দেখাবে এই বাংলায়!

 

কাব্য-ভাবনা ও শিল্প-নির্মাণে পরিণত কবিচৈতন্য যখন ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নিয়ে শিহরিত ও স্পন্দিত হয়ে ওঠে, তখন তা একদিকে যেমন তাঁর সমকালস্পর্শী, অন্যদিকে তেমনি জীবনের সমগ্রতাকে আকর্ষণ করার পক্ষপাতী। স্পষ্টতই এসব কবিতায় কবির অন্বিষ্ট বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’। পীড়িত কবিচৈতন্যের আকুতিও এসব কবিতায় প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। কবির অর্ন্তরের বেদনাময় অনুভূতিও ধরা দেয়। যেমন:

ইলিশ গুঁড়ি রক্তের বৃষ্টি, যেন শস্য ক্ষেতে শিশির ঝরে পড়া

দূরে একজন স্টেনগান হাতে কাদামাখা গলিপথে, ঐ তো দূরে

এগিয়ে যাচ্ছে, তাকে হারানোর কথা ঠিক মনে সায় দেয় না

জানালার ফাঁকে আমার চোখ দুটো তাকেই অনুসরণ করছে

আর আমার বুক-হাত-পা, অন্ধকারে, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে

 

তবুও জানি-

সে-ই স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনবে

স্বাধীনতার স্বর-স্বাদ তার চলার ভঙ্গিতে

স্তরে স্তরে জমে থাকা স্বাধীনতা অর্জন

ইতিহাস-বিন্যাস-পথে শুধু সময়সাপেক্ষ।

রক্তাক্ত ও অবরুদ্ধ অভিজ্ঞতা কবিকে আশাহত করে না। বরং কবিদৃষ্টি প্রত্যাশাচঞ্চল, সম্ভাবনাদীপ্ত ও উজ্জীবিত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য। তিনি তাঁর নিঃসঙ্গ কাব্যজগৎ থেকে বেরিয়ে আসেন লোকালয়ে, স্বাধীনতা-সন্ধানী মানুষের মিছিলে। সেই প্রস্তুতি কখনো গর্জে ওঠে শব্দে, কখনো অস্ত্রে, কখনো-বা ঘৃণার আগুনে। কয়েকটি উদাহরণ :

(১)

ঝন ঝন রণ ঝন ঝনা ঝন

রক্তনয়ন বাঙালি জনগণ

ঝরঝর জলে রক্ত কলেবর

রক্তাক্ত বাংলা, মুক্ত তলোয়ার

মারে বীর নতশির ছাতুখোর

ধারা করে রক্তধারা বৃষ্টিনীর।

 

(২)

বাতাসের বাতাসে

আগুনের আগুনে

অপূর্ব রাখালের বাঁশিতে

বেজে উঠেছে মুক্তিসংগ্রাম

 

মুক্তিযোদ্ধা-

তোমার হাতে শাণিত অস্ত্র

তোমার বাহুতে মৃত্যুর স্বাদ

তোমার চোখে নব সূর্যশিখা

তোমার প্রাণে দীপ্ত মুক্তিযুদ্ধ।

(৩)

দেখ চেয়ে আমাদের বীরযোদ্ধারা বীরবলে

ও কী কৌশলে চূর্ণ করছে পাক-চূড়ামণিকে

ক্ষণিকেই উদয় হবে ভবানন্দময়ী বঙ্গাকাশে

পাকিস্তানি রাক্ষসী সূর্য-রবি যাবে অস্তাচলে

দলপতি জীমূতমন্দ্র হাহাকার-রবে হবে মত্ত।

(৪)

বাঙালি আজ তেজোদীপ্ত উন্মাদ, অগ্নিজ্বালো হত্যার প্রতিশোধ

‘একে-সত্তর’-এ কখনো নয় মিথ্যে, লড়তে হিং¯্র পশুর সাথে

ঝেরে ফেল তবে মনের মমতা, পশুদের চূর্ণ করো পদাঘাতে

বিদ্যুচ্চমকে উড়াও অস্ত্র, শনশনে, ঘন ঘনাকারে বঙ্গগগনে।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর কবিতায় সমন্বিত মুক্তিযুদ্ধ এভাবেই লাভ করেছে। তাঁর চেতনারই পল্লবিত শব্দরূপ, রক্তক্ত শব্দবহ্নিমালা। উচ্চকণ্ঠ অভিব্যক্তি-কবিতা হয়ে উঠেছে প্রবাসী পত্রিকায়। ইতিহাসের যে অনিবার্য গতিপ্রবাহ ঐবদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের সফলতার ইঙ্গিত বহন করে, আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর কবিতায় সেই মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ইতিবাচক পদক্ষেপের সঙ্গে সমান্তরাল গৌরবময় ভূমিকা নির্মাণ করেছেন। আত্মশক্তির একাগ্রতায় তিনি উদ্দীপনা সঞ্চার করেছেন সংগ্রামী চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের সেই অপ্রতিরোধ্য নবজাগরণের প্রাণপ্রবাহের অঙ্গীকারে। উদাহরণ :

রক্তের সমুদ্রে ডুব দিয়ে দেখি- সবুজ দেশে লাল সূর্য

এই সূর্যটি ছিনিয়ে আনতে- পুড়িয়েছি বিশাল জনপদ

তবুও বাঁচিয়ে রেখেছি একটি নগ্ন বৃক্ষ

মেঘকে উড়িয়ে দিয়েছি বন্দুকের গুলিতে

রক্তের গন্ধ চড়ে এখন বাতাসের গর্ভে

এখন যদি বৃষ্টি হয় তবে- শুধু রক্তবৃষ্টি

শত্রুরা সাঁতার কাটবে রক্তগঙ্গায় আর ওদের চিৎকারে

উৎসব শুরু হবে বুড়িগঙ্গায়, রণদৈত্য শবের দল

নিজেরাই নিজেদের কাপন খোঁজবে লাল-সবুজের মাঝে।

এভাবেই জাগতিক আবর্তে-সংগ্রামে-সংঘাতে আব্দুর রউফ চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার শব্দময় উৎসভূমি নিমার্ণ করেছেন। তাঁর কবিতায় সাহসী প্রত্যয়ের চিহ্ন বিদ্যমান। দ্রোহীদীপ্ত ঐক্যচেতনায় তাঁর কবিতাগুলো উন্মুখর হয়ে উঠেছে। আরও কয়েকটি উদাহরণ :

(১)

আমাদের মুক্তির পতাকা তৈরি হয়েছিল এইভাবে-

দুঃখি-মায়ের দেহে জোড়ানো সবুজ শাড়ির ছেঁড়া আঁচল ছিঁড়ে

বাঙালিরা সেলাই করেছিল স্বাধীনতার সুতো দিয়ে

তারপর

পাষাণের বন্দুকের গুলিতে নিহত শহীদ-স্ত্রীর কপালের সিঁদুর

সযত্নে কারুকার্যের মতো বিছিনে নিয়েছিল আঁচলের মাঝখানে

 

অথবা

হয়তো

বাংলা মায়ের বুকের কোনো একটি ভাঁজের সবুজ ক্ষেতে

আকাশের জ্বলজ্বল সূর্যটি সাগ্রহ দেশবাসী বসিয়ে দিয়েছে

মুক্তির পতাকা এখন রতেœর মতো উজ্জ্বল

আস্তে-ধীরে এটা হয়ে উঠছে রক্ত রাঙা।

 

(২)

মুক্তিযুদ্ধ চলবেই

মুক্তির সংগ্রাম বাঙালি চালিয়ে যাবেই

অলিতে-গলিতে, মাটে-গ্রামে-গঞ্জে

অফিসে-আদালতে, কলে-ক্ষেতে-ঘাটে

 

মুক্তিযুদ্ধ চলবেই

মুক্তির সংগ্রাম বাঙালি চালিয়ে যাবেই

সাপের গর্তে, মৃত্যুময় সকালে-বিকালে

পাটাবলির উৎসবে, পাহাড়ে-সমতলে-জলে

 

সবুজ মাটিতে যখনই লাল সূর্য জেগে উঠবে

তখনই শুধু তখনই মুক্তিযুদ্ধের রেখা টানা হবে…।

 

(৩)

ফুটন্ত রক্তের ফেনায়

বিক্ষোভ

ভেঙে ফেলছে

রাজনৈতিক সীমানা

নিজস্ব ভূখ- পেরিয়ে

বেরিয়ে আসতে চায়

আত্মস্বীকৃতির পথে।

এসব কাব্যচিত্রে আব্দুর রউফ চৌধুরীর দ্রোহী ভাবটি ফুটে উঠেছে। দেশপ্রেম আর স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতি বিশ্বস্ততাই তাঁকে দ্রোহী করে তুলেছে। ফুটে উঠেছে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আব্দুর রউফ চৌধুরীর কণ্ঠ উচ্চকিত। প্রবাসে তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কাটালেও বাংলাকে তিনি নিবিড়ভাবে অনুভব করেছেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ ছিল পাকিস্তান আমল। এই বিস্তর সময়ে বাঙালির চোখের জল এক মুহূর্তের জন্যও মোছেনি। বিষণœ মাতৃভূমির এই ব্যথাতুর দৃশ্য আব্দুর রউফ চৌধুরীর অন্তরকে আহত করেছে বারবার। একাত্তরের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর দৃশ্য, পত্রিকা ও বিবিসি-এর খবর থেকে জানা, তিনি ভুলতে পারেননি। ‘‘৭১-এর কবিতা’ গ্রন্থে দেখা যায় আব্দুর রউফ চৌধুরীর কাব্যভাবনা, চেতনাপ্রবাহ ও জীবনদর্শনে আর তাঁর চিত্রকল্প-উপমা-রূপক-প্রতীক নিমাণের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা-ক্ষোভ-অবিশ্বাস-অস্থিরতায় বন্দীজীবনের স্রােত প্রকাশ হতে। তাই বলা যায় মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মকা-ের ফলাফল হয়েই থাকেনি, তা রূপান্তরিত হয়েছে বাঙালির জাতীয় জীবন ও মানসপটভূমির সমগ্রতায়; পরিণত হয়েছে জাগৃতি, নির্মাণ এবং সৃজনকল্পনার রক্তিম ও সুদূরপ্রসারী সূচনাভূমিতে।

 

 কবিতাগুচ্ছ (অপ্রকাশিত)

ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে শক্তি আহরণ করে পথ চলতে থাকেন আব্দুর রউফ চৌধুরী। কারণ, তিনি জানেন, ঐতিহ্য হচ্ছে আধুনিক শিল্পের অন্যতম প্রাণসম্পদ। আর ইতিহাস জীবন ও সমাজের সঙ্গে নিবিড় ভাবে একাত্ম। তাঁর একটি আদর্শাবাদী রাজনৈতিক চেতনা ছিল, বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে তা ছিল নির্দিষ্ট ভৌগোলিক আবেষ্টনীর মধ্যে স্পন্দমান জনজীবনের আশা-আকাক্সক্ষা, দুঃখ-বেদনার অঙ্গীকারে উজ্জ্বল। উদাহরণ:

প্রজাপতির মতো রাজাকাররা ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে সেখানে

মুক্ত ঘুড়ি যেন, এসব সাপের সদ্যপাড়া ডিমগুলো অবিশ্বাস

করে, নবরাষ্ট্রের নবজন্ম নেওয়া প্রসবের প্রথম প্রহরে

সাপের বিষাক্ত ছোবলের বাস্তবতাকে, তবে এসত্য, ওরা তো

বেওয়ারিশ সন্তান, ঢেকুর তুলবেই সর্প-ভাষীরা আহত স্বরে।

এই কবিতার বিষয়চেতনা আব্দুর রউফ চৌধুরীর কাছে ছিল সমাজসত্যের গভীর অনুভবের ফসল। প্রতীকী অর্থে তাঁর জীবনভাবনার গভীরতা এখানে অধিকতর শিল্পিত। বিভিন্ন কবিতায় তাঁর এরকম প্রতীকীচেতনা প্রবল। উদাহরণ:

শুকনো চন্দন, কলাপাতার প্যাঁচ, বাসি ফুল-

সবই ঝরে পড়ে শূন্য উৎসাহে

কিন্তু আশাভঙ্গ, ভিক্ষা-দারিদ্র্যতা-শোষণ-

সবই বাস্তব-সবই শ্বাশত আলোর মতো স্পষ্ট…।

ব্যক্তির চৈতন্যমুক্তি ও সমাজমুক্তির আকুলতা ‘কবিতাগুচ্ছ’-এর অধিকাংশ কবিতায় বিধৃত। পুঁজিবাদী সভ্যতার আভ্যন্তর-ক্ষয়ের অনুভবে যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়েছিলেন আব্দুর রউফ চৌধুরী। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য উজ্জ্বল মুক্তির সম্ভাবনাকে সযতেœ লালন করেছেন। ‘শ্বাশত আলোর মতো স্পষ্ট’-এই শব্দগুলো উন্মোচন করে দেয় আব্দুর রউফ চৌধুরীর উজ্জ্বল আত্মস্বরূপ। উদাহরণ :

সবই ছিল

তবুও সে সম্পূর্ণ উলঙ্গ আজ

শ্বেত পাথরের মতো পবিত্র ছিল তার দেহ

তার স্বর্ণালী বুক বেয়ে ঝকঝক করত সভ্যতা

তবুও মটরগাড়িতে সঙ্গীসহ চড়ে বেড়ানো ওরা

ছিটিয়ে থুতু দেয়, হাসি-ঠাট্টা করে তাকে নিয়ে

আরেকবার থুতু ফেলে, সঙ্গে সিগারেটের পোড়া টুকরোও

তারপর কুমতলবে লুটিয়ে পড়ে পাশে বসা যুবতীর দেহে

 

সবই ছিল

তবুও সে বিমুখ প্রান্তরে

নগ্ন চরাচর করে আজও।

‘সে’ ও ‘ওরা’-র প্রতীক অভিব্যক্ত হয় অমানবিক ব্যবহারে। এতেই প্রকাশ পায় আত্ম-পরিচয়-বিচ্ছিন্ন জাতিসত্তার তীব্র আর্তনাদ। এভাবেই আত্মপরিচয়ের লোপের যন্ত্রণা, দেশের নগ্ন বাস্তবতা, বেত্রাঘাতে নেমে আসা অন্ধকার, সৈনিকের বুটের শব্দ ভীর করতে থাকে আব্দুর রউফ চৌধুরীর মনসতটে। গণতন্ত্রের বিপদ-বিপন্ন পটভূমিতে গণতন্ত্রকে তিনি কামনা করেছেন মানুষের সার্বিক মুক্তির অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে। উদাহরণ :

আঙিনা ডিঙিয়ে, জং-ধরা টিনের চালে আত্মগোপন করল চাঁদ

বাড়ির পাশের মগডালে উড়ে এসে জুড়ে বসল একটি পেঁচা

দুঃস্বপ্নে জেগে ওঠি, শুনি-

মন্থর গতিতে, আস্তে-ধীরে, বেত্রাঘাতে নেমে আসা অন্ধকারে

বুটের ভেতর পায়ে ঠোসা পরিয়ে, পবিত্র গাদি কলঙ্কিত করতে

এগিয়ে এসেছে সুকঠিন এক সৈনিকরাজ, তারপর-

পইপই করে খুঁজে বের করে হত্যা করল জাতীয় নেতৃবৃন্দ

নিশ্চিত বুঝতে পারি, বিপদ-বিপন্ন মুখে-

মাছে-ভাতে বাঙালির ক্ষুধার তৃপ্তি গণতন্ত্র উদ্ধারে, অবিশ্রান্ত

অজেয় শক্তিতে, ত্যাগব্রতে, আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

কড়ি বর্গায় একটি টিকটিকি অবিরাম ‘টিকটিক’ করে চলে।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর কবিচৈতন্যের শেকড়সঞ্চালিত গতিবিধি দ্রোহী দৃঢ়তায়, ঐক্যচিন্তার সুগভীর ঐকান্তিকতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। স্বদেশের, তাঁর সময়কালে, সমস্ত অসঙ্গগতিকে স্বীকার করেও তাঁর শপথ ও শক্তিসাধনা নিবেদিত হয়েছে সম্ভাব্য মুক্তিসংগ্রামের পথপরিক্রমায়।

বেত্রাঘাতে পৃথ্বীপিন্ডে নামে আঁধার

হৃদয় হয় ছিন্নভিন্ন, চমকায় বিদ্যুৎ

ঝরে রক্তের ধ্বজা তনুতে

আঁধার এঁঁকে চলে গোপনে লাল বরাক…।

একটি সিদ্ধান্ত বা মীমাংসায় উপনীত বলেই আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর গন্তব্য সম্মন্ধে সচেতন- জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অন্তগর্ত ও বহির্গত-উভয় স্রােতের সঙ্গেই সংলগ্ন। গ্রহণগ্রস্ত শাসকশক্তির পদচারণায় বিপর্যস্ত ও রক্কাক্ত স্বদেশভূমিতে তাঁর প্রাণের ঔজ্জ্বল্য ও শক্তি হ্রাস পায় না। অতীতের দর্পণে ভবিষ্যৎকে প্রতিফলিত করে তাঁর সময়-কালকে তিনি পরিণত করেছেন অন্তর্লীন যন্ত্রণার অন্ধকারে।

হে মোর স্বদেশ, মোর দেবী

আমি বহু দূরে, তবুও মিনতি

আমার জন্মভূমি রক্ষা করতে

শুনেছো কী বাঙালি ডরাতে

ডরাই না সৈন্যদৈত্য টুটিতে

একদিন….

তুমিই বলেছিলে জয় আমাদের হবে, হবেই

তুমি বলেছিলে বন্যাবেগে শক্ত দৈত্যবাহিনী

কবলিত বাংলার মাটি সমরে স্বাধীন হবেই

তুমি বলেছিলে রাজাকার-পিশাচ উচ্ছেদে

আগত অরুণোদয়ে বাংলা মুক্তস্বাধীন হবেই

বাংলা হবে পরিপাটী, শান্তিতে সহযোগী

….কিন্তু আজও

আমি মহাশূন্যে খোঁজে ফিরি তোমাকে।

‘কবিতাগুচ্ছ’ পর্যায়ে কাব্যকে বিন্যস্ত করে তার শিল্প ও বিষয়গত ক্রমযাত্রার স্বরূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন কবি। একজন চিত্রকর দৃষ্টি এবং অনুভবের সমন্বিত পরিচর্যায় জীবনকে যে প্রক্রিয়ায় রেখায়িত করেন ক্যানভাসে, কবিতার রূপ-রস নির্মিতিতে আব্দুর রউফ চৌধুরী রঙ ও রেখার সেই আশ্চর্য শক্তিমত্তাকে অর্জন করেছেন। তাঁর অন্তর্গত চেতনার রঙে ও তুলিতে তাঁর ‘সময় ও কাল’ বিচিত্রভাবে ধরা দিয়েছে।

বাংলার রক্তমাখা মাটি ছুঁয়ে আমার প্রতিজ্ঞা

অনাহারী মানুষের হাড় ছুঁয়ে আমার প্রতিজ্ঞা

অনাথ পৃথিবীর পরমাণু ছুঁয়ে আমার প্রতিজ্ঞা

জীর্ণ জীবনের বিষপুঁজ ছুঁয়ে আমার প্রতিজ্ঞা

ক্ষুধা-খরার যাতনাঘাত ছুঁয়ে আমার প্রতিজ্ঞা

অবচ্ছিন্ন স্মৃতির উদ্ভাস ছুঁয়ে আমার প্রতিজ্ঞা

মারের সাগর ডিঙিয়ে

কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে

পায়ে-পায়ে রক্ত ঝরিয়ে

হাতে-হাতে অস্ত্র নিয়ে

শ্রম-ঘাম-বিষ বিলিয়ে

বজ্রধ্বজ প্রভঞ্জন রথে

লাল সূর্যটি ছিনিয়ে আনবই।

বাঙালির ইতিহাসের বড় অর্জন স্বাধীনতার যুদ্ধ। এ-যুদ্ধে বাঙালিরা পেয়েছে একটি নতুন মানচিত্র, যদিও হারিয়েছে অনেক-লক্ষ জীবন, মা-ঝির মান-সম্মান, জীবনের আশ্রয়। আব্দুর রউফ চৌধুরীর চোখে এই সংগ্রাম ধরা দেয় আলোর দিশারী, অভিসারী ঝড় হিসেবে।

শতছিদ্র পালহীন তরণী যখন বাইতে না পারি

তখন খোঁজে না পাই আলোর দিশারী

স্বেচ্ছায় মনে জাগে সংশয়-

তপ্ত-ঝাঁঝালো-জ্বলন্ত মৃত্যুর স্বাদ

সংকল্প যেন অক্ষম

তুমি চিন্ময় তাই আবার জাগ্রত হই

তন্ময় ধ্যান ভাঙে

অধীর-তীক্ষ উদ্দাম-উল্লাসে

কাপুরুষ নিঃসঙ্গ বাঘ তো নই

দাঁতে-নখে এখনো ধার আছে

রক্তে অভিসারী ঝড়

জোয়ার-ভাঁটার সন্ধি গঙ্গা-পদ্মাবক্ষে

লুপ্তপ্রায় মানচিত্র আবার প্রতিষ্ঠা করব নিশ্চিতে।

আব্দুর রউফ চৌধুরী প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাগুলো কবিমনের প্রকৃতি ও জীবনজিজ্ঞাসার বৈশিষ্ট্য অনুভাবনে এই প্রবন্ধে তুলে-ধরা রচনাগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, এবং আংশিকভাবে হলেও, কবিমনকে শনাক্ত করা সম্ভব। প্রত্যেক সহজাত কবিপ্রতিভারই একটি নিজস্ব শিল্পব্যাকরণ থাকে, যা মূলত দ্রোহ ও প্রতিবাদধর্মী। আব্দুর রউফ চৌধুরী জন্মেই দেখেছেন তাঁর জন্মভূমি ব্রিটিশের অধীনে, অবরুদ্ধ, অবগুণ্ঠিত; তারপর দেখেছেন পাকিস্তান রাষ্ট্র লুপ্ত করে দেয় তাঁর দেশের সমস্ত ভৌগোলিক সীমাচিহ্নকে। স্বাধীনতার নামে তাঁর মাতৃভূমি রয়ে গেল পরাধীন। নব উপনিবেশশাসিত জনজীবনের চরম মাতৃ-অধিকারকে তিনি চরম ভাবে উপলব্ধি করেছেন। দেখেছেন প্রতিবাদী, সংহারী রূপ। বাংলার দারিদ্র্যতা, পরাধীনতা এবং মহামারী স্থাপিত হয় তাঁর চেতনার জ্বলে জ্বলে লাল সূর্যের উপনিবেশ। তাঁর নিখিলব্যাপ্ত নৈরাশ্য, দ্বন্দ্ব ও সংকটতাড়িত ব্যক্তিচেতনার নিভৃত বেদীতে চলতে থাকে মাতৃভূমি ও স্বদেশের জন্য গভীর আরাধনা- জন্মভূমি, মাতৃভাষা, বাংলাদেশ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সমাজজীবনের বহুমুখী অসঙ্গিত আব্দুর রউফ চৌধুরীকে সীমাহীন হতাশা ও আস্থাহীনতার মধ্যে নিক্ষিপ্ত করে। এরসঙ্গে সেনাতন্ত্রের আগ্রাসী ও রক্তলোলুপ রাজনৈতিক চেহারা তাঁকে আরও হতাশায়, ব্যর্থতায় ও যন্ত্রণাবোধে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাই তাঁর কবিমানসকে আবেগের সততা এবং মানব ও প্রগতিমুখী শুব্ধ রাজনীতির অনুভবপুরিপুষ্টি দান করে। ফলে, আব্দুর রউফ চৌধুরীর কবিতার মুখ্য উপাদান হয়ে ওঠে রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশাত্মবোধ, গণ-আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষ জীবনদৃষ্টি তাঁর কবিতাকে করেছে বিশিষ্ট। প্রবল জীবনাসক্তি ও মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধে তিনি শিল্পের জন্য এক নব-তত্ত্বে উপনীত হয়েছেন। এই তত্ত্ব যুগপৎভাবে একজন কবিকে শিল্পী ও শ্রমিকের সমান্তর মর্যাদায় অভিষিক্ত করে।

 সৃষ্টিশীল রচনা (উপন্যাস)

 পরদেশে পরবাসী

প্রথমে ‘পরদেশে পরবাসী’ র গঠনপদ্ধতি সম্বন্ধে দু’-চার কথা বলে নিতে চাই। শ্রেণীর বিচারে বইটিকে চিহ্নিত করা যায় আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথার ভিত্তির উপরে দাঁড়-করানো উপন্যাস। তবে কেবল সেইটা বললে সবটা কিন্তু বলা হয় না, কেননা এই বইয়ের মধ্যে সত্যিই লক্ষ্য করবার মতো উপাদানবৈচিত্র্য রয়েছে। আমি যতদূর বুঝেছি, আব্দুর রউফ তাঁর প্রথম পর্বের বিলেতবাসকালে ডায়েরির মাধ্যমে তাঁর অভিজ্ঞতাগুলিকে লিপিবদ্ধ ক’রে রাখতেন। পরবর্তীকালে সেই মালমশার সাহায্যেই তিনি উপন্যাস খাড়া করেন। তাঁর নিজেরই জবানবন্দি অনুসারে, ‘বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগে সত্যের আলোছায়ায় ব’সে রচিত এই উপন্যাস।’ এখানে আছে কিছু উপাদান যা স্পষ্টতঃ তাঁর ষাটের দশকের দিনলিপির নথিপত্র থেকে নেওয়া; তার সঙ্গে অনিবার্যতঃ মিশেছে উপন্যাসকারের কল্পনা; এ ছাড়া লেখক জুড়েছেন বেশ কিছু সামাজিক, রাজনৈতিক এবং দার্শনিক চিন্তাভাবনা। এই সংমিশ্রণ আমাদের সময়ের স্বভাব দ্বারা চিহ্নিত। বিচিত্র উপাদানে উপন্যাস নির্মাণ আমাদের যুগধর্ম। ডকু-নভেল বা দলিলধর্মী উপন্যাস একটি স্বীকৃত সাহিত্যশাখা। এই ব্যাপারটিতে তাঁর সঙ্গে আমি আত্মীয়তা অনুভব করি, কারণ আমিও নানান উপাদানের সংমিশ্রণে উপন্যাস আর নাটক গড়তে ভালোবাসি।

এখানে সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা ব’লে নেওয়া যায়। বিচিত্র উপাদান মিশিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষামূলক আঙ্গিকে শিল্পের নবকলেবর নির্মাণ সকলের রুচিসম্মত হয় না। কেউ কেউ চান, উপন্যাসে একটা টানা গল্প থাকবে, তা ছাড়া বড় জোর একটা গৌণ প্লট থাকতে পারে; তেমনি নাটকেও একটা পরিষ্কার কাহিনী থাকবে, একটা প্লট, হয়তো একটা সাবপ্লট। উপন্যাস-নাটক উভয় শাখাতেই এঁরা চান সে ঘটনা বা অ্যাক্শনের ধাপে ধাপে- কিছু মোড় নিয়ে, কিছু বাঁক ফিরে- কাহিনী একটা সুস্পষ্ট পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু সমবেত বিদগ্ধম-লীকে মনে করিয়ে দিতে হবে না যে, আমাদের যাপত জীবনের ডৌল কদাচিৎ ওরকম সুস্পষ্ট, নিটোল ও দৃঢ়রেখা হয়। জীবন আর লিল্পের মধ্যে ব্যবধান বেশি হলে কারও কারও পক্ষে তা পীড়াদায়ক হয়। আবার কেউ কেউ সেই ফারাকটুকু থেকেই আমোদ সংগ্রহ করেন। অর্থাৎ একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্ভব। কেউ কেউ শিল্পকর্মের কাছ থেকে এক জাতের সহজ বিনোদন প্রত্যাশা করেন। অথচ সেই সহজ প্রত্যাশা থেকে বেশ কিছু দূরেই বহু আধুনিক শিল্পিত কর্মের অবস্থান।

একটু গভীরে যাওয়া যাক। ‘স্ট্রীম অফ কন্শাস্নেস’ বা ‘চেতনাপ্রবাহ’-নামক আঙ্গিকের মাধ্যমে উপন্যাসের মধ্যে রাজ্যির জিনিস ঢোকানো বিশ শতকেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর এই রাজ্যির জিনিস ঢোকানোর ব্যাপারে গদ্যলিখিয়েরা মূলতঃ অনুপ্রাণিত হয়েছেন এপিক অর্থাৎ মহাকাব্য বা দীর্ঘকাব্য দ্বারা। একবার ভাবুন, মহাভারতে কী না নেই। ইতিহাস, পৌরাণিক কল্পনা, রাজনীতি, ধর্মোপদেশ- সবই সেখানে আছে। হয়তো সংকট ঘনিয়ে আসছে, তবুও সমেয়ের স্রোতস্বিনীকে থামিয়ে দিয়ে কোনো মুনি হয়তো হাঁটু মড়ে ব’সে পড়লেন পূর্বজন্মের কাহিনী বলতে বা জ্ঞান বিলি করতে। অনেক ন্যারেটিভেই থেকে থেকে উজানে যাবার একটা প্রয়োজন থাকের বটে। সেই তাগিদ থেকেই সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাক টেকনিকটা তৈরি হয়েছে। আর নাটকের তেমনি একজন চিন্তাশীল নাট্যকার চান মধ্যে মধ্যে সময়ের স্্েরাতকে থামিয়ে দিয়ে অন্য এক ধরনের মুহূর্তমালাকে নির্মাণ করতে, যেখানে থাকবে পিছনে তাকানো, বা ভবিষ্যতের দিকে তাকানো, বা কাব্য, বা দার্শনিক অনুভব, বা প্রগাঢ় সোক্রাতিক সংলাপের মাধ্যমে জীবনের কিছু জরুরী প্রশ্নের অন্বেষণ। কিছু সমালোচক বা দর্শক এরকম সময়ে হয়তো ব’লে ওঠেন, ‘উফ্, আবার কাব্যি হচ্ছে,’ বা ‘আবার লেক্চার আরম্ভ হলো।’ যাঁরা এ ব্যাপারে অসহিষ্ণু, আব্দুর রউফের উপন্যাসটি তাঁদের মনপূত নাও হতে পারে। কেননা তিনি মাঝে মাঝেই গল্প বলা থামিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন, উজান বেয়ে অতীতে চ’লে যান, কিংবা ভাবনামূলক অংশের অবতারণা করেন, পাঠককে ভাবাতে চান, অর্থাৎ অসহিষ্ণু সমালোচকদের ভাষায়, ‘লেক্চার ঝেড়ে দেন’। তাঁর এই বৈশিষ্ট্যটি কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার মন কেড়েছে, কেননা আমি নিজে একটি উপন্যাস, নাটক বা দীর্ঘকবিতার নিছক গল্পের দিকটার চাইতে লেখকের চিন্তাভাবনার দিকটা সম্বন্ধেই অধিক আগ্রহ বোধ করি। আলোচ্য উপন্যাসে আব্দুর রউফ চিন্তার যে-জগৎটি নির্মাণ করেছেন, তা আমাদের মনোযোগ দাবী করে। তাঁর চিন্তাশীল লেখকসত্তাটি এই বইয়ে পরিস্ফুট।

ইতিহাস, সমাজ, স্বদেশ, বিদেশ, রাজনীতি, ধর্ম, স্ত্রীপুরুষের সম্পর্ক- নানা বিষয়েই তাঁর চিন্তার প্রতিফলন এই বইয়ে পাওয়া যায়, তবে তাঁর কোনো ডগমা নেই, কোনো একপেশে মনোভাব নেই। আমার মনে হয়েছে যে স্বভাষার সাধারণ পাঠককে শিক্ষিত ক’রে তোলার একটা তাগিদ তিনি গভীরভাবেই অনুভব করেছেন, তাদের চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। উপন্যাসকে তিনি নিছক বিনোদন হিসেবে দ্যাখেন না। শিক্ষাদানকে তার একটা অঙ্গ ব’লেই মনে করেন। এই অবস্থানের সঙ্গে আমার কোনো বিবাদ নেই, কারণ আমি সাহিত্যে বৌদ্ধিকতার সঞ্চারণ দেখতে ভালোবাসি। তবে সাহিত্যে শিক্ষাদানের স্থানটি কোথায় সেই প্রশ্নটি নিয়ে তর্ক হতেই পারে। কেউ কেউ এই ব্যাপারটি মোটেই বরদাস্ত করতে পারেন না। এঁদের মতে এতে রসভঙ্গ হয়। বলা যেতে পারে, আব্দুর রউফ যদি মূলধারার সাহিত্যনবিশির মাধ্যমে লেখালেখির জগতে আসতেন, তা হলে হয়তো তাঁর লেখার এই শিক্ষামূলক দিকটাকে আরেকটু তির্যক ভঙ্গিতে প্রকাশ করতেন, এবং হয়তো সে-পথে তাঁর উপন্যাসটি আরেকটু অন্যভাবে প্রকাশ লাভ করতো। কিন্তু সত্যি বলতে কি, আমি নিজে তো সাহিত্যের অনুশীলিত পথেই সাহিত্যরচনাতে এসেছি, তির্যক রীতিতে হাতে-খড়ি হয়নি এমন নয়, তৎসত্ত্বেও সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যে বৌদ্ধিকতার প্রকাশের জন্য আমাকেও মধ্যে মধ্যে কড়া সমালোচনা শুনতে হয়। এদিকে আব্দুর রউফ স্পষ্টতঃ একজন সংগ্রামী মানুষের জীবন যাপন করেছেন এবং স্বদেশে তথা এ দেশে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে গ’ড়ে-পিটে নিজেকে লেখকরূপে নিমার্ণ করেছেন। আমার মতে, তাঁর মতো একজন স্বনির্মিত কথাসাহিত্যিকের বেলায় এ ধরনের বাছবিচার পাশে সরিয়ে রাখা যেতে পারে; তাঁর উপন্যাসের বৌদ্ধিকতার চর্চা আর শিক্ষাদানের প্রচেষ্টাকে প্রশংসাই করতে হয়।

এ প্রসঙ্গে আমি আরেকটি কথা বলবো। আমি একটি চিন্তাবিনিময়চক্রের সভ্য, যার মধ্যে আছেন কয়েকজন বিজ্ঞানীও। তাঁদের মধ্যে একজন একাধারে মাইক্রোবায়লজির অধ্যাপক এবং সৃষ্টিশীল চিত্রশিল্পী। তিনি তাঁর সব ছবিতে কিছু একটা বলতে চেষ্টা করেন, কিছু একটা দেখাতে চেষ্টা করেন। ছবির পাশে পাশে ভাষ্য লিখে দেন। তিনি একটি উপন্যাসও লিখেছেন, এবং সেখানেও সংলাপের এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে জীবন সম্বন্ধে কিছু জরুরী বক্তব্য সরবরাহ করতে চেয়েছেন। আব্দুর রউফের মতো তিনিও তাঁর শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যটি গোপন করার চেষ্টা করেন নি। বলতে চাইছি যে, যাঁরা তথাকথিত পেশাদার শিল্পী নন, বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির জগৎ থেকে শিল্পের জগতে এসেছেন, শিল্পের মাধ্যমে শিক্ষাদানে বিশ্বাস করতে তাঁদের তেমন কোনো অসুবিধা হয় না, পেশাদার সাহিত্যসমালোচক বা সাহিত্যের অধ্যাপকদের চাইতে অনেক কম অসুবিধা হয়। তাঁরা বরং উল্টে প্রশ্ন করেন, জিনিসটা কেন টাবু হবে, এতে কেন রসভঙ্গ হবে, কেন এতে আমাদের অধিকার নেই? আমি ব্যক্তিগতভাবে এঁদের সঙ্গে চিন্তাবিনিময় করেছি ব’লেই আমার মনে হয়, আব্দুর রউফ এই দলে পড়েন।

‘পরদেশে পরবাসী’ বইটির অন্য যে-দিকটি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে সেটি তার ডকুমেন্টারি-দিক। আব্দুর রউফ ১৯৬২ সালের ১০ই জানুয়ারিতে বিলেতের মাটিতে পা দিয়েছিলেন, আর তাঁর গল্পের নায়কও ঐ তারিখেই লন্ডন পৌঁছচ্ছেন। আমি নিজে প্রথম বিলেত এসেছিলাম ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে। ষাটের দশকের প্রথম দিকে এই দেশটা কেমন ছিলো, সেটা আমার নিজের জানা ব’লেই এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমি একটা বিশেষ কৌতূহল অনুভব করেছি। সেই সময়কার বাস্তবতাকে আব্দুর রউফ চমৎকারভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন, এবং বইটি পড়তে পড়তে আমি অনেকবারই মনে মনে এই দেশের পুরোনো চেহারাটায় ফিরে গেছি। পুরোনো চেহারা বলতে যা বোঝাচ্ছি তার মধ্যে সামাজিক দিক আছে, প্রাকৃতিক দিকও আছে। সমাজ তো বদলাবেই, কিন্তু গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর দৌলতে প্রকৃতির রূপও যে একটু একটু ক’রে বদলে যাচ্ছে তা আমরা অনেক সময় ভুলে থাকি। এখানে উল্লেখ করতেই হয় বাষট্টি-তেষট্টি সালের শীতকালের কথা। অমন কঠিন শীত বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিলেতে আর কখনো পড়েনি। দিনের পর দিন দুনিয়ার ওরকম তুষারীভূত শ্বেতমূর্তি আমাদের সন্তানদের প্রজন্ম কখনো প্রত্যক্ষ করে নি। ইংল্যান্ড তো নয়, যেন রাশিয়া। আমরা যারা সেই শীতকালটা স্বচক্ষে দেখেছি তারা কোনোদিনই তার কথা ভুলতে পারবো না। আমার নিজের একটি কবিতাতেও তার পরিষ্কার স্বাক্ষর রয়েছে। আব্দুর রউফ ঐ একই শীতকালের একটি সুন্দর ছবি এঁকেছেন এই বইটিতে।

এই উপন্যাসে আব্দুর রউফ ষাটের দশকের বিলেতপ্রবাসী সিলেটীদের দৈনন্দিন জীবনের যে-ছবি এঁকেছেন, সামাজিক দলিল হিসেবে তার মূল অনস্বীকার্য। এই জীবনের সংগ্রাম, তার আশা-নিরাশা, ফেলে-আসা জীবনের জন্য স্মৃতিবিধুরতা, নানা সমস্যার মোকাবিলায় প্রতিকারের চেষ্টা- সবই খুঁটিনাটিসমেত ফুটে উঠেছে। জীবনের এই বৃত্তে রেষারেষি, ঈর্ষা, দলাদলি, রাজনীতি যেমন ছিলো, তেমন বিপদে-আপদে পরস্পরকে মদত দেওয়া এবং অতিথিবৎসলতাও ছিলো। ছিলো জীবিকার জন্য প্রবল আর্তি, দুর্দান্ত শীতের সঙ্গে লড়াই, পুরুষের জীবনে নারীর অভাব, গাদাগাদি ক’রে থাকা মেসের পরিবেশে ব্যক্তির জন্য প্রাইভেসির অভাব, সিলেটী বাড়িওয়ালাদের দাপট। এঁরা এক-একটা বাড়ি কিনে একসঙ্গে অনেকজন দেশী ভাইকে ভাড়া দিতেন, তাই তাঁরা খুব ক্ষমতাবান হতেন। ‘ল্যান্ডলর্ড’ শব্দের অপভ্রংশে এঁদের বলা হতো ‘লেঙলুট’। এই ব্যবস্থায় নবাগত সিলেটীরা একদিকে উপকৃত হতেন, আবার অন্যদিকে শোষিতও হতেন। প্রবাসী মানুষগুলি সব অসুবিধে পুষিয়ে নিতেন পরস্পরের প্রতি প্রীতিসিক্ত আতিথ্য দিয়ে। কেউ অনেক রাতে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে কারও বাড়িতে পৌঁছলেও উষ্ণ আপ্যায়ন পেতেন।

ষাটের দশকে আমি নিজে অবশ্য অক্সফোর্ডে ছাত্রীর জীবন যাপন করেছি। সেই জীবনে অন্য একটা ছাঁচ ছিলো। মূলতঃ পড়াশোনার জীবন, বলা যায় প্রিভিলেজের জীবন। ইংরেজ সহপাঠিনীদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ ছিলো; সেই সূত্রে ইংরেজ সমাজের সঙ্গে বিনিময়ের পথ প্রশস্ততর ছিলো। কিন্তু অক্সফোর্ডে টার্ম ছিলো মাত্র বছরে চব্বিশ সপ্তাহ। বাকি সময়ে দিশি ছেলেমেয়েরা যে-যার বাড়ি চ’লে যেতো, আর বিদেশীদের একাই থাকতে হতো। পরবর্তী কালের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর-সমেত তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান থেকে আগত কিছু মানুষ আমার বন্ধুসংগ্রহের মধ্যে ছিলেন। তাঁদের অতিথিবৎসলতার স্মৃতি আজও আমার মধ্যে অমলিন। আমার জন্য তাঁদের দরজা সব সময়েই খোলা থাকতো, এবং একবার ডিনার খেয়ে তাঁদের বাড়িতে পৌঁছলেও প্রায়ই তাঁদের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বসতে হতো কিছু-না-কিছু মুখে দেবার জন্য। রসিকতা ক’রে তাঁরা বলতেন, ‘পড়েছো যবনের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে।’ এইরকম একটি বন্ধুদম্পতি পূর্ব-অক্সফোর্ডে সিলেটী বাড়িওয়ালার কাছ থেকে ভাড়া-নেওয়া ছোট্ট বাড়িতে থাকতেন। সে-বাড়িতে বাথরুম ছিলো না, তাঁরা পাবলিক বাথে স্নান করতে যেতেন, আমাকে তার গল্প বলতেন। তাই আব্দুর রউফের উপন্যাসটিতে পাবলিক বাথে স্নান করার বিশদ বর্ণনা যখন পড়লাম, ঘটনাটা সহজেই ছুঁতে পারলাম। এ ছাড়া সে-আমলের অক্সফোর্ডে সিলেটীদের দ্বারা পরিচালিত রেস্তোরাঁও কয়েকটি ছিলো, এবং মশলা দেওয়া খাবারের জন্য যাদের প্রাণ আনচান করতো তাদের জন্য সেগুলি ছিলো যাকে বলে ‘লাইফ-লাইন’। স্বদেশীদের দ্বারা পরিচালিত রেস্তোরাঁ ছাড়াও সিলেটীরা কখনো কখনো অন্যদের দ্বারা পরিচালিত রেস্তোরাঁতেও কাজ করতেন। যেমন, একজন সিলেটীকে চিনতাম, যিনি ছিলেন একটি সিপ্রিয়ট-পরিচালিত রেস্তোরাঁর শেফ্। আমরা তাঁকে ‘মিয়াঁ সাহেব’ ব’লে ডাকতাম। আমাকে তিনি অশেষ খাতির করতেন, ব’লে দিতেন কোন্ পদটা টাটকা- সদ্য তৈরি করা হয়েছে, কোন্টা বা বাসি, এবং প্লেট উপচে খাবার পরিবেশন করতেন। আমার প্রথম উপন্যাস ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’-তে এই মিয়াঁ সাহেবের ভিত্তিতে রচিত একটি চরিত্রের ছোট্ট ক্যামিও-জাতের স্কেচ আছে। বলতে চাইছি যে ষাটের দশকে আমরা নিজের অবস্থান সিলেটী ভাগ্যান্বেষীদের থেকে দূরে হলেও একেবারে সুদূর ছিলো না। তাঁদের জীবনকে আমি ছুঁতে পারতাম, তাই আব্দুর রউফের উপন্যাসে ব্যবহৃত অনেক ডিটেলই আমার কাছে বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে সুপরিচিত, যা আমার এই বইটি পড়ার আনন্দকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ আনন্দ হচ্ছে চিনতে পারার আনন্দ। এমন কি, আব্দুর রউফ যখন লেখেন, ‘মেয়ে বাগানো মুসলমানের একটা বিশেষ গুণ,’ তখন মনে প’ড়ে যায় যে সেকালে এ ধরনের রসিকতাও আমার পূর্বপাকিস্তানী বন্ধুদের মুখে শুনেছি। এ ছাড়া বইয়ে সাদা-কালো বর্ণনির্বিশেষে পুনরাবৃত্ত চিন্তাহীন অবারিত ধূমপানের যে-বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তাকেও সে-যুগের বাস্তবতা ব’লে চিনতে পারি। তবে এই বইয়ের মাধ্যমে কিছু নতুন তথ্যও জেনেছি। যেসব পাঞ্জাবি ছেলেরা পথে ভাসমান দেহবিক্রয়কারিণীদের সঙ্গে সম্পর্ক পাতাতো তাদের ‘মৌআলু’ বলা হতো, পুলিশ কিছু বলতে এলেই ঐ মেয়েরা দাবী করতো যে তারা ঐ ছেলেগুলির সম্পূর্ণ বৈধ বান্ধবী, অসামাজিক ক্রিয়াকলাপ রুখতে না পেরে পুলিশ উত্ত্যক্ত বোধ করতো, এবং সেই বিরক্তির সূত্রেই ক্রমে ক্রমে ‘পাকি’-নামক গালাগালির উৎপত্তি- এই খবরটি আমার জানা ছিলো না। আমি প্রথম যখন এ দেশে এসেছি তখন এই গালিটি উদ্ভাবিত হয় নি। তার পর কোনো এক সময়ে দেখি এটা চালু হয়েছে। ‘পরদেশে পরবাসী’ বইটি এ ব্যাপারে আলোকপাত করে।

উল্লেখ করা দরকার, এই উপন্যাসে মানুষের যৌনতাকে ঘিরে যেসব সমস্যা তাদের উপরে একটা ঝোঁক পড়েছে। নারীবর্জিত প্রবাসী পুরুষের জীবনে যৌনতার ক্ষুধা একটা দাবিদার চেহারা নিয়েই আসে-সম্ভবত সেই কারণেই এই ঝোঁক। উপন্যাসের পরিবেশে ইংরেজদের সঙ্গে পরবাসী পুরুষদের সামাজিক মেলামেশা সীমাবদ্ধ, সমকক্ষ বন্ধুত্ব একটি বিরল ঘটনা। আদানপ্রদান ঘটে মুখ্যত দুটি চ্যানেলে-চাকরির সূত্রে এবং যৌনতার প্রয়োজনে। তবে যৌনতার তাগিদে বিনিময় আরম্ভ হলেও সহমর্মী বন্ধুত্ব যে গ’ড়ে উঠতেই পারে, তার একটা আবাস দেওয়া হয়েছে ফারনিন-নামক রহস্যময়ীর মাধ্যমে। এ ছাড়া আরও লক্ষণীয় যে কেন্দ্রীয় চরিত্র রূপ মিয়ার মধ্যে প্রাচীন আর নবীনের একটা সংমিশ্রণ আছে। নারীদের দেপ্রদর্শন বা পাঠানদের সমকামিতার প্রতি রূপ মিয়া কিছুটা বিরূপ, তা বুঝতে পারা যায়, আবার একইসঙ্গে মীনা-নামক মেয়েটির সন্তান যে খুব সম্ভব তার স্বামী মজিদের ঔরসে নয় তা বুঝেও রূপ মিয়া মীনার কোনো কড়া সমালোচনা করতে চায় না। মজিদের দেশে ফেরার ছ’মাস সতেরো দিন পরে মীনার সন্তান জন্মেছে। রূপ মিয়া ব্যাপারটি গুরুত্ব দেয় না। সে একাধারে বাস্তববাদী এবং আধুনিকমনস্ক। সে জানে যে এমন ক্ষেত্রে ক্ষেত্রজ সন্তানটি মেনে নেওয়ার মধ্যেই সকলের কল্যাণ নিহিত। প্রোষিতভর্তৃকা নারী মীনার মধ্যেও প্রত্যাশিত কারণেই যৌন ক্ষুধা এবং প্রীতিস্পর্শের জন্য তৃষ্ণা ছিলো, সম্ভবতঃ সেই দাবী মেটাতে গিয়েই সে সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েছে। কিন্তু রূপ মিয়া সেজন্যে তাকে কলঙ্কিনী বলতে নারাজ, তাকে দ- দিতে নারাজ। উ™£ান্ত মজিদকে সে উপদেশ দেয়, ‘বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে থাকো।’ রূপ মিয়ার মধ্যে যেহেতু উপন্যাসকারের আত্ম-অভিক্ষেপ অনেক, তাই আমরা অনুমান করতে পারি যে স্বয়ং আব্দুর রউফ এ ব্যাপারে প্রাজ্ঞ ছিলেন, এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রটির মধ্যে সেই প্রজ্ঞার ছায়া পড়েছে। পুরুষ তার প্রয়োজন মতো নারীসংসর্গ করবে, অথচ স্বামীসঙ্গবঞ্চিতা নারী দিনের পর দিন ব্রহ্মচর্য পালন করবে, এ জাতের কঠোর পিতৃতন্ত্রে তিনি বিশ্বাস করতেন না। বস্তুতঃ বোঝা যায় যে তিনি স্ত্রীপুরুষের সাম্যে আস্থাশীল ছিলেন। রূপ মিয়া এক জায়গায় পরিষ্কার বলে, ‘অবরোধ প্রথাই মুসলিম সমাজের পশ্চাৎপদতার প্রধান কারণ; নারী যে পুরুষের সমকক্ষ হতে পারে সর্বক্ষেত্রে- এ সত্যবোধ হরণ করেছে এ কুপ্রথা, যার কুফলে মুসলমান সমাজ আজ পঙ্গুত্বে পরিণত হয়ে সকল দ্বারের ভিখারি হয়েছে।’

আরও একটি ইশ্যুতে এই বইটির একটি বিশেষ মূল্য থাকা উচিত ব’লে মনে করি। সেটি হলো ভাষাসংক্রান্ত আত্ম-পরিচয়ের ইশ্যু। আব্দুর রউফ তাঁর কাহিনীর ন্যারেশনে সাহিত্যিক বাংলা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু সিলেটীদের মুখের ভাষাকে অবহেলা করেন নি। সংলাপে তার সুষ্ঠু ব্যবহার করেছেন। এই ব্যবহারের চূড়ন্ত পরিণতি ঘটেছে উপন্যাসের শেষে তসলিম আলির স্মৃতিচারণে। ভারী প্রাণবন্ত এই ভাষা। একটু উদাহরণ না দিয়ে থাকতে পারছি না। ‘আমগাছর তলাত জিরাইবার লাগি বইলাম। পরে আস্তে আস্তে খাড়ইলাম। বাইংগন গাছর কাটায় গুতা লাগল। আন্দাইরও বাইংগন গাছ দেখা যায় না। পাখির সাড়াশব্দ নাই। মন ডর। হুনছি পেশাবখানায় পেত্নী তাকে। পেত্নীর বদলা পরীও ত অইত পারে। মনে মনে কইলাম, ‘লক্ষ্মী যদি প্রাণে বাঁচায়’। আম পাতা চুয়াইয়া মেঘর জল ফোটা ফোটা অইয়া পরতে লাগল আমার মাথার উপরে। মাথাটারে গামছা দিয়া বানলাম। কয়েক মিনিটে গামছা ভিজ্জা কালা গেঞ্জিটা জুইব্বা চামড়াত গিয়া লাগল।’ … ইত্যাদি। এই মুখের ভাষার মাধ্যমে হঠাৎ ইল্যান্ডের মঞ্চে সিলেটের গ্রামাঞ্চল মূর্ত হয়ে ওঠে। সাহিত্যের ভাষা আর গ্রামীণ মানুষের কথ্য ভাষার এই মেলবন্ধনের মধ্যে আজকের দিনের বাঙালীর জন্যে কিছু বার্তা আছে। এই বইয়ে ব্যক্ত গ্রন্থকারের সব মতামতের সঙ্গে আমি একমত এমন কথা বলছি না,- কিছু ক্ষেত্রে তর্ক তোলাই যায়,- কিন্তু সব মিলিয়ে আমার মনে হয়েছে যে আব্দুর রঊফ সমন্বয়ের সাধনায় বিশ্বাসী ছিলেন। ইসলামী অনুষঙ্গে প্রয়োজনমতো আরবী-ফার্সী শব্দ তিনি অনায়াসে ব্যবহার করেন, আবার এইমাত্রই আমরা দেখলাম, রাতের অন্ধকারে পেত্নীর ভয়ে ভীত তাঁর চরিত্র তসলিম আলি অবলীলাক্রমে ব’লে ওঠে, ‘লক্ষ্মী যদি প্রাণে বাঁচায়’। দুই বাংলা মিলিয়ে এই মিশ্রতাই বাঙালী সংস্কৃতির প্রাণ।

এই ভাষা প্রসঙ্গে যোগ করি, পূর্ববঙ্গের ভাষা-আন্দোলনকে আমরা সঙ্গত কারণেই সম্মান জানাই, এ বইয়ে আব্দুর রউফও জানিয়েছে, কিন্তু বিশ শতকে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরাও যে বাংলার জন্য লড়েছেন সেই কথাটা আমরা যেন বিস্মৃত না হই। মাতৃভাষার জন্য প্রাণ হয়তো তাঁদের দিতে হয় নি, কারণ ভাষার প্রশ্নে সেরকম কোনো বলাৎকার তাঁদের উপরে করা হয় নি যার জন্য রক্ত ঝরাতে হবে, কিন্তু মাতৃভাষার গুরুত্ব বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রোত্তর সাহিত্যিকদের চেতনা খুবই প্রখর ছিলো। অভিবাসী জীবনেও যে বাংলার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা সম্ভব, আমার নিজের ধারণা তৈরি হলো কোত্থেকে? আমার প্রাপ্তবয়স্ক ধ্যানধারণার বনিয়াদ তৈরি হয় পঞ্চাশের দশকের কলকাতায়। মাতৃভাষায় লেখার প্রতি আমার নিজের যে-দায়বদ্ধতার বোধ, তা লালিত হয় ঐ পঞ্চাশের দশকের কলকাতাতেই। এ ব্যাপারে আমি ঋণী বুদ্ধদেব বসু, তাঁর ‘কবিতা’ পত্রিকা, এবং তাঁর প্রজন্মের সাহিত্যিকদের কাছে। সম্প্রতি বুদ্ধদেব বসুর কবিতা অনুবাদের সূত্রে আমি তাঁর একটি প্রবন্ধও অনুবাদ করেছি, যেটির শিরোনাম হচ্ছে ‘ভাষা, কবিতা ও মনুষ্যত্ব’। প্রবন্ধটি যখন ১৯৫৭ সালে ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রথম বেরোয় তখনই আমাদের আলোড়িত করে। এটি হচ্ছে তদানীন্তন সরকারি ভাষা-কমিশনের বিবৃতির বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার প্রতিবাদ। কেন্দ্র থেকে হিন্দী চাপিয়ে দেবার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্রতম প্রতিবাদ করেছেন তিনি, এবং সাহিত্যের বাহন হিসেবে মাতৃভাষাকে দিয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মান। অথচ মাতৃভাষার প্রতি আনুগত্য নিয়ে যখন কথা হয়, কই তাঁর নাম তো উচ্চারিত হতে শুনি না। প্রাথনা করি আগামী দিনে আমরা যেন দুই বাংলার মাতৃভাষাপ্রেমিকদেরই অকুণ্ঠচিত্তে শ্রদ্ধা জানাতে পারি।

দুই বাংলার বাঙালীর দল আজ পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছেন এক বিশাল ডায়াস্পোরায়, এবং এই বিকীর্ণ বাঙালীদের মধ্যে থেকে লেখকলেখিকারা বেরিয়ে আসছেন স্বাভাবিক নিয়মেই। ‘পরদেশে পরবাসী’ বইটি পড়তে পড়তে কয়েকবারই আমার মনে হয়েছে, আব্দুর রউফ যখন জীবিত ছিলেন তখন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হতে কত মজা হতো! কারণ যেখানে তিনি আর আমি দুজনেই বাংলা ডায়াস্পোরার সাহিত্যিক, সেখানে আমরা সহপথিক। এই নিরলস সহকর্মীর জন্য রইলো আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য।

 

 নতুন দিগন্ত সমগ্র সমগ্র

মাটির তিলক-রেখাকে আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম প্রাপ্তি বলে গণ্য করব…।  নাসিমের স্বগতোক্তি, প্রথম অধ্যায়: তৃতীয় খন্ন্ডে, নতুন দিগন্ত সমগ্র]

১.

