বেশ ক’দিন আগে কবি ওয়ালি মাহমুদের নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বাসনে, নির্বাচিত দ্রোহ’ আমার হস্তগত হলে নিজের ভেতর এক ভিন্নরকম তাড়া অনুভব করি একান্ত কিছু ভালোমন্দ শব্দ লিখার । কবিতার প্রতি আজন্ম দুর্বলতাহেতু কবিতার বই পেলে বারবার পড়ি। বার বার পাড়ি দেই কবির সবুজ বাগান। কবির সযত্ন ছোঁয়ায় বেড়ে উঠা কবিতার মসৃন ভালোবাসা আমাকে সতেজ রাখে, সজাগ রাখে । তাই আমি ঋনী কবিতার কাছে, কবির কাছে।
কবি ওয়ালি মাহমুদের কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বাসনে, নির্বাচিত দ্রোহে’র অধিকাংশ কবিতাই বিভিন্ন কাগজে প্রকাশিত বিধায় কবিতাগুলো খুব চেনা মনে হয়। তারপরও এক মলাটে বন্দী কবিতাগুলো নতুন আমেজ সৃষ্টি করে। আমরা কবিতার ভেতর দিয়ে কবিকে তার কবিতার গতিপথকে আবিষ্কারের সুযোগ পাই। ওয়ালি মাহমুদের আগের কবিতা সম্পর্কে আমার ধারণা স্পষ্ট না হলেও তার এই কাব্যগ্রন্থে অর্ন্তভূক্ত কবিতাগুলো, তাকে চেনা জানার বিশাল ভান্ডার খুলে দিয়েছে । ওয়ালি মাহমুদ মূলত কবি। কবিতাই তার প্রধান বাহন। ‘নির্বাসনে, নির্বাসনে দ্রোহ’-এ অন্তর্র্ভূক্ত ৩৬ টি কবিতাই আত্মস্মৃতিনিমগ্নকথা, ব্যক্তিগত উপাখ্যান, প্রেম-বিরহ, জীবনের সুখমুখরতা, সামাজিক বৈষম্যতা সম্পৃক্ত। জীবনের চারপাশে ভেসে আসা সময়ের স্মৃতিকর্তন। তার কবিতায় নিজের কৈশোর-যৌবন কথা কয় । সাংস্কৃতিময় গ্রাম, পুলাছড়ার পানি, পৌষমাইয়া কামলার ঘামে দলিত সদ্যপ্রয়াত আমনের বুক-এসব শব্দগুলো প্রমাণ করে তার চিন্তায় গ্রামমূখীনতাও প্রবল। নাগরিক যন্ত্রনাময় জীবন থেকে কবিকে হাঁটতে দেখি ‘পুলাছড়ার পানি ভেঙ্গে তালে তালে, মোহনার খোঁজে।’
ওয়ালি মাহমুদ কবি। শব্দ নিয়ে চমৎকার খেলা করেন।‘শিল্পের সঙ্গে হৃদয় সত্তা যখন মোহনায় নোঙর করে, তখন মনোনৌকা পাল তুলে দেয়।’ এই পাল তুলে দেয় বলেইতো তিনি ভেসে বেড়ান শব্দের উজান-ভাটিতে।‘নিশিকাব্যের একাংশতে কবি এভাবে বলেন ‘এখনো আঁধারের নিশিকাব্যে ডুব দিই । স্থলজ’র বিবর্তনক আঁকড়ে ধরি। য-ফলাকে পেলে ব-ফলা সরে যায়। এ এক অদ্ভুত খেলা।’ কবির জীবনে শব্দরা এভাবেই লুকোচুরি খেলে। কখনও শব্দ আসে কখনও হতাশ করে চলে যায়। এই সব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ভেতর কবিতা গড়ে উঠে। কবি ওয়ালি মাহমুদ যখন সন্দিৎসু মনে নিজেকে প্রশ্ন করেন,‘একি ! কোন ঘাটে উঠলাম ? পদ্যের, না গদ্যের। অতি পরিচিত সিঁড়ি বেয়ে কবিতাকে পাজাকোলা করে বয়ে নিয়ে চলি ডাঙ্গার দিকে, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে’-এটা কি কবির সহজ সরল স্বীকারোক্তি? কেনো তিনি অপরিচিত সিঁড়ি বেয়ে কবিতাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাবেন ? কবিতাকে ‘নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে’ তিনি নিয়ে যেতে পারেন তার নিজস্ব পথে, নিজস্ব প্রকাশভঙ্গিতে কিংবা প্রকাশ প্রকরনের বৈচিত্র্যতায়।
‘পিতৃপুরুষ ও তাঁর পরিক্রমন সংক্রান্ত ’-এ কাব্যগ্রন্থের একটি উৎকৃষ্ট কবিতা। বারবার পড়ে অভিভূত হয়েছি। এই কবিতা পড়তে পড়তে আমার পিতামহ, পিতা এবং আমি এই তিনপুরুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কথা ভেবেছি। সামাজিক বিবর্তনের ভেতর এখনও ‘‘দৃষ্টিপঠিত দৃশ্যের আতঙ্কিত অভ্যর্থনাটি রক্তের টানে বুকের লুকানো অস্থিতে গেঁথে যায়।’’ এখনও ‘স্মৃতির পাতা হাঁতড়ে এবং নিড়ানী চালিয়ে ফলবন্ত কোনো ভিয়ান স্পর্শের চেষ্টা চালিয়ে যান। তিনপুরুষের চৌমুনায় এসে বিরতি দেবার কথা ভাবেন। কিন্তু কোন দিকে যাবেন?’ দ্বন্দের বিভক্তিতে সঠিক পথ খুঁজে পাওয়া যায়না। আর যায়না বলেই আমরা নিজেদের মাঝে কামড়া-কামড়িতে সময় পার করছি অবুঝ শিশুর মতো। ভৌগলিক সীমারেখার ভেতর নি:স্তরঙ্গ জীবন আমাদের কাম্য হতে পারেনা। ওয়ালি মাহমুদের কবিতায় ‘সংস্কারের প্রাচীর ভেঙ্গে উঠে আসা দুরের তারুন্য’-কে দেখে আমরা আশায় বুক বাঁধতে পারি, সোনালী স্বপ্নময় ভবিষ্যতের।
ওয়ালি মাহমুদ সমাজ সচেতন কবি, সামাজিক দায়বোধে তার কবিতা বাঁধা। কবিতার নিজস্ব অবয়বে মিলে-মিশে যায় সমাজ-রাজনীতি-মানুষ। সমাজিক মানুষ হিসাবে কবির বোধের গভীরে নাড়া দেয় মানুষের অপ্রাপ্তির বেদনা, ব্যর্থতার নীল আক্রোশ। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে আমাদের আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটেনি। ত্রিশোর্ধ বাংলাদেশে মৌলিক দাবী আদায়ের মিছিলে রাজপথ রঞ্জিত হয় আজো। তাই কবির ক্ষোভভরা প্রশ্ন ‘খেটেখাওয়া শ্রমিকের মিছিলে হারানো যুবা। ত্রিশোর্ধ। কবে বন্ধ হবে মৌলিক অধিকার না পাওয়া মানুষের দাবীর শে¬াগান? রক্তের মানচিত্র হবেনা রাজপথ।’ সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের গানতো কবিকেই গাইতে হয় মানুষের মুক্তির জয়যাত্রায়। আমরা সচেতন মানুষরা রক্তপাত চাইনা, বাঁচার অধিকার চাই।
কবিদের ‘মানবীয় অবয়বে জাগতিক ইশ্বর’ আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। কবি ওয়ালি মাহমুদের অর্ন্তদৃষ্টি প্রখর বলে তার কবিতায় সমাজ, জীবন, সময় ঘনিষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়। একজন সমাজ সম্পৃক্ত কবি হিসাবে তিনি বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারেন সহজেই। কবি ঘুরে বেড়ান জীবনের অলিতে-গলিতে। তার মন আটকে থাকেনা কোথাও। তার ‘নব্বই দশকের প্রয়াণ’ কবিতায় তিনি বলেন,‘যে বদ্ধ নয়, সে কি করে আবদ্ধ হয় ? মন থেকে মনান্তরে বিরচিত আরাধ্য হয়ে বেঁচে রয়।’
প্রেম কবি ওয়ালি মাহমুদকে তাড়িত করে। ভোগায়। ভাবায়। রক্তমাংসের মানুষ হিসাবে কবি অনুভব করেন হৃদয়ের দোলাচল। প্রেমের গভীরে প্রবেশ করে তিনি সত্য খুঁজেন,পূর্ণতা খুঁজেন। বিরহ বেদনায় কাতর হন। ‘প্রেমের মতো তীব্রতরো পরনের কাপড় সারা গায়ে লেপ্টে ধীরে ধীরে আবার ফিরে’ যান মনফলা বাগানের নীচে। প্রেমে ব্যর্থ হয়েও বারবার অনেকেই ফিরে যায় ফিরে যায় প্রেমের কাছে। বুক জুড়ে ভালোবাসার অমোঘ টানে কবি ওয়ালি মাহমুদও ফিরে যান কাংখিত জনের কাছে, মনের কাছে। কবির নিজের মনের কাছে প্রশ্ন রাখেন,‘আমার মানষপটে কার ছায়া? কে অধিবাস করেছে সেখানে ? প্রশ্নের বিপরীতে আমরা তার কবিতা থেকেই উত্তর খুঁজে নিতে পারি। ‘গত দশক ধরে শুধু একজন-কে ভালোবেসে তুমি মনীষাগতভাবে বিপর্যস্ত হয়েছো।’ আমরা ধরে নিতে পারি এই তুমিটিই কবি। অথবা ‘দু’অধ্যায়’ কবিতায় কবিকে বলতে শুনি ‘অনেক সাধনা, ত্যাগ- তিতীক্ষা এবং কষ্ট থেকে উঠে আসা একগুচ্ছ করবী ধরালাম হাতে। আমাকে অবাক করে ফুলটি ছিঁড়ে দিয়ে বলল, ভাগ করে নাও। সে হতে ভাগ করা ফুলটি মোর একটি সংগ্রাহক পাজর। তখন থেকেই ভোক্তা হিসাবে জাহির করি নিজেকে, অংশীদারীত্বের দাবীতে।’ ক্ষত-বিক্ষত মনের যন্ত্রনার শেষেও কবি তার ‘আমার অবর্তমান’ কবিতার শেষ লাইনে প্রেমিকাকে বিনীত ভঙ্গীতে বলছেন, ‘জানি, বাকী সময়টুকুর পূর্ণতায় আমি থাকবনা। আমার স্মরনগুলো বহন করো মনোমাঝে।’ একজন সৎ প্রেমিকের পক্ষেই এরকম সৎ উচ্চারণ মানায়। এ কাব্যগ্রন্থে অনেকগুলো প্রেমের কবিতা স্থান পেয়েছে, যা’ পাঠশেষে কবির প্রেমিক মনের পরিচয় পাওয়া যায়।
ভালোমন্দ মিলিয়েই সবকিছু। এ কাব্যগ্রন্থের সাবগুলো কবিতা যে শিল্পোত্তীর্ণ হয়েছে তা’ দাবী করা যাবেনা। কবিকে শব্দচয়ন ও চিত্রকল্প ব্যবহারে যতœবান হতে হবে। তবে স্বীকার করতেই হবে কবি ওয়ালি মাহমুদের কবিতা তার নিজস্ব কাব্যভাষায়, নিজস্ব রীতিতে গড়ে উঠেছে। এখন তা থেকেই গ্রহন বর্জনের পালা শেষে পাঠকে উপহার দিতে পারেন উৎকৃষ্ট কবিতা। এবারে দু’চারটি কবিতার প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাক।
‘সহযাত্রী এবং আমি’ ‘আমার অবর্তমান’-আত্মস্মৃতি নির্ভরিত কবিতা। এসব কবিতার আবেদন পাঠকের কাছে সাময়িক, স্থায়ী হয়না। কবির তৃপ্তি মিললেও পাঠকের বোধের গভীরে কোন আলোড়ন তুলেনা বা পাঠক সামনে যেতে যেতে পেছন ফিরে তাকাবার প্রয়োজন বোধ করেন না, যদিও প্রত্যেক কবিই নিজস্ব পরিমন্ডলে পরিভ্রমনে যান ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়। ‘মুক্তির আখ্যান’ ও ‘এক বীরাঙ্গনার অটোবায়োগ্রাফির অংশবিশেষ’ কবিতাগুলোতে বিবরনধর্মী প্রবনতা বিদ্যমান। হাঁটতে হাঁটতে পথচলা শব্দগুলো ভীড় জমিয়েছে কবিতার চারপাশে রহস্যহীনতা ও ছদ্মাবরনহীনতায়। কবিতায় শব্দ আছে, তার ব্যঞ্জনা আমাদের মুগ্ধ করেনা। নতুন ঝলকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেনা। টানা গদ্যে কবিতাগুলোতে চিত্রকল্পের অপ্রতুলতা চোখ এড়িয়ে যায়না। কবিকে এদিকে দৃষ্টি দেবার অনুরোধ করবো। এ কাব্যগ্রন্থে দু’টি কবিতা ‘তবুও যদি’ ও ‘খেয়াল’ এর অর্ন্তভূক্তি কিছুটা বেমানান ঠেকেছে। অন্যসব কবিতা থেকে এদের গঠনরীতি আলাদা বলে পাঠককে হোঁচট খেতে হয়। কবিতা নির্বাচনে কবিকে সচেষ্ট হতে হবে।
সামান্য ত্রুটি বিচ্যুতি আড়ালে রাখলে ‘নির্বাসনে, নির্বাচিত দ্রোহ’ একটি চমৎকার কবিতার বই। আগামীতে আরো ভালো কিছু আশা করতে পারি এবং বিশ্বাস করি, কবি ওয়ালি মাহমুদ সকল দুর্বলতা কাটিয়ে আমাদের উপহার দিবেন শিল্পসমৃদ্ধ মৌলিক কবিতা। প্রচ্ছদ ও বাঁধাই ভালো। প্রকাশক- ম্যাগনাম ওপাশ, শাহবাগ, ঢাকা, বাংলাদেশ। মূল্য একশ টাকা। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে যথাক্রমে মো: মতিউর রহমান মাহমুদ ও মিসেস সুফিয়া রহমান কে। কাব্যমোদী মহলে কাব্যগ্রস্থটি সমাদৃত হবে বলে আমি অত্যন্ত আশাবাদী।
জুলাই, ২০০৪
লন্ডন ।
দ্র: সমালোচনাটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক জনমত’ পত্রিকায় প্রকাশিত।