কে এই আব্দুর রউফ চৌধুরী? ২০০৩ সালে যখন ‘পাঠক সমাবেশে’র বিজু শাহেব আমাকে পরদেশে পরবাসী: ইংল্যান্ডের দিনগুলি (পাঠক সমাবেশ সংস্করণ, ২০০৩) বই-এর প্রেসকপি হাতে দিলেন, তখন আমার মনে এই প্রশ্নই প্রথম জেগে উঠেছিল। বৃহত্তর সিলেটের দার্শনিক-সাহিত্যিক দেওয়া মোহাম্মদ আজরফ বা কথাশিল্পী অধ্যাপক শাহেদ আলীর সঙ্গে পরিচয় ছিল ভালভাবেই; কবি দিলওয়ার তো এখনো কবিতা লিখে চলেছেন, কিংবা গত বছরে (২০০৪) প্রয়াত কবি আফজাল চৌধুরী তো ছিল আমাদের সমসাময়িক বন্ধুই; বাংলা সাহিত্যে রম্যরচনার প্রবর্তয়িতা সৈয়দ মুজতবা আলী তো সর্বশিক্ষিতজনপরিচিত; সিলেটের তরুণ-প্রবীণ মৃত-জীবিত আরো অনেক লেখক-কবি-সমালোচক-গবেষক তো আছেনই; স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উল্লেখ করেছিলেন হাসন রাজা-র কথা। বাস্তবতা-আধ্যাত্মিকতার একটি পরুষে-পেলবে মিশেল ধারার সিলেটের লেখকদের সাহিত্যচর্চায় প্রবহমান। কিন্তু এতসব লেখকদের মধ্যে আব্দুর রউফ চৌধুরীর নাম পর্যন্ত অশ্রুত ছিল আমার। আব্দুর রউফ চৌধুরীর পরদেশে পরবাসী বই-এর ভিতরে যত প্রবেশ করতে লাগলাম, তত অনুভব করলাম আমি এক অজানা অভিজ্ঞতার শরিক ও স্নাতক হয়ে চলেছি। ভিতর থেকে ধ্বনিত হলো একটি স্বতঃস্ফূর্ত ‘বাহাবা’! পরিষ্কার বোঝা গেল: এঁর সঙ্গে ঠিক সিলেটের অন্যকোনো লেখকের সঙ্গেও সাযুজ্য নেই। আব্দুর রউফ চৌধুরী এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, এক ভিন্ন ঘরানা।

কারণ হয়তো আব্দুর রউফ চৌধুরীর (জন্ম ১৯২৯-মৃত্যু ১৯৯৬) সংগ্রাম-উন্মুখর বিচিত্র জীবনধারার সঙ্গে উপরি-উক্ত লেখকদের তো বটেই, বাংলাদেশের গড়পড়তা অন্য লেখকদের মিল নেই কোনো। আত্মজৈবনিক পরদেশে পরবাসী উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বিলেতের পটভূমিকায় লেখা সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের অনুরূপ উপন্যাসের কথা মনে পড়েছিল। তবে, এটাও ঠিক, সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের আব্দুর রউফ চৌধুরীর ব্যবধি আসমান-জমিন। আসল কথা: আব্দুর রউফ চৌধুরীর মূলধন তাঁর বিচিত্র ব্যাপক জীবনাভিজ্ঞতা, তাঁর জীবনবীক্ষাও স্বভাবত স্বতন্ত্র। মেধাবী ছাত্র ছিলেন; কিন্তু অর্থাভাবে আকাডেমিক লেখাপড়া ঠিকমতন সম্পন্ন করতে পারেননি। ছোট ব্যবসা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছেন; ছোট চাকরি করেছেন; তারপর স্কুলশিক্ষকতা; পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদান; বিমানবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর দেশে ফিরে বিলেতে যান- এবং সেখানে ছোটখাটো নানা কাজ করে শেষে স্থিত হন ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসে। সেখানেও দীর্ঘকাল চাকরি করার পর অবসর গ্রহণ করে দেশে ফেরেন। তাঁর শেষ জীবন অতিবাহিত হয় জন্মভূমি হবিগঞ্জে। আব্দুর রউফ চৌধুরীর এই সংগ্রামী-কিন্তু-শেষপর্যন্ত-সফল জীবনচিত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয়: এক. শতব্যস্ততার মধ্যেও লেখালেখির চর্চা তিনি অবিরলভাবে চালিয়ে গেছেন (মূলত গদ্য- কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধাদি); দুই. তাঁর স্বাধীনতার উন্মুখিতা, বিপ্লবী-বিদ্রোহীদের সহকারিতা (১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর অন্যতম সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন)।

কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ-উপন্যাস-শিশুসাহিত্য সবই লিখেছেন আব্দুর রউফ চৌধুরী; কিন্তু জীবন বিষয়ে সার্বিক কৌতূহল-সন্ধিৎসা-জিজ্ঞাসা তাঁকে মূলত-ঔপন্যাসিক করে তুলেছে। তাঁর পারিবারিক সূত্রে জেনেছি : জীবনের উপান্তে তিনি বিলেত থেকে ফিরে দেশে স্থিত হয়েছিলেন, হবিগঞ্জে, তখন আমাদের লোকপ্রিয় উপন্যাসধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন বটে বিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এখানেই আসলে প্রতিটি লেখকের নিঃশব্দ সংগোপন সাহিত্যসূত্র : পূর্বজ বা সমসাময়িক সাহিত্যধারায় তিনি সন্তোষ পান না বলেই কলম ধরেন। জীবনানন্দ দাশের কবিতার এই পঙক্তিটি সব লেখকের অন্তরের কথা : ‘আমার নিজের মুদ্রাদোষে আমি একা হতেছি আলাদা।’ তাঁর পারিবারিক সূত্রে জেনেছি : আব্দুর রউফ চৌধুরী ঠিক উপন্যাস লিখতে চাননি, তাঁর মনের (অভিজ্ঞতার, বাস্তবের, স্বপ্নকল্পনার) কথা জানাতে চেয়েছেন। আব্দুর রউফ চৌধুরী উপন্যাস লিখতে চান বা না-চান, তিনি – শেষ বিশ্লেষণে-উপন্যাসই লিখেছেন। পরদেশে পরবাসী-ও উপন্যাস, নতুন দিগন্ত-ও উপন্যাস। মনে হয় : নতুন দিগন্ত উপন্যাসটি লেখকের একটি উচ্চাশী উপন্যাস, বহুদিনের পরিকল্পিত : প্রথম খসড়া ১৯৬৮-৬৯ সালে, চূড়ান্ত রূপান্তরণ ১৯৯৪-৯৫ সালে; বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় খ-ের সঙ্গে তৃতীয় খ- যুক্ত হয়ে নতুন দিগন্ত সমগ্র শিরোনামে অখ- আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

ঠিক কোন্ সময়ের লেখক আব্দুর রউফ চৌধুরী? গ্রন্থাকারে তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ষাটের দশকে। চল্লিশের দশকে আমাদের গল্পে-উপন্যাসে যে-আধুনিকতা শুরু হয়, আব্দুর রউফ চৌধুরী তারই উত্তরসাধন। পঞ্চাশের দশকের কথাসাহিত্যিকদের – আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান, রাবেয়া খাতুন, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আহমদ মীন, হুমায়ুন কাদির, মুর্তজা বশীর প্রমুখ – সমসাময়িক হিসেবে তাঁকে বিচার করা যায়। তাঁর বাস্তবতার অনুধ্যানও খানিকটা মেলে আলাউদ্দিন আল আজাদ-জহির রায়হানদের সঙ্গে। যদিও আব্দুর রউফ চৌধুরীকে ঠিক এরকম কোনো প্রকোষ্ঠে ধারনো যাবে না। ঢাকায় তিনি অধিবাস করেননি;- এমনকি অভিবাসী হয়েও লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-৭১) বা শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-৯৭)-এর যে-যুক্ততা ছিল ঢাকার সঙ্গে, তা তাঁর ছিল না। জীবৎকালে তিনি দেশবিদেশের নানা জায়গায় থেকেছেন, কিন্তু মৃত্যুর পরেই যেন তাঁর প্রকৃত স্বরূপ আবিস্কৃত হচ্ছে।

 

২.

‘উপন্যাস কীসে উপন্যাস হয়ে ওঠে, তা কারও কাছেই সুস্পষ্ট নয়; এর কারণ হয়ত এই যে, কোনো সৃষ্টিকর্মই প্রথাকে অনুবর্তন করতে বাধ্য নয়। প্রত্যেকটি রচনাই অনন্য; তাই কোনো সংজ্ঞায় খুব বেশি দিন একে ধরে রাখা যায় না। নানা বৈচিত্র্যে মানবসৃষ্ট জগৎও ক্রমশই বিপুলায়তন হয়ে ওঠে; তাই আমার লেখা উপন্যাস হয়েছে কী-না, তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। আমি যা দেখেছি এবং অনুভব করেছি তার সঙ্গে আমার কল্পনাকে মিশিয়ে এই জগৎটি নির্মাণ করেছি।’ – নতুন দিগন্ত উপন্যাসের প্রবেশকে একথা লিখেছেন আব্দুর রউফ চৌধুরী। এক-হিসেবে কাহিনী-চরিত্র-ঘটনার বুনোটে তৈরি এই আখ্যানটি নিতান্তই প্রথানুগ, একটি স্পষ্ট আরম্ভ এবং একটি পরিষ্কার সমাপ্তি আছে এতে, আছে অন্তর্বর্তী কাহিনীর পরম্পরা, তাহলে উপন্যাসের ভূমিকায় একথা লিখতে গেলেন কেন আব্দুর রউফ চৌধুরী : ‘[…] কোনো সৃষ্টিকর্মই প্রথাকে অনুবর্তন করতে বাধ্য নয়।’ অতি সত্য কথা। কিন্তু তখনই আমাদের খুঁজতে হয় প্রথাভঙ্গ কোথায় ঘটেছে এ উপন্যাসে।

প্রশ্ন ওঠে : নতুন দিগন্ত উপন্যাসটি কি রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক? জবাবটিও আপনা থেকেই চলে আসে : নতুন দিগন্ত ততটাই রাজনৈতিক/ ঐতিহাসিক উপন্যাস, যতখানি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাজসিংহ উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শত শত উপন্যাস রচিত হয়েছে বাংলাদেশে, আব্দুর রউফ চৌধুরীর নতুন দিগন্ত উপন্যাসও এক-হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ভাবনা-আদর্শকে একটি সারাৎসারে রূপান্তরিত করা হয়েছে এখানে, প্রায় একটি প্রতীকে, বাস্তবতার একটি ভিন্ন আয়তনে। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক গড়পড়তা বাংলা উপন্যাসের সঙ্গে এর পাথৃক্য এখানে, যে, একে স্থাপন করা হয়েছে বাংলাদেশের কোথাও নয় – করাচিতে, যে-মহানগর ছিল পাকিস্তানেরই  একসময়কার রাজধানী, উত্তরকালে পশ্চিম-পাকিস্তান তথা পাকিস্তানের একটি প্রধান নগর, যেখানে অনেক বাঙালির সঙ্গে আমাদের লেখকও অবস্থান করেছেন বেশ কিছুকাল। (আমাদের খ্যাতিমান কথাশিল্পীদের মধ্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও আবু ইসহাক ছিলেন এই নগরে। তারও অনেক আগে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম – তাঁর প্রথম সাহিত্যচর্চার স্থানই ছিল করাচি।) খুব কাছ থেকেই আব্দুর রউফ চৌধুরী লক্ষ্য করেছেন সেখানকার মানুষের বাঙালি-বিদ্বেষ, পূর্ব-পাকিস্তান-ঘৃণা। (আবু ইসহাক বা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর রচনায় এরকম কোনো প্রকাশ নেই।) এই পটভূমিকায় আমাদের লেখক নিয়ে এসেছেন মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত আগের কয়েকটি বছরের উত্তাপ ও জটিলতা ও সূচিমুখ একাগ্রতা। রাজনীতির দাবাখেলার এক সর্বোচ্চ চরিত্র-জুলফি আলি ভুট্টো, যার নাম দিয়েছেন তিনি (কোথাও বলেননি তিনিই স্বনামধন্য-বা-ঘৃণ্য জুলফিকার আলি ভুট্টো); তার বিপ্রতীপে করাচির সর্বহারা দল ‘ওয়ার্কার্স ফ্রেন্ডস ক্লাব’-এর সাধারণ একজন মানুষ নাসিম – যে ক্রমশ হয়ে ওঠে এই উপন্যাসের কেন্দ্রনায়ক।

‘শরৎকাল। কী বিচিত্র শোভা! রোববার। বৈকালিক সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে।’ – উপন্যাসের শুরু হয়েছে এরকম একটি শান্ততায় আনন্দে আলস্যে। তুলনায় এই দীর্ঘ উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদের ঘটনাবলি অতিদ্রুত, নাটকীয়। যেন আলসে-বিলাসে নির্মিত এই নির্মিত এই উপন্যাসটি ফল প্রসব করছে অন্তিমে গিয়ে- একটি রক্তিম ফল। যেন শোষিত পূর্ব-পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের যাতনা নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামোত্তর বিজয়ের প্রতীকের মতন। পুরো উপন্যাসটিতে ঘটনার ঘনঘটা নেই, আছে নিবিড় বর্ণনা, জীয়ন্ত কথোপকথন। চরিত্রপাত্রের মধ্যে যে খুব অন্তঃপরিবর্তন ঘটেছে (যেমন ঘটে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে) তেমন নয়, বরং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতন এ যেন অনেকখানি বহিরঙ্গে বিন্যস্ত। কিন্তু এই বহিরঙ্গ জগৎটি একরঙা নয়-বহুবর্ণিল। এর মধ্যে ব্যক্তির আশা-ক্ষুধা-রাজনীতি-হিংসা-প্রেম-অপ্রেম-যৌনতা সমস্তই মিলমিশ করে আছে। উঁচুতলার ভুট্টো প্রমুখের আর নিচুতলার নাসিম প্রমুখের জীবনযাপনের ধারা চলতে চলতে একসময় একটি চূড়ান্ত ক্রান্তিরেখায় এসে মিলেছে-বইরের উপান্তে। গ্রন্থের প্রারম্ভিক দুটি অধ্যায়ই নির্দেশ দিচ্ছে লেখকের অভীপ্সার ও প্যাটার্নের।

প্রথম অধ্যায়। স্থান : আল মুরতুজা ভবন (ভুট্টোর প্রাসাদ)। চরিত্রপাত্র : ভুট্টো + আন্নী (পরিচারিকা) + নূর মোহাম্মদ (পরিচারক) + বেনফরত (ভুট্টোর তৃতীয় স্ত্রী, ইরানি) + আবদুল্লাহ খুরো (উপ-মন্ত্রী)। এই প্রথম অধ্যায়েই মিশেছে রাজনৈতিক সংলাপের সঙ্গে মদ্যপান আর যৌনতার আবেগ-আবেশ। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ভুট্টোর দু-একটি উক্তি উদ্ধৃত করা যেতে পারে : ‘শেখ মুজিবের উদ্দেশ্য সৎ নয় – তা সত্য; এতদিনে এ-সত্য কথাটি আপনাদের বোধোদয় হল বুছি? কিংবা ‘আমি ভেবে সত্যি আশ্চর্য হই, আপনারা – প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাগণ কী করে পাকিস্তানের জন্মশত্রুর সঙ্গে হাত মিলাতে উদ্যত হতে পারেন?’ অথবা আইয়ুব খুরোর উক্তি : ‘পশ্চিম-পাকিস্তানের প্রাধান্য রক্ষা করার জন্র আমরা করতে না-পারি এমন কোনো কাজ নেই। শয়তানের সাহায্যে, বেশ্যার সাহচর্যে যদি পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষা হয় তবে তাতেও আমরা পিছু-পা হব না।’ ভুট্টো সম্পর্কে লেখক তাঁর মনোভাব গুপ্ত রাখেননি। মদ্যপ ভুট্টোর টানে যখন ভুট্টোর স্ত্রীর সামনেই শরীরিণী পরিচারিকা তার কোলে এসে পড়ে, তখন ভুট্টো সম্পর্কে লেখকের মন্তব্য : ‘তেলাপোকা যা পারে ভুট্টো যেন তা করতে সক্ষম।’ কিংবা ‘এরকম ব্যবহার করা পর-নারীর সঙ্গে ভুট্টোর দোষ নয়, দোষ তার রক্তের।’ অথবা ভুট্টো-সংপৃক্ত মানুষজন সম্পর্কে লেখকের ধারণা-ভাবনা মোটেই সশ্রদ্ধ নয়। মদ্যপানরত ভুট্টোর স্ত্রী বেনফরত আর আইয়ুব খুরো সম্পর্কে : ‘… ক্ষণিকের মধ্যে উভয়ে এমন এক রাজ্যে চলে গেল যেখানে সামাজিক নীতিবোধের কোনো আর বালাই রইল না।’ তবে এই সবই পরিপ্রেক্ষিত মাত্র। কেন্দ্রীয় বিষয় অন্যত্র। যেমন, ভুট্টোর উক্তি : ‘কাশ্মির গতকালের কলঙ্ক, আগামীদিনের প্রশ্ন; কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তান আজকের সমস্যা।’ এই সমস্যা সমাধানের আতীব্র ইঙ্গিতেই নতুন দিগন্ত উপন্যাস সমাপ্ত হয়েছে। রাজনীতি-ভাবনার অন্য প্যাঁচও আছে : ‘ইন্ডিয়ার সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হলে শেখ মুজিবের আশা-আকাক্সক্ষা ধূলিসাৎ করা যাবে; আর এই কঠিন কাজ তার জন্য বিরাট এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দেবে। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী এবং তারপর …।’ সংলাপের বিরামচিহ্ন লেখকেরই-আমাদের নয়। অবশ্য এটা কার্যকরী হয়নি, বা কার্যকরী করা যায়নি, হলে ইতিহাস হতো অন্যরকম। রউফ চৌধুরীর উপন্যাসে ভুট্টো চরিত্রের মধ্য দিয়ে বোঝা যায় : রাজনীতিতে ব্যক্তিস্বার্থ কতখানি শ্লিষ্ট থাকে। ভুট্টোর এবং অন্যদের ব্যক্তিজীবনের অনুপুঙ্খও গাঢ় রঙে খচিত হয়ে আছে এই উপন্যাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়। ভুট্টো-কন্যা নাসিমার সঙ্গে ভারতের নবনিযুক্ত মন্ত্রী নবাবজাদা খুরশেদ আহমেদ পাতৌদির সম্পর্ক তৈরির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিজীবন-আর-রাজনীতিজীবনের কাটাকুটি-খেলা গভীরভাবেই অঙ্কিত করেছেন লেখক। খানিকটা-বাস্তব-অনেকখানি-কল্পিত উপন্যাসের এই প্রথম পরিচ্ছেদেই অন্তত বাস্তবতার একটি প্রতিভাস রচনা করতে সমর্থ হন লেখক।

দ্বিতীয় অধ্যায়। স্থান : করাচি অভিমুখী রেলগাড়ির তৃতীয় শ্রেণীর কামরা। পরে করাচির ম্রিয়মাণ শেরশাহ কলোনির একটি ছোট খুপরি ঘর। পাত্র-পাত্রী : নাসিম + সেপাই + ফারুক + যতীন + মতিন + পারভেজ। ট্রেনের থার্ড ক্লাস কামরার তেমনই বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন লেখক, যেমন দিয়েছেন তিনি ভুট্টোর বাসভবন ‘আল-মরতুজা’র। যেমন : ‘ধীরস্থির শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে নাসিম দেখতে লাগল সেপাই দুটি উঠে বসে অজায়গায়-কুজায়গায় দৃকপাত করে বিস্তর গোল করছে। সামনের স্টেশনে নামবে বোধ হয়। কৃষক-বউয়ের উপর অল্পবয়সের সেপাইয়ের নজর পড়তেই তার জিব লকলক করে ওঠে; চুচুক-চুষে জিবের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য। তার দৃষ্টিতে যেন ডাকিনী-যোগিনীরা নেচে বেড়াচ্ছে। রূপসীর নরম-কোমল রক্তমাংস চিবিয়ে খাওয়ার উদ্দেশ্যে মুখের পেটানো পেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠেছে।’ সেপাই দুটির প্রতি লেখকের যে-বিতৃষ্ণা তা অবাঙালি বলে নয় – কৃষক বউটিও তো বাঙালি। কৃষক বউ-এর প্রতি লেখকের যে অগুপ্ত দরদ তা আছে ভুট্টোর পরিচারিকা আন্নীর প্রতিও। কেবল আন্নীর বিষয়ে লেখক বলেই নিয়েছেন যুগ-যুগান্তরের সংস্কার, যে, প্রভুর মনোরঞ্জন করতে হবে, সিন্ধু অঞ্চলের নিয়ম যে নববধূকে জমিদারের সঙ্গে রাত্রিবাস করতে হবে – আন্নী তারই তাঁবে চলে। অন্যত্র আমরা দেখি : নারীর প্রতি লেখকের সমানুভূতি (যদিও এই উপন্যাসে কোনো নারীচরিত্র প্রধান হয়ে ওঠেনি)। আসলে লেখক দেখাতে চাচ্ছেন দুটি শ্রেণী – উপরমহলের মানুষজন একদিকে, আরেকদিকে নিচুতলার মানুষ। করাচি স্টেশনে নাসিমকে নিতে এসেছে ফারুক, যতীন ও মতিন। খুঁটিনাটির দিকে লেখকের তীক্ষè নজর বলেই যতীন চক্রবর্তী ও মতিনের শারীরিক বিবরণও দিয়েছেন : ‘যতীন যে সম্ভান্ত ঘরের মানুষ তা এক নজরেই বোঝা যায়। বয়স চল্লিশের কম নয়। নাসিমের চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড় হবে। চুলে পাক ধরেনি বলে বয়স একটু কমই দেখাচ্ছে। মতিন অবশ্য যতীনের অনেক ছোট। চুলে কদম ছাঁট। ছোট করে ছাঁটা দাড়ি, যা বয়সকে একটু বাড়িয়ে দিয়েছে। গোলগাল চেহারা। গায়ের রঙ শ্যামলা। শক্তসমর্থ পুরুষ।’ এরকম পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা সারা উপন্যাসটিকেই বাস্তবতা নির্মাণে সহায়তা দিয়েছে। লক্ষণীয় : দুই এলাকাতেই লেখকের সাবলীল বিহার। ‘আল-মরতুজা’ ভবনের ধনী অধিবাসীবৃন্দ (আন্নী এবং নূর মোহাম্মদের মতন পরিচারিকা-পরিচারকরাও) এবং ‘ওয়ার্কার্স ফ্রেন্ডস ক্লাব’-এর সদস্যেরা – লেখক দু-জায়গারই এবং দু-জায়গার মানুষ-মানুষীকে রূপায়িত করেছেন সমান উৎসাহে। দীর্ঘায়তন এই উপন্যাসের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি যে উপন্যাসের প্রথম থেকেই ছিল লেখকের, এই দুটি পরিচ্ছেদ থেকেই তা প্রমাণিত। দুটি পরিচ্ছেদেই আমরা দেখতে পাই একটি প্রসারণ – বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছেন অতীত, এবং সব-মিলিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তর্জনী নির্দেশ। পাঠ থেকে, স্মৃতি থেকে, সংলাপ থেকে, টেলিগ্রাম থেকে লেখক বারবার চলে যাচ্ছেন অতীতে ও বর্তমানের বিশ্লেষণে, সব-মিলিয়ে বৃহৎ একটি পটভূমি নির্মাণে। প্রথম পরিচ্ছেদে যেমন, তেমনি দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রাজনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়ে লেকক তার অভীপ্সিত গন্তব্যের দিকে চলেছেন। কিন্তু লেখকের কোনো দ্রুততা নেই, চারপাশের ছবি আঁকতে আঁকতে এগিয়ে চলেছেন তিনি। এই উপন্যাস যে প্রায় তিরিশ বছর ব্যাপী প্রচেষ্টার ফল তা লুকানো থাকে না। লেখকের লক্ষ্য যে স্থির তা এরকম তুচ্ছ বিষয়ের বর্ণনার মধ্যেও প্রতিফলিত : ‘গোসলের পানি হয়ত ভালো ছিল না। পাইপ দিয়ে কোত্থেকে পানি আসছে কে জানে; নর্দমার নয়ত! মানুষ ত তা-ই খেয়ে বেঁচে আছে, বাচ্চা বাড়াচ্ছে, গিজগিজ করছে – উদ্বাস্তুদের জন্য এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা কী করতে পারে সরকার? যে-সরকার নিজের জন্য এজিদ রাজত্ব কায়েমে ব্যস্ত ও শঙ্কিত।’

তৃতীয় পরিচ্ছেদে অনেকগুলো বিষয় পরস্পরযুক্ত হয়ে একটি জটিল গ্রন্থি তৈরি করেছে।

ক. ভুট্টো + বেনফরত + মালা + নাসিমা + আফরোজা।

খ. [মুম্বাই] নাহিদা (ভুট্টোর দ্বিতীয় স্ত্রী, বাঙালি) + নূর মোহাম্মদ + মখসুদ + সালেহা।

গ. সুরাইয়া (আবদুল্লাহ খুরোর স্ত্রী) + ভুট্টো।

ঘ. নাসিম।

ঙ. ভুট্টো + নূর মোহাম্মদ-প্রভৃতি।

পঞ্চম পরিচ্ছেদের পুরাটাই নাসিম-কেন্দ্রিক। নাসিমের একটি সংলাপে পুরো উপন্যাসের মূল সুর-যা লেখকের আকাক্সিক্ষত-আভাসিত হয়ে উঠেছে : ‘প্রথমে দেশ ও জাতির সাধারণ সমাজ, বিশেষ করে যুবশক্তিকে বিভ্রান্ত ও বিপদগামীর পথ থেকে উদ্ধার করতে হবে। রক্ষা করতে হবে। তাদের রক্ষা করতে হলে অসুন্দর, অস্যেতের বিরুদ্থে সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে। তাদের শিক্ষা দিতে হবে আত্মদান, সাহসিকতা, ভয়শূন্য মৃত্যুর। এরকম সশস্ত্র বিপ্লবই আমাদের পরিবর্তন আনতে সাহায্য করবে। তা-ই আমাদের কাম্য।’ – ‘[…] সশস্ত্র বিপ্লবই আমাদের পরিবর্তন আনতে সাহায্য করবে।’ – নাসিমের এই উচ্চারণই ‘ওয়ার্কার্স ফ্রেন্ডস ক্লাব’ বা ‘শ্রমিক বন্ধু ক্লাব’-এর মূল উদ্দেশ্য।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে [১:৬] নাসিম যে রিভলবার জোগাড় করেও ব্যর্থ হলো, তা তার ব্যক্তিগত দুর্বলতার জন্যে-নাহিদার মায়াবী মুখশ্রীর জন্যে। বিপ্লবীর জন্যে ব্যক্তিগত সবরকম দুর্বলতা পরিত্যাজ্য-প্রথম খন্ডে নাসিমের ব্যর্থতা যেন এটাই শিক্ষা দিয়ে যায়।

‘কাহিনীর গুণ বস্তুত একটিই : এর পর কী ঘটবে সে বিষয়ে শ্রোতাকে উৎকণ্ঠিত করে রাখা।’ (অংঢ়বপঃং ড়ভ ঃযব ঘড়াবষ : ঊ. গ. ঋড়ৎংঃবৎ/ অনুবাদ : সুব্রত বড়–য়া) নতুন দিগন্ত উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই কাহিনী ছুটে চলেছে, অনেক পারস্পরিকতা ভেদ করে অনেক সময় এবং আখ্যান আমাদের কৌতূহল জাগ্রত করে রাখছে, সম্মুখযাত্রিক করে রাখছে, উৎকণ্ঠিত করে রাখছে। প্রধানত করাচিতে বিভিন্ন পরিবেশের পটভূমিকায় স্থাপিত হয়ে কাহিনী একটি লক্ষ্যে অগ্রসর হয়ে চলেছে। প্রথম খন্ড থেকে দ্বিতীয় খন্ড, দ্বিতীয় খন্ড থেকে তৃতীয় খন্ডে অনন্যলক্ষ্য হয়ে চলেছে আখ্যান। কাহিনীর এই টান ঔপন্যাসিকের একটি আবশ্যিক গুণ। আব্দুর রউফ চৌধুরীর অর্জনে আছে ঐ শক্তি।

তবে উপন্যাস তো শুধু কাহিনীর সংগ্রন্থন নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু- কাহিনীর ফ্রেম উপচে পড়াতেই তার অন্তিম সাফল্য। উপন্যাস কাহিনীকে ছাড়িয়ে কোনো তাৎপর্য কি অšে¦ষণ করবে না? করবেই তো।  নতুন দিগন্ত উপন্যাসেও সেই সন্ধান আছে। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন একবার, ‘শুনেছি বাংলা উপন্যাসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক প্রাকচল্লিশ ডেলি প্যাসেঞ্জার আর উত্তরচল্লিশ পৌরস্ত্রী।’ অর্থাৎ সাধারণ মানুষ কাহিনীসর্বস্ত আখ্যানের উপভোক্তা। আব্দুর রউফ চৌধুরী এই কাহিনীমুখ্য উপন্যাসের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর একটি বক্তব্য ছিল। সে-বক্তব্য তিনি প্রবন্ধ লিখে পেশ করতে পারতেন, অর্থাৎ সরাসরি। কিন্তা তা তিনি একটি উপন্যাসের মাধ্যমে তুলে ধরলেন। সজীব সবীজ একটি কাহিনীর মাধ্যমে। উপন্যাসের শিল্পরূপে চরিত্র-ঘটনা-পটভূমির যে বাস্তবতা-গ্রহণযোগ্যতা তা কি যথাযথ হয়েছে নতুন দিগন্ত উপন্যাসে? বিষয়টি আমরা একটু তলিয়ে দেখতে চাই। -(ক) পটভূমি হিসেবে নতুন দিগন্ত উপন্যাসে এসেছে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের একটি শহর। সেখানকার উপরতলার মানুষের জীবনযাপনের ছবি তো বিশ্বাস্যই মনে হয়। আবার যখন বিপ্লবীদের দেখি, তারাও মনে হয় গ্রহণযোগ্য। (খ) চরিত্রগুলোকে লেখকের ইচ্ছার ক্রীড়নক মনে হয় না- তাদের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষার সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের সুখদুঃখ আনন্দবেদনা গভীর মিশেছে। এজন্যই ভুট্টো বা নাসিমকে কলের পুতুল মনে হয় না, রক্তমাংসের মানুষ বলেই মনে হয়। লেখক অনেক মানুষকে নিয়ে এসে উপন্যাসের একটি ব্যাপ্তি দান করেছেন, – এবং যেমন বিষয় বা ঘটনার খুঁটিনাটির বর্ণনা করেছেন তেমনি উপেক্ষা করেননি কাউকে। ভুট্টোকে যে-গুরুত্ব দিয়েছেন, সেই গুরুত্বই দিয়েছেন তার পরিচারিকা আন্নী বা পরিচারক নূর মোহাম্মদকে। এই সমদৃষ্টি সার্বত্রিকদৃষ্টি একজন ঔপন্যাসিকেরই চারিত্রলক্ষণ। (গ) উপন্যাসের প্রথম খন্ডের প্রথম অধ্যায় ও দ্বিতীয় অধ্যায় আপাত-অলগ্ন, কিন্তু তৃতীয় অধ্যায়েই দেখতে পাই তাদের পরস্পরসংপৃক্ততা, তাদের বিজড়িমা। ঘটনার পর ঘটনা ঘটেছে উপন্যাসে। প্রথম অধ্যায়ে ভুট্টোর বাসভবনের অলস-বিলাসী আবহ থেকে দ্বিতীয় অধ্যায়ে ট্রেনে নাসিমের করাচি শহরে আগমণ- সমস্তই যেন একসূত্রে গ্রথিত-পরিকল্পিত, তা ক্রমশ উদঘাটিত হতে থাকে। কিন্তু ঐ উদঘাটন দার্শনিক, প্রাবন্ধিক বা কবির মতন নয়- সমস্তকে ছুঁয়ে ছেনে চুম্বন করে আলিঙ্গন করে এগিয়েছে ক্রমাগত।

দ্বিতীয় খন্ডের অনেকখানি জুড়ে আছে কলকাতায় নাহিদার সঙ্গে নাসিমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের স্মৃতিচিত্র [২:১, ২:২]। কিন্তু শেষপর্যন্ত নাসিমের সিদ্ধান্ত : ‘না, নাসিমের জীবন-সিন্ধুতরঙ্গে নাহিদার হৃদয়স্পন্দন শোনার সময় নেই। সে মনকে দৃঢ় করার চেষ্টা করল; সর্বশক্তি একত্রিত করে, নতুন প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হয়ে। আমার জীবনক্রম কোনো অবস্থায়ই ব্যর্থ হতে দিতে পারি না। একটি নারীর জন্য। ব্যষ্টির চেয়ে সমষ্টি বড়। তেমনি সমষ্টির চেয়ে স্বদেশ বড়। জাতীয়তাবোধ যার জন্মায়নি সে আন্তর্জাতিক বা বিশ্বায়নের মর্ম বুঝবে কী করে?’ কলকাতা ও পার্বত্য ত্রিপুরায় নাসিম থেকেছে দীর্ঘকাল, কলকাতাতেই বস্তুত তার বিপ্লবের শিক্ষা-আত্মগোপন করেছিল ত্রিপুরায়। দ্বিতীয় খন্ডে অনেকখানি জুড়ে আছে নাসিম ও নাহিদার পূর্ব-প্রণয়কাহিনী- নাহিদার গর্ভজাত কন্যাকে সে যে ‘নাসিমা’ নাম দিয়েছে, সেও নাসিমের স্মৃতিরণনে : ‘নাসিমা শব্দটি নাসিমের অন্তরের অজন্তাদ্বার উন্মোচন করে দিল। তাহলে তো আমার সম্মানার্থে, আমাকে অমর করার জন্য মেয়ের নাম রেখেছে না-সি-ম-আ। যতজনে যতবার মেয়েকে নাসিমা বলে ডাকে, ততবার পান করছে আমারই স্মৃতিসুধা।’ [২:৪] ক্রমশ নাসিম বোঝে আসলে নাসিমা তারই ঔরসজাত। নাসিমের দু-একটি উক্তি থেকে তার চরিত্র বোঝা যাবে : ‘[…] মুক্ত-স্বাধীন দেশ তৈরি করার জন্য আমি সর্বস্ব ত্যাগ করেছি। মুক্তির পথ সন্ধান করাই আমার সর্বস্ব।’ [২:৫] ‘আমরাও গরীব সাধারণকে রক্ষা করার জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছি মাত্র; কারণ- ধনীরা নানান কারসাজিতে তাদের সম্পত্তি হরণ করছে- এ-সত্য প্রতিষ্ঠিত করাই হচ্ছে অমাদের কাজ।’ [২:৫]

প্রথম খন্ডের মতন দ্বিতীয় খন্ডও শেষ হচ্ছে নাটকীয় ব্যর্থতায়। নাসিমের বিস্ফোরক-ভরা বোতল হাতে ধরে ফ্যালে ভুট্টো। তা না-হলে ভুট্টো, খলকু খান, পাতৌদি (যাকে হত্যা করাই ছিল নাসিমের উদ্দেশ্য) নিহত হতে পারত। তৃতীয় খন্ড শুরু হয়েছে তাই নাসিমের নতুন পরিকল্পনায়। এই তৃতীয় খন্ডের প্রথম অধ্যায়ই বস্তুত নাসিমের সমগ্র চিন্তা ও প্রতিজ্ঞার সারাৎসার সংকলিত হয়েছে একটি অনুচ্ছেদে : ‘নাসিম মৃত্তিকার সঙ্গে মিশে অনন্ত গগনে, অশ্রান্ত চরণে সর্বম-ল প্রদক্ষিণ করতে চায়; কারণ- বাংলার মাটির কোলে জন্মগ্রহণ করেও বা জীবনের বড় একটি অংশ কাটিয়েও তার আত্মা তৃপ্তি পায়নি। মৃত্তিকার স্তন-রস-পিপাসা তার মুখে এখনো যেন লেগে আছে। মৃত্তিকাবক্ষের বিচিত্র ছবি তার চোখে জাগিয়ে তুলল ‘নতুন দিগন্ত’। যুগ যুগান্তরের মহা-মৃত্তিকাবন্ধন তার পক্ষে কিছুতেই বিস্মৃত হওয়া সম্ভব নয়; তাই তো ফিরে এসেছে মাটিতে পরম তৃপ্তি লাভ করতে, এই মাটিই তো তার অন্তরে জাগিয়ে দিচ্ছে বাংলার মুক্তি-জাগরণের বাণী। নাসিম মনে মনে বলল, সাইকেল প্রয়োজন হলে বিছানার পাশেই রাখব। শেষ হয়ে যায় যদি আমার প্রাণ, তবুও কেউ আটকাতে পারবে না। মাটির তিলক রেখাকে আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম প্রাপ্তি বলে গণ্য করব, এবং মাটির খুব কাছাকাছি থাকার বাসনায় তৃতীয়বারের মত বাসা বাঁধব এখানেই।’ এই অনুচ্ছেদের লেখক-চিহ্নিত অংশ থেকেই উপন্যাসের নামকরণ করেছেন ঔপন্যাসিক। নিম্নরেখ বাক্যাংশটিতে লেখকের অভিরুচি ও অভিপ্রায় পরিব্যক্ত হয়েছে।

 

৩.

কথাশিল্পী উইলিয়াম ফকনর-এর বিবেচনায় ঔপন্যাসিক ‘ডিজাইন’ নির্মাণ করেন উপন্যাস রচনার আগেই। আব্দুর রউফ চৌধুরীর নতুন দিগন্ত উপন্যাসে ঐ নকশারূপেরই সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তিনটি খন্ডে বিভক্ত উপন্যাসে অনেক চরিত্রের মধ্যে নায়ক চরিত্র নাসিম তার মূল লক্ষ্য খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাকে কেন্দ্র করে যে-আখ্যান মঞ্জরিত হয়ে উঠেছে, সেখানে জুলফি আলি ভুট্টো একটি প্রধান চরিত্র। আপাত-প্রতিনায়ক নাসিমই এখানে নায়ক হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ কাহিনীর মধ্যে একটি জাতির জাগরণের পরোক্ষ ইতিহাস মুদ্রিত হয়েছে, কিন্তু তারই সঙ্গে আছে ব্যক্তির অন্তর্গত অজস্র টানাপোড়েন। ভুট্টোর ব্যভিচার পরিষ্কার রূপায়িত যেমন, তেমনি দ্বিতীয় খন্ডের অনেকখানি ব্যয়িত হচ্ছে ভুট্টোর দ্বিতীয় স্ত্রী নাহিদার সঙ্গে নাসিমের সম্পর্কের বর্তমান ও অতীত চারণায়। ভুট্টো ও নাসিম, দুজনেরই রাজনৈতিক জীবনকে-যে ব্যক্তিজীবন অনেকখানি প্রভাবিত করেছে, এ দেখিয়েছেন লেখক। প্রকৃতই রাজনীতি বা আদর্শ ব্যক্তি-বা-জীবন-বহির্ভূত কোনো বিষয় নয়। ফলে চলেছে অনেক কূট জটিলতার বুনন। তারই মধ্যে দু-দুবার ব্যর্থ হওয়ার পরেও নাসিম শেষপর্যন্ত তার উদ্দিষ্ট কাজ হাসিল করতে সক্ষম হলো, একেবারে শেষ দৃশ্যে না-পৌঁছোনো পর্যন্ত আমরা তা জানতে পারি না। নাসিমের সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসটিও এখানে তার মূল মঞ্জিলে পৌঁছেছে।

অনেক চরিত্র : জুলফি আলি ভুট্টো, আন্নী, বেনফরত, নূর মোহাম্মদ, আবদুল্লাহ খুরো, নাসিম আহমেদ, ফারুক, পারভেজ, যতীন চক্রবর্তী, মতিন, অন্তার, জমাদারনী, ফিতেওয়ালিনী, মালা, নাসিমা, আফরোজা, মখসুদ, নাহিদা, সালেহা, সুরাইয়া, মিস মরিয়ম, নজর মোহাম্মদ খান, আকরাম, খোদেজা, নবাবজাদা খুরশিদ আহমদ পাতৌদি, হেদায়েতুল্লাহ, মালতী, সাজেদা বেগম, গাফফার, খলকু খান, জামশেদ, রোকসানা, আজমান আলি, হায়দার জংগ, সুরতজান, নীলুফা, সারওয়ার, খসরু খান, নিয়ামতুল্লা, আইয়ুব খান, খোদাদাদ খান, ভিকারুননেসা, বিলকিস আহমদ, নাদিম শাহ প্রমুখ। প্রধান চরিত্র দুটো : নাসিম ও ভুট্টো। বেনফরত, আবদুল্লাহ খুরো, নাসিমা, সুরাইয়া, আন্নী প্রমুখকে মাঝে মাঝেই আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চরিত্রগুলো যেন একটি আবর্তে ঘূর্ণ্যমান। নাসিম, আন্নী, নাসিমা, পারভেজ- প্রধান-অপ্রধান এই চরিত্রগুলো জীবনতরঙ্গে উৎক্ষিপ্ত যেন। এই চরিত্রগুলো আবার সমাজের ভিতর থেকেই বেরিয়ে এসেছে। যেমন : আন্নী। সুদেহিনী আন্নী যেন বিধিসম্মত বলেই মেনে নিয়েছে তার মনিবের মনস্তুষ্টি (এক্ষেত্রে শরীরতুষ্টি) সাধন। শেষপর্যন্ত যখন সে গর্ভবতী হযে পড়ে, তখন তার প্রভু ভুট্টোর অবহেলাকে ভুট্টোরই চরিত্রানুগ বলে মনে হয়। আবার আন্নীর সপক্ষে যে দাঁড়ায় সে-ই নাসিমা হ তো প্রতিবাদ করে তার রক্তধারার কারণেই- ভুট্টো জানে না সে নাসিমের সন্তান, নাসিমা নিজেও জানে না। বেনজিরের সঙ্গে তার চারিত্রিক পার্থক্য হয়তো এ কারণেই। নাসিমার জীবনের ওঠাপড়া হয়তো সবার চেয়ে বেশি, তার অন্তর্দ্বন্দ্বও, নাসিমকে সে পাতৌদির অবস্থান জানিয়ে দেওয়ার পরে তার দ্বৈততা সাক্ষ্য দেবে হয়তো তার। যে-পারভেজকে চকিত একবার দেখা যায় প্রথম দিকে, উপন্যাসের শেষে সে ফিরে আসে। সে অনেকখানি নাসিমের মতন দেখতে, এটা কি বাস্তবের বাইরে অন্য কোনো প্রতিরূপের ইঙ্গি দ্যায়?

চরিত্রনির্মাণে লেখকের প্রধান একটি হাতিয়ার সংলাপ। করাচির মুখ্য পটভূমিতে যে-উপন্যাস, স্বাভাবিকভাবেই তার সংলাপের ভাষা হতে পারে উর্দু। কিন্তু বাংলা ভাষায় রচিত উপন্যানে তো এ ভাষা অবিরল ব্যবহার কলা সম্ভব নয়। উপন্যাসে বাঙালি নাসিমের প্রবেশের পরে প্রথমেই প্রসঙ্গটা এসেছে : ‘লাহোরের অদূরে ওয়াগার সীমান্তরক্ষী পাকিস্তানি এক সেপাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল নাসিমের। সেপাই তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুছি কোন হু?’ জবাবে নাসিম বলল, ‘মে পাকিস্তানি হ্যায়।’ পরক্ষণেই ‘হ্যায়’র স্থলে ‘হু’ যোগ করল, এভাবে যে, ‘হ্যায়’ বা ‘হু’ একটা-না-একটি তো শুদ্ধ হবেই; কারণ- স্কুল-কলেজ জীবনে যে পয়লা ‘ছবক’ নিয়েছিল তা থেকে সে জানে, চলতি বাংলা বাক্যের শেষে ‘হ্যায়’ নয়ত-বা ‘হু’ একটা কিছু যোগ করলেই চৌদ্দ-আনা উর্দু হয়ে যায়।’ [১:২]

এই নাসিম ক্রমে উর্দুভাষা অনেকখানি আয়ত্ত করে, এমনকি উর্দু দৈনিক ‘জংগ’ পত্রিকাও পড়তে পারে। লেখক সংলাপের প্রয়োজনে উর্দু প্রয়োগ করেছেন। যেমন:

– মেয় আকরাম সাহাবকা সাথ মোলাকাত কারণা চাহাতা হুঁ।

– কিঁউ, কিয়া বাত হে?

– আপ আকরাম সাব হে!

– জ্বি, ফরমাইয়ে। কিয়া চাইয়ে?

– এক খামুস রিভলবার কি জরুরত।

– রিভলবার সে কিসকো কাবু কর না হে বাবু?

– কাশ্মিরিওঁ পে যও জুলোম কারতে হে ইন কো।

– মে ও সব নাহি জানতা। স্রেফ এ জানতা হুঁ কে খাও, পিও অর এশ্ক্ কার। দুনিয়া লিখনে কি জাগা হে। [১:৫]

তবে প্রায় সারা বইয়েই স্বাভাবিকভাবে বিশুদ্ধ চলতি বাংলাতেই সংলাপ চলেছে, তার মধ্যেই পরিচারক-পরিচারিকাদের সংলাপে লেখক কখনো বাংলাদেশের (সিলেটের) উপভাষা বা সাধুভাষা ব্যবহার করে চরিত্রকে বাস্তবায়িত করেছেন। যেমন অন্তার এবং লাল ফিতেওয়ালিনীর (নামহীন) সংলাপ :

– হারামজাদি, তুই আমার পুরুষটারে নিয়া টানাটানি করতাছিস ক্যান?

– ইতাসব মিছা কথা।

– দেহে নাই ল্যাস, কথায় শুধু ঠ্যাস ঠ্যাস।

– রাখতে পারতাছিস না তারে দইরা, এখন আমারে দিতাছিস গালি। সে কি তর কিনা মাঔগ!

– ছিনালির ঘরের ছিনালি; বান্দির ঘরের বান্দি। আইজ তর একদিন না হয় আমার একদিন, তরে আর কোনোদিন রান্নাঘরে ঢুকতে দিমু না। [১:৩]

কিংবা মালার সংলাপ :

– আমি অনেকক্ষণ ধরিয়া তাদেরকে খুঁজিতেছি। কিন্তু কোথায়ও পাইতেছি না।

মানুষ কি রাস্তাঘাট অথবা বাড়িঘর সবকিছুরই খুঁটিনাটির বর্ণনা দেন লেখক। কিন্তু লক্ষনীয় : পুরো উপন্যাসের ঘটনাবলি সংঘটিত হয়েছে (কখনো অবশ্য স্মুতির মধ্য দিয়েও) করাচি, মুম্বাই এবং কলকাতায়। ঢাকা তথা বাংলাদেশে নয়। এটাও খানিকটা আশ্চর্যের। এই নৈঃশব্দ্য। যে-দেশ সম্পর্কে তিনি বলতে চাচ্ছেন তার সম্পর্কে পূর্ণ নীরবতা। তবে উপমা-উৎপ্রেক্ষা ব্যবহারের ব্যাপারে লেখক সবসময়ই দেশজ- তাঁর নিহিত বাঙালিত্বের প্রতীক। একমুঠো উদাহরণ:

১.   রূপোর ট্রে থেকে কফির কাপ হাতে নিয়ে ভুট্টো চুমুক বসাতে-না-বসাতেই আন্নীর হৃদয় ও অন্তর পুড়ে সেখানে এক অদ্ভুত হাসি খেলে উঠল।  মাছরাঙার রঙিন পালক থেকে ময়ূরকণ্ঠী রস নিংড়ে নেওয়ার আকর্ষণ-অনুভব যেন। [১:১]

২.   নৌ-বিমানের ওঠানামা অবলোকন তার খুব প্রিয় ছিল। রাজহংসের মত ডানা মেলে গ্রীবা উঁচু করে পানির ওপর ভেসে বেড়াত উড়োজাহাজগুলো। সমুদ্রসৈকতের এক পাথরখ-ের উপরে বসে দূরদিগন্ত পানে তাকিয়ে থাকত নাসিম; যেখানে আকাশ নতজানু হত বারিধিপদে, সেদিকে; আর আশমানের এই নতি স্বীকারে তরঙ্গবালাদের কলহাস্য ভেসে আসত তার কর্ণকুহরে, কোকিলের কুহুকুহু ধ্বনির মত মনমাতানো শব্দ যেন। [১:২]

৩.   […] শাড়িতেই মেয়েদের মানায় ভালো। পরিপাটি করে পরতে পারলে পাশের পুরুষের উশকুশ শুরু হয়ে যায়। ট্রাউজার দরজির বিদ্যার দৌড় প্রকাশ করে মাত্র, আর শাড়ি হচ্ছে স্বকীয় মেজাজ-মর্জির সুশ্রী প্রকাশ। একটি রেস্তোরাঁর ফরমাশি খাবার, আর অপরটি স্বহস্তে পাকানো চিতলের কোপতা। [১:৩]

৪.   [নাহিদার ভাবনা] আমি দুষ্টু ছিলাম। আজও দুষ্টুই রয়ে গেলাম। ভুট্টোকে সমস্ত দেহমন দিয়ে স্বামীরূপে গ্রহণ করতে পারেনি; তা সম্ভব হয়নি বলেই বোধহয় অতীতের সুখস্বপ্ন মধুর স্মৃতিকে সজীব করে রাখতে চাই; ভাষা-আন্দোলনের শহীদের স্মরণে তৈরি মিনারের মত। একমাথা ঝাঁকড়া তামাটে-কালো চুল, পৌরুষব্যঞ্জক চেহারা, বাঘের মত থাবা দেওয়া পেশী, বিড়ালের মত চোখ কী ভোলা যায়! [১:৩]

৫.   [পাতৌদির হত্যার ব্যাপারে নাসিমের চিন্তা] বঁড়শিবিদ্ধ বড় মাছের মৃত্যুর সঙ্গে ধস্তাধস্তির দৃশ্য-উপভোগ-আনন্দের সঙ্গে নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে কুচ বা জগর দিয়ে এক-ঘা’য়ে মাছকে জব্দ করার আনন্দের কোনো তুলনাই হয় না। [১:৪]

৬.   সুদর্শনা আন্নী চা-কফি-ভর্তি মস্ত বড় একটি সিন্ধি ট্রে হাতে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। পরনে সিন্ধ-নীল সালোয়ার। কামিজে হরেকরকম আয়নার কাজ। মাঝে মাঝে লাল-নীল সুতোর বাহার। আন্নীর মনে পড়ল, এ-পোশাক দেখে ভুট্টো সেদিন চিলের মত জাপটে ধরেছিল তাকে। [১:৪]

৭.   সৎমা যে তার অপরূপ সুন্দরী, এতদিনে তা যেন তার নজরে পড়েনি, স্বর্গের অপ্সরী কৈলাসবাসে দেবকাম্য উর্বশী যেন, বেহেশতের ছবিও বলা চলে, সপ্তাকাশে বিহারিণী নূর, কবির কল্পিত বিস্ময়, স্রষ্টার সৃষ্ট প্রথম নারীর চেয়েও রূপসী সে। [২:৪]

৮.   হঠাৎ নাহিদার মেজাজ বিগড়ে গেল, যেন আকাশের ঈশানকোণে কালবৈশাখী কালীর কালো চুলের অন্তরাল থেকে শত শয়তান সহস্র পক্ষ বিস্তারে কালিমাবৃত করল ধরাতল, সে সঙ্গে নাহিদার অন্তরও। [২:৫]

৯.   ভোরের পাখির ডানা ঝাপটার শব্দ যেন তার কানে একতারা বাজাচ্ছে। [২:৫]

১০.  হঠাৎ একটি জানালার কাছে এসে থমকে দাঁড়াল ভুট্টো। জানালা খোলা; ঘরের মধ্যে মৃদু আলো ঝলছে; তারই মাঝে বিল-জোড়া পদ্মের মত একটি নারীমূর্তি ফুটে আছে, ওর ঝাপসা রূপ যেন পূর্ণিমার চাঁদের মতো ঝলকে উঠেছে। [৩:৩]

১১.  মুখকে পাতিলের পিঠের মত করে ধমক দিল বেনফরত; এ প্রগলভতায় অপ্রতিত হল নাদিম; কিন্তু পরক্ষণে মেঘের আড়ালে বিজলি চমকে উঠল। [৩:৩]

এই উপমা-উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগ যেমন লেখকের দেশজতা-ইতিহাসচেতনাকে উদ্ভাসিত করে, তেমনি বর্ণনার মধ্যে এরকম কথা ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে লেখকের উদ্দেশ্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে : ‘ব্যক্তিবিশেষের পরিপূর্ণ বিকাশের প্রয়োজনে বর্তমান সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য। ব্যক্তির বিকাশ মানেই সমাজের উন্নতি, আর উন্নত সমাজে ব্যক্তির বিকাশ আরও উন্নত মানের ও সহজতর হয়; কারণ- সামাজিক সত্ত্বা ব্যক্তির বিবেককে নিয়ন্ত্রিত করে, কিন্তু বিবেক ব্যক্তিসত্ত্বার নির্ধারক নয়।’ [১:৫]

আব্দুর রউফ চৌধুরীর স্রোতে-প্রতিস্রোতে আবর্তমান নতুন দিগন্ত উপন্যাসটি যত বড় তার চেয়ে মনে হয় অকেন বৃহৎ। এই ব্যাপ্তি উপন্যাসটির পৃষ্ঠাসংখ্যার চেয়ে বেশি। সুনিবদ্ধ কাহিনী, অগণন চরিত্র, উজ্জীবিত সংলাপ, স্বগত সংলাপ, স্মৃতি, ইতিহাস, বিশ্লেষণ, বর্ণনা- সবকিছু ছাপিয়ে যায় লেখকের জীবনবেদ।


 সাম্পান ক্রুস

একটি মহৎ শিল্প যেমন বহুগুণের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকে, ঠিক তেমনি মানবতাবাদী দ্রেহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরীর ‘সাম্পান ক্রুস’-ও একটি বহু শৈল্পিক গুণের সমষ্টি। সে দৃষ্টিকোণ থেকে এক-একজন পাঠকের কাছে তা একাধারে উপন্যাস, ইতিহাস, সমালোচনা-সাহিত্য এবং বিশেষভাবে সংস্কারবাদী দর্শনচিন্তা বলেও সমাদৃত হতে পারে। তবে ঔপন্যাসিক ও উপন্যাস সম্বন্ধে প-িতরা বলেছেন যে, জীবনের সংঘাতময় আবর্তনকে মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাসে এবং যৌক্তিক পরস্পরায় ঘটনার ক্রম নির্ধারণেই ঔপন্যাসিকের সার্থকতা। দৈনন্দিন জীবনের চিন্তা-চাঞ্চল্য ও প্রবাহমানতাকে তুলে ধরাই উপন্যাসের উদ্দেশ্য। লেখকের ব্যক্তিগত জীবনদর্শন ও জীবনানুভূতি কোনো বাস্তব কাহিনীকে অবলম্বন করে যে বর্ণনাত্মক শিল্পকর্মে পরিণত হয়, তা-ই উপন্যাস নামে পরিচিত। উপন্যাসে সাধারণত যে পাঁচটি বিশেষ অবস্থা থাকে সেগুলো হচ্ছে- ১. প্রস্তাবনা, ২. সমস্যার উপস্থাপনা, ৩. আখ্যানভাগের মধ্যে জটিলতার প্রবেশ, ৪. চরম সংকট মুহূর্ত ও ৫. সংকট বিমোচন বা উপসংহার। এসব দিক থেকে বিবেচনা করলে ‘সাম্পান ক্রস’ অবশ্যই একটি উপন্যাস। যা বিশ্ব মানব-জাতির জীবন বিন্যাসে রচিত। ‘বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগে সত্যের আলো-ছায়ায় বসে’ লেখা একটি উপন্যাস। অর্থাৎ, আব্দুর রউফ চৌধুরীর এই উপন্যাসে বাস্তবতার ছাপ যেমন পাওয়া যায় তেমনি বাস্তবতাকে পাওয়া যায় প্রসারিত ও প্রতিফলিত আকারে। এখানে বাস্তবতা হয়ে উঠেছে হৃদয় ছোঁয়া। তবে যে-কোনো শিল্পকর্মে, উপন্যাসেও বটে, বাস্তবতা যেমন মূল্যবান তেমনি মূল্যবান কল্পনাও। আব্দুর রউফ চৌধুরীর বাস্তবতায় দখল যেমন প্রবল, তেমনি প্রবল কল্পনায় অধিকার। বাস্তবতার পরিপোষণায় আব্দুর রউফ চৌধুরী অবশ্য উল্লেখ্য, এই উল্লেখযোগ্যতা আছে আরও অনেকেরই অর্জনে, কিন্তু স্বতন্ত্র হয়ে গেছেন তাঁর আশ্চর্য কল্পনার ব্যবহারে। আব্দুর রউফ চৌধুরী স্বতন্ত্র তাঁর আশ্চর্য কল্পনা শক্তি ও তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে, তাই এখানে কল্পনার সঙ্গে মিশে গিয়েছে বাস্তবতা; যা একটি লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছে। অর্থাৎ কল্পনার প্রবণতা নিয়ন্ত্রিত তাই প্রবাহমান জীবন তথা বাস্তবতার ব্যবহার স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে। স্থির হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদে, প্রবাসী বাঙালির জীবনবেদে, বিশ্ব মানবতার আহ্বানে। তাই বলা যায় যে, আব্দুর রউফ চৌধুরী যেমনি বস্তববাদী শিল্পী ঠিক তেমনি কল্পনাবাদী শিল্পীও বটে। তিনি যে-ভাবেই তাঁর ভাবনাকে সাজান না কেন এই উপন্যাসটির ভিতটা ঠিকই গেঁথেছেন খাঁটি বাস্তবতায়। তিনি আত্মচেতন শিল্পীও বটে- তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজতে তিনি সৃষ্টি করেছেন একদিকে মানুষের বহির্জগতের চিন্তা-চাঞ্চল্য ও প্রবহমানকে- জীবনদ্বর্ন্দ্বের প্রচেষ্টা তার অনুশীলন; অন্যদিকে মানুষের আদিম বৃত্তিগুলির যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বাস্তব ঘটনাকে আশ্রয় করেই কাল্পনিক অসম্ভবতার স্তরে উঠেছিলেন। এজন্যই আব্দুর রউফ চৌধুরী অন্য সাহিত্যধর্মী বা কল্পনাধর্মী ঔপন্যাসিকদের চেয়ে আলাদা।

সংক্ষিপ্ত কাহিনী বর্ণনার্থে বলা যায়- প্রায় পঁচিশ হাজার প্রবাসী বাঙালি মুসলমানদের কাঙ্খিত ‘সাম্পান ক্রুস’  [সেইন্ট পেনক্রাস] এলাকায় একটি মসজিদ গড়ে তোলার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করেই এর সূত্রপাত। কিন্তু তা শুধু মসজিদ আর প্রবাসী বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বিশ্ব মানবজাতির জীবন ইমারত। প্রবাসীদের জীবনের নতুন পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানে নানাবিধ সমস্যার সমাধানের প্রয়াসে কখনো সমষ্টিগতভাবে আবার কখনো এককভাবে নিয়োজিত চরিত্রের সমষ্টিতে বিশ্ব মানবতার আহ্বান। ১৩ অধ্যায়ের এ উপন্যাসে বিশেষভাবে হাতে গোনা কয়েকটি সচল চরিত্রকে কেন্দ্র করেই সমগ্র মানব জাতির জীবনকে চিত্রিত করেছেন। প্রতিটি চরিত্রের মধ্যেই অসম্ভবতা ও কূটাভাসিক বিষয়াদি আছে বলে এবং তারা ক্রমচলিষ্ণু বলে, সহসা তাদের দুর্বোধ্য মনে হতে পারে; কিন্তু শেষ-পর্যন্ত নয়। এই মসজিদ স্থাপন করার অস্থায়ী অফিসটি নিশ্চিত একদিকে ভন্ডামি ও অন্যদিকে ধর্মান্ধতার একটি লীলাক্ষেত্র, প্রকাশ্য ও গোপন যৌনতারও ক্ষেত্র, কিন্তু এতে আখ্যানটি দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে না, কারণ আব্দুর রউফ চৌধুরী যেমন এই অস্থায়ী অফিসটির বহির্দেশ ছেড়ে চলে গেছেন তার নেপথ্যে, তেমনি মসজিদ-কমিটির সদস্যদের বাইরের জীবন ছেড়ে ঢুকে গেছেন তাদের অন্তর্লোকে। উপন্যাসের সবগুলো প্রধান চরিত্র ক্রমচলিষ্ণু ও অন্তঃপরিবর্তিত এবং তাদের প্রত্যেকের আছে স্পষ্ট পরিণাম: লাভলী ও আলহাজ দ্বীন সাহেবের একত্রে গৃহ ত্যাগ; বদই মিয়ার অকালমৃত্যু, কাজী ও তাজিদ উল্লার উদ্যেগে মসজিদ আবার নতুনভাবে স্থাপনের ‘শেষ-মোচড়’, যেন সব জানার পর কি যেন অজানা রয়ে যায়। ঝোড়ো ঘটনাবলির পরে এই প্রশান্ত পরিণাম একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্যেরই দ্যোতক। সুতরাং সব মিলিয়ে আব্দুর রউফ চৌধুরীর ‘সাম্পান ক্রস’ একটি সফল ও গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস।

এই উপন্যাসে, মনে হয়, আব্দুর রউফ চৌধুরীর মূল উদ্দেশ্য যেন মানবচরিত্রের রহস্যোদঘাটন। মসজিদ স্থাপন একটি পটভূমি মাত্র, তার অতিরিক্ত নয়, প্রবহমান জীবনস্রােতই আব্দুর রউফ চৌধুরীর লক্ষ্য। সেই প্রবহমানতায় আছে জীবনেরই স্তরে-স্তরে নিহিত প্রকাশ্য ও গোপন বিশাল বিস্ময়- অকল্পনীয় বিস্ময়। ‘সাম্পান ক্রস’ নাম থেকেও প্রমাণ হয়, মসজিদ স্থাপন একটি পটভূমি মাত্র; কিন্তু লক্ষ্য মানবচরিত্রের রহস্যের নির্দেশ বা প্রতিভাস রচনা। আলহাজ দ্বীন সাহেব, যে এই মসজিদ স্থাপনের একমাত্র ভরসা (ধনী ব্যক্তি), এক সামান্য মেয়ের শরীরী আকর্ষণে আকস্মিক বাঁধা পড়ে গিয়ে শেষ-পর্যন্ত তার সঙ্গে অনিশ্চিতের উদ্দেশে পাড়ি জমায়। আর এই ঘর-ছাড়া মেয়ে, লাভলী, আকস্মি সৌভাগ্যে ঘর পেয়েও না-পাওয়া জগতেই যেন ভেসে যায়। বদই মিয়া প্রায় আত্মাহুতিই দেয়। আর কাজী, যাকে মসজিদ কমিটির সদস্যারাই একসময় অপমান করেছে, নিজের অসীম সহিষ্ণুতাবলে শেষ-পর্যন্ত হয়ে ওঠে এই মসজিদ স্থাপনের সম্ভাব্য সংগঠক। এই সমস্তই অপরিকল্পিত জীবনের বিস্ময়। আর এই অ-পূর্ব-পরিকল্পিত জীবনের বিস্ময় আছে বলেই ‘সাম্পান ক্রস’ অন্তঃসারশূন্য মসজিদ স্থাপনের কাহিনী নয়, ইতিহাস-দর্শন-সাহিত্যালোচনার আখ্যানও নয়।

কয়েকটি চরিত্র নিয়ে ‘সাম্পান ক্রস’ উপন্যাসের আখ্যায়িকা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এরা প্রত্যেকেই তাদের অসামান্য স্বতন্ত্র নিয়ে উপস্থিত। চরিত্রগুলো প্রায় সবই চলিষ্ণু ও অন্তঃপরিবর্তমান, অর্থাৎ উপন্যাসের প্রথমে যেমন ছিল, শেষ-পর্যন্ত তেমন থাকেনি। এই চরিত্রগুলি নিজেদের এবং তার চেয়ে বেশি পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ-সংঘট্টে, একটি পরিণামের দিকে অগ্রসর হয়ে গেছে। বদই মিয়া, তাজিদ উল্লাহ, আলহাজ দ্বীন, মাসুদ মিয়া, সৈয়দ সঞ্জব আলী- সবগুলো চরিত্রের মধ্যেই আকর্ষণ-বিকর্ষণের অবিরল দোলাচল কাজ করে গেছ। কিন্তু এদের প্রত্যেকের জীবনদর্শন ও জীবনকে মোকাবিলা করার পদ্ধতি ও পরিণাম স্বতন্ত্র। নিজেদের নিঃসঙ্গতার বৃত্তে ভ্রাম্যমাণ কয়েকটি মানুষ অন্যদের বৃত্তগুলো স্পর্শ করেছে- কাছে এসেছে- দূরে চলে গেছে। এরা অস্থির ও সন্ধানী, শান্তিহীন ও অসুখী।

 সাম্পান ক্রুস

একটি মহৎ শিল্প যেমন বহুগুণের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকে, ঠিক তেমনি মানবতাবাদী দ্রেহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরীর ‘সাম্পান ক্রুস’-ও একটি বহু শৈল্পিক গুণের সমষ্টি। সে দৃষ্টিকোণ থেকে এক-একজন পাঠকের কাছে তা একাধারে উপন্যাস, ইতিহাস, সমালোচনা-সাহিত্য এবং বিশেষভাবে সংস্কারবাদী দর্শনচিন্তা বলেও সমাদৃত হতে পারে। তবে ঔপন্যাসিক ও উপন্যাস সম্বন্ধে প-িতরা বলেছেন যে, জীবনের সংঘাতময় আবর্তনকে মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাসে এবং যৌক্তিক পরস্পরায় ঘটনার ক্রম নির্ধারণেই ঔপন্যাসিকের সার্থকতা। দৈনন্দিন জীবনের চিন্তা-চাঞ্চল্য ও প্রবাহমানতাকে তুলে ধরাই উপন্যাসের উদ্দেশ্য। লেখকের ব্যক্তিগত জীবনদর্শন ও জীবনানুভূতি কোনো বাস্তব কাহিনীকে অবলম্বন করে যে বর্ণনাত্মক শিল্পকর্মে পরিণত হয়, তা-ই উপন্যাস নামে পরিচিত। উপন্যাসে সাধারণত যে পাঁচটি বিশেষ অবস্থা থাকে সেগুলো হচ্ছে- ১. প্রস্তাবনা, ২. সমস্যার উপস্থাপনা, ৩. আখ্যানভাগের মধ্যে জটিলতার প্রবেশ, ৪. চরম সংকট মুহূর্ত ও ৫. সংকট বিমোচন বা উপসংহার। এসব দিক থেকে বিবেচনা করলে ‘সাম্পান ক্রস’ অবশ্যই একটি উপন্যাস। যা বিশ্ব মানব-জাতির জীবন বিন্যাসে রচিত। ‘বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগে সত্যের আলো-ছায়ায় বসে’ লেখা একটি উপন্যাস। অর্থাৎ, আব্দুর রউফ চৌধুরীর এই উপন্যাসে বাস্তবতার ছাপ যেমন পাওয়া যায় তেমনি বাস্তবতাকে পাওয়া যায় প্রসারিত ও প্রতিফলিত আকারে। এখানে বাস্তবতা হয়ে উঠেছে হৃদয় ছোঁয়া। তবে যে-কোনো শিল্পকর্মে, উপন্যাসেও বটে, বাস্তবতা যেমন মূল্যবান তেমনি মূল্যবান কল্পনাও। আব্দুর রউফ চৌধুরীর বাস্তবতায় দখল যেমন প্রবল, তেমনি প্রবল কল্পনায় অধিকার। বাস্তবতার পরিপোষণায় আব্দুর রউফ চৌধুরী অবশ্য উল্লেখ্য, এই উল্লেখযোগ্যতা আছে আরও অনেকেরই অর্জনে, কিন্তু স্বতন্ত্র হয়ে গেছেন তাঁর আশ্চর্য কল্পনার ব্যবহারে। আব্দুর রউফ চৌধুরী স্বতন্ত্র তাঁর আশ্চর্য কল্পনা শক্তি ও তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে, তাই এখানে কল্পনার সঙ্গে মিশে গিয়েছে বাস্তবতা; যা একটি লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছে। অর্থাৎ কল্পনার প্রবণতা নিয়ন্ত্রিত তাই প্রবাহমান জীবন তথা বাস্তবতার ব্যবহার স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে। স্থির হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদে, প্রবাসী বাঙালির জীবনবেদে, বিশ্ব মানবতার আহ্বানে। তাই বলা যায় যে, আব্দুর রউফ চৌধুরী যেমনি বস্তববাদী শিল্পী ঠিক তেমনি কল্পনাবাদী শিল্পীও বটে। তিনি যে-ভাবেই তাঁর ভাবনাকে সাজান না কেন এই উপন্যাসটির ভিতটা ঠিকই গেঁথেছেন খাঁটি বাস্তবতায়। তিনি আত্মচেতন শিল্পীও বটে- তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজতে তিনি সৃষ্টি করেছেন একদিকে মানুষের বহির্জগতের চিন্তা-চাঞ্চল্য ও প্রবহমানকে- জীবনদ্বর্ন্দ্বের প্রচেষ্টা তার অনুশীলন; অন্যদিকে মানুষের আদিম বৃত্তিগুলির যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বাস্তব ঘটনাকে আশ্রয় করেই কাল্পনিক অসম্ভবতার স্তরে উঠেছিলেন। এজন্যই আব্দুর রউফ চৌধুরী অন্য সাহিত্যধর্মী বা কল্পনাধর্মী ঔপন্যাসিকদের চেয়ে আলাদা।

সংক্ষিপ্ত কাহিনী বর্ণনার্থে বলা যায়- প্রায় পঁচিশ হাজার প্রবাসী বাঙালি মুসলমানদের কাঙ্খিত ‘সাম্পান ক্রুস’  [সেইন্ট পেনক্রাস] এলাকায় একটি মসজিদ গড়ে তোলার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করেই এর সূত্রপাত। কিন্তু তা শুধু মসজিদ আর প্রবাসী বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বিশ্ব মানবজাতির জীবন ইমারত। প্রবাসীদের জীবনের নতুন পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানে নানাবিধ সমস্যার সমাধানের প্রয়াসে কখনো সমষ্টিগতভাবে আবার কখনো এককভাবে নিয়োজিত চরিত্রের সমষ্টিতে বিশ্ব মানবতার আহ্বান। ১৩ অধ্যায়ের এ উপন্যাসে বিশেষভাবে হাতে গোনা কয়েকটি সচল চরিত্রকে কেন্দ্র করেই সমগ্র মানব জাতির জীবনকে চিত্রিত করেছেন। প্রতিটি চরিত্রের মধ্যেই অসম্ভবতা ও কূটাভাসিক বিষয়াদি আছে বলে এবং তারা ক্রমচলিষ্ণু বলে, সহসা তাদের দুর্বোধ্য মনে হতে পারে; কিন্তু শেষ-পর্যন্ত নয়। এই মসজিদ স্থাপন করার অস্থায়ী অফিসটি নিশ্চিত একদিকে ভন্ডামি ও অন্যদিকে ধর্মান্ধতার একটি লীলাক্ষেত্র, প্রকাশ্য ও গোপন যৌনতারও ক্ষেত্র, কিন্তু এতে আখ্যানটি দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে না, কারণ আব্দুর রউফ চৌধুরী যেমন এই অস্থায়ী অফিসটির বহির্দেশ ছেড়ে চলে গেছেন তার নেপথ্যে, তেমনি মসজিদ-কমিটির সদস্যদের বাইরের জীবন ছেড়ে ঢুকে গেছেন তাদের অন্তর্লোকে। উপন্যাসের সবগুলো প্রধান চরিত্র ক্রমচলিষ্ণু ও অন্তঃপরিবর্তিত এবং তাদের প্রত্যেকের আছে স্পষ্ট পরিণাম: লাভলী ও আলহাজ দ্বীন সাহেবের একত্রে গৃহ ত্যাগ; বদই মিয়ার অকালমৃত্যু, কাজী ও তাজিদ উল্লার উদ্যেগে মসজিদ আবার নতুনভাবে স্থাপনের ‘শেষ-মোচড়’, যেন সব জানার পর কি যেন অজানা রয়ে যায়। ঝোড়ো ঘটনাবলির পরে এই প্রশান্ত পরিণাম একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্যেরই দ্যোতক। সুতরাং সব মিলিয়ে আব্দুর রউফ চৌধুরীর ‘সাম্পান ক্রস’ একটি সফল ও গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস।

এই উপন্যাসে, মনে হয়, আব্দুর রউফ চৌধুরীর মূল উদ্দেশ্য যেন মানবচরিত্রের রহস্যোদঘাটন। মসজিদ স্থাপন একটি পটভূমি মাত্র, তার অতিরিক্ত নয়, প্রবহমান জীবনস্রােতই আব্দুর রউফ চৌধুরীর লক্ষ্য। সেই প্রবহমানতায় আছে জীবনেরই স্তরে-স্তরে নিহিত প্রকাশ্য ও গোপন বিশাল বিস্ময়- অকল্পনীয় বিস্ময়। ‘সাম্পান ক্রস’ নাম থেকেও প্রমাণ হয়, মসজিদ স্থাপন একটি পটভূমি মাত্র; কিন্তু লক্ষ্য মানবচরিত্রের রহস্যের নির্দেশ বা প্রতিভাস রচনা। আলহাজ দ্বীন সাহেব, যে এই মসজিদ স্থাপনের একমাত্র ভরসা (ধনী ব্যক্তি), এক সামান্য মেয়ের শরীরী আকর্ষণে আকস্মিক বাঁধা পড়ে গিয়ে শেষ-পর্যন্ত তার সঙ্গে অনিশ্চিতের উদ্দেশে পাড়ি জমায়। আর এই ঘর-ছাড়া মেয়ে, লাভলী, আকস্মি সৌভাগ্যে ঘর পেয়েও না-পাওয়া জগতেই যেন ভেসে যায়। বদই মিয়া প্রায় আত্মাহুতিই দেয়। আর কাজী, যাকে মসজিদ কমিটির সদস্যারাই একসময় অপমান করেছে, নিজের অসীম সহিষ্ণুতাবলে শেষ-পর্যন্ত হয়ে ওঠে এই মসজিদ স্থাপনের সম্ভাব্য সংগঠক। এই সমস্তই অপরিকল্পিত জীবনের বিস্ময়। আর এই অ-পূর্ব-পরিকল্পিত জীবনের বিস্ময় আছে বলেই ‘সাম্পান ক্রস’ অন্তঃসারশূন্য মসজিদ স্থাপনের কাহিনী নয়, ইতিহাস-দর্শন-সাহিত্যালোচনার আখ্যানও নয়।

কয়েকটি চরিত্র নিয়ে ‘সাম্পান ক্রস’ উপন্যাসের আখ্যায়িকা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এরা প্রত্যেকেই তাদের অসামান্য স্বতন্ত্র নিয়ে উপস্থিত। চরিত্রগুলো প্রায় সবই চলিষ্ণু ও অন্তঃপরিবর্তমান, অর্থাৎ উপন্যাসের প্রথমে যেমন ছিল, শেষ-পর্যন্ত তেমন থাকেনি। এই চরিত্রগুলি নিজেদের এবং তার চেয়ে বেশি পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ-সংঘট্টে, একটি পরিণামের দিকে অগ্রসর হয়ে গেছে। বদই মিয়া, তাজিদ উল্লাহ, আলহাজ দ্বীন, মাসুদ মিয়া, সৈয়দ সঞ্জব আলী- সবগুলো চরিত্রের মধ্যেই আকর্ষণ-বিকর্ষণের অবিরল দোলাচল কাজ করে গেছ। কিন্তু এদের প্রত্যেকের জীবনদর্শন ও জীবনকে মোকাবিলা করার পদ্ধতি ও পরিণাম স্বতন্ত্র। নিজেদের নিঃসঙ্গতার বৃত্তে ভ্রাম্যমাণ কয়েকটি মানুষ অন্যদের বৃত্তগুলো স্পর্শ করেছে- কাছে এসেছে- দূরে চলে গেছে। এরা অস্থির ও সন্ধানী, শান্তিহীন ও অসুখী।

 অনিকেতন (অপ্রকাশিত)

‘সাম্পান ক্রস’ উপন্যাসের একটি প্রশাখা; লাভলী-শিল্পী-দ্বীন-রুবেলকে নিয়ে, ব্যক্তিত্বের সঙ্কটধর্মী, একটি উপন্যাস। বিলেতের অপুষ্ট ও অনুজ্জ্বল বাঙালি নিম্নমধ্যবিত্তশ্রেণীর অনমনীয় ব্যক্তিত্ব, তাদের মানগ্লন্দ্ব ও মূল্যবোধের সম্পর্ক এই উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। লাভলীর বিতর্কিত পরিণাম, দ্বীনের মানসিক অবস্থা ও রুবেল-এর প্রচ্ছন্ন নীতিমুখিতার প্রেক্ষাপটে সক্রিয় প্রবাসী কাল-স্থানের দ্বান্দ্বিক আবহ। লাভলীর আন্তর-নৈঃসঙ্গ, ক্ষোভ-লোভ-প্রতিবাদ, শিল্পীর দুঃখ-বেদনা-অভিমান মূলত এই উপন্যাসের বর্ণনীয় বিষয়। আব্দুর রউফ চৌধুরী প্রতিটি চরিত্রের মনোভাব, আচরণ ও চেতনাকে সেই চরিত্রের সমগ্র জীবনপ্রবাহের পটভূমিতে বিবেচনা ও মূল্যায়ন করেছেন। লাভলীর বিপরীত-আচরণ ও পরিণামে তার আত্মসমর্পণ, দ্বীনের অবিবেকী অধিকারচেতনা; শিল্পীর প্রাথমিক জড়স্বভাব এবং অন্তরস্থিত ধ্রুববিশ্বাসের প্রতি রুবেলের নির্মম সততা, তার অস্তিত্ব ঘোষণায় কম্পিত প্রভৃতির কার্যকারণ তাদের জীবনবিন্যাসে সমগ্রতার মূলীভূত। এই উপন্যাসে আব্দুর রউফ চৌধুরী কোনোপ্রকার সংস্কার-আশ্রয়ী অথবা ধর্মীয় নীতিবোধ চালিত দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনকে অনুধাবন করেননি। তিনি লাভলী-শিল্পী-দ্বীন-রুবেলের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের পরস্পর সংঘাত-উত্থিত দ্বন্দ্ব-যন্ত্রণা, বিক্ষোভ-উচ্ছ্বাস, সংযম-অসংযম, আত্মপীড়ন ও মানসিক অবদমন-বিজড়িত পূর্ণ অস্তিত্বের রূপায়ন করেছেন। তবে লাভলী-দ্বীন-রুবেলের সংকট কেবল হৃদয়বৃত্তির সংকট নয়, তাদের ব্যক্তিত্ব ও অস্তিত্বের সংকট। অন্তর্বিরোধ নিম্নমধ্যবিত্তশ্রেণীর চরিত্রের অন্তরঙ্গ বৈশিষ্ট্য। এই উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লাভলী-শিল্পী-দ্বীন-রুবেল- এই চারটি চরিত্রের ব্যক্তিত্বপ্রতিষ্ঠিত ও অস্তিত্বরক্ষার সংঘাতময় ক্রমপরিণতি কার্যকারণ ও স্বরূপ বিশ্লেষণ। এই চার চরিত্রই অগ্রসর হয়েছে তাদের অভিপ্রেত লক্ষ্যের দিকে, অথচ তারা প্রতিমুহূর্তেই নিক্ষিপ্ত হয়েছে অপ্রাপ্তির শূন্যতায়, দগ্ধ হয়েছে অস্তিত্বহীনতার যন্ত্রণায়। মানবস্বভাবের এই আলোকিত এবং প্রচ্ছন্ন যন্ত্রণাকাতর জীবন-আবেগ, অন্তর্জ্বালা ও অস্থির বেদনার প্রতিবিম্বপাত হয় এই উপন্যাসে।

এই উপন্যাসের ঘটনাংশ মূলত লাভলী-রুবেল-দ্বীন ও শিল্পীর চিত্তসংকটের কারণ ও পরিণাম। ব্যক্তিত্ব-সচেতন ও অস্তিত্ব-প্রতিষ্ঠাকামী ব্যক্তির মনোজাগতিক অন্ধকার অঞ্চল আবিষ্কার। চিত্তজাগতিক অন্তর্বিরোধী জটিলতাসমূহের উন্মোচন। চলমানতা এবং জীবনার্থের রূপাঙ্গন। এসব বিষয়ে অবশ্যই আব্দুর রউফ চৌধুরীর চেতনা ও শিল্পবোধ সুস্থির ও সজাগ। এই উপন্যাসের ঘটনাবিন্যাস- নিয়ন্ত্রিত ও শাসিত। প্রকৃতপক্ষে, মানবস্বভারের অমীমাংসিত স্তরের অনুসূক্ষ্ম জটিলতার রূপাঙ্কন। একদিকে, বঙ্কিম-ঢঙ, ঘটনা বিস্তার ও বিবরণ; আর অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের শিল্পনিপুণ-প্রতিমা অঙ্কনে আব্দুর রউফ চৌধুরীর ঔপন্যাসিক সত্তা আলোড়িত হয়েছে। ঘটনাসমূহের বিন্যাসে, মানসক্রিয়ার বিস্তৃত বিশ্লেষণে, বিস্ময়কর চিত্রকল্প সৃজনে ও অব্যর্থ প্রতীক উদ্ভাবনে তিনি প্রয়োগ-নিপুণ। একমুঠো উদাহরণ-

১.   ট্রি-টপ স্ট্রিটের ছাপ্পান্ন নম্বর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন বদরুদ্দিন ও তার বন্ধু। পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একবেণী ঝুলিয়ে, ধনেখালিজিড়ের রঙের জামা-পায়জামা পরা লাভলী সিঁড়ি ভাঙতে লাগল, আর শিল্পী নির্ভেজাল হাসি ছড়িয়ে তাকে অনুসরণ করতে লাগল। লাভলী আর শিল্পী দুই বোন। দুজনের অবস্থার ও চরিত্রের মিল থাকলেও, আসলে কিন্তু সূক্ষ্ম বেমিল আছে অনেক কিছুতেই।

২.   গভীর সন্ধ্যাকালের আকাশ, আশপাশের গাছপালাগুলোর গায়ে ভেজা সন্ধ্যার ছায়া, গাঢ় ধূসর বর্ণের আকাশের গা ঘেঁষে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি ঝরছে কয়েকদিন ধরে, থামছে না একমুহূর্তের জন্যও। বিলাতি মনে, কিভাবে কে জানে, মেঘলা আকাশ বিরক্তিকর উপলক্ষ তৈরি করে।

৩.   শিল্পী চমকে উঠল, বিদ্যুৎ-বাতির হলুদ-কুসুমের মতো রঙ লেগে আছে গাছের গায়ে, ভুলে যাওয়া কোনো কথা যেন মনে ভেসে উঠতে চাইছে, কিন্তু আসছে কই, শুধু বুকের ভেতর একটি অনুভব, যা থেকে সে নিষ্কৃতি চায়, তবুও অল্পসল্প বেদনাবিষাদের ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে, দুঃখ-দুঃখসুখ আর কী!

ট্রি-টপ স্ট্রিটের বাসায়ে দ্বীনের উপস্থিতি ‘অনিকেতন’-এর যাবতীয় জটিলতার উৎস জেনেও আব্দুর রউফ চৌধুরী বিস্ময়কর সংযত, তুচ্ছ ভঙ্গিতে জানিয়ে দেন,

মা-ঝি তিনজন মিলে সারা সন্ধ্যা ধরে অনেকরকম রান্না করে-পোলাও, কোরমা, রোস্ট, ইলিশভাজা- টেবিল সাজিয়েছে। পায়েশে আঙুল ডুবিয়ে লাভলী শেষবারের মতো মিষ্টির ভাগও পরীক্ষা করে নিয়েছে, তারপর মনে মনে বলে, বিন্দুমাত্র কম পড়েনি।

 

খাবার-সজ্জিত খাবার-টেবিলে আসন-গ্রহণ করতে করতে দ্বীন পর্দার ফাঁকে এক তীব্র ও গভীর দৃষ্টিতে লাভলীকে দেখে নিয়ে এবং এই প্রতিমাধ্রুবলক্ষ্মীরূপটিকে আপন হৃদয়ে সযতেœ ধারণ করে, বললেন, ‘কী চমৎকার!’

 

বদরুদ্দিন কথাটির যথার্থ অর্থ না-বুঝেই হয়তো উত্তর দিলেন, ‘এ আর কী!’ পরক্ষণেই যখন তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হল দ্বীনের উপর তখন তিনি বিস্মিত হলেন, তার চেহারায় এ কী-এক অপরূপ পরিবর্তন! কিছুক্ষণ আগের সেই আবেগহীন মুখ আর নেই। সেখানে সহসা স্থান করে নিয়েছে এক প্রজ্বলিত-তৃপ্তি; অহেতুক মাতাল জ্যোৎ¯œার মেলা যেন।

 

ঘটনাবিন্যাসের উপরি-উদ্ধৃত বৈশিষ্ট্য আব্দুর রউফ চৌধুরীর প্রবণতা অনুধাবন করলে বোঝা যায় যে, কেন তিনি বঙ্কিমা ও বিস্ময়করভাবে বদরুদ্দিনের গৃহে দ্বীনের উপস্থিতি ঘটালেন। এই উপস্থিতির পরের ঘটনাগুলো লাভলীর জীবনকে ছিন্নবিছিন্ন করে দেয়, সেই বিবরণের সম্ভাব্য শিল্পসৃষ্টিই হচ্ছে আব্দুর রউফ চৌধুরীর উদ্দেশ্য। ঘটনা নয়, ঘটনা-উত্থিত মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার স্তর উন্মোচনই আব্দুর রউফ চৌধুরীর অন্বেষণ। আর তাই লাভলীকে আত্মসচেতন ও ব্যক্তিসচেতন; আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টায় উত্তেলিত; এবং ঘটনাপ্রবাহের ¯্রষ্টা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। বোধ-বোধি, ব্যক্তি-পরিবার-সামাজিক দ্বন্দ্বে বাস্তবস্পর্শী জীবন-অর্থ ও শিল্পকলার ঔজ্জ্বল্যে ‘অনিকেতন’ স্বায়ম্ভুব।

 

 মা (অপ্রকাশিত)

‘নতুন দিগন্ত সমগ্র’ উপন্যাসের ‘নাসিম’ চরিত্রের ‘মা’-কে নিয়ে এই উপন্যাসটি রচিত। একজন বিপ্লবী ‘মা’-র জীবনই এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু। ‘মা’-কে এখানে অবশ্যই একজন ‘নারী’, ‘দেবী’, ‘কন্যা’, ‘আনন্দময়ী’, ‘বিপ্লবী’ হিসেবে চিত্রায়ন করা হয়েছে। ‘[…] ‘মা’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চান, স্বরাজ-টরাজ বুঝেন না। […] আমরা কারও সিংহাসনতলে আসীন নই।’  এই উপন্যাসে আব্দুর রউফ চৌধুরী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ-সরকার এবং ভারতবর্ষের রাজনীতিকদের  আসল চেহারা উদঘাটন করেছেন। ‘মা’ সত্য প্রকাশের যন্ত্র, এই যন্ত্রকে কোনো নির্মম শক্তি অবরুদ্ধ করতে পারে না; কেননা অন্যায় অবিচার আর পরাধীনতা কোনো মানবধর্ম হতে পারে না। এই উপন্যাসে আব্দুর রউফ চৌধুরীর নিপীড়িত মানবাত্মার জন্য অকৃত্রিম সহানুভূতি অন্বেষণ অস্বীকার করা সম্ভব নয়। মানবতাবাদী আব্দুর রউফ চৌধুরী ‘বিপ্লবী’-এর পথ ধরেই স্বাধীনতায় পৌঁছুতে চান; এ ছিল তাঁর পুরোমাত্মার বিশ্বাস। স্বাধীনতাকামী দেশবাসীর প্রত্যাশা, বিপ্লবী দীক্ষা, পরাধীনতা ও শোষণের বিরোধে প্রতিবাদ, অন্যায়-অবিচার আর মানব বিরোধিতার বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন-এসব বিবরণের সম্ভাব্য শিল্পসৃষ্টিই হচ্ছে আব্দুর রউফ চৌধুরীর উদ্দেশ্য। ভারতবর্ষ অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং নির্বীঘœ জাতিসত্তার মর্মমূলে আলো জাগিয়ে তোলার চেষ্টায় তিনি উত্তেলিত।

 

 

 সৃষ্টিশীল রচনা (ছোটগল্প)

 বিদেশি বৃষ্টি

এটি গল্প সংকলন। লেখকের মৃত্যুর (১৯৯৬) বহু পরে আংশিকভাবে ‘সুরমা’ পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল এর কয়েকটি গল্প পান্ডুলিপি দৃষ্টে। গল্পগুলি তাঁর পরীক্ষামূলক রচনা। জীবদ্দশায় তিনি তা প্রকাশ করেননি। অথবা একই সময় ইতিহাসমূলক গ্রন্থ রচনায় অধিক মনোযোগের কারণে তা প্রকাশের সুযোগ তিনি করতে পারেননি। এগুলি অনেকটা ‘রিলিফ’ হিসেবেই যেন লিখে রেখে গেছেন। এর রচনাকাল ১৯৮৫-’৮৬ সাল। উল্লেখ্য এই সময় থেকেই লেখক লন্ডনে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে প্রথম স্থিত হন, তাঁদের পারিবারিক জীবনের জঙ্গমতার অবসান ঘটে। আবার এই সময় থেকেই তিনি সমাজ-কর্মেও অধিক লিপ্ত হন, জড়িয়ে পড়েন নানা উন্নয়ন ও কল্যাণমুখী কর্মকা-ে। কিংস্ ক্রস ইসলামিক সেন্টার ও মস্ক স্থাপন, ধর্ম বিষয়ক গ্রন্থানুবাদ প্রভৃতি তাঁর প্রধান কাজ হয়ে ওঠে। তবে সৌভাগ্য যে এই সময় মনের বিশ্বাস ছোঁয়া ও সমাজ-দৃষ্টিতে কিছু সৃষ্টিও তখন তাঁর হাতে দিয়ে রচিত হয়। যদিও তার প্রকাশনা নিয়ে তিনি তেমন কোনো ভাবনাই আমলে দেননি। এজন্য তাঁর সাহিত্য-প্রকাশ সূচিত হয় ধর্ম-বির্তক ও মনন সম্পৃক্ত বিবেচনার পথে। ধর্ম ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ, নারীর অবস্থান ও সাহিত্য-চিন্তা (বিশ্লেষণ) তাঁর এই সময়ের রচনার মুখ্য বিষয় ছিল; কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় লেখাগুলির গ্রন্থাবদ্ধরূপ দেখা যায়নি। একইভাবে যে কটি ছোটগল্প রচনা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন সেগুলিরও গ্রন্থ-প্রকাশ ঘটেনি। এই গল্পগুলি বিদেশী পটভূমি ও আবহাওয়ায় রচিত হয়েছিল। এগুলি ছিল তাঁর প্রিয় সৃষ্টি। তবু তা কেন প্রকাশযোগ্যতা লাভ করেনি? বলতে ইচ্ছা করে এগুলি ছিল যেন গ্রীষ্মের দাবদাহে বৃষ্টির সুধার তুল্য; তাই এর নাম ‘বিদেশী বৃষ্টি’।

‘বিদেশী বৃষ্টি’র গল্পগুলি আব্দুর রউফের পরীক্ষমূলক রচনা-সে কথা আগেই বলেছি। এখানে আটটি গল্প ও ৩টি পাঠানী কৌতুক গল্পের সমাহার। মূলত গল্পগুলির অধিকাংশই যেন চলমান অবস্থা থেকে স্থির জীবনকে দেখা কিংবা স্থিত সংরাগে জীবনের জঙ্গম ধারাকে লক্ষ্য করা ও চিহ্নিত করা। জীবনে থাকে একটি চক্রমান রূপ; এই আবর্তনের ও প্রত্যাবর্তনের খেয়াটি আরোহীর দৃষ্টিতে থাকে এক-রৈখিক, স্থির, সরল ও অনাবর্তক মাত্র। লেখক যে চলিষ্ণু রূপটি নির্মাণ করেছেন, তা বহুমাত্রিক ও তাৎপর্যক। আর তাই জাহাজে বা ট্রেনে, স্মৃতিতে বা তৎক্ষণিক অবস্থায় জীবন যেমন আবর্ত্তশীল, চলিষ্ণু ও অস্থাবর, তেমনি বর্ণিত হয়ে রূপময় হয়ে ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। আঁধারময় ঝড়ো-বাদলের পথে বিদ্যুতের আলোয় ক্ষণ-দেখারও যেমন অর্থ আছে, তেমনি দীর্ঘ যাত্রাপথে বহু দৃশ্যের মধ্যে বিশেষ নির্বাচনটিও ব্যঞ্জনাকর হওয়া সম্ভব; শরৎচন্দ্র ও দুই বিভূতি থেকে প্রবোধ সান্যাল, অন্নদাশঙ্কর বা সৈয়দ মুজবা আলী এঁরা তার নিপুণ কারিগর ছিলেন। ক্ষণ-জীবনচিত্রে বনফুর্লেও শত নির্মাণ বাংলাসাহিত্যের এক সুখকর স্মৃতি। আব্দুর রউফ চৌধুরী সব স্মৃতিকে মাঝে মাঝে উসকে দেন সত্য কিন্তু তবু তিনি স্বতন্ত্র। এ গ্রন্থের ‘বই চুরি’, ‘বিদেশী বৃষ্টি’ এবং ‘একটি ছিন্নপত্রে’র আবেদন চিত্রময় এবং শারীরিও বটে, তবুও কি একটা দ্রোহী ভাবনার সূত্রপাত ঘটে যায় যেন এরই ভেতরে। ক্বচিৎ কোনো ¯িœগ্ধ মাধুর্য অথবা জীবনের একটা চাপা ক্ষেত্রের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসার অস্ফুট চেতনা এখানে জন্ম নিয়েছে নারীর স্বপ্নে। নারী পুরুষের প্রাকৃতিক বন্ধনের বিকৃতিতে পুরুষের অপৌরুষ বা কাপুরুষোচিত আচরণে ও পুরুষতন্ত্রের নামে সমাজশক্তির আড়াল তৈরীতে নারীর অবমাননার পর্যায়গুলিও তাতে ধরা পড়েছে। প্রথম গল্প ‘লং-জাম্প’-এর নায়িকা বৈবাহিক জীবনে, পূর্ব পরিচিত ভুট্টো, যার বয়স এখন চল্লিশের ধারে মরা কোটালে, তার এবং তার মতো সমাজের আরও যারা দুষ্টক্ষত, তাদের অন্তর্চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক কোনো রকম কাহিনী বিস্তারে না গিয়েও। ট্রেনে আসা এবং ওয়েটিংরুমে যাওয়া পর্যন্তই এই গল্পের সীমানা। প্লট ইত্যাদির কাঠামো-বন্দী কিংবা ফ্ল্যাস-ব্যাকের ছক-বাঁধা কাহিনী সম্পন্ন গল্প এটি নয়। অথচ এর মধ্যে নব নগরায়নের ইতিহাস, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক, এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মেয়ের বাস-ভ্রমণকালীন আব্রু রক্ষায় বিড়ম্বনা, ছাত্রজীবনের স্মৃতিকে অবৈধভাবে কাজে লাগানোর জন্য বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিভূ ভুট্টোর সচেতন কিন্তু ব্যর্থ প্রয়াস এবং অন্যদিকে স্বাধিকার প্রমত্তা নারীর দুঃসাহস, মোড়লকে আড়ালে সচেতন কিন্তু ব্যর্থ প্রয়াস এবং অন্যদিকে স্বাধিকার প্রমত্তা নারীর দুঃসাহস, মোড়লকে আড়ালে বা প্রহরায় রেখে স্বভাবিত নায়কের (ভুট্টো) মুখোশ উন্মোচনার্থ অভিনয় ও ‘শ্লেষাত্মক’ বাক্যবাণ নিক্ষেপ প্রভৃতি এই গল্পে একটি নতুন মোড় ও মাত্রা সৃষ্টি করেছে।

‘বিদেশী বৃষ্টি’র প্রায় প্রতিটি গল্পেই সেই চমক, সেই শ্লেষ, সেই আত্ম-উন্মোচন বা নাটকীয় প্রতি-উম্মীলন একটা বিশিষ্টতা অধিকার করে আছে। অনেক ক্ষেত্রে কেবল একটি অবস্থার পরিবর্তন কিংবা আকস্মিক বা নাটকীয় পরিচয়ের মধ্য-দিয়ে সুখের মতো কষ্টকর বিচ্ছেদের একটি স্পর্শকাতর বর্ণনাও গল্পের রূপ নিয়ে উঠেছে। গল্প-মান লাভ করেছে সেই অনায়াস রস-নিষ্পন্ন সৃষ্টি। অনেক ক্ষেত্রে তিরিশী ধারণা (এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, লেখকের গল্পপাঠ ও প্রিয়গল্পকারদের কথা তাঁর চিঠিপত্রেও আভাসিত আছে।) প্রসূত ফ্রয়েডীয় চৈতন্যকে আশ্রয় করা হয়েছে সত্য, কিন্তু তা প্রশ্রয়ে নির্মাণের তীর্যক দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে সৃষ্টি ও রক্ষা করেছে গল্পের অতলতলের প্রাণ ভোমরাটিকে। জীবনের গভীর ও বিস্তৃতবহ অভিজ্ঞতা এবং ঋদ্ধ ভাষা তথা শব্দরাজিতে অধিকার ব্যতীত তা সম্ভব নয়। আব্দুর রউফ চৌধুরী সেইখানে আন্তরিক ও পরিশ্রমী।

আব্দুর রউফ চৌধুরী একাত্তরের অভিজ্ঞতাকেও এ গ্রন্থের মধ্যে টেনে এনেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপক অভিজ্ঞতা জনাব চৌধুরীর। সেই অভিজ্ঞতা জাত সৃষ্টি ‘কালো রাত্রির ঠিক দু‘দিন আগে’। এটি সাংবাদিকতা-সুলভ গল্প নির্মাণ নয়। কিন্তু প্রচলিত মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ন্যায় যুদ্ধবর্ণনা বা মুক্তিবাহিনীর কষ্ট বর্ণনাও তাঁর লক্ষ্য নয়। এ গল্পের শেষ বাক্যটি থেকে এর বর্ণনীয় বিষয় ও লক্ষ্য স্পষ্ট হয়, বাক্যটি হচ্ছে- ‘আর দু’দিন পরেই ২৫শে মার্চ ১৯৭১ সাল।’ কৃষণ চন্দরের ‘পেশোয়ার এক্সপ্রেস’-এর সাথে এই গল্পটি নানা দিক থেকে তুলনীয় হতে পারে। আবার এর ভিন্নতা ও স্বকীয়তাও ভয়ঙ্কর স্পষ্ট। এ গল্পে ট্রেন বা কোনো গাড়ি নয়, কাল বা সময়ই হচ্ছে নায়ক। মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমকালীন কোনো ঘটনা, রাজনীতি বা বাংলাদেশের কোনো চিত্র না এনেও একটা চাপা আবহাওয়া সৃষ্টি করে সেই মোক্ষমটি তথা চরম মুহূর্তটিকে গল্পের পরিণতি ও লক্ষ্য হিসেবে তুলে আনা হয়েছে। গল্পে লেখকের মুন্সিয়ানায় মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না।

 

 গল্পসম্ভার ও গল্পভুবন

আব্দুর রউফ চৌধুরী একজন দ্রোহী কথাসাহিত্যিক। একদিকে যেমন তিনি শিল্পী অন্যদিকে তেমনি প্রতিবাদী। মন্ময় সাধনায় যেমন তাঁর কৃতিত্ব আছে তেমনি তিনি তাঁর সৃষ্টিজগতেও সিদ্ধহস্ত। পাশ্চাত্ত্য-সাহিত্যের ঐশ্বর্যভা-ার ছিল তাঁর সামনে উন্মুক্ত। তাঁর ছোটগল্পে আছে শৈলীর অবাধ প্রয়োগ; কারণ তাঁর মন ছিল এক প্রগাঢ় রূপশিল্পীর মন। তাঁর ছোটগল্পে শুধু দৃশ্য-রূপই নয়, উপলব্ধি ও মননের নব-রূপ যেন অবয়ব পরিগ্রহণ করে। ব্যক্তির স্বার্থপরতা বা সুবিধাবাদেরও একটি শিল্পরূপোজ্জ্বল চেহারা তাঁর ছোটগল্প থেকে অনুভূত হয়, যা সবসময়ে জীবন-নৈতিকতা-নির্ধারিত পথে চলে না; তাই নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, তিনি সাহিত্যের মাধ্যমে সর্বাত্মকভাবে এক দ্রোহী মানসিকতাকে অবলম্বন করে তাঁর শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর চেতনা কোনো কোনো সময় অস্থিরতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে জর্জরিত হলেও তাঁকে জীবনবিমুখ করেনি, বরং তাঁর শিল্পে বৈভব বর্ধিত হয়েছে। তাঁর বেশির ভাগ গল্পই দীর্ঘ। তিনি ছোটগল্প রচনায় প্রথাসিদ্ধ নিয়মকেই অনুসরণ করেছেন। সামগ্রিক বিচারে বলা যায় রবীন্দ্রনাথের প্রবর্তিত ধারারই তিনি উত্তরসাধক; তবে বৈচিত্র্যগুণে ও নিজস্ব রূপদৃষ্টির নির্মাণ-কুশলতায় তাঁর ছোটগল্প অন্যরকম। সচেতনভাবে তিনি কোনো গোষ্ঠীর মতবাদ বা তত্ত্ব তাঁর ছোটগল্পের চরিত্রে-ঘটনায়-সংস্থাপনে আরোপ করতে না-চাইলেও তাঁর যুগের যুবমানসের মনোবিশ্লেষণের ভাবটি কোনো কোনো গল্পের বিষয়ধর্মে কার্যকরী প্রভাব ফেলেছে; তবে এই ভাবের প্রবাহ এসেছে ছোটগল্পের প্রয়োজনে, চরিত্রের অনিবার্য কারণে। আব্দুর রউফ চৌধুরীর ছোটগল্পের বর্গীকরণ করলে তাঁর গল্পগুলোর একটি সুষ্ঠু কাঠামো পাওয়া যাবে এবং মূল্যায়নেও সহায়ক হবে।

ক. দাম্পত্য জীবনের জটিলতা: নীলা, আত্মব্রত, বিকল্প, বন্ধুপত্নী।

খ. সামাজিক সমস্যা ও প্রতিবাদ: জিন, নেশা, ভূত ছাড়ানো, জিনা।

গ. মনস্তাত্ত্বিক: রানী, সৃষ্টিতত্ত্ব, পরিচয়, শাদি।

ঘ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: অপেক্ষা, পিতা, বীরাঙ্গনা, বাহাদুর বাঙালি।

ঙ. বাৎসল্য রস: উপোসী, স্নান, যৌতুক, ট্যাকরা-ট্যুকরি।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পের এই বিভাজন অবশ্য পাথর খ-ের মতো স্থির কিছইু নয়; এক বিভাগের গল্পের সঙ্গে অন্য-বিভাগের লক্ষণও এসে জুড়ে যায়, তবুও আলোচনার সুবিধার্থে এরকম একটি শ্রেণীকরণকে সহায়ক সারণী রূপে গ্রহণ করা যায়।

 

ক. দাম্পত্য জীবনের জটিলতা

‘প্রত্যেক সৃষ্টিশীল লেখকের অন্তরালে একটি বক্তব্য আত্মগোপন করে থাকে। গভীর জীবনবোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত লেখক এই বক্তব্যকে পাঠকের প্রত্যক্ষ গোচরে আনতে চান না। সেই বিশেষ কথনটি আঙ্গিক বা ভাববস্তুতে এমনভাবে উপস্থিত করেন যাতে শিল্পরসটি ক্ষুণœ না হয়।’  সমাজের সমস্যা ভারাক্রান্ত অবস্থা আব্দুর রউফ চৌধুরীর বিবেকী সত্তাকে আলোড়িত করেছে, আর এই প্রতিক্রিয়ার সফল শিল্পরূপ ফুটে উঠেছে তাঁর ‘নীলা’, ‘আত্মব্রত’, ‘বিকল্প’, ‘বন্ধুপত্নী’ প্রভৃতি গল্পের আবহে। মানুষের জীবনে প্রতিদিন নানা ঘটনা ঘটে। সংসারের নানা সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে মানুষকে চলতে হয়। জীবনকে মোহগ্রস্তভাবে নয়, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখেছেন আব্দুর রউফ চৌধুরী; ভেবেছেন মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কথা। ক্ষয়, শীর্ণতা, গ্লানি, চরম বৈষম্য থেকেই জন্ম নেয় মহৎ সত্য-জীবনের সংঘাত ও দ্বন্দ্ব। এরই সন্ধান মিলে তাঁর ছোটগল্পে, যার আবেদন পাঠকের চিত্তে মহৎ সত্যকে জেনে নেওয়ার একটি প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি করে, আকর্ষণ তো বটেই। ‘নীলা’, ‘আত্মব্রত’, ‘বিকল্প’, ‘বন্ধুপত্নী’ গল্পগুলোতে দাম্পত্য-জীবনের জঠিলতা এসেছে, এসেছে প্রীতিতে, স্নেহে, কল্যাণ-কামনায় এবং অকথিত পারস্পরিক আকর্ষণে ভালোবাসার সম্পর্কও; অনিবার্য কারণে বিচ্ছেদের সুনিশ্চিত আভাস থাকলেও আরও কিছু কথা যেন থেকে যায়, সবই নিঃশেষে সমাপ্ত হয় না। এসব গল্পে  কামনা, প্রেম, ঈর্ষা-বিরাগজড়িত জীবন বর্ণনাংশের বিন্যাস-কুশলতায় সত্য হয়ে উঠেছে মহাসত্য।

নীলা : একজন বিবাহিত নারীর প্রতি তার স্বামীর অকথিত অবহেলা এ-গল্পে চমৎকারভাবে, সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে:

নীলার ভিতরে অনেক বিক্ষোভ অভিমান আর ঘৃণা পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। সে যেন কোনো দিনই কারো কাছ থেকে ভালোবাসা পায়নি; তার স্বামীর কাছ থেকেও না, না পেয়েছিল, ঠিক বুঝতে পারছে না। স্বামী কী কোনো দিন তার জন্য অপেক্ষা করেছিল, তার মনে পড়ছে না, হয়তো সারা জীবন সে-ই তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করেছে। মেঘ ও জ্যোৎস্নার খেলার মতো, বোবার কথা বলার ইচ্ছের মতো সে তাদের দাম্পত্য-জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো হৃদয়ে সযতেœ ধরে রেখেছে।

স্বামীকে ছেড়ে স্ত্রীর অন্যত্র চলে যাওয়াটা যে, একজন স্বামীর চিত্তের হতাশা তা আব্দুর রউফ চৌধুরী নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেছেন, এবং তিনি এই ব্যথাতুর চিত্তের হাহাকার পাঠকের অন্তরে পৌঁছোতে সক্ষম হয়েছেন, এখানেই তাঁর কৃতিত্ব। ‘নীলা’ গল্পে যেমন করা হয়েছে:

নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করা ছাড়া আর কীই-বা করার ছিল তার! কখনো কখনো ত্রুটিপূর্ণ সম্পর্কের ফাঁক পূরণের জন্য বন্ধুজনের শরণাপন্ন হতেন, কিন্তু তাদের অশোভন উপদেশ উপেক্ষা করে নিজের মন ও আত্মাকে আত্মশক্তি দিয়ে শাসন করতেন।

গল্পরস ঘনীভূত করার জন্য যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হয় তা আব্দুর রউফ চৌধুরীর অজানা নয়। ‘নীলা’ গল্পে যেমন করা হয়েছে :

নীলা অস্বাভাবিক অস্বস্তি বোধ করছে। তার যন্ত্রণাময় জীবন যেন এক কাঁটাওয়ালা বিষাক্ত ফুল, পৃথিবীর পরিত্যক্ত বস্তু। গভীর অরণ্যে, কাঁটাঝোপে যেন তার বসতি। নীলার জীবনের সীমানা তার কাছে অজানা থাকলেও সে কারো কাছে নতজানু হয়ে ক্ষমা চাইতে পারে না, এমনকি তার বুকে স্বামীবিহীন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হাপর মারলেও না; বেদনার ঝাপটে হৃদয় ছিঁড়ে একাকার হয়ে গেলেও না; নিশিথে যদিও সে তার স্বামীর সঙ্গে যৌনস্পৃহার সময়গুলো উপলব্ধি করে সর্বাঙ্গময় তবুও না। এসব কথা কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারে না নীলা, তাই হয়তো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মদচ্ছির আলীর দিকে। তার দৃষ্টি করুণ। এই করুণ দৃষ্টির কারণেই মদচ্ছির আলীর অন্তরের ঠিক মাঝখানে, অদ্ভুত চাপাপড়া একটি পাথর ভেদ করে, মুখে বলা যায় না এমন এক যন্ত্রণা আঁচড় কাটতে লাগল।

আব্দুর রউফ চৌধুরী এ-গল্পের বিষয়ের মূলভাব উদঘাটনে যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন তা যথাযথ হয়েছে। বর্ণনাভঙ্গি ও বাক্য বিন্যাসে সম্পূর্ণ কৃত্রিমতা বর্জিত। এর বর্ণনায় স্বাভাবশিল্পী আব্দুর রউফ চৌধুরীর জীবনদৃশ্য প্রকাশিত হয়েছে, যার সঙ্গে রয়েছে সহজ-বাস্তব সাধারণ জীবনচর্যার একটি নিবিড় সম্পর্ক।

আত্মব্রত : আব্দুর রউফ চৌধুরীর এ-গল্পে শিল্প-দৃষ্টির প্রধান শক্তি মধ্যবিত্ত সমাজকে জানা ও চেনার রঞ্জন-রশ্মি প্রকাশ করা। এখানে তাঁর অতলস্পর্শী দৃষ্টির স্বচ্ছতা বিস্ময়কর। সত্যিকারের মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সাফল্যে তিনি চিত্রিত করতে পেরেছেন। হাজী মজনুর যৌনতৃষ্ণা অপরিসীমভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ধারণাটি হচ্ছে, নারীর এক-পুরুষগামিতা আর পুরুষের বহু-নারীগমন সম্পর্কিত বিধি। সন্তানের জননী হওয়া সত্ত্বেও হাজী মজনু তার প্রথম স্ত্রীকে ব্যক্তি-স্বাধীনতার জন্য দায়ী করে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

তবে রেখা জানে, সে মার্জিত ও অহঙ্কারী একজন নারী; তার সুরূপ ও অহঙ্কার হাজী মজনুর দিকে তাকে ফিরতে দেয়নি। […] ছোট্ট-বড়ো বাধা-নিষেধ উপেক্ষা করে প্রণয়ডোর যখন স্বাধীনতা নামক স্বাদটিকে বর্ধিত করে তখন শৃঙ্খলতায় আঘাত তো আসবেই; আর প্রণয়ডোর যখন ছিঁড়ে যায় তখন উচ্ছৃঙ্খলতার রাজত্ব সহজেই সৃষ্টি হয়। এই স্বাধীনতার স্বাদকে তরান্বিত করতে রেখা হয়ে উঠল খরস্রােতা।

আজকের পৃথিবীর বহু সামাজিক অশান্তির মূলে কিন্তু এই স্বাধীনতার উচ্ছৃঙ্খল আকাক্সক্ষাই দায়ী। এই আধুনিক কালের স্বাধীনতায় কেউ কারো সম্পত্তি নয়, কেউ কারো অধীন নয়-একথাই প্রকাশ করেছেন লেখক। সোজা কথায় পুরুষ নারীকে নিজস্ব সম্পত্তি করে রাখতে চায় নিজের স্বার্থে-এরই প্রতিবাদ করেছেন গল্পকার।

কাউকে পরিপূর্ণ রূপে পেতে হলে নিজেকে সমর্পণ করতে হয় অন্তরের সব জঞ্জাল জলাঞ্জলি দিয়ে। তাকে উদাত্তভাবে আহ্বান করতে হয় একক অভিলাষে।

নারী প্রেম চায়, ঘর চায় এবং পুরুষকে জয় করতে চায়-এই তিনটি রূপেই আব্দুর রউফ চৌধুরীর নারী-চরিত্রটি দেখা দিয়েছে তাঁর এই গল্পে।

এক সন্ধ্যায়, সন্তান-দুটো নিয়ে রেখা এক নবীন এঞ্জিনের সাহায্যে ও যুবক-পাখায় ভর দিয়ে উড়ে গেল; নতুন প্রেম লাভের, ঘর বাঁধার এবং পুরুষচিত্ত জয় করার আশায়।

বিকল্প : এই গল্পের নামই এর উদ্দেশ্যকে ধারণ করে এবং পাঠককে ধারণা দেয় গল্পের গতিপথ সম্বন্ধে।

‘বিকল্প’ গল্পে মাফিক ও জায়েদার বিবাহিত জীবনে মিলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় মাফিকের শ্বশুর। অর্ধগৃধœু শ্বশুর জামাই-এর কাছ থেকে মোহরানার অংশ হিসেবে অলংকার আদায় না করে কন্যাকে তার স্বামীর সঙ্গে যেতে দেবে না, তার পক্ষে ওকালতি করতে আসে ধর্মব্যাবসায়ী মৌলা, প্রয়োজনে তারা মাফিকের কাছ থেকে তালাক নিতে প্রস্তুত হয়। কিন্তু মাফিকের তরুণ বন্ধু বাহার ও আবদ-আল-মাওলা তাদের পরিকল্পনার বিপক্ষে জোরাল অবস্থান নেয়। শেষ পর্যন্ত ভোরের আলো-ছায়ায় সকলের অগোচরে নতুন জীবনের প্রত্যাশায় মাফিক ও জায়েদা যাত্রা করে। গল্পটির সমাপ্তি গভীর ইঙ্গিতবহ। কুসংস্কারে অবদ্ধ জীবন থেকে উদারনৈতিক জীবনের উদ্বোধনের ইঙ্গিত প্রদান এবং পুরাতন ও নতুন জীবনের সংঘাত ও নতুনের বিজয়কে অর্থবহভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’

‘আমাদের সংস্কারাচ্ছন্ন সনাতনী সামন্ত্রতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তরুণ-তরুণীদের হৃদয়বৃত্তির ক্ষেত্রে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে বাধা কখনো কখনো এমন অলঙ্ঘনীয় হয়ে ওঠে যে তরুণ-তরুণীদের নানা ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে পৌঁছে দেয়। জায়েদা, মাফিক এক্ষেত্রে সাহসী, খুঁজে নিয়েছে বিকল্প পথ। লেখক আব্দুর রউফ চৌধুরী বলার ভঙ্গিতে বিকল্প এ-পথ খুঁজে নেওয়াকে অভিবাদন জানিয়েছেন, পরিচয় দিয়েছেন আধুনিকতম মননের।’

বন্ধুপত্নী : ‘বন্ধুপত্নী’ মনস্তত্ত্ব নির্ভর গল্প। নারী হৃদয়ের যাতনা ও পুরুষ মনস্তত্ত্ব রূপায়ণে গল্পটি মূল্যবান।  স্বামী-বন্ধুর গোঁয়ার্তুমি নাসরিনের অন্তর্দাহের মূল কারণ। যেদিন থেকে নাসরিন তার স্বামীর সঙ্গে করাচিতে বসবাস শুরু করে সেদিন থেকেই তার স্বামী-বন্ধুর আনাগোনা বেড়ে যায়। স্বামীর নির্দেশে তার বন্ধুর আদরযত্ন করতে শুরু করে নাসরিন। প্রথম প্রথম সে আসত তার স্বামীর সঙ্গেই, পরে একা একা। নাসরিনকে একা পেয়েই সে ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা কথা বলে। একদিন সে এসে শাসিয়ে যায়, তার কুমতলবে যদি নাসরিন রাজি না হয় তাহলে সে তার স্বামীকে বাধ্য করবে তাকে তালাক দিতে। তারপর স্বামীর আরেক বন্ধুর পরামর্শে নাসরিনের মানসিক অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটে।

খ. সামাজিক সমস্যা ও প্রতিবাদী গল্পসমূহ

কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের কাছে বিচারবুদ্ধি সমর্পণ করলে মানুষের পরিণাম ঘটে অনিবার্যভাবে অপমানে। সেই অপমান দেখা দিয়েছে ‘জিন’, ‘নেশা’, ‘ভূত ছাড়ানো’, ‘জিনা’ প্রভৃতি গল্পে।

জিন : অবয়ববাদী সমালোচকরা গল্পজাতীয় রচনায় ‘বয়ন’ ও ‘গল্প’ এই দুটো বিষয়ে যে একরকম ভাগ করে থাকেন, সে বিভাজনে আব্দুর রউফ চৌধুরীর মতো গল্পকাররা সঙ্কট তৈরি করেন। তাঁর মতো লেখকরা মনে করেন যে, বয়ন ছাড়া যেমন গল্প হয় না তেমনি গল্পকে সরিয়ে নিলে বয়নের ভিত্তি থাকে না, তাই তাঁর মতো লেখকরা বিশেষ যতেœ কাহিনীকে মূল ভিত্তি করে ভাষা ও কারুকাজে গল্প-নির্মাণের কাজটি ফুটিয়ে তুলেন। সমগ্র গঠন এবং ক্ষুদ্রতম অংশ-দুটোই তখন চিহ্নিত পরিচর্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়। আব্দুর রউফ চৌধুরীর এই গল্পে এর প্রমাণ মিলে, যা প্রকাশ করতে তিনি গ্রামেই আশ্রয় নিয়েছেন। এই গল্পে গ্রামের মানুষ সমন্ধে তাঁর মমতা ও বেদনার পরিচয় ব্যাপক। গ্রামের মানুষের জীবনের উল্লাস ও বেদনা, সুখ ও কেদ, বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার ছবি যেমনি প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি তাদের মুখের ভাষা তাঁর কলমের আঘাতে এক অসাধারণ বিশ্বস্ত ছবি ফুটে উঠেছে, যা মানবিক সহানুভূতির পরিচয়-প্রকাশই বটে। এ-গল্পে লেখকের দেখার দৃষ্টি মনে হয় দূর থেকে নয়, বরং একেবারে কাছ থেকে দেখা। এ-গল্পের চরিত্রগুলোর ভাবনা ও বেদনাকে ঘিরে মনস্তত্ত্ব প্রাধান্য পেলেও গ্রামের মানুষের জীবন-আচরণ ও পরিবেশের তথ্যনিষ্ঠ ও জীবন্ত বিশ্বস্ত চিত্রই ফুটে উঠেছে। পরিবেশ সম্বন্ধে কয়েকটি উদাহরণ তুলে দেওয়া যাক :

১.   […] গোপাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ কলাগাছটি নীরবে আঁকড়ে রয়েছে মাটি ও পানি।

২.   চাঁদ উঁকি দিল আবার, সঙ্গে সঙ্গে চাঁদকে নিয়ে বাঁশবনের ফাঁকে কচুরিপানাগুলো লুকোচুরি খেলতে শুরু করল […]।

৩.   ঘর নিঝুম, আকাশ নিঝুম, বাঁশপাতা নিঝুম, তবে বাঁশবনে ব্যাঙের দল সুর তুলেছে আবার, ঘ্যাঙোর ঘ্যাঙোর; ডুবাজলে মাছের লাফালাফি চলছে সফাৎ সফাৎ […]।

৪.   পুকুরের পাড় ডুবুডুবু করে পৃথিবী শান্ত হল, পাড়ার ছাগলপাল কান্না থামাল […]।

৫.   […] সিদ্দিক আলীর দাওয়ার চাল উড়ে গিয়েছে, হা-হা করছে, যদিও ছনের কোনো দোষ ছিল না, দিন কয়েক আগেও সে শক্তহাতে মেরামত করেছিল, বেঁধেছিল ঝাউবেত দিয়ে, তার ওপর ছেঁড়া মাছধরার জালটিও ছড়িয়ে দিয়েছিল।

গল্পটি মনস্তত্ত্ব প্রধান, জীবনের সফলতা-ব্যর্থতা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আমেনা নিজের অন্তরকে শূন্যতায় বিষণœ করে রাখে। সিদ্দিক আলী মমতা ও স্নেহ দিয়ে আমেনাকে আরোগ্য করে তুললেও পীরের অত্যাচারের কোনো প্রতিবিধান করতে পারেনি, বরং পীর যখন ‘বিদায় নিতে উদ্যত’ হন তখন ‘গায়ের রক্ত পানি-করা’ অনেক দিনের প্রচেষ্টায় যে ক’টি টাকা জমিয়েছিল, তা সে নিঃশব্দে মোল্লাজির হাতে তুলে দেয়।

‘জিন’-গল্পে আব্দুর রউফ চৌধুরী রূপ-কলা-কৌশল গভীর মানসিকতায় সমৃদ্ধ করে গল্পনির্মাণের এক অসামান্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন; তিনি গল্পের নির্মাণকলা সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন। একটি ভূতকে চিহ্নিত করে পরম যতেœ মানুষের ব্যবহার ও অপব্যবহারে গল্পটির আখ্যান রচিত হয়েছে। ভূতে-ধরা এবং পরে আবার ভুতে-ছেড়ে যাওয়ার মধ্যে মানুষের গল্প থেকে একটু সময়ের জন্য নজর সরিয়ে আবার মানুষের আরও গভীরতর গল্পে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন-এতে বাংলার অবহেলিত নারীজাতির সবচেয়ে দুঃখের বা অপমানজনিত ইতিবৃত্তিটি গ্রথিত হয়েছে। গল্পের রূপ-কলা-কৌশল যেমন শক্তিশালী তেমনি কাহিনীও। উপসংহারে একটি ঘটনা অতিক্রম করে আরেকটি ব্যাপ্ত ব্যঞ্জনার সন্ধান পাওয়া যায়। আমেনার প্রত্যাশাপূর্ণ প্রশ্ন-‘গেছি তো ভালাই করছি। তুমি অত ভাবীর কথায় নাচ কিয়র লাগি কওছান হুনি?’ এখানেই যেন মূল গল্পটি শুরু হয়। স্ত্রীর মুখে কী সিদ্দিক আলী সন্ধান করে তার নিজস্ব জীবনভূগোল, তার এতদিনের অস্তিত্ব ও অবস্থানের সূত্র, তার বন্ধন-এসবই ভাবতেই থাকি। ভাবতে থাকি এ-গল্পের রস মোপাসাঁ বা ও’হেনরির রচনার চমক সম্বন্ধে, যা অলক্ষিতই থেকে যায়। আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পের বিষয়ে যেমন মানুষের আত্মার টান আছে ঠিক তেমনি নির্মাণকলাও বিস্ময়কর ও স্বতন্ত্রভাবে ফুটে উঠেছে।

নেশা : মানুষের জীবনের মৌল রূপটি যতই আদিম হোক, কী তার আসল রূপ-এই ভাবনা থেকেই রচিত হয়েছে ‘নেশা’ গল্পটি। এ-গল্পের কাহিনী হচ্ছে এরকম: জাবেদ নামের এক প্রবাসী বাঙালির এক-রাত ও এক-সকালের ঘটে-যাওয়া ইতিবৃত্ত। তার সূত্র ধরে গল্পকার চরিত্র ছাড়িয়ে মানব স্বভাবের আদিমতম বৃত্তি-যৌনতা, ধার্মিকের নির্দয়তা, বিদেশির ক্রুরতা, বন্ধুর প্রতি বিশ্বাস প্রভৃতি বিষয়ের সমন্বয়ে বেঁচে থাকার প্রয়াসগুলো অতি নিপুণতার সঙ্গে পরিবেশন করেছেন। শত বাধা-প্রতিকূলতার মধ্যেও জাবেদ পরাজয় মেনে নেয় না, সর্বদাই সে যেন অপ্রতিহত ও অনবদমিত। সবকিছুর মধ্যে জীবন উপভোগের এক প্রবল বাসনা তার ভেতর সক্রিয় থাকে। এই গল্পের প্রথম ঘটনাস্থলরূপে নির্দিষ্ট হয়েছে ব্রিকলেন, পরে অক্সফোর্ড স্ট্রিট; আর শেষ হয়েছে আবার প্রথম ঘটনাস্থলে। নারীর সঙ্গবিহীন এক নিরুৎসাহ জীবনের জ্বলন্ত ছবি লেখক এঁকেছেন কাহিনী-বিন্যাসে ও বর্ণনার রঙে-রসে। তিনি জাবেদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ফুটিয়ে তুলতে উপকাহিনীর সাহায্য নিয়েছেন। বর্ণনার বাস্তবগুণ, বাস্তবতার অভ্যন্তরে প্রবাহিত লেখকের স্মৃতি, বৃহত্তর সামাজিক ও গভীরতর মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিত-সবই যেন প্রকাশিত হয়েছে এ-গল্পে।

বর্ণনায় ব্যবহৃত হয়েছে চলিতগদ্য, লেগেছে কাব্যের স্পর্শ। বর্ণনার মাধ্যমেই অনেকটা খোলাখুলিভাবে প্রকাশ পেয়েছে নারীর সঙ্গবিহীন পুরুষের জীবনের চিত্রটি। এতে গল্পের রসহানি হয়নি বরং গল্পের প্রাণে সাড়া জাগিয়েছে, কাঠামোতে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে গড়া জীবনের পরিপূর্ণ ছবি অনাবিষ্কৃত থেকে যায় যদি না এতে থাকে মানুষের গোপন ইচ্ছার প্রকাশ। দেহের বাসনাকে অস্বীকার করলে জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ দেখানো অসম্ভব। দ্রোহীশিল্পী এ-থেকেই উপকরণ খুঁজে নেন, খ- পরিসরে সৃষ্টি করেন মানুষের পূর্ণাবয়ব চিত্রটি। এই গল্পের গঠনে লেখক প্রচলিত পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। বর্ণনার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন সংলাপ, যার ভাষা স্বতন্ত্র। গল্পের কেন্দ্রীয় ভাব একেবারে গল্পের শেষতম অনুচ্ছেদে ফুটে উঠেছে :

জাবেদ তার দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল, ‘গতরাতে কি হয়েছিল? কোনো গোলমাল করেনি তো?’ হেসে উঠল অভিষেক, তারপর বলল, ‘না।’ জাবেদকে দেখতে দেখতে সে মনে মনে বলল, গতরাতের যে-বিরক্তি, যে-তিক্ততা আমার ভেতর নাড়া দিচ্ছিল-সবকিছুই যেন বিলাতি তুষারের মতো হাওয়া হয়ে উড়ে গেছে।

পাঠক রুদ্ধশ্বাসে গল্পটি শেষ করবেন কিন্তু পাঠ শেষে তার অন্তরে অনেক জিজ্ঞাসার জন্ম নিবে; এখানেই গল্পকারের কৃতিত্ব। বাংলাদেশের ছোটগল্পে এরকম গভীর ভাবদ্যোতক প্রেরণা বিরল।

ভূত ছাড়ানো : ‘ভূত ছাড়ানো’ গল্পে লেখক বাঙালি জীবনে বহুদিন থেকে চলে আসা একটি বদ্ধমূল ধারণায় কুঠারাঘাত করেছেন। ভূত-প্রেতে বিশ্বাস বাঙালির আবহমান কাল থেকে। মদরিছের স্ত্রীর ভূত ছাড়াতে আসা অর্থলোভী কামুক পীর এবং সে ভূত ছাড়িয়ে অর্থ নিয়ে যায়। কিন্তু শেষপর্যন্ত জানা যায় আসলে মদরিছ তার স্ত্রীকে ‘নাইওর’ যেতে দেয়নি তাই সে ভান করেছিল। এই গল্পের মধ্য-দিয়ে গ্রাম্য কুসংস্কারের কারণে সরলপ্রাণ মানুষগুলো কিভাবে প্রতারিত হচ্ছে তারই বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছেন গল্পকার।

জিনা : নীলার জীবনের সঙ্কট অবলম্বন করে নারী ও পুরুষের মিলনে সৃষ্ট জিনা-নামক সামাজিক সমস্যাকে আশ্রয় করে সুযোগসন্ধানী তৎপরতার উপর আলোকপাত করেছেন গল্পকার। এই গল্পে একদিকে তিনি একটি নারীর চিন্তাচেতনাকে যেমন শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তেমনি গুরুত্ব দিয়ে দেখিয়েছেন নারীর মর্যাদা কিভাবে অতি উৎসাহী ধর্মরক্ষকদের হাতে পর্যদস্ত হয়। এ-গল্পে তাত্ত্বিক কথাবার্তাই প্রাধান্য লাভ করেছে।

গ. মনস্তাত্ত্বিক

মানুষের মনের লীলা-বৈচিত্র্যকে প্রধান্য দিতেই হয়তো আব্দুর রউফ চৌধুরী ‘রানী’, ‘সৃষ্টিতত্ত্ব’, ‘পরিচয়’, ‘শাদি’ প্রভৃতি গল্প সৃষ্টি করেছেন। পাঠকচিত্তকে আন্দোলিত করতে, বিক্ষুব্ধ করতে এসব গল্পের বিষয়বস্তু হয়তো নির্বাচন করেছেন তিনি। তাঁর তুলিতে উদয় হয়েছে অনুভূতির বিচিত্র প্রতিক্রিয়া, এ যেন প্রদীপের আলোর মতোই ক্ষণস্থায়ী, যা পাঠক-মনকে আকৃষ্ট করে, পাঠক-হৃদয়ে কল্লোল জাগায়। আব্দুর রউফ চৌধুরী যা সৃষ্টি করেছেন তার মূল সুর গভীর তত্ত্বের নয়, সাধারণ মানুষের মনের পাতায় যে দু-চারটি সূক্ষ্ম অনুভূতির রেখা ফুটে ওঠে তাই যেন।

রানী: ‘রানী’ গল্পের ভাবসম্পদে ‘রেলস্টেশন’ প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে হৃদয় আবিষ্কারের প্রয়াসকে ব্যক্ত করা হয়েছে। রানীর হৃদয়ের বিকাশ লক্ষ্য করার মতো। এই বিকাশ সাধনে লেখক যে স্বাভাবিক গতি দান করেছেন এতে গল্পটি রসসিক্ত হয়ে উঠেছে। কাহিনীর পটভূমি করাচির সেনানিবাস। এই সেনানিবাসের মানুষগুলোর প্রকৃত রূপ চর্মচক্ষে ধরা পড়ে না, এর দর্শনের জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতাসজ্ঞাত উপলব্ধি। সাধারণ দর্পনে প্রতিবিম্বত হয় যে চেহারা সেটা মানুষের অন্তরলোকের নয়, ঘনিষ্ঠ-সম্পর্ক থেকে যা উন্মুচিত হয় সেটাই সঠিক চিত্র। মোটামুটি এই বিষয়টির উপরই গুরুত্ব আরোপ করেছেন গল্পকার। স্বামীর চরম অবহেলায় রানীর মনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা লেখক দেখিয়েছেন, তিনি জানেন, নারীর সম্ভ্রম বিনষ্ট হয়ে গেলেও গল্পে সৃষ্টি করতে হয় নতুন আলোর ঝর্ণাধারা, যা জীবনমুখী ও মহৎ আবেদনমুখী। আফসারের বন্ধু কায়সারকে কেন্দ্র করেই এ-কাহিনীর সূত্রপাত।

কায়সারের বুকের ভেতর শিরশির করে উঠল, এই সম্পর্ক সে প্রাণপণ অস্বীকার করতে চায়, ঠেলে দিতে চায় মাথা থেকে, তারপর নিজেকে সংযত করে বলল, ‘না মানলে কি করবে?’ কায়সার সম্পর্কটিকে না-মানলে রানীর মনের অব্যক্ত কথাগুলো উচ্ছ্বসিত জলাশয়ের মতো ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে হৃৎপি-ের গভীরে হারিয়ে যাবে; যেখানে বনমোরগের ডাক চলছে-অনিয়মিত, বর্ণশূন্য, রুক্ষ; ঘরের বাতাসের মতো অনিশ্চিত; অনিশ্চিত ঘাসহীন, কাদাহীন রোদভেজা মরুবালুর মতো, অনিশ্চিত সিন্ধুনদের উপর বয়ে চলা লবণাক্ত লু-হাওয়ার মতো-কখনো হিম, কখনো শীতল, কখনো বরফঠা-া, আবার কখনো রঙচটা নি®প্রাণ বস্তুর মতো ফ্যাকাশে। কায়সার জানে, অব্যক্ত হৃদয়ের কথাগুলো কঠিন জটলায় ডুবে গেলে সেখানে জন্ম নেবে লাল-নীল রক্তের জটিল মোহনা, আস্তেধীরে ক্ষতস্থানটি শুকিয়ে উঠলেও বিবর্ণ মরা হৃদয়ের অব্যক্ত কথাগুলো বঞ্চিত ঘটঘটে হতে হতে একসময় বিলীন হয়ে যাবে, সঙ্গে হৃদয়ের শেষ আকাক্সক্ষাটিও; কিন্তু অব্যক্ত কথাগুলো ব্যক্ত করতে পারলে হৃদয়াঘাতপ্রাপ্ত জায়গাটি ছেঁড়া কাগজের মতো শুকোবে, জীবনবৃক্ষে সজীবতা লাভ করবে, শরীর প্রেমকামের তৈলাক্ত রসে ঋজু হবে।

ঘটনার উন্মোচনে রয়েছে নাটকীয়তা, বিকাশে দুর্ধমনীয় সংশয়, উপসংহারে স্বস্তির আবরণে মোড়া অতৃপ্তির রেশ-ফলে ছোটগল্পের সব গুণই এতে প্রকাশিত, বিকশিত। এ-গল্পের নামও যেন রূপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। লেখক এ-গল্পে একটি বাস্তব সমস্যা তুলে ধরায় উদ্দেশ্যমূলকতার সীমাবদ্ধ গ-ী অতিক্রম করে এর আবেদন পাঠকের মর্মমূলে স্পর্শ করেছে।

সৃষ্টিতত্ত্ব : একটি মনোবিশ্লেষণধর্মী গল্প, যার কেন্দ্রীয় চরিত্র শরিফসাবের বিচিত্র অনুভূতির শৈল্পিকরূপ লেখক নিপুনতার সঙ্গে অঙ্কন করেছেন। হৃৎ-আক্রমণ থেকে শরিফসাবের মনে জন্ম নেয় একরকম অনিশ্চিয়তা।

স্বল্প সময়ের ভূমিকম্পে যেমনি একটি শহরের চেহারা বদলে যায় তেমনি কয়েক সেকেন্ডের বিশ্বাসে জীবন সম্বন্ধে শরীফসাবের ধারণাগুলো উলটেপালটে গেল।

এই ক্ষণিকের আক্রমণ তার মস্তিষ্ক থেকে অন্তর্হিত হলেও আবির্ভূত হয় নানা উপসর্গের। উপসর্গরূপে দেখা দেয় ধর্মের প্রতি ক্ষোভ ও ধর্মীয় অনুভূতির বিপরীতে বিজ্ঞানের জয়গান।

উঠতি বয়সী এক মুছল্লির গোঁফের নিচে ফুটে উঠেছে মৃদু নাচন। সে তার বন্ধুর কাছে শোনেছিল, ‘বিজ্ঞানের মতে বিবর্তনের পথ ধরে মাত্র ৩০ হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষ এই পৃথিবীতে এসেছে। রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রথমে সৃষ্টি হয় হাইড্রোজেন; তারপর নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অণু-পরমাণু, রেপ্লিকেটিং মলিকিউল, জীবন্ত প্রোটোপ্লাজম; একসময় গঠনহীন প্রোটিন থেকে নিউক্লিয়াস আর কোষঝিল্লি, কৌষিক আর অকৌষিক প্রটিস্টার অসংখ্য প্রজাতি, প্রাথমিক উদ্ভিদ তারপর প্রাথমিক প্রাণী, তারপর প্রাণী-জগতের অগণিত শ্রেণী-বর্ণ-বংশের প্রকার আর প্রজাতি, শেষপর্যন্ত মেরুদ-ী প্রাণী এবং শেষত মানুষ। প্রাণের মূলবীজ হচ্ছে ডিএনএ, যার অণু দেখতে মোচড়ে কু-লিপাকানো মইয়ের মতো, এর ধাপগুলোতেই রয়েছে জৈবসংকেত।’ এসব কথা মনে পড়াতেই তার গোঁফের নিচে ফুটে উঠেছে মৃদু নাচন।

বিচিত্র অনুভূতির সমাবেশ শরিফসাবের চিন্তাচেতনাকে জটিল করে তুলে। শারীরিক বিপর্যয় থেকে যে ভীতি নামক উপাদানের জন্ম, জীবনের আপাত তুচ্ছ সমস্যার সম্মুখবর্তী হয়ে সেই ভীতি রূপান্তরিত হয়েছে বিভিন্ন ভাবে।

গল্প আর জমে উঠল না। গল্পের লেখকও এতে নিরাশ হলেন। ঘটনাটি যদি ঘটে যেত তাহলে তিনি পাঠককে নিয়ে কল্পনার রথে চড়ে স্বর্গে চলে যেতে পারতেন, স্বর্গের বর্ণনা দিতে তখন অসুবিধা হত না, কিন্তু তা আর পারলেন কই!

লেখক এ-গল্পে বাংলা সাধুগদ্য ও চলিতগদ্য দুটোই ব্যবহার করেছেন। গল্পে বর্ণিত চরিত্র ও ঘটনার সঙ্গে সচেতন শিল্পীর যে মমত্ব ও নিরাসক্তি-সমন্বিত সঠিক অবস্থান থাকা দরকার তা লেখক আয়ত্ত করেছেন।

পরিচয় : মনস্তত্ত্ব নির্ভর গল্প। গল্পকার অনেকটা মনোবিজ্ঞানীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বিশ্লেষণ করেছেন এক যুবকের মনস্তত্ত্ব। মূলত সফিকের মনস্তত্ত্ব, দ্বন্দ্ব-যন্ত্রণা-অস্থিরতা।

পিতৃপরিচয়ের অভাবে সফিকের আত্মদাহন, মায়ের উপর বর্তমান পিতার পৈশাচিক অত্যাচার এবং পিতৃপরিচয় পাওয়ার পর তার গভীর আত্মতৃপ্তি নিয়ে লেখা ‘পরিচয়’। প্রসঙ্গক্রমে মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, নারী ধর্ষণ এবং ধর্ষণে তাদের ঔরসে জন্মগ্রহণ করা সন্তানদের প্রসঙ্গ সংযোজিত হওয়ায় গল্পটি ঋদ্ধ হয়েছে।

শাদী: ‘শাদী’ গল্পে পুরুষের জন্যে একাধিক বিয়ে কখন এবং কেন জায়েজ এবং বিয়ের আগে বর-কনে পরস্পরের মধ্যে আলাপচারিতার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপকারিতা ইত্যাদি বিয়ে বিষয়ক বিভিন্ন প্রসঙ্গ প্রাধান্য পেয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে বোবা-কনের বিয়ের প্রসঙ্গ সংযোজিত হওয়ায় গল্পটি ঋদ্ধ হয়েছে।

 

ঘ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে কয়েকটি গল্পকে বৈশিষ্ট্য ম-িত করেছে ‘অপেক্ষা’ ও ‘পিতা’, ‘বীরাঙ্গনা’, ‘বাহাদুর বাঙালি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব গল্পের প্রেরণার মূলে সন্ধান পাওয়া যায় রাজনীতি সচেতনতা ও স্বদেশপ্রেম।

অপেক্ষা : ‘অপেক্ষা’ ছোটগল্পের প্রেরণার মূলে পাওয়া যায় রাজনৈতিক সচেতনতা ও স্বদেশপ্রেম। গল্পটি একজন দেশপ্রেমিক কর্মীর দেশের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন ভালোবাসার বিমূর্ত প্রকাশ। আব্দুর রউফ চৌধুরীর সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর অনুরাগ এখানে তীব্রভাবে উপস্থিত; কারণ, রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়ের মধ্যেও জেগে থাকে সত্যের উদবোধন। এ-গল্পের মৌল চেতনায় রয়েছে আত্মপ্রবঞ্চনার মধ্যে বসবাস করা কাপুরুষ ও স্বার্থপর শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে সুউচ্চ প্রতিবাদ। গল্পটি রচিত হয়েছে বাংলাদেশ সৃষ্টির ক্রান্তিলগ্নে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ নিঃসন্দেহে জাতীয় জীবনের বিশেষ মুহূর্ত-জাতির ভাগ্যাকাশে একটি নক্ষত্র উদিত হওয়ার সময়ে প্রবাসীর মনে কোনো দ্বিধা থাকা অসম্ভব। গল্পের ভাবধর্মে এই বিশেষ চিন্তা ব্যবহৃত হয়েছে। এরসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে পুঁজিবাদী সমাজের নিচতলার জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সঙ্কট ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে সাধারণ মানুষের মনে যে জটিল মানসক্রিয়ার উদ্ভব ঘটে তা। এই সাধারণ মানুষেরই একজন নাসিম, গল্পের নায়ক। নাসিম চরিত্রের আশ্রয়ে এক অন্তর্প্রবাহী প্রতিবাদী চেতনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। নাসিম চরিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই লেখকের ব্যক্তিত্বের ধারক। ব্যক্তিগত জীবনে লেখকের সংযোগ ছিল শ্রমিক-সংগঠনের সঙ্গে; আর তাঁর মতোই গল্পের নায়কের আছে মানবেতর মানুষের প্রতি মমতা ও শ্রদ্ধা। গল্পকার পাকিস্তান আমলের সামাজিক পটভূমিতে বাংলাদেশে যে নতুন জীবনাদর্শের উন্মোচন ঘটছিল এর অন্তর্গত সমস্যাগুলোকে তত্ত্বগতভাবে নয়, সরেজমিনে বিচরণ করে, তাঁর অভিজ্ঞতায় চিহ্নিত করে সার্থকভাবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি রহস্যকার নন, রহস্যভেদী। মনন ও অভিজ্ঞতার এমন মিলন বাংলা ছোটগল্পের ক্ষেত্রে বিরল।

ফোঁস ফোঁস আওয়াজে প্রতি নিশ্বাসে ধূমোদ্গার করে যে রেলগাড়িটি করাচি অভিমুখে ছুটে চলেছে তারই তৃতীয়শ্রেণীর এক কামরায় বসে থাকা নাসিম আহমেদ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখতে পেল, এঞ্জিনের নির্গত ধূম্ররাশি আকাশের নীলের সঙ্গে মিলেমিশে ধূসর বর্ণ ধারণ করে যেন বাজপাখির মতো ডানা মেলে আছে।

নাসিম রেলগাড়িতে করে করাচি যাচ্ছে। গল্পের ভাবসম্পদে ‘রেলগাড়ি’ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা হয়ে উঠেছে মূল্যবোধকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখার ঐকান্তিক প্রতিজ্ঞা। এ-যেন দরিদ্রবর্গের জীবন এবং তাদের বাঁচবার সংগ্রাম, প্রতিরোধ, দেশ-সমাজ-শ্রেণী রক্ষার বিপ্লøবী ভাব। নাসিমের রেলগাড়ির যাত্রা এবং তার স্মৃতিচারণের মাধ্যমে জাতীয় ও স্থানীয় জীবনের সঙ্কটকে বোঝানো হয়েছে। যেমন :

১.   সেপাইদ্বয় যদি ইতরপ্রাণী না হত তাহলে মানুষের এত ভিড়ে অসভ্যের মতো সটান শুয়ে থাকত না; […]।

২.   সীমান্তপথে জিনিশ ও মানুষ যাতে বে-আইনিভাবে পারাপার হতে না-পারে সেজন্য প্রহরী মোতায়েন করেছে সরকার; কিন্তু উপরি রুজি ছাড়া তার  মতো গরিবের সংসার চলে না।

৩.   […] পরাধীনতার জগদ্দল পাথর যে-কোনো বিদেশির নামে আপনি বহন করেন না কেন, পরাধীনতার তীব্রতা দিনদিন বাড়েই, […]।

৪.   নাসিম বিস্ময়ানন্দে চিৎকার করে উঠল, ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’

নাসিম তার সময়ের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তন চায়, তাই তার কল্পনায় থাকে একদিকে অতীত ও বর্তমান জীবনের গ্লানি অন্যদিকে ভবিষ্যতের সজীব প্রাণপ্রাচুর্য ভরা জীবনের স্বপ্ন। সে নতুন রাষ্ট্র গড়ার জন্যই চায় দেশের আমূল পরিবর্তন। নতুন দেশ তৈরি করার কিছু কারণ সে স্পষ্ট করে; যেমন :

পরীক্ষানিরীক্ষার অজুহাতে ঢাকা-দেহ-ধমনীর রক্ত শাসকগোষ্ঠী শোষণ করে এনে করাচির শিরা-উপশিরায় নবজীবন সঞ্চার করছে। ক্লাইভের খঞ্জর তারা উত্তরাধিকারের সূত্রে পেয়েছে বলেই হয়তো এমন করছে! তারা এর উপযুক্ত জবাব পাবে যদি বাঙালি জাতি একদিন জেগে ওঠে।

একটি নতুন দেশ রচনার দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় গল্পের সমাপ্তি ঘটে। এখানেই গল্পের আসল আবেদনটি সৃষ্টি হয়েছে। সংগ্রামী অগ্রগতি বা জাগরণকে অবশ্যম্ভাবী করার লক্ষ্যে লেখকের মানবতার আদর্শ স্থাপিত হয়েছে। এখানেই তিনি তারাশঙ্কর, ননী ভৌমিক, মনোজ বসু, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু পত্রী বা আজাদ থেকে পৃথক। এই জাগরণ তাঁর মাকর্সবাদী চিন্তার ফসল নয়, তবে শোষণহীন সমাজ-ব্যবস্থা প্রবর্তিত হোক এই তাঁর চেতনার মূল সুর। নাসিম বাংলা সাহিত্যে নতুন নয়, কিন্তু সে লেখকের হাতে আরও বিস্তৃত। গল্পকারের সহজাত দ্রোহী চেতনা এখানে সক্রিয়।

পিতা : বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমিতে রচিত আর একটি গল্প। নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে যে চেতনা বিরাজ করে সেই সময়ের বিশেষ মুহূর্তগুলো এ-গল্পের প্রাণধর্মে ব্যবহৃত হয়েছে। এ-গল্পের নায়ক একজন পিতা। তিনি তার প্রিয়তমাকে হারালেও তার একমাত্র সম্বল তার মেয়েকে নিয়ে একটি নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেন। তার প্রিয়তমা না-থাকলেও তার আছে স্বদেশপ্রেম, আছে সন্তান। পিতা বুঝতে পারেন তার জীবন দিয়ে সন্তানকে রক্ষা করাই হচ্ছে এই ক্রান্তিলগ্নে দেশমাতৃকার বৃহত্তর কর্মকা-ে নিজেকে নিয়োজিত করা। কারণ, একজন পিতার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে তার সন্তানের মঙ্গলময় ভবিষ্যৎ স্থাপন করা। প্রত্যেক পিতাই তার জীবনের সমস্ত কিছু উজাড় করে সন্তানকে তার সাধ্যমতো বাঁচিয়ে রাখতে চান। আব্দুর রউফ চৌধুরীর এ-গল্পে এ-ধরনের বিষয়ই প্রকাশ পেয়েছে। পিতার অসহায়ত্ব কিভাবে প্রকাশ পায় মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে তারই এক অনুপঙ্খ চিত্র অঙ্গন করেছেন লেখক। এ-গল্পের বিশ্লেষণে যে বৈশিষ্ট্যগুলো দৃশ্যমান হয় সেগুলো হচ্ছে :

(ক) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকের সিলেট বিভাগের পল্লী অঞ্চলের একটি স্বচ্ছ ছবি পাঠকের দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করে।

(খ) আঞ্চলিক পরিবেশ সৃষ্টিতে সিলেট বিভাগের মুখের ভাষার ব্যবহার ঘটনাকে ঔজ্জ্বল্য দান করেছে।

(গ) যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের একটি হিন্দু দারিদ্র্যকিষ্ট পরিবারের সরস অভিব্যক্তির এক রূপ প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন, পোশাক-পরিচ্ছদ, সামাজিক আচার-রুচি ইত্যাদি। এসব বিষয় অবলম্বন করে আব্দুর রউফ চৌধুরী গল্পের রসকে ঘনীভূত করতে সক্ষম হয়েছেন।

এ-গল্পে সন্তানের কাছে দায়গ্রস্থ পিতার বিপন্ন-বিস্ময়কে উন্মোচিত করা হয়েছে কয়েকটি উপমা যোগে, যেমন ‘সোনালি ধানের ঝিলিক’, ‘পূবালী ঠা-া হাওয়া’, ‘তেলমাখা ও রঙজ্বলা গামছা’, ‘কালাচাঁন্দ অঞ্চল এখন শ্মশানঘাট’, ‘শয়তানের ত্রিশূল’ ইত্যাদি। এছাড়াও সন্ধান মিলে :

১.   যুদ্ধ কিভাবে মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়;

২.   যুদ্ধের কারণে কিভাবে একটি কৃষক পরিবার নিঃস্ব হয়, তার মর্মন্তুদ চিত্র;

৩.   শারীরিক দুর্বলতা, যুদ্ধের প্রচ- দাবদাহ, স্ত্রীর মৃত্যু, গৃহ-স্বদেশ ত্যাগ-সবকিছুর পরিণতিতে পিতার মন কিভাবে বিদ্রোহ করে; ইত্যাদি।

তবে গল্পের মূল আবেদনটি সৃষ্টি হয়েছে গল্পের শেষাংশে। গল্পের করুণ সুরের মধ্যেও বীররসের ধ্বনি প্রবহমান। পিতার উক্তি এক্ষেত্রে স্মরণীয় :

ক্ষোভে, দুঃখে, অন্তঃগ্লানিতে দিশেহারা পিতা দৌড়ে গেল তার পিতৃভিটের দিকে, একইসঙ্গে তার কণ্ঠে ধ্বনিত হতে লাগল, ‘ইতারেই কিতা স্বাধীনতা কয়?’ কেঁপে উঠল বাংলার বিষণœ বাতাস; প্রকৃতি রোষবিষ্ট, উষ্মান্বিত যেন; একচমকে শতাব্দীসুপ্ত ভীতু পিতার শরীরে শক্তি সঞ্চয় হল, সঙ্গে সঙ্গে তার মনে জেগে উঠল এক নতুন স্পৃহা-সন্তানকে রক্ষা করা যেমনি তারই কর্তব্য ঠিক তেমনি স্বাধীনতা রক্ষা করা তার মতো পিতারই দায়িত্ব।

সমাজ-বাস্তবতার শিল্পী হিসেবে আব্দুর রউফ চৌধুরীর যে প্রতিভা, তার আভাস পাওয়া যায় এ-গল্পে। যুদ্ধ দূরীকরণের প্রয়াসে লেখক শিল্পীর সততার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। এ-গল্পের ঘটনাতে আছে সহজ স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দ গতি। পরিবেশের বর্ণনাও কাহিনীকে উজ্জ্বল করেছে। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে আত্মবিশ্লেষণ। এ-গল্পে ঘটনার ক্রমবিকাশে এমন প্রবহমানতা আছে, যাতে অনিবার্যভাবে এসেছে নাটকীয় সংশয়দ্বন্দ্ব, যা গল্পের আঙ্গিককে করেছে ঐশ্বর্যম-িত। কাহিনী উপস্থাপনার কলাকৌশল, গঠনকৌশল-ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। গল্পটির নামও গভীর অর্থবহ।

বীরাঙ্গনা : এক সাহসী গ্রাম্য তরুণী তান্বীর অসীম সাহসিকতার আলেখ্য ‘বীরাঙ্গনা’ গল্প। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গল্পে পাক-হানাদার-বাহিনী ও রাজাকারদের পৈশাচিকতার বিপরীতে উপস্থাপিত হয়েছে বঙ্গ-ললনার বীরাঙ্গনা রূপ। গ্রাম্য-বধূ তান্বী যখন পশ্চিমা পিশাচদের হাতে নিহত স্বামীর শব জড়িয়ে আলুথালুবেশে বিলাপ করছে তখন পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদেও নেতা জাবেদের লোলুপদৃষ্টি পড়ে তান্বীর ওপর। কামলোলুপ জাবেদ তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলে তান্বী তার গালে প্রচ- চড় বসিয়ে দেয়। বঙ্গ-ললনার হঠাৎ এই মূর্তিতে হতচকিত জাবেদ ফিরে যায় তার সৈন্যসামন্তসহ। গল্পের বিষয়বস্তু আসলে প্রতীকী। এর মধ্য-দিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরতা এবং আপামর বাঙালির প্রতিরোধের চিত্র ফুটে উঠেছে।

বাহাদুর বাঙালি : ‘বাহাদুর বাঙালি’ গল্পে তীব্র ঘৃণা নিক্ষিপ্ত হয়েছে রাজাকারদের প্রতি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারদের ভূমিকা এবং এখন তাদের অবস্থান ও ক্রিয়াকর্মের বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে এই গল্পে। সময়ের ব্যবধানে যে তাদের অবস্থান ও বিশ্বাসের সামান্যও ব্যত্যয় ঘটেনি তারই যথার্থ আলেখ্য লেখক উপস্থাপন করেছেন।

ঙ. বাৎসল্য রস

বাৎসল্য রস বাঙালি চেতনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বাংলা ছোটগল্পের সূত্রপাত থেকেই এই শ্রেণীর গল্পের পরিচয় পাওয়া যায়। বাৎসল্য রসের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালি জীবনের অশ্রুসিক্ত করুণ দিকটিও। আব্দুর রউফ চৌধুরী এ-ধরনের একাধিক গল্প লিখেছেন; যেমন ‘নেশা’, ‘উপোসী’, ‘যৌতুক’, ‘ট্যাকরা-ট্যুকরি’ প্রভৃতি গল্প।

উপোসী : এ-গল্পের পরিবেশ গ্রামীণ। নিটোল, স্নিগ্ধ পল্লীর রূপ আব্দুর রউফ চৌধুরীর অন্য-গল্পে থাকলেও এতে আছে এক শ্রীময় হাতের স্পর্শ। আর একটি বিষয় এ-গল্পে পরিস্ফুটিত, যে-অঞ্চলের পটভূমিতে গল্পটির প্রাণকেন্দ্র নির্মিত তা হচ্ছে নদীর তীর-সংলগ্ন একটি অঞ্চল, যেখানে ধান-ক্ষেতের চেয়ে ঝিঙের জমিই বেশি। এ-গল্পের নায়ক, স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে এক কুঁড়ে ঘরের বসিন্দা, তরমুজ। সে তার স্ত্রীকে ভালোবাসে গভীরভাবে। তার অপর যে পরিচয় লেখক দিয়েছেন তা হচ্ছে:

[…] সে নিজের স্বার্থ ছাড়া এ-জগতে আর কিছুই বুঝে না। দুটো পয়সার জন্য কিনা করতে পারে। অলস-অকর্মণ্য জীবনযাপন করে বলে হয়তো সে নিজেকে একান্ত অসহায় ভাবে। স্বীয় পন্থায় উপার্জিত অর্থ নিঃশেষ না-হওয়া পর্যন্ত সে নিজেকে নতুন কাজে সম্পৃক্ত করতে পারে না, হয়তো-বা করতে রাজিও না; যদিও কিছুদিন পরের জমিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছিল, তবুও না, তবে সে জানে দশ-টাকার কাজ না-করলে পাঁচ-টাকার মজুরি পাওয়া সম্ভব নয়। কিছুদিন দালালিও করেছে বটে, হোক না সে গরুর দালালি বা জমির দালালি বা মাটির দালালি, কিন্তু এসব কাজে সে নিজের মনে শান্তি পায়নি, বরং তার সামনে মানুষের নিষ্ঠুর চেহারাই নানাভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্রমে সে হাড়ভাঙা শ্রমকাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। তারপর বৈধ উপায়ে টাকা উপার্জনের ধান্দা ছেড়ে গোপন ও অপ্রকাশ্য যত প্রকার নীতিবিগর্হিত পন্থা তার জানা আছে সেসব পথেই অগ্রসর হয়।

এ-গল্পে আব্দুর রউফ চৌধুরী এক জয়-দীপ্ত-দৃপ্ত অন্তরের চিত্র অঙ্কন করেছেন। সুস্থ সমাজে অস্বীকৃত চুরি, প্রতারণা প্রভৃতি কাজে সিদ্ধহস্ত তরমুজ। শুধু উপযুক্ত শারীরিক কাঠামো ও সাহসের অভাবে সে দস্যুবৃত্তিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি, তবুও  অন্যায় পথে জীবিকা নির্বাহ করতে তার কোনো সমস্যা নেই। আলস্য স্বভাবের তরমুজ উর্পাজিত অর্থ নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত সে নিজেকে নতুন কর্মে সম্পৃক্ত করতে চায় না। অসহায়তা কিংবা অস্তিত্ব জিজ্ঞাসার পীড়ন তার জীবনের নিত্য সঙ্গী। সহধর্মিনীর সঙ্গে তরমুজের সৌহার্দ্য ও মমতাপূর্ণ সম্পর্ক। সে বারুখানের ভোগ থেকে তার বউকে ভাগিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু তার বউয়ের রূপের মোহে সময় পেলেই  বারুখান তার কাছে যাওয়া-আসা করে; ব্যবসায় ঝুঁকি নিয়ে টাকা কর্জ দেয়, তরমুজের অতিরিক্ত কোনো আবেদন অনাগ্রহ থাকা সত্ত্বেও পূরণ করে। তরমুজ খাটলে তার রোজগার বৈধ ও আরও নিয়মিত করতে পারত, তবে তার ভালোবাসা তার স্ত্রীর প্রতি খুবই গভীর, সে বলে, ‘চাইছলাম বউটারে লইয়া সুখর এক সংসার বানাইতে। বউটার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা তো আর পথ তুকাইয়া পাওয়া প্রেমট্রেম না, যে আতখা আইল আবার আতখা পলাইয়া গেল।’  তবে সে তার প্রচ- রাগের সময় চোখ রাঙ্গালেও কখনো তার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলে না। এই সংযম প্রদর্শনই তার রূপমুগ্ধ রুচিস্নিগ্ধ মার্জিত মনেরই প্রকাশ। স্ত্রীর চোখে জল দেখা দিলে তার অন্তর গলে যায়; কিন্তু তরমুজ এক রৈখিক চরিত্র নয়, সে দ্বন্দ্বময় চরিত্র। সে তার অপরাধবোধ সম্পর্কে সচেতন। আজন্ম সে যে পেশায় অভ্যস্থ সেই চোর্যবৃত্তি নিয়েই তার মন দ্বন্দ্বময়। ‘সে মন্দ হতে চায়নি, তবে বাঁচতে হবে। চারদিকের অবিরাম ক্ষয়ের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চায়নি, কিন্তু…।’  আত্মগ্লানিতে পীড়িত তরমুজ নেতিবাচক জীবন পরিত্যাগ করে সুস্থ-সুন্দর জীবনে উন্নীত হওয়ার বাসনায় দীপ্ত হলেও সে তার পুরনো অভ্যাসের কাছে পরাভূত হয়। ‘হে আল্লাহ মানসম্মানএ আমারে ফিরাইয়া আইন্অ। আমার তাকদির তোমার লেখা মোতাবেক কাম করতাছে। আমার দোষ নিও না হে খোদা। তোমার হুকুম ছাড়া গাছ’র পাতাও লড়তে পারে না। তোমার হুকুমঐ চল্লাম।’  এ-গল্পে চোরের দুটো কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। একটি ছেলেমেয়ের উপোস আর অন্যটি অর্থের অভাবে তার স্ত্রী যেন বারুখানের সঙ্গে চলে না যায় সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়া।

তরমুজের অনৈতিকের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার স্বভাব এবং তার স্ত্রী-র প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ দুটো বিষয়ই অসাধারণ নৈপুণ্যের সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন লেখক। তরমুজ হয়ে উঠেছে সর্বার্থে বিশ্বাসযোগ্য একটি মানুষ। তরমুজের স্ত্রীর চরিত্রও সুচিত্রিত। তরমুজের ভালোবাসা সে গ্রহণ করে এবং প্রতিদানও দেয়। সন্তানের জন্ম দিয়েছে। সে অপেক্ষাকৃত মধ্যবিত্ত বাবরুখানের বাড়িতে কাজ করে তার স্বামীকে সাহায্য করার চেষ্টা করে। স্বামীকে ভালোবাসে বলেই সে চৌধুরী-বাড়ি থেকে তরমুজ চুরি করার পর সাফল্য নিয়ে ঘরে ফিরে এলে নিজেকে ছুঁড়ে দেয় তার আশ্রয়ে; এরকম চৌর্যবৃত্তি অসমর্থন করা সত্ত্বেও। তরমুজ ও তার স্ত্রীর চরিত্রের স্বাভাবিকতা, তাদের আচরণ-বৈকল্যের সূক্ষ্ম বর্ণনা চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্বকে ফুটিয়ে তুলেছে। এরসঙ্গে লেখক প্রথম সারির চলচ্চিত্র-পরিচালকের মতোই তাঁর কলমের রেখায় এই গল্পের কাহিনীকে দৃশ্যমান করেছেন।

¯œান : আব্দুর রউফ চৌধুরী ঘটনা নির্মাণে সুদক্ষ। একইসঙ্গে তাঁর প্রাঞ্জল বর্ণনার গুণে একটি ক্ষুদ্র স্থানও হয়ে উঠেছে রূপময়। এ-গল্পের প্রধান আকর্ষণ এই বর্ণাঢ্যতা। লেখক যেন কলরব মুখরিত জনপদের চেয়ে একটি নিস্তব্ধ স্নানাগারের ছবি আঁকতে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। মানুষ যেখানে আশ্রয় নেয় স্নানের জন্য সেখানের বর্ণনাটি এত স্বচ্ছ যে পাঠকের অনুভূতি একাত্মতা খুঁজে পায়। কাকলীর সুর-ছন্দ গদ্যময় পৃথিবীর অস্তিত্বকে ভুলিয়ে দেয়। প্রবাসী বাঙালি লেখকদের মধ্যে আব্দুর রউফ চৌধুরী প্রথম সক্ষম শিল্পী যিনি ক্ষণিকের ঘটে-যাওয়া ঘটনার আবরণে একটি বলিষ্ঠ চিন্তাকে প্রস্ফুটিত করতে সফল হয়েছেন। গল্পটির আবহ তৈরিতে লেখক সার্থক। পরিবেশ সরস। গল্পরীতির গুণে প্রবাসী মেজাজটি পাঠককে আন্তরিকভাবে আকৃষ্ট করে। একটি বিষয় এ-গল্প পাঠে প্রতীয়মান হয় যে, বাঙালি তখনো পাকিস্তানের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী। বিশেষ করে পাঠান-পাঞ্জাবি ও বাঙালির মধ্যে যে অসৌহার্দপূর্ণ সর্ম্পক ছিল এটি তারই নিদর্শন। প্রবাসে বাঙালির সামাজিক পটভূমিতে যে জীবনাদর্শের উন্মোচন ঘটে তিনি তার অন্তর্নিহত সমস্যাকে তত্ত্বগতভাবে নয়, সরেজমিনে বিচরণ করে সার্থকভাবে রূপদান করতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন :

১.   পাশ থেকে একটি নারীর চঞ্চল সুর ভেসে এল, এর মধ্যে যেন একটি পুরুষহীন জীবনের হাহাকার প্রকাশ পেল।

২.   আমি চার বছর পর দেশে ফিরে ছ-মাসও থাকতে পারিনি। যাওয়ার আগেই আমার একমাত্র ভাই একখ- জমি খরিদের সর্বাঞ্জাম করে রেখেছিলেন। এমতাবস্থায় আমি গ্যাঞ্জাম করলে ভাইটি আমার মানবে কেমন করে! […] একান্নবর্তী পরিবারের সুখ-সুবিধা আর গুণগাথাকীর্তন করতে করতে গাজীর বয়ানের মতো আমি আম্মার সুরে সুর মিলাতে না-পেরে পালিয়ে এলাম একপ্রকার অতিষ্ট হয়ে।

৩.   […] তার দেহ-বিলাতি কষ্টিপাথরের ধাক্কা খেতে খেতে কেমন যেন ঝরে পড়েছে।

৪.   […] পাঞ্জাবিকে দিগম্বর বেশে দেখতে পেয়ে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। […] ইংরেজের সংস্পর্শে এসে হয়তো পাঞ্জাবিরা এভাবে নাঙ্গা হয়ে স্নান করার স্বাদ পেয়েছে।

৫.   পাঞ্জাবি এয়ারম্যানদের সঙ্গে পাঞ্জাবিতে গল্প করে, আমাদের কাছে আসতেই কর্পোলটির মেজাজ বিনা কারণে বিগড়ে গেল। পাঞ্জাবির প্রতি যেমন ছিল তার অগাধ আশা-ভরসা, তেমনি ছিল বাঙালির প্রতি অপরিসীম সন্দেহ আর ভয়। তার ধারণা ছিল, অপদার্থতায় নিখিল পাকিস্তানে বাঙালির সমকক্ষ আর কেউ নেই; তাই মনে মনে বাঙালির সদগতির উপায় নির্ধারণ করত; […]।

আব্দুর রউফ চৌধুরী এ-গল্পে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি খ- মুহূর্তকে চিত্রিত করেছেন। যেখানে আছে সমস্যা, সঙ্কট, আত্মজিজ্ঞাসা সব মিলে পরিপূর্ণ জীবনকে জানার প্রয়াস। এ-গল্পে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র ছবি আছে, কিছু সুখের কিছু দুঃখের; তবে সচল জীবনধারার একটি সুগীত ধ্বনি গল্পের আবহে ক্রিয়াশীল। এখানে আব্দুর রউফ চৌধুরীর দ্রোহ সত্তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না, বরং সাধারণ জীবনাচরণে মমতার বন্ধন যেখানে উচ্চারিত তারই সন্ধান পাওয়া যায়। স্মৃতিচারণে আছে লেখকের দেশকে জানার দুর্দমনীয় ইচ্ছার প্রকাশ।

যৌতুক : যৌতুকপ্রথাকে উপজীব্য করে গল্পকার লিখেছেন ‘যৌতুক’ গল্প। মাওলানা মোহম্মদ আবদুস সবুর আখন্দ তার পুত্রের বিয়েতে রঙিন টিভি যৌতুক দাবী করেন। কোনো ভাবেই তিনি যৌতুক ছাড়া বিয়ে করাবেন না। ফলে বিরোধ বাঁধে কলেজ পড়–য়া, জিনস্-পরা তার ছেলে জাফর ইকবালের সঙ্গে। পিতা ধর্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে যৌতুক গ্রহণকে জায়েজ বলে প্রতিপন্ন করতে চায়, অন্যদিকে পুত্র আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ধর্ম ও সামাজিক অবস্থার যথার্থ মূল্যায়নের মাধ্যমে পিতার যুক্তির অসারতা প্রমাণের চেষ্টা করে। যখন মাওলানা সাহেবের ভাগ্নি শ্বশুরবাড়িতে যৌতুকের জন্যে অত্যাচারিত হয়ে মৃত্যু বরণ করে তখন তার বোধদয় হয় এবং যৌতুক ছাড়াই পুত্রের বিয়েতে তিনি সম্মত হন। গল্পকার আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর লেখনী সর্বদাই কুসংস্কার ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এ গল্পেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। সে সঙ্গে নিজে কষ্টে না পড়লে যে অন্যের কষ্ট অনুভব করা যায় না তার প্রমাণ করেছেন।

ট্যাকরা-ট্যুকরি : কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে ‘ট্যাক্রা-ট্যুক্রি’ গল্প। এই গল্পে লেখকের মনস্বিতার পরিচয় সুস্পষ্ট। নারী নির্যাতন, নারী অধিকার, ধর্মেও নামে নারীকে দাবিয়ে রাখা এবং ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণ দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগের সার্বিক চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। অশিক্ষিত মুসলিম সমাজে মৌলভীদের দৌরাত্ম্যে কিভাবে শিশু ও নারী নির্যাতিত হচ্ছে তা লেখক তুলে ধরেছেন।

 

২.

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে, প্রায়ই দেখা যায়, চরিত্রগুলোর বহিঃসংঘাত ও অন্তঃসংঘাতে যে আবহ টানটান হয়ে ওঠে সমগ্র বয়নে, তারই পরিণাম হিসেবে এসেছে একটি শেষ আলোড়ন-অনেক ক্ষেত্রেই গল্পের শেষে। তাই বলা যায় যে, আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে একটি ‘শেষ মোচড়’ আছে। কখনো এসেছে দাম্পত্য জীবনের জটিলতায়, বিচ্ছেদে, কখনো-বা একটি অস্ফুট-উচ্চারিত বাক্যের সূক্ষ্মতায়। কিন্তু ‘শেষ মোচড়‘-এ পৌঁছনোর জন্য আব্দুর রউফ চৌধুরী যে-পথ অবলম্বন করেছেন, তা হচ্ছে অজানাকে জানার আবহ গড়ে তোলা। আর অজানাকে জানার আবহ গড়ে তুলেছেন পরিবেশ-বর্ণনায়, চরিত্র-বিন্যাসে ও সংলাপ সৃষ্টিতে। সবকিছুরই দক্ষ প্রয়োগ তিনি জানতেন।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর ‘শেষ আলোড়ন’ নির্মাণের উপজীব্য হচ্ছে মানুষ, বিশেষ দেশ ও কালের মানুষ। তিনি দেশ ও কালের বিশেষ পটের মানুষকে দেখেছেন, ভেবেছেন; তারপর সেই মানুষের সমকালের নানা সমস্যা-আকাক্সক্ষা-জীবনযাত্রা, তার বাস্তবতা ও কল্পনাকে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে আলোকিত করে সচেতন প্রযতেœ তাঁর গল্পের প্রতিমায় গড়ে তুলেছেন। তাঁর সময়টায় বাংলাদেশের রুদ্ধগৃহের দরজা-জানালা খুলে যাচ্ছিল ক্রমশ। বাংলাদেশের ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ নানামুখী সংঘাতে আন্দোলিত হচ্ছিল এবং বদলে যাচ্ছিল অনিবার্যভাবে। বাঙালি জীবনের সেই রূপান্তরের পর্বই আব্দুর রউফ চৌধুরীর ছোটগল্পের কাহিনী নির্মাণের উপাদান। তিনি তাঁর কাহিনী নির্মাণে সংস্কারবাদের প্ররোচনায় একান্ত শিল্পীর মতোই পরিবর্তনশীল সমাজের ছবি এঁকেছেন। তাই তাঁর ছোটগল্পে কৃষক ও কৃষিমজুর, গ্রামীণ ও শহরের মধ্যবিত্ত, নিম্নবর্ণ, নিম্নবিত্ত ও শ্রমিক, উদ্ভিদসুলভ জনগণ নিরঙ্কুশ আধিপত্য পেল। তিনি তাদের সমস্যার তল খুঁজে খতিয়ে দেখতে চেয়েছেন সহানুভূতির সঙ্গে। যে বাঙালি সমাজের ভিতর থেকে জন্ম নিচ্ছিল ভবিষ্যৎ (স্বাধীন দেশের সৃষ্টি, রাজনীতি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন), জন্মযন্ত্রণায় যার সর্বাঙ্গ কম্পিত হচ্ছিল সেই দেশ ও কালের মানুষই তাঁর ছোটগল্পের উপাদান। সেখানে প্রধান হয়ে উঠেছে ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব, বাঙালি ও অবাঙালির বিদ্বেষ, সাধারণ মানুষ ও মৌলভির বিরোধ। যেমন ‘নেশা’, ‘¯œান’, ‘রানী’, ‘সৃষ্টিতত্ত্ব’, ’জিন’ প্রভৃতি। কাহিনী-বিন্যাস নিয়ে আরও কথা আগেই বলা হয়েছে। ‘শেষ মোচড়’-এর একমুঠো উদাহরণ:

১.   কথাটি শোনামাত্রই আমেনা রক্তজবা চোখে তাকাল তার স্বামীর দিকে। আমেনার চোখ-দুটো যেন। তারপর মুখ ভেংচে বলল, ‘গেছি তো ভালাই করছি। তুমি অত ভাবীর কথায় নাচ কিয়র লাগি কওছান হুনি?’

২.   ভদ্রলোকটি একপলকে সুগভীর-তীব্র আবেগপূর্ণ বেদনা প্রকাশ করে, ঘাড় বাঁকিয়ে, ঠোঁটের ফাঁকে অস্ফুট ভাষার প্রলেপ মেখে, দেহে গোধূলিলগ্নের অস্তে-যাওয়া সূর্যের বঞ্চিত বাসনার স্ফুলিঙ্গ ধারণ করে দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলেন। তবে তার ব্যর্থজীবনের শ্রান্তির ও দুর্বলতার  দীর্ঘনিশ্বাসটি স্নানাগারের দরজায় লেপটে রইল। এই লেপটে থাকা ব্যর্থতার মাঝেই অমল অনুসন্ধান করতে লাগল তার বৌদিকে আবার।

৩.   আর দু-দিন পরই ২৫শে মার্চ ১৯৭১ সন।

৪.   একচমকে শতাব্দীসুপ্ত ভীতু পিতার শরীরে শক্তি সঞ্চয় হল, সঙ্গে সঙ্গে তার মনে জেগে উঠল এক নতুন স্পৃহা-সন্তানকে রক্ষা করা যেমনি তারই কর্তব্য ঠিক তেমনি স্বাধীনতা রক্ষা করা তার মতো পিতারই দায়িত্ব।

৫.   মদচ্ছির আলীর মন্তব্যে তার আহতান্তরে নব জীবন রচনা করার স্পৃহা জেগে না উঠলেও ঠিকই তার হৃদয়ের একাংশ নবদীপ্তিতে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হতে লাগল।

৬.   জায়েদার চোখের সামনে অনেক অন্যায় হয়ে গেছে, মুখ খুলে কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি, কিন্তু এখন চুপ করে থাকতে চাচ্ছে না, তবুও মুখ ফুটে কিচ্ছুই বলতে পারছে না, শুধু মাফিকের বুকে তার কপালের ঘাম মুছতে মুছতে ভাবতে লাগল, ঠিক পারব তো অতল অন্ধকার পাড়ি দিয়ে ওর সঙ্গে নতুন করে বাঁচতে!

৭.   ‘না, না! এমন ঘটনা ঘটার তো কথা ছিল না! সমশের তো কথা দিয়েছিল যে, সে এ-বিয়েতে বাধা দেবে না। কিন্তু এখন…।’

৮.   ‘আমারে নাইওর দিলা না কেনে?’/ উত্তর শুনে মদরিছ আঁতকে উঠল। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। তারপর বলল, ‘পঞ্চাশ টাকা আজাইরা কুয়াইলাম।’

৯.   রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে মসজিদ স্থাপন করা একটি আস্ত ভুয়ো জিনিশ-এতে পরলোকে হয়তো-বা শান্তি পাওয়া যাবে, তবে নিজের আত্মা শান্তি পাবে না, এমনকি ছেলেমেয়েও উচ্চ-শিক্ষায় শিক্ষিত হবে না, শান্তির আশ্রমে আশ্রয় নিলেও বাস্তব জীবনের নির্মমতা থেকে বাঁচা যাবে না।

১০.  কিছুক্ষণ পর ইকবাল এসে জানাল, ‘আব্বা বলেছেন, আপনি পাত্রী-পক্ষের সঙ্গে আলাপ করে বিয়ের দিন-ক্ষণ ধার্য্য করে নিতে। তিনি আরও বলেছেন, বিয়েতে দাবী-দাওয়া না থাকাই বাঞ্ছনীয়।’

প্রত্যক্ষত আত্মজীবনীমূলক সবসময়ে না-হলেও আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে আত্মজীবনের উপাদান-ব্যবহার অনেক সময়ে বিশেষ এক-ধরনের শিল্পের জন্ম দিয়েছে। ‘আত্মব্রত’, ‘জিনা’ গল্পগুলোর মতোই ‘নীলা’, ‘বন্ধুপত্নী’ গল্পগুলোতেও লেখক-ব্যক্তিত্ব স্বপ্রকাশিত। কনোও কোনো গল্পে বর্ণনামূলক রীতির-কিন্তু স্বীয় অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, মনোবিশ্লেষণ ইত্যাদি-ব্যবহারে কিছুটা আত্মজীবনীমূলক হয়ে উঠেছে। তবে আব্দুর রউফ চৌধুরী গল্পবৃত্ত থেকে ঈষৎ বহির্ভূত কোনো কথক-চরিত্রের উক্তি ব্যবহার করেননি, বা নিমগ্ন আত্মকথনও না, অথবা আশ্রয় নেননি সাধারণ বিবৃতিমূলক রীতির-সর্বক্ষেত্রেই গল্পে বর্ণিত ঘাটনার সঙ্গে সচেতন শিল্পীর মতো যে মমত্ব ও নিরাসক্তি সমন্বিত সঠিক অবস্থান থাকা প্রয়োজন তা তিনি করেছেন। চরিত্র উদঘাটনে তিনি পারদর্শী। দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছ মুহূর্তগুলো যেমনি তেমনি চরিত্রগুলোও অনির্বচনীয় রূপে প্রতিভাত হয়েছে তেমনি মাটি ও জলের সঙ্গে বাঙালির যে নাড়ীর যোগ তাও তাঁর গল্পে ওতপ্রোতভাবে প্রকাশ পেয়েছে। সাধারণ পল্লীজীবনে বা প্রবাসজীবনে যে অতল রহস্য ও সম্ভাবনা থাকে তা লেখকের অনুভূতিকে বারবার নাড়া দিয়েছে। সমস্যা কণ্টকিত জীবনে যে বেঁচে থাকার প্রেরণা আছে, দীপ্তি আছে তিনি সে উপাদান প্রত্যক্ষ করেছেন। কোনো কোনো গল্পে নারীসমাজের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছেন; তবে নারীদের তিনি প্রধানত পুরুষের চোখেই দেখেছেন। আব্দুর রউফ চৌধুরীর গৃহিণীরা গৃহবাসিনী ও গৃহকর্মে নিরত। সেইসঙ্গে নারীর উপর পুরুষ কোথাও কোথাও অনুশাসন আরোপ করেছে, তাকে সর্বতোভাবে অধীনে রাখতে চেয়েছে। আবার কোথাও কোথাও নারীর রূপের এবং ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে মুগ্ধ হয়ে গেছে এবং ঘুরে ঘুরে আবর্তিত হয়েছে নারীকে ঘিরেই। আবার কোথাও কোথাও নারী সচেতন, সক্রিয় এবং প্রতিবাদী। সৃষ্টির নিরন্তর প্রেরণায় আব্দুর রউফ চৌধুরী শিল্পীর মতোই চরিত্র উদঘাটন করেছেন। সহজ, সরল জীবনচর্যায় যে একপ্রকার লালিত্য ও বর্ণসুষমা থাকতে পারে তিনি তাঁর ছোটগল্পে সেই সাক্ষ্যই বহন করেছেন।

 

৩.

আব্দুর রউফ চৌধুরী জাতশিল্পী, তাই তাঁর ছোটগল্পে গল্পের নিরাভরণ রূপ ও রসে সমৃদ্ধ। প্রতিটি গল্পই শিল্পোত্তীর্ণ। তিনি এমন একজন গল্প-লেখক যাঁর এক-একটি গল্পের কৃৎ-কৌশল পাঠকের সামনে বহুসম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। ছোটগল্পের অন্যতম লক্ষণ ‘ঐক্য-সঙ্কট’ নির্ভুলভাবে পাওয়া যায় তাঁর গল্পে। উপকরণের মাধ্যমে উচ্চ-মধ্য-নিম্নবিত্ত শ্রেণীভুক্ত মানুষের জীবনযাপনের বহুস্তরান্বিত কৃত্রিমতাকে, আত্মছলনাকে, স্বার্থপরতাকে পরতে পরতে লেখক উন্মোচন করেছেন। এইসব গল্পের বক্তব্যে ঋজুভাব, পরিমিতি বোধ, ছোটগল্পের কাঠামোতে নিটোল পারিপাট্য তার শিল্পচেতনার বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছে। তাঁর গল্পে যে পরিবেশ ও চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে তা গল্পের ভাবসম্পদের অনুসারী। আর প্রবাসী গল্পগুলোতে স্বদেশভূমির প্রসঙ্গটা এনেছেন সুদূরপ্রসারী চিন্তাপ্রবাহের অনুসঙ্গে। এখানে বাংলাদেশের প্রকৃতি, মাটি, মেঘ, কুয়াশা, জল বিশ্বভুবনের সঙ্গে একাত্মতা সৃষ্টি করেছে। তিনি একজন মুক্তচিন্তার অনুসারী মানুষ ছিলেন। ধর্ম সম্পর্কে কোনো রকম গোঁড়ামী তাঁর ছিল না। এজন্যই তিনি ব্যতিক্রমী, আর এই ব্যতিক্রম তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত। তাঁর গদ্যরীতির যে সাবলীলতা তা-ও এসেছে তাঁর বিশিষ্ট জীবনধারার অনুসঙ্গে। সৌন্দর্য-দর্শনের কথাও এসেছে তাঁর গল্পে; যেমন- ‘রানী’ একটি সৌন্দর্য-দর্শনের কাহিনী, আবার অন্যদিক থেকে একটি প্রবাসী নারীর প্রতি তার স্বামীর অবহেলারও এক আখ্যান। ‘জিন’, ‘ভূত ছাড়ানো’, ‘ট্যাকরা-ট্যুকরি’ প্রভৃতি যেমন নারীর প্রতি সামাজিক নির্যাতনের গল্প, তেমনি কুসংস্কার-বিরোধী গল্পরূপেও মর্মস্পর্শী। সব গল্পই অবশ্য এমন নানা রঙের আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায় না, তবুও আব্দুর রউফ চৌধুরীর এমন গল্প আছে একাধিক-যাদের একটিকে বিভিন্ন দিক থেকে দেখতে দেখতেই লেখা হয়ে যেতে পারে আর একটি স্বতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ রচনা। খুব বেশি লেখক সম্পর্কে এমন দাবী করা চলে না। স্বচ্ছ জলধারার মতোই তাঁর চিত্রণ, ব্যঞ্জনাবহুল, রসসমৃদ্ধ। তিনি চরিত্র ব্যাখ্যায়, ঘটনা বিবরণে এবং সর্বোপরি দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণে যে ভাষা প্রয়োগ করেছেন তা যথাযথ। তবে পরিবেশ সৃষ্টি প্রসঙ্গে বলতে গেলে নি¤েœর একমুঠো উদাহরণই যথেষ্ট :

১.   সিন্ধুপাড়ে সুখের নীড় বাঁধলেও কী গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের কথা ভোলা যায়! হয়তো-বা তাও নয়, হয়তো বিষাদ ফুটে উঠেছে অন্য কারণে-স্বামীর সঙ্গে একা একা সন্ধ্যাটি কাটিয়ে দেওয়ার আনন্দের শিরশিরানি, অন্তরে জেগে-থাকা বাসনাটি অকারণে অস্ত গেছে বলে, কোথা থেকে এক বন্ধু এসে সুসময়টুকু নষ্ট করে দিল।

২.   অকালের বাতাস যত চমকে ওঠে বৃষ্টিও তত ঝুমুর ঝুমুর তাল তুলছে, তারপর বৃষ্টি ও বাতাস একসঙ্গে মাটির ঘরের ঝুঁটি ধরে প্রলয়তা-বনৃত্য শুরু করল। পাশের বাড়ির মরচে ধরা টুটোফুটো টিনের ওপর আছড়ে পড়া অসংখ্য বৃষ্টিকণার অসহ্য আওয়াজে ছনের ঘরের মধ্যে বসেও বোবা-কালার মতো কা-কা করা ছাড়া উপায় কী! চিৎকার করে কথা বললেও মনে হয় কানের কাছে কে যেন শুধু ফিসফিস করছে, তবুও সিদ্দিক আলীকে কথা বলতে হচ্ছে, ‘মাতছ না ক্যানে?’

৩.   তার হেঁটে-যাওয়া পথের পাশে, ডুবে-যাওয়া খালের ভেতর থেকে, আকাশের ডাক শোনার লোভে ভেসে উঠেছে কই-মাগুর, উজাই যেন। ভেসে ওঠা মাছগুলোর পাশ দিয়ে কোঁচড়হীন পথিকের মন্থরগতিতে চলে-যাওয়া পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যেও তরমুজ বিস্মিত চোখে দেখতে পাচ্ছে পথিকের চোখ-দুটো কই-মাগুর ধরার লোভে যেন বড় বড় হয়ে উঠেছে, তার পুতলির মধ্যে যেন শয়তানের আস্তানা।

৪.   এক শনিবার অমল এই আধমাইল পথ পেরিয়ে, নিশ্চুপে ব্রিকলেনের বাঙালির মুখের দিকে একটু তাকিয়ে, পুরাতন একটি ফ্যাক্টরির পাঁচিল ঘেঁষে, মাথাভাঙা ওক গাছটিকে পাশ কাটিয়ে, জুতোর শব্দের সঙ্গে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা পত্রিকার পাতাগুলো শীতের ঠা-া বাতাসের সঙ্গে এলোমেলোভাবে উড়িয়ে, তার বন্ধুর দেওয়া ঠিকানায় এসে উপস্থিত হল।

৫.   নদীর উভয় কূল প্লাবিত। ঢেউয়ের তালে নৌকা দোলছে বিষম বেগে। তুফান নৌকার ছাদ ও বর্গার ঝুঁটি ধরে প্রলয়তা-ব নৃত্যে মত্ত। ঝরে-ছিঁড়ে-ভেঙে পড়ছে বর্গা সব। ছাদ ভেঙে ছইয়ের হাড়গুলো বেরিয়ে পড়েছে, যেন পেতনীর দাঁত, এরই মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি নারী, কোলে তার কম্পমান বছর দেড়েক শিশু; মা’র বুকে দুধ নেই, শুকনো; ফানুস ফেটে বায়ু বেরিয়ে গেছে যেন।

৬.   […] উত্তর পাশে একটু খালি জায়গা আছে যেখানে একটি গোলাপ ও দুটো গন্ধরাজের গাছে ফুটে থাকা ফুলগুলো পাশের গোবরের ঢিপির গন্ধকে প্রশমিত রাখার ব্যর্থ প্রয়াসে ব্যস্ত।

৭.   […] একটি শঙ্খচিল সমুদ্রের পথ ভুলে, আকাশে, মুক্তভাবে সাঁতার কাটতে লাগল, অবশেষে সে তার ক্লান্তি দূর করার জন্য নাসরিনদের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিল। আর তখন তার পালকে ফিরে-আসা সূর্যের ঝাপসা আলপনা তৈরি হতে লাগল। কিন্তু সূর্যের এই আলপনা আমাকে স্পর্শ করতে পারল না, গুম হয়ে আমি দরজায় নক করলাম। কপাট খুলে দিল নাসরিন, তার শাড়ির আঁচলে হলুদের রাজত্ব।

৮.   অজস্র স্রোতস্বিনীর দেশে বর্ষাকালে প্রত্যন্তাঞ্চলে চলাচল করার জন্যে নৌকার ব্যবহার অপরিহার্য, এসময় পাঞ্জাবি-পাঠান জওয়ানদের নাজেহাল করার সুযোগ বাঙালির সামনে এসে দাঁড়ায় সহজেই। খেয়ানৌকায় উঠলে তাদের হাঁটু কাঁপে। তারা কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারে না। ছাতুভোজী কিনা তাই হয়তো!

৯.   […] পার্বত্য ত্রিপুরায় জন্ম নেওয়া উপজাতীয় উদ্যাম মনু নদী বনজঙ্গল ভেঙে যখন ধেয়ে আসবে শাখা-বরাকের দিকে, বীর্যবতী করার উদ্দেশে, তখন গাছতলার ও মেঠো গৃহবাসী ত্বরমান জলের দাপটে দৌরাত্ম্য প্রকাশ করে লাশ হয়ে ভেসে বেড়াবে বা অপরপাড়ে পাড়ি জমাবে অদৃষ্টের বঞ্চনায়।

১০.  […] তাদের পাশ দিয়ে একটি মহিলা চলে গেল। মহিলাটির পেছন থেকে নিরীহ মুখে একটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। কুকুরের ঘেউ ঘেউ থামার পর তাজিদুল্লা যোগ করল […]।

পরিবেশ বর্ণনার বাস্তবগুণ ও বাস্তবতার অভ্যন্তরণে প্রবাহিত লেখকের প্রবাসজীবন, স্বাভাবিক বর্ণনার মধ্য দিয়েই বৃহত্তর সামাজিক ও গভীরতর মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিতের সন্ধান পাওয়া যায় তাঁর গল্পে। উদাহরণগুলো পরিবেশ বর্ণনায় লেখক কী পরিমাণ সফল হয়েছেন তার সাক্ষ্য বহন করে। বাসস্থানের যে বর্ণনা দিয়েছেন তার দুটো বিপরীত উদাহরণ এরকম :

১.   ‘চা আনি’-বলে পর্দা সরিয়ে রানী চলে গেল রান্নাঘরে, আর তার পিছনে দুলতে লাগল পর্দার প্রতিটি ভাঁজ; সেখানে ইস্ত্রির কোনো নিটোল চিহ্ন নেই, সেলাইয়ের পরতে পরতে শুধু জমে আছে ধুলোর তারকাঁটা, সুতোর মাঝে মাঝে যেন দুর্বোধ্য ও দুঃস্বপ্নের ভগ্নস্তূপের উপর জমে ওঠা বেদনার একরকম রহস্যময়ী জীবনগাঁথা সগর্বে আত্মপ্রকাশ করছে।

২.   বসারঘরের পরিবেশটিও ওর মতো শান্ত তবে অদ্ভুত; সাজানো হয়েছে রুচিসম্পন্ন ভাবে; বাংলার যত কুটিরশিল্প আছে সবকিছু এনে যেন ঠেসে দেওয়া হয়েছে এই ড্রইংরুমে।

আব্দুর রউফ চৌধুরী তার পারিপার্শ্বিক জগৎ সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন, তাই তিনি তাঁর গল্পে তাঁর অতিচেনা ভুবনটিকে অন্তরের সঙ্গে গেঁথে নিয়েছেন। শুধু মানুষ নয়, পশুদেরও যে একটি রূপ আছে, বর্ণ আছে-তিনি তাও বর্ণনা করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়:

১.   তরমুজ কিছুক্ষণের জন্য নিজের মধ্যে ডুবে থেকে দোকানের বারান্দায় ঝুলন্ত আলোটি দেখতে লাগল। সে যেন গাঢ় অন্ধকারের অপেক্ষায়, তবে ভাঙা দাওয়ায় আশ্রয় নেওয়া কুকুরটির কাছে ঝাপসা অন্ধকারই প্রিয়। সে এই আলো-অন্ধকারে লেজ গুটিয়ে সামনে ছড়ানো তার পা-দুটোর ওপর মুখ পেতে চোখ বুজে ঝিমোচ্ছে; কিন্তু তরমুজের চোখে তা ধরা পড়ল না, সে আকাশের গায়ে ভেসে বেড়ানো মেঘের ভেলার দিকে তাকিয়ে রইল। কাশির শব্দে কুকুরটি মুখ তুলে কান-দুটো খাড়া করল, তার শ্রবণশক্তি তীক্ষè, কিন্তু ঘ্রাণশক্তি আরও প্রবল, তবে দৃষ্টিশক্তি একেবারেই অস্পষ্ট, তাই শব্দের সন্ধান করতে সে হাই তুলে উঠে দাঁড়াল।

২.   হঠাৎ জানালার পাশ থেকে একটি বিড়াল ঝাঁপিয়ে পড়ল টেবিলের ওপর, পাতাঝরার মতো নিঃশব্দে। তারপর পা টিপে, সন্তর্পণে এগিয়ে এল গোরার দিকে। ফিকে-নিকষ-হিমেল আলো ভেঙে  গোরা হাত বাড়িয়ে বিড়ালের পিঠ ছোঁয়াতেই সে যেন কেমন নড়ে উঠল; পশমে  ছোট ছোট তরঙ্গ, মৃদু কম্পন সৃষ্টি হল। ক্ষণিকের জন্য সে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থেকে  গোরার হাত ও বাহু বেয়ে টেবিলের নিচে লুকিয়ে যাওয়ার মতলব খুঁজতে লাগল।

৩.   এ-ধরনের বিড়াল বাসা-বাড়িতে থাকার কথা নয়, আর যদি-বা থাকে তবে গম্ভীর ভঙ্গিতে করিডোরের মাঝখানে নিশ্চুপ বসে থাকার কথা নয়। কিন্তু এই পাহাড়ি বিড়ালটি সেরকম নয়।

৪.   গোয়ালঘরে ছয়টি বলদ ও দুটো গাভী পচা কচুরিপানার উপর দাঁড়িয়ে তাজা কচুরিপানা খাচ্ছে, ছয়টির মধ্যে একটি ভীষণ কালো, বিদেশী হবে, দেহের শক্ত বাঁধনের উপর মস্ত বড়ো এক ঢিবি, আর পরিচ্ছন্ন লম্বা লেজটি মাছি তাড়ানোতে ব্যস্ত, কিন্তু দেশীগুলোর ওপর সচ্ছন্দে মাছির মেলা জমেছে, তাদের সংখ্যা গৃহস্থের সচ্ছ্বলতার পরিচয়।

৫.   ঘরের কোণে পড়ে থাকা একটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল সমরুমিয়ার দর্শনলাভে, সঙ্গে সঙ্গে একটি বাঁশের খেরকি ফাঁক করে কে যেন ছুঁড়ে ফেলে দিল এক হাঁড়ি আবর্জনা; নিঃশব্দে সরে গেলেন সমরুমিয়া।

৬.   নদীর পাড়ে, ভাঙা নৌকা-ঘাটে, তার শ্বশুরবাড়ির কুকুরটি দাঁড়িয়ে আছে। […] এই প্রথমবারের মতো সে তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-কুটুম্ব ছাড়াই পিতৃগৃহে যাচ্ছে। এমনকি কুকুরটিও তার সঙ্গী হল না।

৭.   […] সে চেয়ে আছে লায়নার উপর আঁকা ছবির প্রতি, যেখানে খরগোসকে পাকড়াও করার চেষ্টায় ব্যস্ত একটি কুকুর।

৮.   বিড়ালটি তার শিকার নিয়ে, টলমল পায়ে, এগিয়ে চলল দরজার দিকে। ভাঙা চৌকাঠের সামনে পৌঁছতেই, কী যেন কী ভেবে, সে থমকে দাঁড়ায়।

 

৪.

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পের ভূমি নির্মিত হয়েছে ভারতবর্ষ বিভাজনের পর, বাংলাদেশ সৃষ্টিসহ, কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাকে ঘিরে। যেমন :

১.   পাকিস্তান আমলের সামাজিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক নৈরাজ্য।

২.   বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

৩.   রাজনৈতিক উত্থান-পতন।

৪.   অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষের ক্ষোভ।

তাঁর ছোটগল্পের ভেতর আছে অন্যরকম স্বাদ; এসব গল্পে এসেছে লেখকের বাসস্থান- ইংল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ। এখানে ভৌগলিক ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও একজনের ভালোবাসা, বেদনা, হাসি, কান্না সবকিছুই এক, রক্তের রঙও এক-কাজেই একটি বড় ক্যানভাসে মানুষের গল্প চিত্রিত করেছেন গল্পকার। মানুষের মনের বিচিত্রতা, মনস্তাত্ত্বিকতা সবই যেন স্থান করে নিয়েছে তাঁর গল্পে। যেখানে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা নিয়ে গল্প লিখেছেন সেখানে চরিত্রের বিন্যাস হয়ে উঠেছে অনিবার্য শিল্পরীতি। মুক্তচিন্তাও তাঁর গল্পের ভাববস্তুর অবলম্বন। তিনি সমাজের সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের চিন্তার যেমনি আশ্রয় নিয়েছেন তেমনি উচ্চবিত্তের দৃষ্টিতে দেশ ও তাঁর সমাজকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। বঞ্চিত মানুষের মর্মবাণী যেমনি তাঁর গল্পে স্থান পেয়েছে তেমনি তিনি সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রামকে সুষ্ঠুশিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তাঁর গল্পে শ্রেণী সচেতনা এসেছে মূলত জীবনের সত্যকে উদ্ভাসিত করার লক্ষ্যে। সত্যানুসন্ধানী আব্দুর রউফ চৌধুরী সমাজ-ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন কামনা করেন, তবে সেই নবজন্ম আসুক বাস্তবতার ভিত্তিতে-সুখ-দুঃখ, কঠিন বাস্তবতার বিভিন্ন পর্যায়, সংকেত, সৌন্দর্য ও জীবন-দর্শন সবকিছুই-অলীক কোনো আশ্বাস-বিশ্বাস দ্বারা নয়। জীবনের সঙ্গে দুঃখ, সংগ্রাম এবং ভালবাসার সৃষ্টি সবই তাঁর চেতনায় পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েছে। এদের নিয়েই পরিপূর্ণ জীবন সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। তিনি সমন্বয় সাধনে প্রয়াসী। তিনি সংগ্রামমুখর, তবে শিশিরস্নাত রৌদ্রকরোজ্জ্বল পৃথিবীর অধিবাসী। তিনি যেমনি মানুষের জীবনের দুঃখ-অভাব-বঞ্চনাকে উপজীব্য করেছেন তেমনি জীবন থেকে কখনো পলাতে চাননি। তাঁর শিল্পচেতনা গভীর জীবনঘনিষ্ঠ।  তাঁর গল্প-বিষয় ভাবনায় এসেছে বিচিত্রতা। তাঁর গল্পের আবহে প্রেরণা জাগিয়েছে রাজনৈতিক চেতনা, প্রতিবাদ, শ্রেণী সচেতনতা, মানবতাবাদী চিন্তা ও প্রভাব। তাই তিনি বাস্তব জীবনের রূপকার, দ্রোহী কথাসাহিত্যিক।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর ছোটগল্পে সরকালনি সামাজিক সমস্যা ও সমাজ সংশ্লিষ্ট জীবনভাবনা বেশ প্রত্যক্ষ ও জোরালো। তাঁর ছোটগল্পে দেশের মাটি ও মানুষ অনেক বেশি ভূমি দখল করে আছে। বিভিন্ন শ্রেণীর, জীবিকার নর-নারীর ভিড় তাঁর ছোটগল্পে। এখানে সারা বঙ্গদেশের জনসমাজের একটা প্রতিনিধিত্বমূলক রূপ। অর্ধ-শতকের সামাজিক বিকাশের ধারাও এদের মধ্যে ধ্বনিত। রাজনৈতিক-সামাজিক-দার্শনিক বক্তব্য, প্রেম ও ধর্ম, বাস্তব জীবনের রূঢ় সত্য, সুনির্দিষ্ট সমস্যা সবই স্থান করে নেয়। লেখক বড়ই অনিষ্করুণভাবে বাস্তবের মুখোমুখি। আব্দুর রউফ চৌধুরীর ছোটগল্পে বিশ্লেষণে দেখা যায় :

এক. অর্থনৈতিক সমাজবিন্যাস সম্পর্কে আশ্চর্য সচেতনা।

দুই. রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ে সুস্পষ্ট বোধ।

তিন. নারীঘটিত সামাজিক সমস্যাগুলো সম্বন্ধে তীক্ষè দৃষ্টি।

চার. নবপ্রজন্মের সঙ্গে পুরাতনের দূরত্ব।

পাঁচ. প্রতিদিনের জীবনচিত্রে বিবিধ সমাজসমস্যার প্রতিফলন।

 

এক. অর্থনৈতিক সমাজবিন্যাস

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকা- প্রধানত প্রকাশ পেয়েছে শ্রেণীবিন্যাস ও শ্রেণীসংঘাতের মধ্য দিয়ে। কোনো কোনো কাহিনীতে শ্রেণী-শোষণের রূরূপ বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন, ‘উপোসী’, ‘শাদী’, ‘ট্যাকরা-ট্যুকরি’, ‘ভূত ছাড়ানো’, ‘যৌতুক’ ইত্যাদি। তবে প্রায়ই জীবনের, সমাজের অর্থনৈতিক সত্য ব্যাপকভাবে ধরা রয়েছে শোষণ ও শোষিত শ্রেণীগুলোর মোটামুটি নির্ভুল অবস্থান নির্দেশের মধ্য-দিয়ে। লেখক জানেন, ব্যক্তিগত আচরণে-বিশ্বাসে-আবেগে মানুষের শ্রেণী-স্বভাব মুদ্রিত থাকে। ব্যক্তিত্ব কোনো শুদ্ধ অস্তিত্ব নয়। বাস্তবভাবে মানুষকে দেখতে গিয়ে তার সামাজিক ভিত্তি, শ্রেণী-চিহ্ন এবং ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে অপরিহার্য ও ওতপ্রোত হয়ে উঠেছে। আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে দুটো অর্থনৈতিক সত্য লক্ষ্য করা যায় : ১. পুঁজিবাদ, ২. সমাজতন্ত্র। যেমন :

১.   আপনারা ভাগ্য বা তকদির শব্দের এমন ব্যাখ্যা দেন যে, যাতে ধনী-অভিজাত শ্রেণীর আরাম-আয়েশে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত না-ঘটে, বরং ধনিক-বণিকের উচ্ছিষ্ট উপভোগের হীনস্বার্থ হাসিল করার উদ্দেশ্যে স্রষ্টার বিধান বলে গরিবকে সান্ত¡না দেন।

২.   কলেজে পড়–য়া অধিকাংশ ছেলেমেয়েই প্রথমে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়। তারপর স্তর থেকে স্তরান্তরে গমন করে। কেউ হয় ধনবাদী, কেউ-বা গণবাদী, আবার কেউ কেউ মৌলবাদের মূলে প্রবেশ করে। সুশিক্ষা ও পরিবেশ প্রথম দিকে তাদের অন্তরকে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে উদ্বুদ্ধ করলেও পরবর্তী কালে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, শ্রেণী বা দলীয় স্বার্থে তাদের অন্তর আটকে যায়। ফলে তারা  মানবেতর                চিন্তাচেতনা থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে ইকবাল এখনো সমাজতন্ত্রের চিন্তাধারায় আপ্লুত।

৩.   ‘কেউ গাছতলায় থাকতে পারবে না’-এ পার্লামেন্ট গৃহীত আইন; গৃহহীনকে গৃহ দেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

পুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থায় জমিদার ও নানা পেশার বিত্তশালীদের ভূমিকার ছবি এঁকেছেন আব্দুর রউফ চৌধুরী। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়:

১.   মা’র একজন বিত্তশালী বেয়াই [মাজহারুল শেখ] অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে; তখন দেশ জুড়ে দুর্ভিক্ষ চলছে, আর তার কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য টাকাকড়ির প্রয়োজন […] মাজহারুল শেখ […] মূর্তিপ্রতীক হয়ে বসে আছেন সামনে, চেয়ারে। শত পরাবিদ্যায়ও প্রাণসঞ্চার হবে না তার। তিনি তো অপৌরুষের এবং অভ্রান্ত জ্ঞানান্বেষণে আত্মনিয়োগ করতে চান না। চান না, দুঃখ-দ্বন্দ্ব-বিরোধ-অজ্ঞান-সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে অমৃতময় মুক্ত জীবনলাভ করতে। তার দেহ-মন-ইন্দ্রিয় সমন্বিত আত্মবুদ্ধি চৈতন্য জ্যোতিতে অপ্রকাশিত। তিনি গূঢ় সত্যকে সহজে উপলব্ধি করতে অক্ষম।

২.   আল্লাহ তাআলা রূহ সৃষ্টি কড়ইয়া রাখছঔন। তার দুনিয়ায় আইত অইব; আল্লাহর কতা মুতাবেক। তবে ভাবইয়া পাই না, ফ্যাক্টরির মালিক জাফর-সাবর চার-বছর আগঅ এক পোয়া অঐছল তারপর আইজ পর্যন্ত আর কোন খবর নাই।

৩.   জৈন্তার রাজবংশের এক উত্তরাধিকারী শিবচন্দ্র নারায়ণ বাবুর শানশওকত কিংবদন্তী তুল্য ছিল। তিনি নাকি গৌহাটী যেতে পারতেন পরভূমে পা না ফেলে। তারই অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয় শিবসাগর দীঘি। ইংরেজ-সরকার তাকে ক্ষমতা দেয় তার অঞ্চলের অপরাধীকে ছয়মাস পর্যন্ত বন্দি করে রাখার। শিংমাছের গর্তে গলা-জলে ডুবিয়ে রেখে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের দেহকে বিষিয়ে দেওয়ার অধিকারও ছিল তার।

৪.   অজ্ঞতা, ধর্মান্ধতা ও হাজার বছরে গড়ে ওঠা কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশে জিনসাধক পীর-মৌলোভীরা হাতড়িয়ে নিচ্ছে নিরীহ মানুষগুলোর অর্থকড়ি। তারা জুজুর ভয় দিখিয়ে শোষণ করছে শিশুর মতো সরলপ্রাণের গ্রাম্য মানুষগুলোকে।

মানুষ হিসেবে এসব মানুষ কত ছোট, মূল্যবোধে কতটা নিচু, ভাষায় অনেকখানি বিষ মিশানো থাকে সেকথা বলেছেন লেখক। আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে পুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থা যারা ধরে থাকে তাদের কথা বলা হয়েছে। কোথাও এরা গল্পের কেন্দ্রে, কোথাও এদের ভূমিকা গৌণ।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে শ্রমজীবীশ্রেণীর মানুষের দেখাও মেলে। সেগুলো এমনভাবে লেখা যদি শ্রমিকেরা না থাকে তবে গল্প মার খায় না। আছে শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর, চোর, রাখাল, জেলে, মাঝি ইত্যাদি। এসব শ্রমজীবীরা আব্দুর রউফ চৌধুরীর অভিজ্ঞতার বাইরে ছিল না। তিনি গ্রাম ঘুরেছেন, দেশ ও বিদেশ ঘুরেছেন, মানুষজনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে এসেছেন। মানুষকে জেনেছেন, তাদের ভেতর থেকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। ভিতর থেকে মানুষকে দেখে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে জটিল মিশ্রণে তাকে চিনে নেওয়ার কঠিন দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে পল্লীর অর্থনীতিতে যতরকম শ্রমজীবী মানুষ আছে তাদের তালিকা তৈরি করা অবশ্য লেখকের লক্ষ্য নয়। শ্রমজীবীশ্রেণীর মানুষের, বাংলার দারিদ্র্যতার প্রকাশের, কয়েকটি উদাহরণ :

১.   এই পরিবারের  অবস্থা ও অর্থশক্তির পরিমাণ-পরিমাপ বছরের-পর-বছর এই ভাবেই অপরিবর্তন থাকবে হয়তো, যা ভগ্নস্তূপের মতো, চারপাশে শুধু ধ্বংসের আবহ।

২.   যে-লোকটি তার মেয়ের জন্য শাড়ি কিনতে ব্যস্ত তার পরনের কাপড়, পাঁজরের হাড়, দেহের সাজসজ্জা বাংলার দারিদ্র্যতারই প্রকাশ।

৩.   ঘরে ঢুকে কাঁদো স্বরে একজন ক্ষেতকামলা মদরিছ জানাল যে, তার স্ত্রী গত সাত-দিন ধরে ভূতের প্রভাবে আছাড়ি-পিছাড়ি যাচ্ছে। ভাঙছে সব বাসনপাত্র। চীনা মাটির দুখানা বরতন ছিল মেহমানের জন্যে, তাও টুকরো-টুকরো করেছে। গরিবের ঘরে ভঙ্গুর রাখেনি কোনো কিছুই।

৪.   তিনি জলসায়, মহফিলে গজল পরিবেশন করতেন। গজল গেয়ে ট্রেনে-বাসে মসজিদ-মাদ্রাসার জন্যে চাঁদা তুলতেন।

৫.   ‘আচ্ছা চাচা, এ-বুড়ো বয়সে গয়না নৌকার কাজ করছো কেন? গলুই ছাড়াতেই তো তোমার কষ্ট হচ্ছে। তোমার কী কোনো উপযুক্ত ছেলে নেই?’/ ‘পুয়া তাকিয়াও নাই। হকলতাই কপাল বাবাজি। কপালের লেখন খন্ডাইতে পারে কেটা!’

 

দুই. রাজনৈতিক পরিস্থিতি

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে সাধারণভাবে কয়েকটি জিনিশ লক্ষ্য করার মতো :

ক. কোনো কোনো গল্পে রাজনীতির ব্যাপার হঠাৎ এসেছে, যেন পূর্ব-প্রস্তুতিহীন, অথচ এত তাৎপর্যপূর্ণ তার প্রয়োগ যা অপরিহার্য বলে মনে হয়। যেমন ‘যৌতুক’। এই গল্পের মূল সমস্যা মোটেই রাজনৈতিক নয়। কিন্তু সংবাদপত্রে নিবেদিতচিত্ত ইকবালের চিন্তার অংশ হিসেবে জাতীয় প্রসঙ্গের কথা এসেছে। সেখানেও কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের মনোভাবের প্রতি তীব্র কটাক্ষ প্রকাশে গল্পকার অভ্রান্ত।

রাজশাহীতে শিবিরের হাতে ছাত্রনেতা রূপের হত্যার প্রতিবাদে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।

খ. একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের রাজনৈতিক ভাবনা আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে প্রতিফলিত হয়েছে। ‘অপেক্ষা’, ‘পিতা’, ‘বীরাঙ্গনা’, ‘বাহাদুর বাঙালি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব গল্পের প্রেরণার মূলে সন্ধান পাওয়া যায় লেখকের রাজনীতি সচেতনতা ও স্বদেশপ্রেম। দেশপ্রেমিক লেখক মনেপ্রাণে পাকিস্তান শাসক-সমর-গোষ্ঠীকে ও রাজাকারদের ঘৃণা করতেন। প্রায় প্রতিটি গল্পেই এ ঘৃণা তিনি প্রকাশ করেছেন অকপটভাবে।

১.   চার-বছর মাত্র ছাতুখোরদের সঙ্গে বসবাস করে উর্দুতে ভাবতে শিখেছে মাফিক, একথা ভাবলেই সে অবাক হয়। পাকিস্তানির সঙ্গে সম্পর্ক কোনো দিনই গলাগলির পর্যায়ে পৌঁছোয়নি, অনেক ক্ষেত্রে গালাগালিতেই পর্যবসিত হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব-বাংলার সংযুক্তির সাধ প্রথম মিলনেই মিটে গেছে, ওদের আত্মম্ভরিতার আকস্মিকতায় […]।

২.   পাঞ্জাবিপ্রীতিতে আপ্লুত হয়ে পাকসেনাদের পদলেহনে অন্য যেকোনো রাজাকার থেকে তালেব আলী পিছিয়ে নয়, বরং তাকে অন্যূন পদলেহনকারী বলা যায় […]।

৩.   তাজিদুল্লা একজন নামকরা রাজাকার, বাংলাদেশের শত্রু।

 

(গ) আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে নিটোল রাজনৈতিক ব্যঙ্গও প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর স্বদেশবোধ এত খাঁটি ছিল যে তিনি সমকালীন রাজনৈতিক দলগুলোকে তীক্ষ ভাবে কটাক্ষ করতে ভোলেননি।

আজকাল রাজাকারের বিরুদ্ধে কিছু বলতে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি সাহস পায় না, কারণ তাদের প্রভাবাধীন সরকার দেশ শাসন করছে। জাতীয় পতাকার অবমাননা করতে ঘৃণ্য রাজাকার সাহস পাচ্ছে। জেলাশহর পৌর-মিলনায়তনে বুদ্ধিজীবীদের ফাঁসির দাবীতে সভা বসছে।

লেখক ‘বাহাদুর বাঙালি’, ‘বীরাঙ্গনা’, ‘পিতা’, ‘যৌতুক’ প্রভৃতি গল্পে স্বদেশ-বিরোধী শক্তিকে নির্মমভাবে কশাহত করেছেন। লেখক যখন কিছু বলেছেন তখন ভর্ৎসনা একটুও আবরণ রাখেনি।

(ঘ) ইংরেজ-সরকার ও ভারতবর্ষের নেতাদের কর্মকা-ের এবং ধর্মসম্প্রদায়ের বিরোধের প্রসঙ্গগুলো তাঁর কিছু কিছু গল্পে সমাজ-বাস্তবতার উপাদান হিসেবে কম-বেশি ঢুকে পড়েছে। যেমন:

১.   ইংরেজ-সরকার তাকে ক্ষমতা দেয় তার অঞ্চলের অপরাধীকে ছয়মাস পর্যন্ত বন্দি করে রাখার।

২.   গান্ধীজি তাঁর স্বদেশে মেথর জাতীয় অস্পৃশ্যদেরকে হরিজন বা ভগবান-পুত্র বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু হিন্দুধর্মের জাতিভেদ প্রথার স্থিতিস্থাপকতার শক্তি এত প্রবল যে, কোনো সংস্কারই স্থায়ী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়নি, বরং এর বীজানু মুসলিম সমাজেও সংক্রমিত হয়; দুর্বল মনের মানুষই সহজে শ্রেণীস্বার্থে উজ্জীবিত হয়, ‘আমি অমুকের চেয়ে বড়ো’-এমন মনোভাবের পুষ্টি সাধনে।

৩.   পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ভুল মতবাদের উপর ভিত্তি করে।

৪.   আর্মির অধিকাংশ লোক গোঁয়ার-গোবিন্দ শ্রেণীর, জ্ঞানালোক বঞ্চিত, মওদুদী-মৌলোভী দ্বারা পরিচালিত, তাই তারা জানে না মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খানসহ তাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দের জন্মস্থান ছিল বর্তমান হিন্দুস্থানেই। এমনকি বাঙালি হত্যাযজ্ঞের দুই নায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া ও জুলফিকার আলী ভূট্টো হিন্দুস্থানের আলো-বাতাসে মানুষ হলেও ধর্মীয় রাষ্ট্র পাকিস্তানের আবহাওয়া তাদের আস্ত হায়ওয়ান বানিয়াছে, তারাই মিথ্যা প্রচারে লিপ্ত, তাই বলছেন যে, পূর্ব-বাংলার অধিকাংশ মানুষ অমুসলমান, তাদের হত্যা করা যায়েজ।

ঙ.   বাংলাকে মুক্ত করতে যে বিপ্লবীরা কাজ করে তাদের প্রতি কিছু কিছু গল্পে প্রীতি ও শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে। বিপ্লবীকে নায়ক করে লেখা ‘অপেক্ষা’ এই ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আব্দুর রউফ চৌধুরীর বিপ্লবী পদ্ধতি কতটা কার্যকর বা মান্য সে-বিষয়ে যতই প্রশ্ন থাক, তবে তাঁর রচনার অন্তর্নিহিত বাণী যে অহিংস আত্মসমর্পণের নয়, বরং সশস্ত্র আন্দোলনের সে-বিষয়ে সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে ‘অপেক্ষা’, ‘বীরাঙ্গনা’, ‘পিতা’ ইত্যাদি।

 

তিন. নারীঘটিত সামাজিক সমস্যা

‘গল্পভুবন’ ও ‘গল্পসম্ভার’তে আব্দুর রউফ চৌধুরী নানা স্বভাবের নারীচরিত্র তৈরি করেছেন। তাদের জটিল মন, তাদের রহস্যময় ব্যক্তিত্বের মুখে পাঠককে দাঁড় করিয়েছেন। এসব সৃষ্টি সাহিত্য-ভোক্তার কাছে পরম প্রাপ্তি। নারী প্রসঙ্গে একমুঠো উদাহরণ:

১.   চোখ বুঁজে পুরুষগুলো যেন অনুভব করতে চাইল সুন্দরীর গভীরে অনুপ্রবেশ করে বীর্যস্খলনের আনন্দ, আর যখন তারা একে একে চোখ খুলল তখন দেখা গেল রমণীর সর্বস্ব লুটে খাওয়ার আকাক্সক্ষা তাদের চোখে ঝিলিক মারছে শুধু।

২.   সব নারীই তো চায় সংসার ও সুখ, টাকাওয়ালা পুরুষ! হয়তো সবই ভুল।

৩.   যৌনস্বাদ উপভোগ করার জন্য একজন পুরুষ পাবে সত্তরজন হুরী, তাহলে একজন বেহেশতি নারী কতজন তাগড়া মরদ পাবেন তার যৌনকামনা চরিতার্থ করার জন্যে?

৪.   দুটো বখাটে ছোকরা কৃষক-বৌয়ের লাল পোশাকটি নিয়ে হাসি-তামাশা শুরু করেছে। পটপট বুট ভাঙছে আর মাঝেমধ্যে খিলখিল করে হেসে উঠছে। একইসঙ্গে অস্পষ্ট অশ্লীল গান, ফাঁকে ফাঁকে মৃদু শিসও। কৃষক-বৌ অবলার ভঙ্গিতে নিজের হাত নিজে ডলছে। মুখ টিপে চোখের ইশারায় তার পাশে বসা লোকটিকে কী যেন অনুরোধ করার চেষ্টা করছে; হয়তো-বা তাকে এখান থেকে অন্য বগিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলছে।

৫.   নারীকে বন্ধুর আসনে বসানোর পরিবর্তে ভোগ্যপণ্য মনে করা হচ্ছে। নারীকে শুষে, জুলুম করে ক্রীতদাসীর চেয়ে অধম ও হীন ভূমিকায় নামিয়ে পুরুষ শাসিত সমাজ আনন্দ উপভোগ করছে। পুরুষ শাসিত সমাজ-ব্যবস্থা যেন মানবিকতার উপর ধর্ষণ চালিয়ে নারীকে কিছুটা আর্থিক ও সম্পত্তির অংশ দিয়ে কেড়ে নিয়েছে তার অধিকার; এরইসঙ্গে একজন স্বামীকে, টাকার বিনিময়ে, স্ত্রী লাভের সহজ পন্থাটি বাতিয়ে দিয়েছে। পুরুষরা নারীকে পরিণত করেছে পশুতর জীবে। নারী তো আর পুরুষের ক্রীতদাসী নয়।

৬.   শিশু জন্মদানের সিদ্ধান্ত যে নিতে পারে, সে কেন পারবে না তার ভবিষ্যতের  ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলতে? মানুষ তৈরির কারখানার প্রধান মিস্ত্রিকে অবজ্ঞা? অজ্ঞতার অজুহাতে অপরাধ ঘুচে না।

৭.   নারীনির্যাতনে সমাজের নীরবতা সত্যি বিস্ময়কর। […] একজন পুরুষ ও একজন নারী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ হয়ে যায় পতি, স্বামী, প্রভু; আর নারী পরিণত হয় সেবাদাসীতে।

৮.   আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য নারী-স্বাধীনতার পক্ষে আমাদের সোচ্চার হতেই হবে।

৯.   দোজখযন্ত্রণা ভোগের মধ্যেও তার মা কেমন হাসিমুখে সেবা করে চলেছেন তার স্বামীকে, আদরযতেœ ভরে দিচ্ছেন তার সন্তানের জীবনতরী-এসব ভেবে বিস্ময়াভিভূত সফিক শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে চাইল তার হতভাগী জননীর কদম-মুবারকে। কিন্তু…।

১০.  একজন নারী ও একজন পুরুষ যে কাজটি উভয়ের স্বাধীন ইচ্ছে, অতি গোপনে সম্পন্ন করে, সে-স্থানে, সে-সময়ে চার ব্যক্তির উপস্থিতি কল্পনাতীত, তা একমাত্র সম্ভব ধর্ষণকালে যদি ধর্ষিতার চিৎকারে চার ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হয়। কাজেই মনে হয়, প্রস্তরখ- নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ ধর্ষণকারী পুরুষের প্রতিই প্রযোজ্য, নারীর প্রতি না; কারণ, নারী শুধু তো অত্যাচারের শিকার।

সমাজতত্ত্বঘটিত সন্ধানে নারীদের প্রসঙ্গ নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা করার প্রয়োজন দুটি কারণে :

১.   গল্পকার গভীর ও ব্যাপকভাবে নারীদের অবস্থান, তাদের স্বাতন্ত্র্য, সমাজ-সময় মিশিয়ে রেখেছেন তাঁর বহু কাহিনীতে।

২.   সমকালীন সমাজ-জীবনে নারীদের কেন্দ্র করে অনেক বাড়তি সমস্যা চারদিকে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে রেখেছে। সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না। গেলে সমাজ-বাস্তবতার একটি বৃহৎ অংশ বাদ পড়ে যায়। লেখক এ-সত্য মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে নারীরা পণপ্রথা-বহুবিবাহ-তালাক-জিনা প্রভৃতি সামাজিক বিধানের দ্বারা বিশেষভাবে নিত্য পীড়িত হয়েছে। ভিন্ন জাতিবর্ণে বিয়ের ফলে ধর্মের ছুরির আঘাত। ধর্ষণ ও কুসংস্কারের ফলে লাঞ্ছিত হয়েছে। সংসারজীবনে নিত্য অবহেলা ও অত্যাচারের শিকার হয়েছে। কখনো নীতিহীনতার পঙ্কে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কেউ কেউ বিদ্রোহও করেছে। পারিবারিক-সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত নারীর ছবিও আছে। ‘যৌতুক’ গল্পের এক নারী পণপ্রথার বলি। সেখানে লেখকের ভর্ৎসনা সরাসরি সামাজিক কুপ্রথাকে আহত করেছে। ‘বিকল্প’ গল্পের জায়েদা পিতৃগৃহে পণপ্রথার কারণে পীড়িত হয়েছে। লেখক দুটি গল্পেই সূক্ষ্ম মানসিক পীড়নের ইঙ্গিত করেছেন, তাতে কঠিন নিষ্ঠুরতা কিছু কম প্রকাশ পায়নি। ‘ট্যাকরা-ট্যুকরি’র কাহিনীতে বংশমর্যদা, কুসংস্কার ও শিশুমরণের ঘটনা আছে। ‘আত্মব্রত’ গল্পে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে যে সমস্যা তৈরি করেছে তার জোরটা মনস্তত্ত্বে। ‘শাদী’ গল্পে নারী বোবা বলেই বিয়ের আসন থেকে নতুন বর উঠে যায়, আর বোবা জেনেই সমশের তাকে নির্দ্বিধায় বিয়ে করে। ‘রাণী’ গল্পের মূল বিষয় অবহেলিত নারীর অন্তর্দাহ এবং স্বামী-বন্ধুর যথার্থ পরামর্শে স্বামীর মানসিক কামনাকে অনুধাবন করতে পারায় স্ত্রী তাকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় পাপ পথ থেকে। নীলা ও রেখার স্বামীগৃহ ত্যাগ ও বাইরের ঘটনাগত রূপ তাদের বিদ্রোহের অংশ। তারা স্বতন্ত্র মানুষ। সাংসারিক পীড়নের স্থূলতায় আক্রান্ত না-হলেও নারীর মূল্য যে কোথায়, পরিবারের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় তারা শিখেছিল। নীলা ও রেখা তাদের ভাগ্য নিয়ে লড়েছে। এ যুদ্ধ শুধু নিজেদের জন্য নয়, নারীর মানবিক মূল্যের জন্য। ‘আত্মব্রত’ গল্পের রেখা হেরে গিয়েও আত্মসমর্পণ করেনি। স্বামী-পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচিয়ে নিজের জন্য দুরন্ত-পথ খুঁজে নিয়েছে।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে নারীদের সামাজিক সংস্থানকে সমকালীন বাস্তবতার উপস্থিত করা হয়েছে।

 

চার. নবপ্রজন্মের দূরত্ব

লেখক কেন বাস্তব জীবন এবং সামাজিক মানুষের কথা সোজাসুজি প্রবন্ধের মাধ্যমে না বলে এরকম একটা পথ ধরলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কখনো কারণটা পুরো শিল্পগত, কখনো সমাজতাত্ত্বিক, বিংবা দুয়ের মিশ্রণও হতে পারে। গল্পকার যে-কথা বলতে চান যদি সেখানে প্রতীক বা রূপকের আড়াল না থাকে, না-থাকে ভাষা-শব্দ-বর্ণের প্রাচুর্য তো নগ্নসত্যের তীব্রতা প্রকাশে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বক্তৃতা। সাহিত্যসৃজন হয় না। লেখক চতুর কৌশলে তা এড়াতে চান। সে যাই হোক কারণটা কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক। আবার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বক্তব্য সোজাসুজি প্রকাশ পায় না বলেই, সমাজবাস্তবতা কিছু ঢাকা আর খানিকটা খোলা থাকার জন্যই এসব ক্ষেত্রে অভিপ্রেত অনুসন্ধান জটিল হতে বাধ্য। সব যুক্তি ভেঙে দিয়ে তবুও বলা যায় যে, আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে আছে:

১.   সামাজিক বিধি-নিষেধ-বিশ্বাস দিয়ে গড়া জীবনের বাস্তবতা ও জাগরণ।

২.   স্বামী-স্ত্রীর অবস্থান-বিপর্যয়, নারীর অবনমন ও বঞ্চনা।

৩.   সঙ্কীর্ণ ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ ও রুচি ডিঙিয়ে সত্য হয়ে ওঠে বঞ্চিত মানুষের বাস্তব জীবন।

পণপ্রথা, তালাক প্রভৃতি সামাজিক কুপ্রথাকে আঘাত করে যুবকরা পিতা বা শ্বশুরের বিরোধিতা করেছে। ‘যৌতুক’ ও ‘বিকল্প’ গল্পে ব্যাপকভাবে দেখলে বলা যায় রক্ষণশীল সামাজিক কুপ্রথার সঙ্গে প্রগতিবাদী তরুণদের বিরোধের কাহিনী এগুলো। দুই পুরুষের সংঘষের রূপ নিয়েছে গল্পে। সে কারণে সিদ্ধান্ত, গল্পকার দুই প্রজন্মের জীবনবোধের পার্থক্য হিসেবেই এখানে একে দেখাতে চেয়েছেন। গল্পগুলোতে নবপ্রজন্মের প্রতি লেখকের সমর্থনের উত্তাপ অনুভব করা যায়, সমস্যাপূরণেও। গল্পকারের সমাজ-বাস্তবতার বোধ যে তীক্ষè ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ করা চলে না।

‘নীলা’ ও ‘জিনা’ গল্পগুলোও দুই প্রজন্মের জীবনবোধের সংগ্রাম। ‘নীলা’ গল্পে কাকা ও ভাই-ঝি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের প্রতি মনোভাবে, ব্যক্তিগত বাসনায় বা দয়া বিতরণে-  জীবনধারণের প্রাত্যহিকতায় দুই পৃথিবীর মানুষ অর্থাৎ দুই প্রজন্মের। একজনের ভাষা অন্যের নয়, কাকা  ও ভাই-ঝির মধ্যে দুস্তর দূরত্ব। ‘জিনা’ গল্পেও নবপ্রজন্মের গঠিত ঘটনা নিয়ে পূর্বপ্রজন্মের লড়াই।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে ‘প্রজন্মের দূরত্ব’ বিবিধ বাস্তব সামাজিক সমস্যা, চেতনার আন্দোলন, ঐতিহাসিক বিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। এসব ভাবনার যে একটি বিশেষ বাস্তব দিক আছে সে-বিষয়ে গল্পকার হিসেবে তাঁর চেতনা অসীম।

 

পাঁচ. জীবনচিত্রে বিবিধ সমাজসমস্যা

‘জিন’ ও ‘ভূত ছাড়ানো’ গল্পে ধর্মীয় কুসংস্কারের এক চূড়ান্ত নিষ্ঠুর সত্য ধরা পড়েছে। অনেক ঘটনা যা কদাচিৎ ঘটে, যাকে চিন্তাহীন মন আকস্মিক ও ব্যতিক্রমী মনে করে, তার মধ্যেই সমাজের গভীর পাপ, দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি প্রতিফলিত হয়। সব মিলে জনসংঘের নির্বোধ ধর্মীয় কুসংস্কারের উপর যে কষাঘাত এই গল্প-দুটো- তা সর্বকালে ছড়িয়ে পড়ে এবং লেখকের সমাজ-চৈতন্যের ব্যাপকতার নিদর্শন হয়ে থাকে।

ধর্মান্ধ কুসংস্কারের প্রতি বেদনাদীর্ণ ভর্ৎসনার গল্প ‘ট্যাকরা-ট্যুকরি’। পিতা পূর্ণ আস্থা স্থাপন করে রুগ্ন সন্তানকে পীরের মন্ত্রপূত-জলে, তাবিজে, ঝাড়ফুঁকে তার সব ব্যাধি দূর হয়ে যাবে। ফলে পিতাই নিজ সন্তানের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। লেখক সংস্কারমূঢ়তাকে আহত করার প্রয়োজনে, পিতাকে ক্রুদ্ধ আঘাত করার নির্মমতায় মাকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেন। আলোচ্য গল্প তাই সমাজ-বাস্তবতার গভীর প্রতিবিম্ব।

নিষ্কৃতি নারীদের চিত্তমুক্তির কাহিনীও বটে ‘আত্মব্রত’। রেখার কাছে স্বামীর বা সমাজের মুখোশ খুলে কুৎসিত ভন্ডামি বেরিয়ে পড়লে, ‘এক সন্ধ্যায়, সন্তান-দুটো নিয়ে রেখা এক নবীন এঞ্জিনের সাহায্যে ও যুবক-পাখায় ভর দিয়ে উড়ে গেল; নতুন প্রেম লাভের, ঘর বাঁধার এবং পুরুষচিত্ত জয় করার আশায়।’  রেখা যুবকের সঙ্গ নিয়ে হৃদয়ের, মনুষ্যত্বের দাবী মেনে নিল।

 

৫.

আব্দুর রউফ চৌধুরীরর গদ্যশৈলীতে যে বিশিষ্টতা আছে তা পাঠক মনকে সহজেই আকৃষ্ট করে; তাঁর ভাষা নির্মাণ ও শব্দ ব্যবহারের বিশেষ গুণগুলো কী বা তার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন কিভাবে তা উল্লেখ করা আবশ্যক। আব্দুর রউফ চৌধুরীর ভাষা নির্মাণ ও শব্দ ব্যবহার তাঁর বক্তব্যকে শাণিত ও অর্থবহ হতে সাহায্য করেছে। প্রধানত তিনি বাস্তব জীবনের রূপকার। বাস্তবতার এই রূপ পরিগ্রহ করেছে তাঁর ভাষা নির্মাণ। তিনি প্রধানত চলিতভাষাই ব্যবহার করেছেন। তাঁর কোনো কোনো গল্পে সংস্কৃতাশ্রীয় অলঙ্কার-শব্দ ব্যবহার করা সত্ত্বেও গদ্যে এসেছে আটপৌরে লালিত্য। কোনো কোনো গল্পে সাধারণ শব্দ ব্যবহার করে পরিবেশ ও চরিত্রের একটি অন্তরঙ্গ পরিচয় উদ্ধার করেছেন। শোষক ও শাসকের মধ্যে বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবধানটি সাধারণ বাক্য ব্যবহারে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্ণনাতে পারিপাট্য আছে, সহজ স্বাভাবিক সাবলীল তার প্রকাশ ভঙ্গি। বর্ণনায় পরিমিতিবোধ, বাক্য ব্যবহারে সংযম, ভাষা ও গতি রক্ষিত হয়েছে। আব্দুর রউফ চৌধুরীর ভাষা ঋজু, স্বচ্ছন্দ, গতিময় হওয়ার পিছনে আছে তিন শ্রেণীর ভৌগোলিক পটভূমি-সিলেটের গ্রামঞ্চল, করাচি ও বিলাত। ভাষা দিয়ে গদ্যরীতিরও পরিক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাঁর সৃজনশীল ভাষা ব্যবহারে একদিকে আছে ঔজ্জ্বল্য, প্রখরতার দীপ্তি, অন্যদিকে স্বাভাবিক স্নিগ্ধপ্রলেপ। আব্দুর রউফ চৌধুরী মোটামুটিভাবে বাঙালি সমাজে ব্যবহৃত দেশজ ও আঞ্চলিক আবহ নির্মাণে সিলেট অঞ্চলের কথ্যভাষা ব্যবহার করেছেন। ‘জিন’, ‘উপোসী’, ‘পিতা’, ‘বিকল্প’, ‘শাদী’, ‘ট্যাকরা-ট্যুকরি’, ‘ভূত ছাড়ানো’, ‘যৌতুক’ গল্পের কিছু কিছু  বাক্যালাপ লেখক আঞ্চলিক ভাষাতে প্রকাশ করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় :

১.   ‘গেছি তো ভালাই করছি। তুমি অত ভাবীর কথায় নাচ কিয়র লাগি কওছান হুনি?’

২.   ‘সেন্ডেল আত নিলেঐ অইত।’/ ‘ডর লাগতাছে।’/ ‘আয় অখন উঠি। বাপ ঠাকুরদা’র ভিটর সন্ধান তো করন লাগব।’

৩.   ‘কিতা চাও তরমুজ?’ / ‘গরিবর আর কিতা চাইবার আছে।’ / ‘ধার-টার চাউ না কিতা?’ / ‘ধার কেটাই-বা দিব।’

৪.   ‘আপনার হউর […] কোঁচ দিয়া মাছ শিকার করাত ওস্তাদ। গতকল্য ইয়া-বড় একটা কাতলা কাবু করছইন। দেখইন কেমন তেলতেলা চেপটা পেটি।’

৫.   ‘নীলাম্বরী একখানা শাড়ি লইলে পুরিটা খুশ অইব, অবশ্য হলুদ পাড়ওয়ালা শাড়ি তার খুব পছন্দর। ছয়মাস আগঅ তোমার কাছ থাক্কাই পাক্কা দশ হাতর একখানা চেকর শাড়ি নিছলাম, অখনও রঙ যায় নাই।’

৬.   ‘পুয়া তাকিয়াও নাই। হকলতাই কপাল বাবাজি। কপালের লেখন খ-াইতে পারে কেটা!’

৭.   ‘বাবা শাহজালালের দরগা থাকি তাবিজ আইন্যা দিছিলাম। ছিঁড়িয়া ফালাইয়া দিল।’

৮.   ‘মাইয়ার বাবাজান নাকিতা কইছলাইন একটা হুন্ড্যা দিবা, আমার হুজুরঅর ভরসায়। আমার হুজুর নাকিতা হিসময় বাসঅ ক্যানভাসর কাম করতাইন। আর বোইনর বাড়ি তাকতাইন। হিসময় তানঐর ভাগ্নি খুব যত্নতালাবি করতা। হুজুর তানঐর ভাগ্নির খুব আদর করতাইন। আহা,  আমার হুজুরঅর স্নেহর ভাগ্নিটার ঐ দুষমনরা হত্যা করইয়া পালাইচে। হুজুর বইয়া বইয়া চোখঅর পানি পালাইতাচইন।’

অন্য গল্পগুলোতে বাক্যালাপ হয় শুদ্ধ চলিত বাংলায়। আব্দুর রউফ চৌধুরী নিজেকে অসাম্প্রদায়িক সাম্যবাদী লেখক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলা শব্দ চয়নে তাই বাঙালির প্রতিদিনকার ব্যবহারিক শব্দ, তাঁর গল্প রচনায়, প্রধানত অবলম্বন করেছেন; তবুও কিছু মুসলমানি শব্দ অনিবার্যভাবেই এসেছে, এতে ঘটনা, চরিত্র এবং পটভূমির একটি স্বাভাবিক গতি সঞ্চরিত হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ্য :

১.   যৌনস্বাদ উপভোগ করার জন্য একজন পুরুষ পাবে সত্তরজন হুরী, তাহলে একজন বেহেশতি নারী কতজন তাগড়া মরদ পাবেন তার যৌনকামনা চরিতার্থ করার জন্যে?

২.   তালাক দিতে হলেও স্ত্রীর উপস্থিতি প্রয়োজন। শরিয়ত সম্মত কথা।

৩.   সামসের নগর নিবাসী জনাব আব্দুস সাত্তার মিয়ার প্রথম পুত্র আব্দুস শহীদের সঙ্গে ইসলামিক শরাশরীয়ত মতে পঞ্চাশ হাজার টাকা কাবিন নামার মাধ্যমে চার ইমামের অনুমোদিত পন্থায় বিয়ের পয়গামে তোমার সম্মতি থাকলে ‘কবুল’ বা ‘বিসমিল্লাহ’ বা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বা ‘হুঁ’ বলো বা অমনি ধরনের একটি সম্মতিসূচক ইঙ্গিত দাও।

৪.   সুয়ামীর পাউওর নিচ হিস্ত্রীর বেহেশ্ত। এ-শিক্ষা দিছ না তোমরা পুরিটা’র?

৫.   বাদ মাগরেব, ঘরের ভেতর বসে কাঁঠাল ও সীম বীজের সমন্বয়ে পাকুরা খেতে খেতে, পাঞ্জাবির হাত গুটিয়ে, আঙুল নেড়ে, কালো লম্বা দাড়ি দুলিয়ে, মুকিদপুর আলিয়া মাদ্রাসার হেডমোওলানা আজিজুর হক ব্যাখ্যা করছেন ফতোয়ার ফাঁকফোকর।

৬.   স্বামীর মৃতে্যুর পর চার মাস ইদ্দত পালন; […] তালাকের পর তিন মাস ইদ্দত পালন; […] হাশরে শাস্তির পরিমাণ পুরুষের অর্ধেক […]।

৭.   মক্কা শরীফের মসজিদের সামনে জিনা অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত নারীকে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে রাখা হয়, ঢেকে দেওয়া হয় তাকে কালো কাপড়ে। নামাজ শেষে পূণ্যাত্মা মুসল্লিরা পাথরের ঢিলা দিয়ে একে একে আঘাত করতে থাকেন কালো কাপড়ে আবৃত মাথাটিকে।

আব্দুর রঊফ চৌধুরী সমন্বয়ের সাধনায় বিশ্বাসী ছিলেন। ইসলাম অনুষঙ্গে প্রয়োজনমতো আরবী-ফার্সী শব্দ তিনি অনায়াসে ব্যবহার করেছেন, আবার দুই বাংলা মিলিয়ে যে বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণ তাও প্রকাশ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ্য :

১.   বাদামকালো ছনগুলো বৃষ্টির জলে ঢলঢল, কয়দিন ধরেই বৃষ্টি চলছে-সকাল নেই, সন্ধ্যা নেই, শুধু বর্ষণ; আবার মাঝেমধ্যে তুফানও-ক্রুদ্ধগর্জনে, বিষাক্তনিশ্বাসে ছোবল মারছে ছনের চালে, একইসঙ্গে সাপের মতো বিদ্যুতের দলও নেচে উঠছে মেঘের আড়ালে, বজ্রপাতের মাঝেও যেন শোনা যায় ইস্রাফিলের হুঁঙ্কার, বীণার ঝঙ্কার। […] চাঁদের স্নিগ্ধতা নিয়ে উদয় হল শেখের ঝি, মাফিকের স্ত্রী, স্বামীকে উদ্ধার করার জন্যে যেন রহিমা-সীতা।

২.   রঙধনু যেমন শারদীয় বিকেলের আকাশে শতগুণ শোভা বৃদ্ধি করে, তেমনি দেবীর শাড়ির বিবিধ রঙের পাড়ের মধ্য দিয়ে ব্রা-ব্লাউজ ছিঁড়ে বোঁটা-দুটো যেন আত্মপ্রকাশে মাতুয়ারা, লালায়িত।

৩.   বর্ণহিন্দু ব্রাহ্মণ বিফল মনোরথে ফিরে এসে উপস্থিত হন নিম্নশ্রেণীর আরেকদল শূদ্রের কাছে। কিন্তু তাদের একই কথা। সামাজিক অবস্থানের উন্নতি সাধন, অন্যথায় বৃথা সবরকম কথোপকথন। অন্যকোনো উপায় না-পেয়ে ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণ-সম্রাট সম্মত হন তাদের জাতীয় নাম শূদ্রের সঙ্গে নমস্য যোগ করতে। কালোক্রমে ওরা দেবতার পুত্র বা নমঃসূত নামে অভিহিত হয়। বাঙালির আবিষ্কৃত এ-পদবীর অনুকরণে গান্ধীজি তাঁর স্বদেশে মেথর জাতীয় অস্পৃশ্যদেরকে হরিজন বা ভগবান-পুত্র বলে আখ্যায়িত করেন।

৪.   কর্নেল জাবেদ একেবারে ‘থ’ হয়ে গেল, ধ্রুপদীর বস্ত্রহরণে অপারগ দুর্যোধন যেন।

৫.   জৈন্তার রাজবংশের এক উত্তরাধিকারী শিবচন্দ্র নারায়ণ বাবুর শানশওকত কিংবদন্তী তুল্য ছিল। তিনি নাকি গৌহাটী যেতে পারতেন পরভূমে পা না ফেলে। তারই অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয় শিবসাগর দীঘি।

শব্দের প্রয়োগে উপমা ব্যবহার বা নির্মাণের ক্ষেত্রে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছেন আব্দুর রউফ চৌধুরী। কয়েকটি উদাহরণ :

১.   তার বাহুলগ্ন প্রেম-অপরিবর্তন হরিণাক্ষী একটি নারী, সে এক শিশুর স্নিগ্ধপ্রজ্ঞাসম্পন্না জননী, যার অপরূপ সৌন্দর্য যেন পঞ্চমহাভূত প্রকৃতির গর্ভজাত সৃষ্টি, জ্যোতিষ্কম-লের প্রথম সূর্যের স্বতঃস্ফূর্ত শিশিরসিক্ত আলো, তৃষিত পৃথিবীর একপশলা বারিসিক্ত বৃষ্টি, রাত শেষে উদিত নক্ষত্রকুলের সুন্দরতম ধ্রুবতারা, ঊষালগ্নের স্থির উজ্জ্বল জ্যোতির দ্যোতিত, শাশ্বত অন্তবিরামহীন পূর্ণিমার চাঁদ, অপরূপ ও সৌন্দর্য সুষমাম-িত একটি মূর্তি, তবে ভীতু মূর্তপ্রতীক যেন।

২.   আমেনার দেহখানা যেন আখনপাতার মতো বিধ্বস্ত।/ […[ যেন তেলসিক্ত লাল মরিচ-শয়তানের ত্রিশূল; […]।

৩.   খরায় চৌচির হয়ে যাওয়া মৃতপ্রায় ফসলক্ষেতে যদি অনর্গল বৃষ্টিপাতে প্রাণ ফিরে পায় তাহলে চাষীর মনে যেরকম আনন্দ সৃষ্টি হয় সেরকম অবস্থাই তার।

৪.   বৌদির গাল-দুটো ফাগমাখা হয়ে উঠল, যেন অমাবস্যা পা পিছলে আগ্নেয়গিরির মধ্যে গিয়ে পড়েছে। […] তারপর বৌদি কিছুক্ষণ অসমাপ্ত কবিতার হিজিবিজি অক্ষরে কলম থেমে থাকার মতো ভঙ্গিতে বসে রইল।

৫.   ক্লাইভের খঞ্জর তারা উত্তরাধিকারের সূত্রে পেয়েছে বলেই হয়তো এমন করছে!

৬.   এই কান্না যেন অপরাজিতের গায়ে প্রজাপতির উড়ে বেড়ানোর মতো ঝিলিক দিয়ে বরফগলা নদীর মতো গড়িয়ে পড়তে চাচ্ছে তার গাল বেয়ে।

৭.   মেঘযুক্ত আকাশের মতোই আবছা, স্যাঁতস্যাঁতে একটি নিঃসঙ্গভাব বাড়ির দেওয়ালে নকশি কাটে।

৮.   নিঃসঙ্গ প্রদীপের মতো নিস্তব্ধে দাঁড়িয়ে আছে, […]।

৯.   চাউনি যেন অপহৃত গৃহস্থের গৃহের মতো শূন্য, তবে এলোমেলো; […]।/ […] তার যন্ত্রণাময় জীবন যেন এক কাঁটাওয়ালা বিষাক্ত ফুল, পৃথিবীর পরিত্যক্ত বস্তু।

১০.  যেন দাদীর ঝাঁপিতে সযতেœ রক্ষিত দাদার বহুকালের দ্রব্যে ইঁদুর পড়েছে; তাই হাসতে গিয়েও তার সারা মুখে ছেঁড়া-দুধের ঘোলাটে রূপ ধারণ করল। […] বন্যার রাক্ষুসী থাবা থেকে বেঁচে যাওয়া গৃহস্থের গোলায় তুলে রাখা পরিশ্রমের ফসল যখন মহাজনের পাইক এসে নিয়ে যায়, লগ্নি টাকার চক্রবৃদ্ধি হারের সুদ গণনা করে, সাকুল্য পাওনা হিসেবে, তখন ব্যথাক্ষুব্ধ অসহায় গেরস্থ-বউয়ের অন্তরে যেমনি আলোড়ন সৃষ্টি হয় তেমনি জায়েদার অবস্থা, পিতৃ-আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে অতি কষ্টে সে তার পা-দুটো টেনে নিয়ে চলল রান্নাঘরের দিকে।

১১.  দুপুরের ধুলাচ্ছন্ন সৈনিকছাউনি ও জনহীন পথটি যেন মরীচিকার জাল, কর্মশালা থেকে আসা পরিশ্রান্ত এই সৈনিকটি হঠাৎ বাঁধমুক্ত নৌকার মতো স্থির একটি স্নোতে ভেসে এখানে আমার দৃষ্টির সম্মুখে সমুত্তীর্ণ হয়েছেন কেন?

১২.  […] তোমার শরীর তো পরিপূর্ণ পূর্ণিমার চাঁদ […]।

১৩.  জোড়াতালি দেওয়া পালের মতো জাবেদের দৃষ্টি, যদিও তীরের মতো ছুটে চলেছে তার বোট।

১৪.  […] পালশূন্য চৈত্র-দুপুরের তেজময় সূর্যটি মেঘশূন্য আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

১৫.  অর্ধেক-খাওয়া দুধের বোতল মুখ থেকে সরিয়ে নিলে শিশুর মুখের যে অবস্থা হয়, কাঁদার পূর্বাবস্থা, তেমনি মুখ করে কুবেরের ধন পঞ্চাশ টাকা জিনসাধক সৈয়দ আকমল আলীর হাতে তুলে দিল সে।

১৬.  উচ্চস্বরে হেসে উঠল সে। তার অট্টহাসির শব্দে শঙ্কিত হয়ে উড়ে গেল একজোড়া পায়রা-খাবার ফেলে, প্রাণের ভয়ে। তবুও তার হাসি থামল না।

১৭.  মাওলানা মোহম্মদ আব্দুস সবুর আখন্দের ভাষায় যেন ঈশান কোণে কাল-বৈশাখীর ঘূর্ণিবার্তা প্রকাশ পেল […]।

১৮.  সে বিমর্ষ বিহ্বল, তবে তার অন্তরে পাম্পী-ধ্বংসের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে যেন।

১৯.  তার মাথায় পিঞ্জরাবব্ধ অদৃশ্য পাখির মতো নীলার চিন্তাগুলো উড়ে বেড়াবে।

এরকম সাধারণ উপমা-নির্মাণে তিনি জীবনের অম্লমধুর চিত্রই উন্মোচন করেছেন। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা তাঁর নিজস্ব নির্মিতি। তাঁর প্রতীক ব্যবহারও দৃষ্টিগ্রাহ্য ও সৌন্দর্যসৃষ্টিতে সফলতা অর্জন করেছে। প্রতীক ব্যবহারের কয়েকটি উদাহরণ :

১.   […] বিক্ষুব্ধপ্রকৃতির প্রতিশোধাত্মকরোষের একটি চিহ্ন-প্রকৃতির বিরুদ্ধে প্রতারণা ও ছলনামূলক সর্বগ্রাসী কংক্রিটের তৈরি  রেলস্টেশনটি।

২.   […] ছোট টেবিলে সযতেœ রাখা বেশখানিক দুধ পড়ে থাকা বোতলটি নিঃশব্দে তরমুজের কর্মকা- দেখছে।

৩.   ভদ্রলোকটি ধীরস্থির পায়ে একটি মেশিনের দিকে এগিয়ে গেলেন, ওর গায়ে লেখা আছে-‘ব্রিলক্রিম। আমাকে ব্যবহার কর।’

৪.   যে-রাস্তা তাঁর বাসা থেকে বেরিয়ে মূলসড়কে গিয়ে মিলেছে তার খালবাকল উঠে গেছে।

৫.   রেলগাড়ি ছুটে চলেছে […] নানারকম গাছগাছালি, ভাঙা ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত-মাঠ পিছনে ফেলে।

৬.   […] নদীর চরে, দুপুরের আকাশে, যে লুব্ধ গৃধ্রের দল অধীর আগ্রহে উড়ছিল […]।

৭.   […] টেপ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে জল গড়াচ্ছে।

৮.   হাজী মজনু তার দৃষ্টি সরিয়ে স্থাপন করলেন বেঞ্চের পায়ে জড়িয়ে থাকা একটি জং-ধরা পুরোনো টিনের কৌটোর ওপর; সমস্ত পৃথিবীর সমস্ত জঞ্জালই যেন এর মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে।

৯.   অন্ধকার হচ্ছে মহাসত্যের সোপান, শৃঙ্গের অবারিত প্রহরীমুক্ত দ্বার।

১০.  […] হাতলভাঙা টিউবওয়েলে হাতমুখ ধুয়ে […] এগিয়ে এল বাংলাঘরের দিকে […]।

১১.  […] অলকনন্দার কুঞ্জতলের আরেকটি কৃষ্ণচূড়া।

১২.  […] বাতাসে দোল-খাওয়া জালটি অদৃশ্য চিলের পাখা-ঝাঁপটানোর মতো আড়াল করে রেখেছে মাঝির মুখটি।

১৩.  […] কুশিয়ারা নদী কলতানে বলে যাচ্ছে-ভয়ের শেষ যেখানে, নির্ভয়ের জন্মই সেখানে।

১৪.  […] একটি আম টুপ করে জলে পড়ে ডুব দিল, সঙ্গে সঙ্গে আবার ভেসেও উঠল, তবে মাথা নত হয়েই রইল।

১৫.  মদরিছ তার বালিশের ক্যাভারের ভেতর থেকে টাকা বের করে আনল।

১৬.  […] বিড়ালের ভুঁড়ির ওঠানামার […] মাঝে তিনি দেখতে পেলেন তার জীবনের নূতন অধ্যায়ের সূচনা।

১৭.  […] খসে পড়ল বৃন্দাবনী হুঁকোর রূপোর বাঁধানো নলটি।

১৮.  শোবার-ঘরে ইঁদুরের মতো তেলাপোকাও কম না।

১৯.  […] সে যেন ভীমরুল, বোলতা, বল্লা, ভৃঙ্গরোল বা এ-জাতীয় এক পোকা, তবে রোগা, ছোট এবং দুর্বল; […]।

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পে জীবনদর্শন আছে, আছে মননশীল চিন্তার অবকাশ, তবুও তিনি পাঠকের কাছ থেকে দূরে অবস্থান করে দার্শনিক হতে চাননি। তিনি জীবনের রূপকার। জীবনের রহস্য, সমস্যা, দ্বন্দ্বকে চিত্রিত করেছেন মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছে। তিনি মানুষের চেতন ও অবচেতন মনের গভীরে অবগাহন করেছেন। এই রহস্য সৃষ্টিতে তিনি যে ধারাক্রম নির্মাণ করেছেন তা একটি বিশ্বস্ত ভুবন রচনার সহায়ক হয়েছে। সম্ভাব্য ঘটনা এবং বিশ্বস্ত চরিত্রায়নের মধ্যে এসেছে এই সফলতা। তাঁর সৃষ্ট গল্পের আবহে আছে একধরনের প্রখরদীপ্তি, যার সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছে তীক্ষ, জীবনঘনিষ্ঠ ও অর্থগাঢ় তাঁর এই আলেখ্যরাজি।

 বিবিধ

 ইংল্যান্ডে দিনগুলি

এই গ্রন্থটি হচ্ছে দিনলিপি আকারে লেখা লেখকের ইংল্যান্ডের স্মৃতিকথা। কে সে, যাকে উদ্ভাবন করে নিতে হয় নিজের স্বদেশটাকেই? আমরা যারা সব সময় নিজের দেশে থাকি, হয়তো নিজ বাসভুমে পরবাসী হয়েই, আমরা কি সত্যি সত্যি জানি নিজেরদের এই দেশটাকে- না কি জানি ওপর-ওপর, ভাসা- ভাসা? অথবা যতটুকু জানি, তা আমাদের অস্তিত্বের মধ্যে এমন ওতপ্রোত মিশে থাকে যে অনেক সময় হয়তো নিজের বাঁচন থেকে দেশটাকে আলাদা করে নিয়ে, একটু দূরে সরিয়ে রেখে ভাল করে পর্যবেক্ষণই করা যায় না। তো উদ্ভাবন করে নেওয়া তো দূরের কথা। ইচ্ছাই হোক বা অনিচ্ছায়, দেশ থেকে সরে দূরে কোথাও চলে গেলে বুঝি বারে বারে নিজের ভেতরই আমরা আমাদের স্বদেশকে গড়ে পিটে বানিয়ে নিতে থাকি; তাতে সত্য যতটা থাকে বাস্তব যতটা তার সাথে পাল্লা দিয়েই থাকে স্মৃতি, পিছুটান, মন, কেমন করা অদ্ভুত সমস্ত উচ্ছাস। আব্দুুর রউফ চৌধুরীর ‘ইংল্যান্ডের দিনগুলি’, তেমন একটা শৈল্পিক গুনের স্মৃতিকথা। তবে এটি ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন ভাবে সমাদৃত হতে পারে। কারণ দৃষ্টিতে ইতিহাস, জীবন-কথা, আবার অনেকের কাছে সংস্কারবাদী দর্শন-চিন্তা। বইটির সমস্ত প্রেক্ষাপট জুড়ে লেখক প্রবাসীদের জীবনের অন্তর্লোকে যথেষ্ট আলো ফেলেছেন। তিনি প্রবাস জীবনের পটভূমিকে ব্যবহার করে মানুষের গভীর রহস্যকেই উদঘাটন করতে চেয়েছেন। তাইতো লেখক এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগে সত্যের আলো ছায়ায় বসে রচিত এই স্মৃতিকথা। মাটির পৃথিবীর মানুষ নিয়ে সাধারণ জীবনের একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র। সজীব ও জীবন্ত।’ এই স্মৃতিকথায় বাস্তবতার ছাপ যেমন পাওয়া যায় তেমনি বাস্তবতাকে পাওয়া যায় প্রসারিত ও প্রতিফলিত আকারে। তাই সেটা হয়ে উঠে হৃদয় ছোঁয়া। লেখক জীবনের বাস্তবতাকে স্বতন্ত্রভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন; সৃষ্টি করেছেন মানুষের বর্হিজগতের শান্তি আর জীবন দ্বন্দ্বে যে চেষ্টা তারই চিত্র। প্রবাস জীবনের চিত্রকে ব্যাপক ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রবাসীরা যে নিজেদের নিঃসঙ্গতার বৃত্তে ভ্রাম্যমান তাও ফুটে উঠেছে। আবার দেখাতে চেয়েছেন মানুষের আদিম বৃত্তিগুলোর যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। আর এখানেই লেখক অন্যসব লেখকের চেয়ে স্বতন্ত্র। নিজেকে ঘিরেই ঘটনার আবর্ত, প্রবাহ ও মোহনা। প্রবাস সমাজের বিচিত্র শর্তবন্দি ও শৃংখলিত জীবন পদ্ধতির অনুগামী হওয়াই তাঁর জন্য স্বাভাবিক। বিভাগোত্তর দুই দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশের প্রবাস জীবনের রূপ-রূপান্তর, মানুষের অস্তিত্ব-বিষয়ক উদ্বেগ এবং সময় ও সমাজের ক্ষত-বিক্ষত অনুভূতির বিন্যাসে এই গ্রন্থটি ভরপুর। লেখক দীপ্ত কন্ঠে বলেছেন, ‘এখন সময় এসেছে নতুনত্বের; জীর্ন-পুরাতন ফতোয়ার বন্ধ জালে আবদ্ধ সমাজকে ভেঙ্গে নতুনত্বের জোয়ারে ভাসিয়ে দেবার।’  তিনি এমন এক শিল্পী নীতি গ্রহণ করেছেন যা মানুষের দেহ ও অন্তর আত্মার বিচিত্র রহস্যের অতল সমুদ্র। লেখক বোঝাতে চেয়েছেন দেহ কামনাকে বাদ দিয়ে আত্মার বিকাশ অসম্ভব। হয়তো ডি এইচ লরেন্সের মতো তিনিও মনে করেছেন মানুষের ভাবনায় ভুলে থাকতে পারে, কিন্তু তার রক্ত যা অনুভব উপলদ্ধি ও প্রকাশ করে তাতে ভুল নেই। সময় ও সমাজ বির্বতনের অনিবার্য টানে গ্রাম বাংলার জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য লালিত জীবনের যে রূপান্তর তা উন্মেচিত হয়েছে এই গ্রন্থে। লেখকের যে স্বদেশ প্রীতি তা প্রকাশ পেয়েছে এই বাক্যে, ‘একমাত্র বেদুইনই থাকতে পারে মরু হৃদয় নিয়ে। বেদে তা পারে না। বেদের জন্যে প্রয়োজন নদী, জল, মুক্ত বাতাস। ফলে বাঙালির জন্যে প্রয়োজন নদী, জল, আর শস্য শ্যামল বিস্তীর্ন সবুজ মাঠ।’ তবে এই গ্রন্থের যে বিষয়টি সবচেয়ে সুন্দর ভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন তাহল সিলেট অঞ্চলের প্রবাসী লন্ডনিদের জীবন চিত্রটি। তাছাড়া ঐ সব প্রবাসীরা কতটুকু যোগ্যতা নিয়ে বিদেশের মাটিতে অবস্থান করছে তাও প্রকাশ করেছেন। দৃঢ় বিশ্বাস, যদি কখনো সিলেটের লন্ডন প্রবাসীদেরকে নিয়ে নৃ-বিজ্ঞানের ছাত্ররা কাজ করে তাহলে এই গ্রন্থ তাদেরকে যথেষ্ট উপদানের খোড়াক জোগাবে।

 

 লিখে যাচ্ছি আমার জীবন কাহিনী (অপ্রকাশিত)

এই হচ্ছে লেখকের আত্মজীবনী  গ্রন্থ (১৯২৯-১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ)। তবে এতে প্রকাশ পেয়ে আব্দুর রউফ চৌধুরীর চিন্তাচেতনায় গ্রাম বাংলা। গ্রামের সঙ্গে আব্দুর রউফ চৌধুরীর ছিল হৃদয়ের সম্পর্ক; নীড়ির সম্পর্কও। তাঁর সৃষ্টিসত্তার গভীরে যেমন লোকজ-প্রভাব তেমনি পল্লী-চেতনা ছিল সর্বদায় ক্রিয়াশীল। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমার জন্ম গ্রামেই, আমার মৃত্যুর পর গ্রামেই যেন ঠাঁই পাই।’  এই গ্রন্থে তিনি তাঁর গ্রাম বাংলার এক অন্যন্য চিত্র এঁকেছেন,

ভরা ভাদ্র। একছড়ি চম্পাকলা নিয়ে বাজারে যাব, খাঁ’র বাড়ির নায়ে। ‘আদি’ [শীতলপাটি] দু’খানা সঙ্গে নিবে হুরমত ভাই। মাইজির [মা’র] স্বহস্তে তৈরি ‘আদি’ বেশ দামে বিক্রি হয়। আর এই ‘আদি’ যে মূর্তা [ঝাউবেত] দিয়ে তৈরি হল সেগুলো এনেছিলাম অনেক কষ্ট করে, জোঁকের কামড় খেয়ে, দাশ-বাড়ির জঙ্গল থেকে; পাকা-পাকা [পুক্ত-পুক্ত] দেখে বেছে-বেছে। ‘আদি’ বাইন  [তৈরি] করা খুবই কষ্টের। অনেক ধর্য্যরে প্রয়োজন পড়ে; কারণ রঙ-করা ঝাউবেত জাতীয় উপকরণ দিয়ে কারুকাজে গড়ে-তোলা ‘আদি’র সৌন্দর্যবর্ধন সত্যি কঠিন জিনিশ।  গ্রাম বাংলার একান্ত নিজস্ব শিল্পকলা বলতে যেগুলোকে মনে করা হয় থাকে ‘আদি’ তাদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এ শিল্প ঐতিহ্যবাহী এবং অতুলনীয় লোকশিল্পের নিদর্শন। এই ‘আদি’র কারুকলাটির মধ্যেই যেন মাইজির জীবনের সুখ-শোক, আনন্দ-বিষাদ, আকাক্সক্ষা-ব্যাকুলতা- সবকিছুরই সারনির্যাস গাঢ়বদ্ধ হয়ে ফুটে ওঠে। মাইজির জীবন-ইতিহাসও যেন এর মধ্যে সূক্ষ্ম-সংকেতে প্রতিবিম্বত হয়। মাইজির দুর্লভ শিল্পনকশি ‘আদি’র অপূর্ব সৃজন আমাকে মুগ্ধ করে; তাই এক-একটি ‘আদি’ শেষ হলেই তাঁকে বিন¤্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁর ঋণ অপরিশোধ্য।

আজ বাজারে চালের দাম কত হবে, কে জানে? আধ-সের চাল যদি আনতে পারি তালেই হবে; তবে মাইজির জন্য এক-আনা পান তো আনতেই হবে। […] চাচাজি জামসেদপুর থেকে যখন টাকা পাঠাতেন তখন বেশ ভালো চলত। যখন বন্ধ করে দিতেন তখনই অবস্থা দাঁড়াত চরমে। আদি-চাটি, বদনা-ঘটি, চকি-দরজা- সবকিছু বিক্রি করেও পেটের জ্বালা যেন মিটত না।

গ্রাম-বাংলার মানুষের যে অভাব, কত বড় অভাগা তা নিজের জীবনের মধ্য-দিয়ে, আপন হৃদয় মন্থন করে, আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর এই গ্রন্থে একটি চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন; এতে বুঝতে কঠিন হয় না যে, গ্রামের লোকদের খাদ্য নেই, স্বাস্থ্য নেই-তারা একান্ত অসহায়। তাদের এই বেদনা, এই অসহায় অবস্থা তিনি রুন্ধ্রে-রন্ধ্রে উপলব্ধি করেছেন; তাই এদেরই দুঃখ-বেদনার কথা এই গ্রন্থের পাতায় পাতায় উদ্ভাসিত হয়েছেন। নাড়ীর টানের মর্মবেদনাই স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দিকটিরই প্রতিফলন ঘটেছে। গ্রাম-বাংলার মুগ্ধতায়, রমাহগ্রস্ততায় বা বন্দনাসুলভ ব্যঞ্জনায় তিনি এই গ্রন্থটি রচনা করেননি; বরং সময়ের বাস্তবোচিত গোড়ায় নিজেকে স্থাপন করেই লিখেছেন।

দুঃখ-দৈন্যের শত-সহ¯্র ঘটনাবলীর সমষ্টি আমার ছেলেবেলা। আমার বাল্যজীবন। এখনো মনে হয় এই তো সেদিনের এসব ঘটনা। সেই দিনগুলোর কথা আজও চকচক করে ওঠে আমার মনের আয়নায়। এসব ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা দিয়ে নতুন প্রজন্মকে ব্যথা দিতে চাই না; তবে পর্যালোচনা করা আবশ্যক। পর্যালোচনার উদ্দেশ্য ব্যথা দেওয়া নয়, বরং এ থেকে তারা শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে। এতে শিক্ষার অনেক কিছু আছে বলে আমার ধারণা; কারণ ভবিষ্যৎ গড়ার মালমশলা সংগ্রহ করতে হয় অতীতের ঘটনাবলী থেকে; যা সফল জীবন গড়নে সহায়ক। এ হচ্ছে বাস্তব জ্ঞান। যেকোনো সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টার প্রাক্কালে ভেবে দেখা প্রয়োজন যে, এর মূলে কী কারণ নিহিত রয়েছে, কারণ, you must produce what you have consumed.[1]

আব্দুর রউফ চৌধুরীর গ্রাম-বাংলার রূপরেখাটি অত্যন্ত অকৃত্রিম ও আন্তরিক। স্বদেশী ও স্বভাষী। সহজে অন্তরে প্রবেশ করে। মনে, মননে ও মগজে দাগ কাটে। চিন্তায় আছে যুক্তিশীলতা আর দৃঢ়তর ইতিবাচক বিশ্বাস। নিরন্তন বিশ্লেষণ। বদ্ধ-চেতনাকে মুচড়িয়ে দেওয়ার দ্রোহী ক্ষমতা। অজ-পাড়াগাঁ গ্রামকে চর্তুমুখী করে ভাবা যে কত সহজ তাই যেন আব্দুর রউফ চৌধুরী প্রকাশ করেছেন। ভাবনায় যেমন ফাঁকি নেই, বর্ণনায়ও কোনো ফাঁকি নেই।

আমাদের সুপারি-গাছগুলো অন্যের বলে দাবী তোলায়, সুপারি খাওয়ার সখ হলে বচনের মা’র কাছ থেকে এক-আনার সুপারি কিনে আনতে হত। যদি যথাসময়ে, চিহ্নিত নিজস্ব জায়গায়, সুপারি-গাছ রোপণ করা হত তাহলে এই এক-আনা বেঁচে যেত; যা দিয়ে লবণ কেনা সম্ভব হত; আর এ করতে পারলে ‘চিকন’ লবণের জন্য গ্রামের এক-মাথা থেকে অন্য-মাথা ঘুরে-ঘুরে ভিক্ষুকের মতো ধন্না দিতে হত না; অথবা, আধ-সের কেরোসিনের জন্য ‘সমলা’র কাছে না-পেয়ে ‘আছিনা’-র মা’র কাছে বা শেষপর্যন্ত খাঁ’র বাড়ি ছুটোছুটি করতে হত না। হায়-রে এক-আনার কেরোসিন তেল।

তাঁর রচনার মধ্য-দিয়ে গ্রাম-বাংলার মানুষের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা সহজেই অনুভব করা যায়, কারণ বাঙালির জীবনের ভিত্তিই তো গ্রাম-বাংলা। এই অভিব্যক্তি একজন খাঁটি বাঙালিরই, মানবধর্মী আব্দুর রউফ চৌধুরীরই, পুঁথি মুখস্থ কোনো তাত্ত্বিকের অবশ্যই নয়। আব্দুর রউফ চৌধুরী গ্রাম-বাংলার দুর্গতির যে প্রতিকারের পথ দেখিয়েছেন, তা হয়তো কোনো বাঙালি এই শতাব্দীতে গ্রহণ নাও করতে পারে; তবে তিনি যে দুদর্শার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তা আজও গ্রহণযোগ্য।

উত্তর-ঘরের আম-গাছগুলোতে যথেষ্ট আম ধরত। তারা যখন বাজারে তোলার জন্যে, হাট-বারে, আম পাড়তেন, আমার বালকমন তখন মানা মানত না। বেহায়ার মতো আম-গাছের নীচ থেকে আম কুঁড়াতাম। পোকা-ধরা আম নিয়ে যখন ঘরে ফিরতাম তখন মাইজির বকুনি খাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। দুঃখে মাইজিরও চোখে জল আসত। যদিও তাদের আম-গাছের ডাল, ফলের ভারে, আমার পূর্ব-পুরুষের ভঙ্গণ জামিদারী ভিটের উপর দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের ছনের চালে নুয়ে পড়ে ছিদ্রের সংখ্যা বাড়ালেও একটি ভালো আম আমার ভাগ্যে জুটত না; বরং সীমের বৃক্ষ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বিরোধ-প্রবণতা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হত। […] অবশ্য আমাদেরও আম-গাছের বাগান আছে, তবে সেই বাগান এখন ঘন জঙ্গলের দখলে। ‘পুতলি’-আম, দেখলে চোখে আনন্দ জন্মে, কুড়াতে গেলে জুতোর অভাবে খড়ম অথবা ছইয়ের তৈরি জুতো পরে যেতে হত, তবে চোরের মতো; যদি-বা মুক্তার ভাই দেখে ফেলে, সে তো আবার দাবী করে সেই বাগানটি তার। শুধু কী তাই, আমাদের যে-খাল দিয়ে এককালে অন্তঃমহলে নাইওরী নৌকা আসত, সেই খাল থেকে সে মাটি তুলে নিয়ে যায় অবাধে; পুবের বিশাল পুকুরের অর্ধেকটারই দাবী করে মশা’র মা; দক্ষিণের বড়ো সড়কের পাশের খালটি পরিষ্কার করতে গিয়ে কী-যে লঙ্কাকা- বেঁধে গেল; এরাই নাকী এককালে ছিল আমাদের রায়ত-দল, লাঠিয়াল-দল, পাইক-পেয়াদা। আমি আমার পূর্ব-পুরুষদের রত্নভা-ার দেখিনি। দেখিনি তাদের দাপটও। সবই স্বপ্ন যেন; ফাঁকা রঙিন কল্পনার প্রশ্রয় দেওয়া আমার সাজে না। বাস্তবই আমার কাঝে জ্বলন্ত উদাহরণ। বাস্তব হচ্ছে আমার ছেলেবেলায় আমাদের গ্রাম-বাংলা ছিল অন্নের অভাবে দিশেহারা; আর অশিক্ষায়, কুশিক্ষায়, রোগবালায়ে, কুসংস্কারে, ভীরুতায় ভরপুর। অর্থলোলুপতা, স্বার্থলোলুপতা, শোষণলোলুপতা, নারীলোলুপতা আর স্বার্থান্মেষী মহলের ভ-ামীর কোনো অভাব ছিল না। অভাব ছিল না অসুন্দরের, অসূরার, অনড়তার ও অনাচারের। চেতনা-নৈতিকতা-মানবিকতা এখানে ছিল একেবারেই অসহায়। এসব কী কল্পনা করতে পারে আমার উত্তরসূরীরা।

আব্দুর রউফ চৌধুরী লক্ষ্য করেছেন গ্রামের সঙ্গে নগরের বৈষম্যকেও। ‘গ্রাম-বাংলার কৃষক-চাষীর রক্তে ঝরানো, শ্রমে-ঘমে ভেজা মেহনতের ফলল শহরের ব্যবসায়ী মহল ভোগ করে। তবে এই সত্য, যার কোনো বিকল্প নেই, বেঁচে-থাকার খাদ্য গ্রামই যোগান দেয়, শহর নয়। […] কৃষককূলের অবস্থা অত্যন্ত করুণ, ভূমিহীন; তাদের মরা-বাঁচা, মান-ইজ্জত শহরের কৃপার উপর নির্ভরশীল। […] তাই আমার উত্তসূরীদের আত্মকেন্দ্রিকতাকে, আত্মসর্বতাকে ও গ্রাম-বাংলার রক্তশোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে গঠনমূলক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’  আব্দুর রউফ চৌধুরীর মর্মস্পর্শী ভাষায় ও বর্ণনাগুণে গ্রাম-বাংলার মানুষের সকল দুঃখ ও সুতীব্র বেদনাবোধ হৃদয়কে কাঁপিয়ে তুলে। এই গ্রন্থে লেখকের হৃদয়ভেদী ঋজু মননশীলতার ও যুক্তিশীলতার পরিচয় মিলে। পরিচয় মিলে চিরাচরিত ধ্যানধারণা ভেঙে বেরিয়ে আসার অঙ্গীকার, নতুন জীবন গড়ার আহ্বান, সর্বাত্মক মুক্তিমন্ত্রের ঘোষণা, শোষিত মানুষের জাগরণের জয়ধ্বনি।

 

 যে কথা বলা যায় না (অপ্রকাশিত)

এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘ধর্ম ও বিজ্ঞান’। যে-বিশ্বাস জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল নয় তা হচ্ছে অজ্ঞান, এবং এই কারণে বিজ্ঞান-বহির্ভূত যেকোনো বিশ্বাসের বিরোধিতা করা আবশ্যক। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ও বিচারে যা নির্ভেজাল হিসেবে প্রমাণিত হয় না তা বিশ্বাস করা অসম্ভব, হোক-না তা মানবিক সামর্থ্যরে উচ্চতম পর্যায়ে অবস্থিত, কারণ যা নির্ভেজাল নয় তা কোনোভাবেই প্রমাণিত হতে পারে না, এবং তা অবশ্যই চরমসত্যও হতে পারে না, যা সত্য নয় তা মানা অসম্ভবই বটে! সত্য প্রমাণে অবশ্যি বিজ্ঞান সুস্পষ্ট, এবং বিজ্ঞানসম্মত পন্থায় সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ, সম্ভবও। যেমন, মধ্যাকর্ষণ শক্তি বলে একটি জিনিশ আছে, বা চাঁদ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি ‘শূন্য’ মধ্যাকর্ষণের স্থান আছে, এসব বিজ্ঞানসম্মত পন্থায় প্রমাণিত সত্য, তর্কবির্তক বা বুদ্ধির বদৌলতে এসবের সত্যতা প্রমাণ করতে হয় না। বিজ্ঞানসম্মত পন্থায় যা প্রমাণিত সত্য তা, অন্যকোনো লক্ষ্যে পৌঁছানোর বাসনা যদি প্রবলভাবে কারও মনে সজীব থাকে তবুও, খ-ানো অসম্ভব, এক্ষেত্রে ধর্মবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে অন্যকিছু প্রমাণ করার চেষ্টা করা অর্থহীন। বিজ্ঞানের কাজ নয় ধর্ম-বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করা বা ধর্মবাণীতে যা বলা হয়েছে তা প্রমাণ করা। বিজ্ঞানের মৌলিক-নীতিকে অমান্য করে কোনো কিছুর পক্ষে, বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয়ে, প্রয়োগ ও প্রমাণ ব্যতিরেকে উকালতি করা সম্ভব নয়, বা এসব করা বিজ্ঞানের কাজও নয়, কারণ ধর্মবিশ্বাসের উপর তার ভিত্তি নয়। পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও প্রমাণের উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞান যা সত্য তাই নির্মাণ করে। মানবজাতির ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা বা অন্ধবিশ্বাসের কাজে বিজ্ঞান সহায়ক হতে পারে না, বরং সে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানের মাধ্যমে মানবজাতিকে, গভীরভাবে, সত্য উপলব্ধি করতে সহায্য করে, তাই যারা হিন্দু-বিজ্ঞান, ইহুদী-বিজ্ঞান, খ্রিস্টান-বিজ্ঞান, ইসলামী-বিজ্ঞান বলে প্রচার করেন, তারা সব্বাই জানেন যে, বিজ্ঞান বিজ্ঞানই, একে ধর্মের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না, বিজ্ঞান হচ্ছে সর্বজনীন ও প্রমাণিত সত্য। লেখক লিখেছেন,

ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে বিস্তর সংঘাত, বিস্তর ব্যবধান বর্তমান। ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস; এ ভিত্তিটি স্থাপন করা হয় ঈশ্বরতত্ত্ব, অলৌকিকতত্ত্ব, অবতারতত্ত্ব, ধর্মগ্রন্থ, পরকাল ও পরলৌকিক মোক্ষলাভ- এসবের উপর; আর এ-ভিত্তির মূলে রয়েছেন ঈশ্বর, তিনি ‘সাকার’ বা ‘নিরাকার’, তাঁকে ধরা, ছোঁয়া বা দেখা যায় না, তবে তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান, তিনি সবার চেয়ে বড় বিজ্ঞানী, সেরা শিল্পী, সেরা গ্রন্থকার; আর ধর্মবিশ্বাসীরা তার ঈশ্বরকে খুশি রাখার জন্য পূজা-আচার-ব্রত-যাগযজ্ঞ-প্রার্থনা-তীর্থযাত্রা-উপবাস-বলিদান ইত্যাদি পালন করে থাকেন। অন্যদিকে বিজ্ঞান দেশকালে বিদ্যমান বস্তু ও ঘটনা সমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক নিরূপণ, পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্তে পৌঁছে; সাক্ষপ্রমাণে যা ঠিকে না তা বিজ্ঞান মেনে নেয় না, তাই বিজ্ঞানের কাজই হচ্ছে সহজ থেকে শুরু করে জটিল ‘পরিঘটনা-ম-লে ক্রিয়াশীল কারণগুলি’র সত্যানুসন্ধান করা।

 

গ্রন্থটি তিনটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে: ‘ধর্ম ও বিজ্ঞান’-শিরোনামে ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা; দ্বিতীয় পর্বে: ‘শ্রীমদ্ভগবদ গীতা’-শিরোনামে গীতায় বিজ্ঞান অন্বেষণ করা; আর তৃতীয় পর্বে: ‘আদিপুস্তক ও নয়াপুস্তক’-শিরোনামে ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থে বিজ্ঞানের অনুসন্ধান করা। এই গ্রন্থতে জ্ঞানপিপাসু আব্দুর রউফ চৌধুরীর সন্ধান মিলে। সন্ধান মিলে প্রগতিশীল মানবচিন্তারও। ধর্ম সম্পর্কে অত্যধিক পড়াশোনা এবং বিজ্ঞান থেকে আহরিত জ্ঞানের যথার্থ প্রকাশ লক্ষ্যযোগ্যভাবে পরিস্ফুট। এ-গ্রন্থে আব্দুর রউফ চৌধুরীর বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় অতি সুস্পষ্ট। লেখক যে একজন যুক্তিনিষ্ঠ, তথ্যসঞ্চয়ী দ্রোহী কথাসাহিত্যিক এই তার প্রমাণ।

 

 আমি মুহাম্মদ আলী বলছি

(‘জনমত’ পত্রিকায় আংশিক প্রকাশিত, ১৯৭১-১৯৭৫)।

 

রচনা-নিদর্শন

 

বানাইয়া হাওড়

 

বানাইয়া হাওড়- কালানি থেকে হরিপুর

বিরাট-বিপুল-বিচিত্র রূপ তার

নীলুয়াপবন হিল্লে¬াল

নৌকাসন্তরণ কেলি

 

ঈশান-কোণে অনিল বিশঙ্কায় উত্তেজিত

কৃষ্ণমেঘের মেলায় মাঝির মুখ আহত

আরোহী চিত্তোদ্বেগে ভীতশঙ্কিত

 

সে কী! বিদ্রোহ! না কী বিপ্লব!

শঙ্কাহীন অসীম পুলকানন্দ

বিপদোত্তরণে উল্ল¬াসানন্দ

 

নীলবেগুনি বাতাস, সবুজশ্যাম বনানী

জলতরঙ্গহীন শান্তপ্রশান্ত প্রান্তর

বন্ধন টুটে যাওয়া লীলানিকেতন

 

সুখের উল্ল¬াস- সুখসমুদ্রসুখোৎপত্তি

তরঙ্গচঞ্চল মহাপ্রলয়মহরত

শোষিতবঞ্চিতলাঞ্চিতভাগ্যহত

মেহনতিশূদ্রের জাগ্রতোল্ল¬াস-

শোষণমুক্ত আত্মার মহানন্দজয়

 

প্রেমিকা

 

হে প্রেমিকা- তোমার অষ্টাদশী ছবি

আমার কল্পনেত্রে আঁকে চালচিত্র

হায় প্রেমিকা- ভালোবাসার মানুষ, তুমিই কাম্য

আমার মতো রূপক পঙ্খীরাজের

 

নীলপদ্মকাঁটায় কবিতা বেঁধেছো হৃদয়ে

সকল নারীর উর্ধ্বে বিচরণ তোমার

প্রেমের আগুনে জ্বালিয়ে মারছো আমাকে

কী নিষ্ঠুর, কী ভয়ঙ্কর তুমি!

 

একতারার সুরে কেবলই বহ্নিশিখা

আমি আর আমি নই

ময়ূরপালকে সজ্জিত একটি কাক মাত্র

তোমার চুম্বন-ছোঁয়ার লোভে নকল ময়ূরপঙ্খী শুধু

 

তোমার দেহস্বাদ গ্রহণ করতে আমি সর্বনাশি বাঁকাচাঁদ

সনাতন-কলঙ্ক মুছতে আমি হত্যা করেছি কৃষ্ণরহস্যকে

 

চলন্ত ট্রেন

 

ইঞ্জিনের ঠসঠস-

বাঁশির কাঁপন, ঠোঁটের দুলন, হাতের নড়ন

চক্রবৃদ্ধি নির্জন সুদের মত চলতে থাকে

উড়ে চলে ব্যাকরণের খাতা

জলপচা রক্তের ঘুরে তাকায় গোরা

যুবতীর বুকে খেলে ওঠে কৃষ্ণচূড়া-

আশ্চর্য দৃশ্য, অদ্ভুত ব্রজবুলির বন্ধুত্ব

 

অগ্রদূত এগিয়ে চলে একমনে-

তার ভাষায় ছন্নছাড়া ইঙ্গিত

পাঁজর-ভাঙা যন্ত্রণার আলপনা এঁকে চলে রেলপাতে

গাছ-ঝোপ-বন-জঙ্গলে চিত্রিত হয় হাঁড়কাঁপা শীত

 

অভিমানী বৃষ্টি-

বরফহীন প্রকৃতির সঙ্গে অনড়-মিতালি পাতে

নিবিড় সম্পর্ক গড়ে অবৈধ ছাতার সঙ্গে

ছাতাটি যেন ভেজা ময়ূরীর মত আড়ষ্ট

 

দূর পাল¬ার রেলগাড়ি

ছোট স্টেশন, একটি দীর্ঘশ্বাস

শোঁশোঁ শব্দ, দুরন্ত দুর্ধম বাতাস

হুমড়ে পড়ে কবুতর স্লিপারের উপর

 

যাত্রীর ওঠানামা, যুবতীর থমকছম

আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত শয়তান, সিগারেটের আগুন

লম্বাচিকন, শক্তশীর্ণ অচূর্ণ চিকুরের বিন্যাস

খোলা স্কার্ফ, আলুতালু অস্থির আবাস

লাবণ্যশূন্য বাসি যৌবনের হাঁটুর ওপর ওঠা কাপড়

পুলকিত-উদ্বেলিত গোড়ার দৃষ্টির অস্থিরতা

 

দৌড়াদৌড়ি-ডাকাডাকি-হাঁকাহাঁকি নেই

‘চা গরম’-‘পান সিগারেট’ হাঁকে না কেউ

বিন্নিধান ছড়ায় না কেউ আঁচলের ভাঁজে

নেই কোনো ধপাধপ নারিকেল পড়ার শব্দ

খই নেই, গুড় নেই, নেই কোনো ভেটের মুড়ি

পদ্মও ভাসে না জলে, শুধু কাগজের ভিড়ে

আঙুর আর নাশপাতি-

 

আর গোরা-

তার মগজ জুড়ে তুলসিতলার ক্লান্তপ্রদীপ

আত্মায় জেগে ওঠে তৃষ্ণিত কামনা

নিজের স্বরূপ লুকিয়ে রাখার কী অপূর্ব চেষ্টা

 

ট্রেন চলতে থাকে পৃথিবীর ভাঁজে ভাঁজে মোড়ে মোড়ে

 

একটি বাতবিলেবু

 

প্রেমিকের নাকে মদের গন্ধ, নারীর গন্ধ-

কবিতার নৌকো ভেসে চলে জীবনসৈকতে

মেঘে-বজ্রে ঢেকে যায় আকাশ

প্রেমিকার চরণে বাজে বিরহসঙ্গীত

 

একটি বাতাবিলেবু-

টপ করে পড়ে যায় ভাদ্রের সমুদ্্ের

প্রেমিকের নাকে মদের গন্ধ, নারীর গন্ধ-

অপূর্ব আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে অলিগলি রাস্তার মোড়ে

কী হিল্লোল! কী দাবানল দাহ; শ্যাওলা-ঢাকা

শ্যাওলা প্রেমের তারকাঁটা জড়িয়ে থাকে ল্যাম্বপোস্ট

 

একটি বাতাবিলেবু-

স্বপ্নে, না শুধু কল্পনায়; না-কী মতিভ্রম- সবই

প্রেমিকের নাকে মদের গন্ধ, নারীর গন্ধ-

গোপন তরঙ্গ ছুঁয়ে যায় ঘড়ির কাঁটা

শাদা রেণুতে নকশি কাটে কদমফুল

প্রেমের তারকাঁটা চুমু খায় বৃষ্টিজলে

 

একটি বাতাবিলেবু-

ছেঁড়া ছাতা, ঘুড়ির ঘুম, লোনা স্নান; না-কী সবই ভুল

প্রেমিকের নাকে মদের গন্ধ, নারীর গন্ধ-

পদ্মপুকুর উত্তাল-পাথাল, ঘোলাটে জল

কলমিলতায় কাঁপে পদ্মপাতা

শব্দহীন হরিখেলা চলে ঝিঙেফুলে

 

একটি বাতাবিলেবু-

টপ করে পড়ে যায় ভাদ্রের সমুদ্রে

প্রেমিকের নাকে মদের গন্ধ, নারীর গন্ধ-

রক্তমাংসে ছড়িয়ে পড়ে গন্ধহীন ময়ূরীরোদ

হৃৎপি-ে চলে শিলাবৃষ্টি আর পাথরে সর্পধর্ষণ

শিকারি-জিভ চুষে খায় প্রেমিকার ভরাট স্তন

 

বিষাদ, বিস্বাদ……টপ করে পড়ে যায়

একটি বাতাবিলেবু ভাদ্রের সমুদ্রে

 

 

পিশাচী অমাবস্যা

 

পিশাচী রাক্ষসী অমাবস্যা দেখা দেয় যৌবন-বীজের বোঁটায়

নিতম্ব জুড়ে চলে প্রেম-ভালবাসা, ধকধক করে পুড়ে চিতার কাঠ

 

শুকনো চন্দন, কলাপাতার প্যাঁচ, বাসি ফুল-

সবই ঝরে পড়ে শূন্য উৎসাহে

কিন্তু আশাভঙ্গ, ভিক্ষা-দারিদ্র্যতা-শোষণ-

সবই বাস্তব- সবই শ্বাশত আলোর মতো স্পষ্ট

 

আর আর্যের দাপটে অসুরের পরাজয়-

মানবস্বার্থের বিসর্জন, অগ্নিদগ্ধ বিভাজন-

সবই অলৌকিক- কল্পনা, সবই অন্ধকার

সবই যেন সাপের আবরণে শয়তানের বাস

 

পিশাচী রাক্ষসী অমাবস্যা দেখা দেয় গোধূলিলগ্নে পটের ছবিতে

ঝাপসা পট জুড়ে চলে প্রেম-ভালবাসা, পুড়ে ছাই চিতার কাঠ

 

 

অনুতাপ

 

শিমুলগাছেতে ধুতরো ফুল

গুবরঢিবিতে আতরের গন্ধ

স্বর্গপুরীতে অগ্নির উৎপাত

অন্ধকারে চলে বিদ্রোহ-বিপ্লব

 

বেত্রাঘাতে পৃথ্বীপি-ে নামে আঁধার

হৃদয় হয় ছিন্নভিন্ন, চমকায় বিদ্যুৎ

ঝরে রক্তের ধ্বজা তনুতে

আঁধার এঁঁকে চলে গোপনে লাল বরাক

 

বাস্তবতার বাস্তবনেত্রে দেখা দেয় আলো

অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, অনুতাপ

বর্ষার জল, অশ্রুপাত, বজ্রনাদ

তুফানের নিশান; তবুও থাকে নিশ্চুপ

নীচতর নীচতম নীচ যে সে।

গল্প

জিন

 

১.

ধূসর আকাশে কঠিন পাথরের মতো আধখানি চাঁদ নেহাত কর্তব্যের খাতিরে মেঘের ভারি লেপের নিচ থেকে তার অলস মুখটি একটুখানি বের করেই, ক্লান্তি দূর হয়নি বলে, আবার ঢুকে পড়ল পেতনীর ঘনকালো চুলের ভেতর। মেঘ ও অন্ধকার স্রোতের মতো ভেসে চলেছে পৃথিবীর উপর দিয়ে; এই মেঘান্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে জোনাকি পোকা তো ছাই, তারাগুলোর আত্মপ্রকাশ করাই কঠিন। মেঘান্ধকার দিব্যি ফুরফুরে হাওয়ার ওপর ভর দিয়ে আসমানজমিন সাঁতরে তালগাছের মাথা খুঁজে চলেছে, আর গোপাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ কলাগাছটি নীরবে আঁকড়ে রয়েছে মাটি ও পানি। চাঁদ উঁকি দিল আবার, সঙ্গে সঙ্গে চাঁদকে নিয়ে বাঁশবনের ফাঁকে কচুরিপানাগুলো লুকোচুরি খেলা শুরু হল; এ-দেখে বুক থেকে অভিমান ঠোঁটে এনে চাঁদকে গেঁথে ফেলল মেঘ। বাতাস ঝুলন্ত পৃথিবীর শিরা-উপশিরা কাঁপিয়ে দপদপ করে জেগে উঠতে-না-উঠতেই চাঁদ রাগের মাথায় মেঘের গায়ে নখ আঁচড়াতে লাগল। যত না অভিমান করছে মেঘ তত বেশি ছুটে চলেছে বাতাস। একসময় শুরু হয়ে গেল তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি, ক্ষণে অক্ষণে বিজলির চমক-পেতনীর দাঁত খিঁচুনী যেন। বাতাস আর পানির ঘ্রাণ অগ্রিম পেয়ে মাটির শঙ্কাকুল অবস্থা। অনেকক্ষণ ধরে আকাশের গুম হয়ে থাকা গুমোট ভাবটি কাটিয়ে উঠতে-না-উঠতেই হঠাৎ বৃষ্টি নামতে শুরু করল। সেই থেকে গাছগাছালি আবারও জলখেলায় মেতে উঠল। অকালের বাতাস যত চমকে ওঠে বৃষ্টিও তত ঝুমুর ঝুমুর তাল তুলছে, তারপর বৃষ্টি ও বাতাস একসঙ্গে মাটির ঘরের ঝুঁটি ধরে প্রলয়তা-বনৃত্য শুরু করল। পাশের বাড়ির মরচে ধরা টুটোফুটো টিনের ওপর আছড়ে পড়া অসংখ্য বৃষ্টিকণার অসহ্য আওয়াজে ছনের ঘরের মধ্যে বসেও বোবা-কালার মতো কা-কা করা ছাড়া উপায় কী! চিৎকার করে কথা বললেও মনে হয় কানের কাছে কে যেন শুধু ফিসফিস করছে, তবুও সিদ্দিক আলীকে কথা বলতে হচ্ছে, ‘মাতছ না ক্যানে?’ উত্তর পেল না সে। মাটির বিছানা আঁকড়ে-থাকা সিদ্দিক আলীর স্ত্রী স্তব্ধ হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, ঘরের কোণে জমে ওঠা অন্ধকারকেও সে ভয় পাচ্ছে, অথবা সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সিদ্দিক আলী সন্দিগ্ন দৃষ্টিতে তাকাল আবার। তার কোমলস্নিগ্ধ মনে শঙ্খচিল ঘুরে ঘুরে অবিরাম স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তার স্ত্রীর কালো ডাগর চোখের ওপর প্রলেপ মেখে থাকা ঘনপালক ঘেরা আঁখিপল্লব নিশ্চুপ, মাথায় ঘোমটা নেই, ঘুমন্ত চোখে শুধুই অদ্ভুত বাস্তবতা, তবে মুখটি খুবই রোগা-রোগা দেখাচ্ছে। না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে তার স্ত্রী! সিদ্দিক আলীর মন বলছে যে, না, এখনো তার চৈতন্য ফিরে আসেনি। একসময় সে হাত বাড়িয়ে তুলে নিল তার স্ত্রীর বাঁ-হাতটি; চুড়িতে মৃদুমন্দ ঝঙ্কার উঠল, তারপর নিঃশব্দ। হাতের ছায়া মিলিয়ে গেল মাটির দেওয়ালে, আর দেওয়ালের অপরপাশে বাতাসের ঝাপটায় একটি সুপারিগাছ ভেঙে পড়ল। সিদ্দিক আলী ঘরের মধ্যে জমে ওঠা অন্ধকারের শাখা-প্রশাখা অদৃশ্যে সরিয়ে বর্গা-ধর্ণার সন্ধান করতে লাগল। অন্ধকারের ঘাড় চেপে মেঘ ঝলসে বিদ্যুচ্চমকালো। অট্টহাসিতে ফেটে পড়া বাদলের ভারে আকাশ ভেঙে পড়ল উঠোনে যেন। তাড়াতাড়ি সিদ্দিক আলী দৃষ্টি ফিরাল তার কোমলকুসুমনয়না স্ত্রীর দিকে, হয়তো অল্প পরেই তার জ্ঞান ফিরবে। পুরো না-হলেও অর্ধেকটা স্বস্তি বোধ করল সে। এইটুকু করতে কী না দাপট গেছে তার স্ত্রীর রক্তমাংসের ওপর দিয়ে, এ-যেন ছিল দেবতা আর দৈত্যের লড়াই, বাতাস আর মেঘের তুফান, দুর্বল আর শক্তির যুদ্ধ-সত্যিই তাই। প্রেতাত্মা ভর করেছিল তার স্ত্রীর দেহে, একেবারে টায়টায় ভর। একাজে অবশ্য আকমল মোল্লার নাম-ডাক আছে-একথা জেনেই সিদ্দিক আলী দৌড়ে গিয়েছিল তার কাছে। প্রথমে তিনি আসতে চাননি, রাতের আঁধারে নদী পাড়ি না-দেওয়ার অজুহাতে; পরে চুন-জর্দা মিশানো পান খেতে খেতে লোভী কাকের মতো বৃষ্টি মাড়িয়ে, বাতাস গলিয়ে, বাঁশবনের ব্যাঙের ডাক এড়িয়ে, হাসিখুশি মুখে এসে উপস্থিত হলেন।

রোগিণীর পাশে রাখা প্রদীপটি টিপটিপ করে জ্বললেও আবছা অন্ধকার নিঃশব্দে ঢেউ তুলছে, আধা-আলো আধা-আঁধারে মুখটি ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। মোল্লাজি মাটির বিছানায় পা গুটিয়ে বসে রোগিণীকে তীক্ষè দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, ‘প্রেতাত্মা, জিন কাবু করিতে সময় লাগিবে।’ সিদ্দিক আলী নিশ্চুপ, শুধু তার দুটো চোখ দরজার ফাঁকে বাইরে ঘুরতে লাগল। একসময় সে দেখতে পেল, কোঁকড়ানো কালোমেঘের ঝাঁক চাঁদকে আগলে রেখেছে, বাতাস দরজার পাল্লার সঙ্গে হোঁচট খাচ্ছে। সেখান থেকে দৃষ্টি ফিরাতেই দেখতে পেল, রোগিণী জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে; তবে বুঝতে পারছে না, কেমন করে যেন একটি অচেনা গন্ধ এগিয়ে আসতে থাকে। মোল্লাজি তার শকুনি দৃষ্টি রোগিণীর দেহে স্থাপন করে বললেন, ‘আইনজা করিয়া ধর সিদ্দিক আলী। জিনকে বশীভূত করিতে হইলে শক্তি লাগাইতে হইবে স্বৈরাচারি শাসকের মতন।’ সিদ্দিক আলীর বুক টনটন করে উঠল, তার চোয়ালের হাড়গুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। মোল্লাজি আবার বললেন, ‘নিকটে আসিয়া বহ্, পিছন থাকিয়া নেউলের মতন আঁকড়াইয়া ধরো।’ তার স্ত্রীকে শোয়া অবস্থা থেকে নির্দয়ভাবে সিদ্দিক আলী একটানে বসিয়ে দিল। তারপর তার লৌহকঠিন হাতে তার স্ত্রীর উরসের মাঝেখানের ত্রিবলি খামচে ধরল; সঙ্গে সঙ্গে তার মাথার মধ্যে ঝলসে উঠল অন্যের শরীর ভোগ করার একরকম টসটস ভাব। মোল্লাজি জিনে ভর-করা গৃহবধূর মসৃণ কেশগুচ্ছ আলতোভাবে বুলিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পাঠ করতে লাগলেন, তারপর কানের কাছে নাক এনে পরের জিনিশ ভোগ করার গন্ধটি শুঁকে বললেন, ‘তেরি নাম কিয়া হে?’ মোল্লাজির মুখ থেকে বেরিয়ে আসা বকবক গন্ধ রোগিণীর মাথাকে বিগড়ে দিল, বলল, ‘আমেনা।’ মোল্লাজি এবার আবিষ্কার করলেন আমেনার সঙ্গে আলাপ করার গোপন পন্থাটি। কুটিল নজর রোগিণীর জড়–লখানায় স্থাপন করে ধ্বনিহীন বাক্যে, অপ্রকাশ্যে, বললেন, ভালই হইয়াছে, এবার জিনের সন্ধান করিতে অসুবিধা হইবে না। তারপর প্রকাশ্যে বললেন, ‘তেরি নিকট থাকিয়া কয়েকটি তথ্য জানিয়া লইতে চাহি। সত্য, সত্য ফরমাইতে হইবে। বলিয়া দাও, তেরি আসল নাম কিয়া হে?’ উপেক্ষিত নারী আবারও বলল, ‘আমেনা।’ বাকবাকুম আর বাকবাকুম। মোল্লাজি রোগিণীর সঙ্গে কথার চরকা কেটে চললেন। সিদ্দিক আলীর বুকের ওমে আমেনার শরীর গলতে শুরু করলেও মন আপোস মানতে নারাজ; আর মোল্লাজি মনমতো উত্তর না-পেয়ে চিত্তবিকার-বিক্ষেপে ক্ষেপতেই লাগলেন; তিনি প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর যে, জিনের সঙ্গে আলাপ করছেন, আমেনার সঙ্গে নয়। শুধু ভর্ৎসনা বা কটুবাক্যই নয়, তার মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে আমেনাকে নির্মমভাবে প্রহার করার জন্য। মোল্লাজি অসহায় সিদ্দিক আলীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যেমনি করিয়াই হউক আজি রাত্রি জিনকে তাড়াইতে হইবে। শরীরে কিলগুতা বসাইলে জিন এমনি এমনিই কাটিয়া পড়িব।’ সিদ্দিক আলীর মুখে চিন্তার ছাপ, প্রদীপের আলো ও ছায়া ষোলকটি কাটতে লাগল তার চওড়া কাঁধে, হাতের পেটানো পেশিতেও; তবে বিষণœ কিন্তু গভীর চোখে তাকিয়ে রইল মোল্লাজির দিকে। বৃষ্টিভেজা রাতে স্যাঁতস্যাঁতে হাওয়ার মধ্যেও তার পেটানো বুক স্বেদে সপসপ করছে, আমেনার শরীরে আলাদা তাপ তাই হয়তো, তবুও সে একবার আড়চোখে দেখে নিল তার হাতের মধ্যে বন্দী থাকা থরথরে কালোছায়াটিকে। আমেনার দেহলতা দারুণভাবে শক্ত হয়ে উঠেছে, এমনকি প্রকৃতির বিবর্তনে নিপুণতায় গড়া তার উরসিরুহ-দুটোও নড়তে চাচ্ছে না, তার গালও না; সেই গালে মোল্লাজির নির্দেশে সিদ্দিক আলী চড়থাপ্পর বসাল। অত্যাচার সহ্য করতে না-পেরে আমেনার চোখ দিয়ে বেরিয়ে এল কয়েক বিন্দু জল, যেন বেদ্বীন জিনের কাতর আর্তনাদ। আমেনার পাশে বসা মোল্লাজি হঠাৎ কিছুটা টানাটানা ও কর্কশ স্বরে হেসে উঠলেন। হাসি থামলে আড়চোখে আমেনার বুকের স্ফুটনোন্মুখ দুটো চুচুকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বলিবা না? তোমাকে বলিতেই হইবে।’ আর অস্পষ্ট ভাষায়, অর্থাৎ মনে মনে, আমেনাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, না বলিলে আজি রাত্রি তোমার যোনিরস চুষিয়া খাইব। কিন্তু কথাগুলো কোনো মতেই তার ঠোঁটের ফাঁকে বেরিয়ে এল না, বরং তার কণ্ঠ এর আগেই থেমে গেল। তাকে নেশায় পেয়েছে, মাগির নেশায়; তার ছোটো ঘোলাটে চর্মচক্ষু-দুটো ঘোর স্পন্দনে জেগে উঠল আবার। মোল্লাজির ব্যবহার প্রত্যক্ষ করে সিদ্দিক আলীর হৃৎপি- দ্রুতলয়ে নাচতে লাগল, কিন্তু মুখে কিছুই প্রকাশ পেল না, বরং আমেনাকে দেখতে দেখতে একটু-আর্ধেকটুকু উষ্ণতা ক্রমশ সঞ্চয় হতে লাগল তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। রূপসীর দেহলতা কেমন যেন বিচিত্র চিরন্তনভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠল তার চোখে, তাই হয়তো সে দাঁত দিয়ে এ মুহূর্তে আমেনার কপোলকে কামড়ে ধরতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে কই, বরং তার চমক ভাঙল যখন মোল্লাজি মিনমিন করে বলতে লাগলেন, ‘নাম তোমারে বলিতে হইবে, নইলে তোমার গভীরে অনুপ্রবেশ করিয়া জিনের জাত মারিয়া দিমু সুন্দরী।’ সিদ্দিক আলীর কাছে এ-যেন আকাশ ফাটা কথা, বজ্রপাত। যদিও মোল্লাজির মুখে পরম আনন্দের একরকম তৃপ্তির হাসি প্রকাশ পাচ্ছে, তবুও সিদ্দিক আলী নিথর পাথর যেন, প্রতিবাদের সব ভাষা তার কাছে অজানা।

 

২.

ডিমডিম প্রদীপশিখা জ্বলছে সিদ্দিক আলী ও আমেনার মাঝখানে। আমেনাকে এই ক্ষীণ প্রদীপের আলোতে কেমন যেন ছায়া ছায়া লাগছে। সিদ্দিক আলী গোপনে প্রদীপটি আরও কাছে এনে আমেনার মুখের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের ফাঁকে লেপটে আছে ঘন ফেনার ছটা; এই ফেনা বেয়ে, পৃথিবীর চোখ বেয়ে পরাজয়ের গাঢ় অন্ধকার নেমে এসেছে যেন সিদ্দিক আলীর চোখে। অন্যদিকে, কৌতূহলের এক সুস্পষ্ট রেখা ভেসে উঠেছে যেন আমেনার অবিন্যস্ত কুন্তলদলে। ঘর নিঝুম, আকাশ নিঝুম, বাঁশপাতা নিঝুম, তবে বাঁশবনে ব্যাঙের দল সুর তুলেছে আবার, ঘ্যাঙোর ঘ্যাঙোর; ডুবাজলে মাছের লাফালাফি চলছে সফাৎ সফাৎ; এসব শব্দের মাঝেই, ঘরের ভেতরকার জগৎটি অচেনা হয়ে উঠেছে সিদ্দিক আলীর কাছে। সে মাটিতে বসে তার কাঁধ থেকে লাল-সবুজ গামছাটি সরিয়ে নিয়ে, এর খুট দিয়ে আলতোভাবে আমেনার মলিন মুখ মুছতে লাগল। ঘরের আবছা-আচ্ছন্ন অন্ধকারও তার আহ্লাদের ঝিমঝিম ভাবটি উপলব্ধি করছে। আমেনার বুক থেকে শাড়ি সরিয়ে এই বৃষ্টিভেজা রাতে জোরে জোরে তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া দিতে লাগল, তাকে শান্ত করার চেয়ে, মনে হচ্ছে, নিজের পরাজয়কেই প্রশান্তির প্রলেপে ঢেকে দিতে চাচ্ছে। একসময় তার অন্তর যখন একটু শান্ত হল তখন সে লুঙ্গির খুট থেকে দিয়াশলায়ের একটি বাক্স বের করে কানের পাশে গুঁজে রাখা বিড়িতে আগুন ধরাল। তারপর বিড়ি টানতে টানতে আমেনার পাশে উবু হয়ে বসে চুপিচুপি ডাকল, ‘আমেনা, উটছ্  না!’ কোনো সাড়াশব্দ নেই, তবুও শান্তনরম চোখে তাকিয়ে রইল। একটু গভীর, একটু করুণ দেখাচ্ছে আমেনাকে। তার বুকে হাত রেখে নিঃশব্দে একগুচ্ছ ধোঁয়া ছাড়ল। হঠাৎ, অজান্তেই, দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। নিবে গেল তার বিড়ির আগুন। সিদ্দিক আলী মনে মনে বলল, না, অকনও  আমেনার হুঁশ অইছে-না । তাক, পরিয়া তাক। হুঁশ অইলেই  জাগিয়া উটব। নিজেকে সান্ত¡না দিল। সময় এগুতে লাগল। জিনের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া যে কী দারুণ ব্যাপার তা আজ সিদ্দিক আলী স্বচোখে দেখেছে। শুধু কী তা-ই, নিজের হাতে গরম করে নিয়েছিল একটি লাল মরিচ, সরষে তেলে ডুবিয়ে। পেশিতে শক্তি সঞ্চয় করে আমেনার নাকের কাছে কোনো রকম তুলে এনেছিল, কিন্তু আর অগ্রসর হতে পারেনি। যতবার চেষ্টা করছিল ততবারই তার হাত কেঁপে উঠছিল। অগ্রসর হতে পারেনি বলেই হয়তো মোল্লাজি ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘আহা, মায়া করিলে চলিবে না। ও এখন তোমার স্ত্রী নহে। জিন। বুঝিলা-আসল জিন।’

তবুও পারেনি সিদ্দিক আলী। সে নির্বিকার। তার মুখ পাংশু হয়ে ওঠে। মনে মনে বলে যে, শেষ পর্যন্ত কী আমার ভাগ্যে ছিল অন্যের আদেশে আমেনার ওপর অত্যাচার চালানো। মোল্লাজি মরিচটি কেড়ে নিয়ে নির্মল হাসি হেসে বললেন, ‘তুমি বাহিরে যাও। আমাকে বহু কঠিন কঠিন ব্যবস্থা লইতে হইবে। তুমি সহিতে পারিবে না।’ সিদ্দিক আলীর নিপাটনগ্ন বুকে মোল্লাজি যেন শাবল মেরে থেঁতলে দিলেন। মখমলের মতো ব্যথা নিঃশব্দে আঁচড় কাটতে লাগল তার হাড়ের নিচে; চিড়চিড় করে উঠল তার অন্তরাত্মা। সে জানে, জিন-বল বা ভূত-বল কোনওটাই ছাড়ানো চাট্টিখানি কথা নয়, তবুও চোট সামলাতে হচ্ছে মোল্লাজিকে। কিছু না-বলে যন্ত্রচালিতের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে এল সিদ্দিক আলী; সঙ্গে সঙ্গে একঝলক দমকা হাওয়া লাফিয়ে ঢুকল ঘরের ভেতর, চারদিক ভরে গেল ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে। দরজা বন্ধ করতে করতে সিদ্দিক আলী একবার অসহায়ভাবে উঁকি দিল মোল্লাজির দিকে। মোল্লাজির চুলগুচ্ছ, আমালদামাল বাইরের বাতাসের মতো, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তার ঘাড় ও কাঁধ জুড়ে। মোল্লাজি একহাতে কাঁপা প্রদীপ ধরে, অন্যহাতে প্রদীপশিখাকে বাতাসের ছোবল থেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। এরই নিচে আমেনার দেহখানা যেন আখনপাতার মতো বিধ্বস্ত। মুখটি গভীর অন্ধকারের অতলে। অন্ধকারে ছেয়ে গেছে তার পিছনও। দরজা বন্ধ করতেই শিকল ওঠার শব্দে সিদ্দিক আলীর পা-দুটো যেন বরফ হয়ে গেল; সঙ্গে সঙ্গে দাওয়ার বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে নীরবে বসে পড়ল। তার নীরবতা ভাঙল অজানা এক আতঙ্কে, কেঁদে ওঠার শব্দে। মানুষের এত কান্না কোথায় জমা থাকে? অবিরত ক্রন্দনেও যেন তার চোখের অশ্রু ফুরোয় না, কিন্তু কান্নার শব্দ যেন মোল্লাজির কানের পর্দা ভেদ করতে অক্ষম। বাইরে হাওয়া ও বৃষ্টির যুদ্ধ ঠিকই চলছে। এরইসঙ্গে শুরু হয়ে গেছে মোল্লাজির একের-পর-এক পরীক্ষানিরীক্ষা, জিন তাড়ানোর সুব্যবস্থা, জানা-অজানা পন্থাগুলোর প্রয়োগ। ফুটন্ত সরষে তেলে ডুবানো আরেকটি লাল মরিচ স্বহস্তে তুলে নিয়ে আমেনার নাসারন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিলেন মোল্লাজি, ‘বিসমিল্লাহ’ বলে। হালকা চিৎকার উঠতেই বাঁ-হাতের পাঁচ আঙুলে মোল্লাজি ঝাঁপটে ধরলেন আমেনার মূর্ধজগুচ্ছ, তারপর হেঁচকা-টানে গায়ের সর্বশক্তি প্রয়োগে তাকে ঝাঁকতে লাগলেন। মাথার ব্যথায় অস্থির হয়ে উঠল আমেনা, উঃ-আঃ করতে লাগল। এই অস্থিরতাকে কাবু করতে মোল্লাজি হাঁটু স্থাপন করলেন তার নেতিয়ে পড়া উরুসন্ধিতে। আমেনা বাঘিনীর দৃষ্টিতে জরিপ করতে লাগল মোল্লাজিকে, একইসঙ্গে তার আলামতকেও। রমণীর শরীর দখলের লোভে আগমনলগ্ন থেকেই শেয়ালের মতো জিভ বের করে ঝুঁকে আছেন মোল্লাজি। সুরমাটানা চোখ-দুটো পলকহীন, রমণীর দেহকে শুধু চাখছে। মোল্লাজি বারংবার বলা সত্ত্বেও আমেনা রাজি হচ্ছে না নিজেকে জিন বলে স্বীকার করতে, তাই মোল্লাজি নিজের রাস্তা ধরে আমেনার ঘাস-মাটি সব হাতিয়ে নিতে ওঠেপড়ে লেগে গেলেন। আমেনার মনের মধ্যে ঘোড়দৌড় চলছে; সে তার শাড়ি দিয়ে চাঁদের মতো অর্ধকলা নাভিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে কই; কারণ মোল্লাজি পরমযতেœ তার দেহকে মাটির শয্যায় গেঁথে নিয়েছেন। আড়াই-হাতের মোল্লাজির মাথায় আড়াই রকমের মতলব গজগজ করছে; তার মতিগতিও কেমন কেমন যেন; একারণেই হয়তো তিনি ধস্তাধস্তিতে ঘেমে উঠেছেন। মোল্লাজির লুঙ্গিতে ঢেউ তোলা নানারকম অদৃশ্য তরঙ্গ আমেনার শরীরে এসে ধাক্কা লাগছে, সে ঠিকই বুঝতে পারছে ঘাসফড়িং হয়ে তিনি তাকে চেটে নিতে ব্যস্ত। আমেনার চোখ-দুটো, মোল্লাজিকে ছুঁয়ে, তার স্বামীর সন্ধানে ব্যস্ত, কিন্তু কোনো পাত্তা পাচ্ছে না; তবে মোল্লাজি তার কাজে অটল, তিনি কোলা-ব্যাঙের মতো গলার স্বর করে বললেন, ‘তুহি আমেনা না। তুহি কালাচাঁন জিন।’ মোল্লাজিই ঠিক। আমেনা এখন আর আমেনা নয়। আমেনার শরীরে ভর করেছে কালাচাঁন জিন, তবুও এই দেহ যে তার। দাওয়ায় বসে থাকা সিদ্দিক আলী তার স্ত্রী যে কষ্ট পাচ্ছে তা আর সহ্য করতে পারছে না। এমন অত্যাচার কী মানুষ সহ্য করতে পারে? অথচ তার কিছুই করার উপায় নেই। নিজের নিরুপায় অবস্থার জন্য আপনা থেকেই তার চোখের পাতা ভিজে উঠল আবার। তার মুখে বেদনার ছায়া, দমবন্ধ হয়ে আসা অবস্থা যেন। তার স্ত্রীর উপর যে অত্যাচার চলছে তা সহ্য করতে না-পেরে সে তাড়াতাড়ি দাওয়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল, খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টি আর বাতাসের যুদ্ধে নিশ্বাস ছেড়ে বাঁচতে। বৃষ্টিভেজা হাওয়ার বেসামাল ধাক্কায় কেমন যেন হালকা বোধ করল সে। দাওয়ার কাছে ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন একটি ছোট্ট মাটির ঘর, খোলা দরজা; এর ভেতর ডানার আশ্রয়ে বাচ্চা নিয়ে ঝিমুচ্ছে একটি মুরগি; আর এর সামনে জলেভেজা, দাঁড়িয়ে থাকা, বুকের পাঁজর বের করা কুকুরটি, মন্থরগতিতে চলা একজোড়া পায়ের আওয়াজে মুখ তুলে তাকাল। অন্ধকার সিদ্দিক আলীর চোখে ধাঁধা ধরিয়ে দিয়েছে। সে দেখে, কুকুরের চোখে ক্রোধের আগুন, যেন তেলসিক্ত লাল মরিচ- শয়তানের ত্রিশূল; এরইসঙ্গে ভেসে উঠল ছিলিমে রাখা একটুকরো জ্বলন্ত আংরা, তার বিপদ ও মনের অস্থিরতা কাটিয়ে নেওয়ার আহ্বান যেন। সিদ্দিক আলীর মনের কথা বুঝতে পেরে কুকুরটি তার মুখ ফিরিয়ে নিল; তবে উঠোনের অন্যপাশে অভাবী সংসার সারাদিন একা একা টেনে ক্লান্তির ভারে পাটিতে রাঙাবৌ শোয়ে আছে, পাশে তার ছেলে, অবশ্য তার স্বামী সদরে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না সিদ্দিক আলী। ভাবীর ঘরে গিয়ে এক ছিলিম তামাক চেয়ে নেবে কী! আমেনার আর্তচিৎকার ভেসে এল সিদ্দিক আলীর কানে আবার। তার বুকের মধ্যে কাদা মাটিতে মটোরগাড়ির চাকা যেমনি দাগ কাটে তেমনি ব্যথার আঁচড় কাটতে লাগল, শরীরও কাঁপছে। জিন তাড়ানোর সবচেয়ে কঠিন-কঠোর ব্যবস্থার বোধ হয় প্রয়োগ করা হচ্ছে। জিন যত বেয়াড়া ততই মোল্লাজিকে তেড়ে উঠতে হচ্ছে। বেশরম জিনের জাত। যেমনি কুকুর তেমনি মুগুর প্রয়োজন-নইলে কী চলে! কার্যসিদ্ধি নিয়ে কথা। আকাশ-পাতাল আবারও মাতাল হয়ে উঠেছে, ঝড়-বৃষ্টির তা-ব খেলা চলছে। সিদ্দিক আলী এলোপাতাড়ি পা ফেলে ছিলিমের সন্ধানে এগিয়ে এল। পৃথিবী অশান্ত-চাল উড়ছে, গাছ ভাঙছে। সর্বনাশের এই আতঙ্কে রাঙাবৌ তার ছেলেকে কাঁথায় আঁকড়ে ধরে দরজা খুলে দিল। প্রকৃতি থাবা মেরে ভেঙে দিল গরুহীন গরুঘরের বেড়া, ডুবিয়ে দিল যে-পথ মাড়িয়ে সিদ্দিক আলী একটু আগে এসেছিল সেই পথ। সে বন্দী হল বৃষ্টিজলরাশিতে। অন্য-পথের সন্ধান না-জানা দিশেহারা সিদ্দিক আলী মুখ থুবড়ে বসে রইল রাঙাবৌয়ের ঘরে। একসময় ছিলিমের সন্ধান পেল। অন্যদিকে বুকে বুক, হাতে হাত, ঊরুতে ঊরু স্থাপন করে, তবে মুখে মুখ লাগিয়ে স্বর্গোদ্যান বিচরণ করতে যতই চেষ্টা করছেন মোল্লাজি ততই আমেনা মাথা সরিয়ে নিচ্ছে, শুরু হল আবারও ধস্তাধস্তি, কোস্তাকুস্তি। অতৃপ্ত, বঞ্চিত, অপূর্ণ রতিক্রিয়ার ক্ষোভে মোল্লাজির প্রকৃতির উপাদান গোপন অঙ্গটি আমেনার ঘরের মধ্যে বসবাসের সন্ধান করতে না-পেরে বাইরে প্রবলভাবে মাথা কুটে মরছে। ঊরুসন্ধির তৃণরোমে আগুনের অজানা দহন অনুভব করে আমেনা থরথর করে কেঁপে উঠল; তার নাভিমূলও। আত্মার মধ্যে সমস্ত সৃষ্টিকে ধ্বংস করে দেওয়ার একটি আকাক্সক্ষা রচিত হতে-না-হতেই আমেনা ঝাঁপ দিল স্বামীর সঙ্গে মিলনের স্মৃতিতে, রোমাঞ্চকর উন্মাদনায়। বুক কম্পিত, উরু উত্তপ্ত, মন দ্রোহাচ্ছন্ন। আর তার হৃদয়ে রণহুঙ্কার, মাথায় সূর্যের চেয়েও তেজি বিদ্যুচ্চমক, এটমে এটমে আলোড়ন যেন। বাইরে যতই প্রকৃতি তর্জনগর্জন করছে না কেন ভেতরে কিন্তু একসময় সবকিছু থেমে যায়, শেষ পর্যন্ত জিনই হাল ছেড়ে দিল। আমেনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার শরীর দখল করে নিয়েছেন মোল্লাজি। জিনসাধকের শক্তির সঙ্গে পেরে ওঠা কী রমণীর কর্ম! তাই তো জ্বলন্ত কয়লায় পোড়া লাটিমাছের মতো ব্যথায় মোচড়ে উঠতে লাগল আমেনা। সে চিৎকার করল, কিন্তু কণ্ঠ ফুটল না; শুধু তার মন বলতে লাগল, ঘরের বাইরে থাকা কুকুরের চেয়েও অপবিত্র এই মোল্লাজি; তবে তার মনের কথা মুখে প্রকাশ করতে পারল না, তাই হয়তো তার বুক ফুলে উঠেছে। ‘এর মধু পান করিয়াই আমি তোমাকে জিনের হাত থাকিয়া রক্ষা করিব।’ কথাটি মোল্লাজির মনে উদয় হতেই তার পেশিতে রক্তপ্রবাহ দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে লাগল। মোল্লাজির অদম্য শক্তির কবলে আমেনার দেহের প্রতিটি ভাঁজ আস্তেধীরে স্বর্ণলতার মতো নেতিয়ে পড়ল; কিন্তু তার নাসারন্ধ্র দিয়ে প্রবাহিত হতে লাগল উষ্ণ নিশ্বাস, আগুনের স্ফুলিঙ্গ যেন। একসময় মোল্লাজির দেহের চাপ শীতল হয়ে এল। শক্তির বেগ কমে গেল। আবেশ ছড়িয়ে পড়ল তার দেহ জুড়ে। স্খলনের আনন্দপ্রবাহের সফলতায় মোল্লাজির ঠোঁটে তৃপ্তির দুষ্টু হাসির তরঙ্গ ভাঙতে লাগল। এরই একটি তরঙ্গ মুখে ধারণ করে মোল্লাজি ফিসফিস করে বললেন, ‘সর্বসময় আমি তোমারে রক্ষা করিব। জিন তোমারে আর ধরিতে পারিবে না। আমার রস ধারণ করিয়া তুমি পরিপূরক হইয়াছ। তৃপ্তির পূর্ণতা লাভ করিয়াছ।’ একইসময় পুকুরের পাড় ডুবুডুবু করে পৃথিবী শান্ত হল, পাড়ার ছাগলপাল কান্না থামাল; তবে সিদ্দিক আলীর দাওয়ার চাল উড়ে গিয়েছে, হা-হা করছে, যদিও ছনের কোনো দোষ ছিল না, দিন কয়েক আগেও সে শক্তহাতে মেরামত করেছিল, বেঁধেছিল ঝাউবেত দিয়ে, তার ওপর ছেঁড়া মাছধরার জালটিও ছড়িয়ে দিয়েছিল। এরইমাঝে সিদ্দিক আলীর দাওয়ার কুকুরটি আশ্রয় নিয়েছে অন্যের দাওয়ায়। অবশ্য মুরগিটি তার বাচ্চাসহ বন্দী অবস্থায় এখানেই রয়ে গেছে; আর উড়ে যাওয়া চালের নিচে আমেনা যে খিড়কিপথে এটা-ওটা ফেলত সেদিকে সিদ্দিক আলী, ঘন অন্ধকার আঁকড়ে থাকা, বিস্ময়ভরা, নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল। বাতাসের দাপটে রান্নার হাঁড়িতাগার ঘটিবাটি সিঁকের মধ্যে আত্মগোপন করেও যখন রক্ষা পায়নি তখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে এখানে সেখানে। সিঁকেতে যত্ন করে তুলে রাখা মেহমানদের জন্য চীনা মাটির দু-খানা বাসনও দরজার সামনে পড়ে টুকরো টুকরো। এদেরকে পাশ কাটিয়ে মোল্লাজির অন্তরের মতো শূন্যদৃষ্টিতে সিদ্দিক আলী ঘরে ঢুকে দেখল আমেনা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে পাটির একপাশে, লাশ যেন। আমেনার শাড়ি ছিন্নভিন্ন, যেন ঝড়ের পর কলাপাতা। প্রথমেই অনাবৃত দেহাংশ ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করল সে, শরমের ছোঁয়া তার নিজের চোখেমুখে যেন লেপটে আছে; কিন্তু সাফল্যের হাসির বান ভাঙতে লাগলেন মোল্লাজি। হাসি যখন একটু থামল তখন তিনি তার ভাঙা দাঁত বের করে বললেন, ‘আর ভাবনা নাহি। অনেক কষ্ট করিয়া জিনটাকে বিদায় করিয়াছি।’ কথাগুলো বলে মোল্লাজি আড়চোখে তাকালেন সিদ্দিক আলীর চিন্তিত মুখের দিকে। ‘কিতার লাগি আমেনারে জিন আছর করচিল?’ সিদ্দিক আলীর কথায় তার মুখে মৌল্লাজি অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে কী যেন খুঁজতে লাগলেন! কিন্তু সেখানে মান-অভিমান, দুঃখ-রাগ কোনো কিছুরই আভাস পেলেন না তিনি, তাই হয়তো তার মুখ গলিয়ে চোখ গিয়ে ঠেকাল উঠোনের অন্যপাশে-হেলে পড়া লেবুগাছের ছায়াটির উপর। ঘরের ভেতর থেকে, অন্ধকারের মধ্য-দিয়ে, গাছটির মাথা চোখে পড়ছে না, পড়লে হয়তো দেখতে পেতেন লেবুগাছটি ফুলে ভরপুর ছিল, ঝড় ও বৃষ্টির দাপটে ঝরে পড়েছে। প্রদীপের আলোতে ঋজু কা-টিও দেখা যাচ্ছে না, গুড়িতে ছড়িয়ে থাকা ঝরাপাতাগুলোও না। মোল্লাজি সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সিদ্দিক আলীর উপর স্থাপন করতেই দেখতে পেলেন, সে মুখ যেন আস্তেধীরে কঠোর হতে শুরু করেছে। মোল্লাজি নিজের মনের কথা গোপন রেখে বললেন, ‘জিনের মতে, হানজাবেলা , বাঁশবনে তাহার সঙ্গে তোমার স্ত্রীর মহব্বত হইয়া ছিল।’ আহত অভিমানে সিদ্দিক আলী বলল, ‘অখন কিতা অইব।’ মোল্লাজি বললেন, ‘চিন্তার কোনো কারণ নাহি। নাকে খৎ দিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়া গিয়াছে যে, সে আর কোনো দিন এই তল্লাটে আসিবে না। তবুও বলিয়া রাখিতেছি, ভবিষ্যতে আমার প্রয়োজন পড়িলে আমারে ডাকিতে দ্বিধা করিও না।’ এসব বলতে বলতে মোল্লাজি বিদায় নিতে উদ্যত হলেন, আর তখন সিদ্দিক আলী তার গায়ের রক্ত পানি-করা বহুদিনের প্রচেষ্টায় জমানো টাকাগুলো তার হাতে তুলে দিল। মোল্লাজি কাঁপা হাতে দোয়া করে, পকেটে টাকাগুলো গুঁজে, মিলিয়ে গেলেন ঝড়বৃষ্টির প্রলয় শেষের অন্ধকারে।

 

৩.

ঘণ্টা কয়েক আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ছবির মতো সিদ্দিক আলীর মনের পর্দায় ভাসতে লাগল। তন্ময়ভাব কেটে গেলে সে আবার তাকাল আমেনার দিকে। মাত্র এক বছর আগে, আমেনার বাপের ঘাটে পঁচা-পাট ছাড়ানোর জন্য বোঝাই করা নৌকা থেকে ভিজে পাটের আঁটিগুলো গুনে গুনে তুলে দিচ্ছিল সিদ্দিক আলী। তখনই সে লক্ষ করছিল যে, ষোড়শী আমেনা পাটশলার আড়ালে বসে কী যেন করছে। সূর্য তার আভা দিগন্তব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে জেগে উঠেছিল কিছুক্ষণ আগে। আমেনাকে সেই আলোতে আধখানি চাঁদের মতো মনে হচ্ছিল সিদ্দিক আলীর কাছে। গরিবের ঘরে আনন্দ আসে ঈদের দিনই শুধু, তবুও আমেনাকে ঘরে তুলে আনার পর, গত এক বছর ধরে, সিদ্দিক আলীর সংসারে আনন্দের কোনো অভাব হয়নি। আমেনার চাঁদমুখ মলিন হয়নি একদিনের জন্যও। আজ সেই মুখে বিষাদের রেখা স্পষ্টভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে। কপালে হাত দিয়ে সিদ্দিক আলী বুঝল আমেনার শরীর গরম। কাঁথা দিয়ে গলা পর্যন্ত ঢেকে দিয়ে, নিভে যাওয়া বিড়িতে আগুন ধরিয়ে, ঘনঘন টানতে লাগল; কিন্তু তার দৃষ্টি আমেনার উপরই স্থির। হঠাৎ আমেনার চোখের পাতাগুলো কেঁপে উঠল, ঠোঁটও মৃদুমন্দ নড়ছে। একসময় আস্তেধীরে চোখ-দুটো খুলে আমেনা তাকাল। মুখের কাছে মুখ এনে সিদ্দিক আলী প্রশ্ন করল, ‘কিলাকান  লাগতাছে? কষ্ট অইতাছে বুজি?’ সন্দিহান চোখে পালটা প্রশ্ন করল আমেনা, ‘ইবলিসের পোয়াটা গেছেগি ?’ জিন না মোল্লাজি কার কথা-ঠিক ঠাহর করতে পারল না সিদ্দিক আলী, তবুও আমেনাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল, ‘এককুইবারে  গেছেগি। হারা জীবনের লাগি বিদায় অইছে। যাইবার সময় ঐ কতাই কইয়া গেছইন মোল্লাজি।’ আমেনার ঠোঁটের কোণে গোপন হাসির ঝিলিক উঠল; সেই হাসি দেখে সিদ্দিক আলী আশ্বস্ত হল, জিন ঠিকই আমেনাকে ছেড়ে পালিয়েছে। সে সস্নেহে আমেনার শরীরে হাত বুলাতে লাগল। দুজনই নিশ্চুপ। হঠাৎ সিদ্দিক আলী নীরবতা ভেঙে বলল, ‘কিলাকান কেয়ামতই অইয়া গেছে। আমি অখনও বুঝতাছি না হানজাবেলা তুমি বাঁশবনে কিতার  লাগি  গেছিলায় ?’ কথাটি শোনামাত্রই আমেনা রক্তজবা চোখে তাকাল তার স্বামীর দিকে। তারপর মুখ ভেংচে বলল, ‘গেছি তো ভালাই করছি। তুমি অত ভাবীর কথায় নাচ কিয়র লাগি কওছান হুনি?’

এখানেই যেন মূল গল্পটি শুরু হয়। স্ত্রীর মুখে কী সিদ্দিক আলী সন্ধান করে তার নিজস্ব জীবনভূগোল, তার এতদিনের অস্তিত্ব ও অবস্থানের সূত্র, তার বন্ধন-এসবই ভাবতেই থাকি। ভাবতে থাকি এ-গল্পের রস মোপাসাঁ বা ও’হেনরির রচনার চমক সম্বন্ধে, যা অলক্ষিতই থেকে যায়। আব্দুর রউফ চৌধুরীর গল্পের বিষয়ে যেমন মানুষের আত্মার টান আছে ঠিক তেমনি নির্মাণকলাও বিস্ময়কর ও স্বতন্ত্রভাবে ফুটে উঠেছে।

নেশা : মানুষের জীবনের মৌল রূপটি যতই আদিম হোক, কী তার আসল রূপ-এই ভাবনা থেকেই রচিত হয়েছে ‘নেশা’ গল্পটি। এ-গল্পের কাহিনী হচ্ছে এরকম: জাবেদ নামের এক প্রবাসী বাঙালির এক-রাত ও এক-সকালের ঘটে-যাওয়া ইতিবৃত্ত। তার সূত্র ধরে গল্পকার চরিত্র ছাড়িয়ে মানব স্বভাবের আদিমতম বৃত্তি-যৌনতা, ধার্মিকের নির্দয়তা, বিদেশির ক্রুরতা, বন্ধুর প্রতি বিশ্বাস প্রভৃতি বিষয়ের সমন্বয়ে বেঁচে থাকার প্রয়াসগুলো অতি নিপুণতার সঙ্গে পরিবেশন করেছেন। শত বাধা-প্রতিকূলতার মধ্যেও জাবেদ পরাজয় মেনে নেয় না, সর্বদাই সে যেন অপ্রতিহত ও অনবদমিত। সবকিছুর মধ্যে জীবন উপভোগের এক প্রবল বাসনা তার ভেতর সক্রিয় থাকে। এই গল্পের প্রথম ঘটনাস্থলরূপে নির্দিষ্ট হয়েছে ব্রিকলেন, পরে অক্সফোর্ড স্ট্রিট; আর শেষ হয়েছে আবার প্রথম ঘটনাস্থলে। নারীর সঙ্গবিহীন এক নিরুৎসাহ জীবনের জ্বলন্ত ছবি লেখক এঁকেছেন কাহিনী-বিন্যাসে ও বর্ণনার রঙে-রসে। তিনি জাবেদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ফুটিয়ে তুলতে উপকাহিনীর সাহায্য নিয়েছেন। বর্ণনার বাস্তবগুণ, বাস্তবতার অভ্যন্তরে প্রবাহিত লেখকের স্মৃতি, বৃহত্তর সামাজিক ও গভীরতর মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিত-সবই যেন প্রকাশিত হয়েছে এ-গল্পে।

বর্ণনায় ব্যবহৃত হয়েছে চলিতগদ্য, লেগেছে কাব্যের স্পর্শ। বর্ণনার মাধ্যমেই অনেকটা খোলাখুলিভাবে প্রকাশ পেয়েছে নারীর সঙ্গবিহীন পুরুষের জীবনের চিত্রটি। এতে গল্পের রসহানি হয়নি বরং গল্পের প্রাণে সাড়া জাগিয়েছে, কাঠামোতে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে গড়া জীবনের পরিপূর্ণ ছবি অনাবিষ্কৃত থেকে যায় যদি না এতে থাকে মানুষের গোপন ইচ্ছার প্রকাশ। দেহের বাসনাকে অস্বীকার করলে জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ দেখানো অসম্ভব। দ্রোহীশিল্পী এ-থেকেই উপকরণ খুঁজে নেন, খ- পরিসরে সৃষ্টি করেন মানুষের পূর্ণাবয়ব চিত্রটি। এই গল্পের গঠনে লেখক প্রচলিত পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। বর্ণনার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন সংলাপ, যার ভাষা স্বতন্ত্র। গল্পের কেন্দ্রীয় ভাব একেবারে গল্পের শেষতম অনুচ্ছেদে ফুটে উঠেছে :

জাবেদ তার দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল, ‘গতরাতে কি হয়েছিল? কোনো গোলমাল করেনি তো?’ হেসে উঠল অভিষেক, তারপর বলল, ‘না।’ জাবেদকে দেখতে দেখতে সে মনে মনে বলল, গতরাতের যে-বিরক্তি, যে-তিক্ততা আমার ভেতর নাড়া দিচ্ছিল-সবকিছুই যেন বিলাতি তুষারের মতো হাওয়া হয়ে উড়ে গেছে।

পাঠক রুদ্ধশ্বাসে গল্পটি শেষ করবেন কিন্তু পাঠ শেষে তার অন্তরে অনেক জিজ্ঞাসার জন্ম নিবে; এখানেই গল্পকারের কৃতিত্ব। বাংলাদেশের ছোটগল্পে এরকম গভীর ভাবদ্যোতক প্রেরণা বিরল।

ভূত ছাড়ানো : ‘ভূত ছাড়ানো’ গল্পে লেখক বাঙালি জীবনে বহুদিন থেকে চলে আসা একটি বদ্ধমূল ধারণায় কুঠারাঘাত করেছেন। ভূত-প্রেতে বিশ্বাস বাঙালির আবহমান কাল থেকে। মদরিছের স্ত্রীর ভূত ছাড়াতে আসা অর্থলোভী কামুক পীর এবং সে ভূত ছাড়িয়ে অর্থ নিয়ে যায়। কিন্তু শেষপর্যন্ত জানা যায় আসলে মদরিছ তার স্ত্রীকে ‘নাইওর’ যেতে দেয়নি তাই সে ভান করেছিল। এই গল্পের মধ্য-দিয়ে গ্রাম্য কুসংস্কারের কারণে সরলপ্রাণ মানুষগুলো কিভাবে প্রতারিত হচ্ছে তারই বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছেন গল্পকার।

জিনা : নীলার জীবনের সঙ্কট অবলম্বন করে নারী ও পুরুষের মিলনে সৃষ্ট জিনা-নামক সামাজিক সমস্যাকে আশ্রয় করে সুযোগসন্ধানী তৎপরতার উপর আলোকপাত করেছেন গল্পকার। এই গল্পে একদিকে তিনি একটি নারীর চিন্তাচেতনাকে যেমন শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তেমনি গুরুত্ব দিয়ে দেখিয়েছেন নারীর মর্যাদা কিভাবে অতি উৎসাহী ধর্মরক্ষকদের হাতে পর্যদস্ত হয়। এ-গল্পে তাত্ত্বিক কথাবার্তাই প্রাধান্য লাভ করেছে।

 


 

[1] Ôwj‡L hvw”Q Avgvi Rxeb KvwnbxÕ, Avãyi iDd †PŠayix|

 


 

 

 

 


[1] Hibbert Lectures, Professor Max Fuller.

[2] m~iv dv‡Z¡i, 24|

[3] m~iv ivÕ`, 7|

 

Share Now

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *