তবুও পথ চলি নিরন্তর অভিমানে | মনজুরুল আজিম পলাশ | সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকা | লন্ডন, যুক্তরাজ্য

ইতোমধ্যে স্বয়ং ওয়ালি মাহমুদ কবি হিসেবে চমৎকার  ছুঁয়ে যায়। কাঁধে ঝোলা, বিশুদ্ধ খদ্দর, ছেঁড়া জিন্স বা বাবরি চুলের সনাতন কবি কবি দৃশ্যমানতার জন্যে নয়, তার অনেকগুলো কবিতার বই আছে এই সরল মাপকাঠির জন্যও নয়- বরং কবিত্বের জন্য অপরিহার্য বা নুন্যতম যে বৈশিষ্টের সমাবেশ সেই মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষতা, মানবিক স্পর্শকাতরতা, অনুভব-দেখার বোধ, আদিগন্ত সারল্য, নির্লোভ-নির্মোহ জীবন যাপনের চেষ্টা, সহজান দার্শনিকতা ও সৃষ্টির নিন্তর বেদনা তার মধ্যে বর্তমান বলেই তিনি উন্নীত হয়েছেন বিশেষ মানুষ হিসেবে।

কবি ওয়ালি মাহমুদ-এর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বাসনে, নির্বাচিত দ্রোহ’ বিভিন্নভাবে ব্যতিক্রমধর্মী। গ্রন্থটির আকার, প্রচ্ছদ, ভেতরের কাগজ, কাগজের ভারীত্ব-রঙ এবং সর্বোপরি জরুরী যে বিষয়- চানা গদ্যে নির্মিত তার কবিতাগুলো পাঠ করা শুরু করলে এক ধরনের ঋজু ভাব আসে; মনে হয় কবিতার বইটি হাতে নিয়ে বইটি ব্যতিক্রমী যে ব্যক্তিত্বটুকু অনুভব করা গিয়েছিল তার সাথে ভেতরকার কবিতাগুলোর একটা নিশ্চিন্ত সম্পর্ক আছে।

ওয়ালি মাহমুদের কবিতা আধুনিক অথচ মানবিকভাবে অপ্রকাশ্য নয়। ‘নিশি কাব্যের একাংশ’ কবিতায় পদ্য বা গদ্যের চেয়েও কবিতার প্রতি পক্ষপাত তেনি ঘোষণা করেছেন এভাবে- ‘একি! কোন ঘাটে উঠলাম? না পদ্যের, না গদ্যের। অপরিচিত সিঁড়ি বেয়ে কবিতাকে পাঁজাকোলা করে বয়ে নিয়ে বয়ে নিয়ে চলি ডাঙ্গার দিকে, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে।’এভাবে কবিতা নিয়ে যিনি বহমান তাকে আমরা অবশ্যই কবিতা প্রেমিক বলতে পারি। শুধূ প্রেমিক বলা বোধহয় আরও ভালো। ওয়ালি মাহমুদ প্রেমিক বা দ্রোহী হলেও ঘন ঘন প্রস্তাবনা বা বিদ্রোহ- কোনটাই করেন না। অনেকটা অপেক্ষমান- জ্বলছেন কিন্তু জ্বালাচ্ছেন কম। এও বলা যায়, কেউ এগিয়ে এলে তাকে গ্রহণ করতে বা ভালোবাসতে খুব কার্পণ্য হয়তো করবেন না। তিনি সব সময় প্রস্তুত যোদ্ধার মতো; কিন্তু যাত্রা করবার জন্যে অন্যের সম্মতিরও কিছুটা অপেক্ষা করেন। এভাবেই কখনও কখনও তিনি মূলত: উপস্থাপনমূলক। আবার কখনো নির্বিরোধ। আমরা লক্ষ্য করি, সব সময় একটা প্রত্যয় থাকে তার কবিতায় প্রতিশ্রতিরও অপ্রকট-বিনীত উপস্থিতি আছে; সর্বোপরি, আগেই বলেছি, তার কবিতার একটা বেশ ভারী ব্যক্তিত্ব আছে। টানা গদ্যরীতিটি যে ব্যক্তিত্বকে সবসময় সহায়তা করে, সচল রাখে। এই ব্যক্তিত্বটির এগিয়ে চলা স্বাধীনতার দিকেও, ‘নব্বই দশকে প্রয়ান’ থেকে আমরা জেনে যাই তাঁর কথা- ‘যে বদ্ধ নয়, সে কি করে আবদ্ধ হয়? মন থেকে মনান্তরে বিরচিত আরাধ্য হয়ে বেঁচে রয়।’ উপরি হিসেবে এভাবে আমরা কিছু কবিতার উচ্চারণে ‘অনুপ্রাস’ স্বাদ থেকেও বঞ্চিত হই না।

আমাদের জীবনে মুক্তিযুদ্ধ বুঝি এমনই একটা বিষয় লেখালেখিতে যার পুন:পৌনিক আবির্ভাব সবসময়ই মানবিকভাবে প্রয়োজনীয় ও গৌরবময় হয়ে উঠে। ওয়ালি মাহমুদও তার বয়েস ছাপিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেন। এই বইয়ের কয়েকটি কবিতায়ও মুক্তিযুদ্ধ এসেছে। ‘মুক্তির আখ্যান’ থেকে উল্লেখ করি,‘মাঝে লাল সবুজ কাপড়ে যুগান্তর পরিনীতা হয়েছিল, প্রিয়তমা বাংলাদেশ’, ‘এক বীরাঙ্গনার অটোবায়োগ্রাফির অংশবিশেষ’ কবিতাটিও একজন বীরাঙ্গনার মানবিক বিবৃতিতে দু:খময় ও স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে উজ্জ্বল- ‘এখনো নিস্তব্ধ রাতের কোন জেগে থাকা দ্বি-প্রহরে চাঁদের নীচে বসে জোৎস্নার আলোয় স্বদেশকে জানান দেই, স্বাধীনতা হে স্বাধীনতা, তুমিই আমার স্বপ্ন পুরুষ।’ স্বাধীনতা ভাবনায় ওয়ালি মাহমুদের অনুসন্ধান-ভাবনা শুধু একটা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ‘লনসডেল হতে বাকিংহাম’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘মন দরে কিনে নিয়ে রত্তি দরে বিক্রী করা ১৭৫৭ হতে ১৯৪৭ সাল’; বোঝা যায়- কবির ইতিহাস সচেতনতার বিস্তৃতি অনেক পেছনেও।

ফ্লাপ-এ ওয়ালি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘প্রকৃতি, নদী ও নারীর সমষ্টি তার লেখায় মূর্ত। ভালবাসার বিমূর্ত আবেগকে তিনি কাব্যের চয়নিক শব্দকল্প, উপমার বোধানুকূল প্রয়োগ করেছেন ভিন্নভাবে [..] তিনি কখনো বৈরাগী হয়ে প্রেম তীর্থ ভ্রমণে, কখনো উদ্দাম তারুণ্যে ভালোবাসার অসীম আকাশ ছুঁয়েছেন বিচিত্র আঙ্গিকে। অন্যদিকে অনুভূতির তীব্র দাহনের উপস্থিতি তার কবিতায় লক্ষণীয়। নিয়মমাফিক বৃত্তের বাইরে স্বতন্ত্র অবস্থানের পুন:পুন: প্রচেষ্টায় মলাটবন্দী কাব্যের পঙতিমালার সযতœ সৃষ্টি, কবিতাকে চিনিয়ে দেয় গভীরভাবে’- আমি আরও সরল করে বলবো, ওয়ালি মাহমুদ বার বার ফিরে আসেন মানবিকতার কাছে। প্রকৃতির কাছেও তিনি পৌঁছতে চান মানুষের মাধ্যমে, সরাসরি নয়। মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েন তার কবিতার বেশ কিছু অঞ্চল দখল করে নেয়। মানুষে মানুষে সম্পর্ক, এই সম্পর্কের মাত্রা ও এর দর্শন নিয়ে তার জিজ্ঞাসা ব্যাপক। মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক, দু:খবোধ, ভালোবাসা, পূর্ণতা, নীতিবোধ ইত্যাদি বিষয়গুলোর মধ্যদিয়ে নিরন্তর পরিভ্রমণরত কবি ‘অপ্রসঙ্গের স্মরণচরিত’ কবিতায় বলে উঠেন- ‘যতদূরে যাই সরে, সরাতে পারিনা তারে। ক্ষণিকের মাঝে এতটুকু পাওয়া, বেশীতে হারানোর ভয়।’ ‘অভিনয় ও বসতি’ কবিতায় কবির আত্মজিজ্ঞাসা এভাবে বিবৃত হয় ‘কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সত্যের আদলে কতোটুকু সত্য বলি আমি অথবা আমরা।’

অন্য অর্থে ওয়ালি মাহমুদ কিছুটা একা, আহত ও অভিমানী। মানবিক সূক্ষতা যার যত বেশি সে বোধ হয় তত বেশী একা-আহত-অভিমানী হতে পারে। লক্ষ্য করি, এসব কারণে ওয়ালি কিন্তু কখনোই আক্রমনাত্মক নয়, বরং একটু আন্তরিক হলে জানা যায়, নীরব একটা দু:খবোধ আছে তার- ‘যে সুখে বিরহ ছিল’ কবিতায় ‘অন্তরের অন্তস্থল হতে উৎসারিত না হলে ভুলে যেও নিরবধি’ কিংবা ‘আমার অবর্তমানে’ কবিতায় ‘জানি- বাকী সময়টুকুর পূর্ণতায় আমি থাকব না। আমার স্মরণগুলো বহন করো মনোমাঝে’- পাঠ করলে বিষয়টি কিছুটা হলেও বোঝা যায়, স্পষ্ট হয়।

ওয়ালি মাহমুদ মাঝে মাঝে আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার করেন তার কবিতায়। এই ব্যবহার দূর্বোধ্যতা বা জটিলতা তৈরী না করে মাঝে মাঝে একটি ভিন্ন ব্যাঞ্জনা যেমন দেয় বা পাঠককে আগ্রহী করে তোলে শব্দটির সঠিক অর্থ জানতে বা অনুমান করতে অন্যদিকে একটু ঝুকিও কিন্তু তৈরী করে- হঠাৎ হঠাৎ এই আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহারের জন্যে কোন কোন পাঠক কিন্তু শব্দের অর্থহীনতার কাছে অসহায় আটকে থাকতে পারেন। একটা শব্দ যদি বাক্যে প্রবেশ করতে বা বাক্যের পরিপূর্ণ অর্থ উদ্ধারে ভয়াবহ বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে এই সমস্ত আঞ্চলিক শব্দ নিয়ে বেশি নীরিক্ষা করা যায় কিনা তা একটু ভাববারই বিয়ষ। আমি দুটি উদাহরণ দিচ্ছি- ‘সর্বনামের মাইজলা অবস্থানকে আড়াল করে সামনের তিমূখীতে মিশে যান দিব্যি।’ (পিতৃপুরুষ ও তাঁর পরিভ্রমণ কবিতা থেকে নেয়া) এবং দখল নেব হৃদয় টুমার (তবুও যদি কবিতা থেকে)- এখানে ‘মাইজলা ও ‘টুমার’ শব্দ দু’টি কি উল্লেখিত বাক্য দু’টির অর্থ বুঝবার ক্ষেত্রে বাঁধা কিংবা কিছুটা প্রতিকূলতা নয়? শুধু আঞ্চলিক শব্দ নয় ওয়ালি মাহমুদ মাঝে মাঝে তার কবিতায় একটু কঠিন বা অপ্রচলিত শব্দের সচেতন ব্যবহার করেন বলেও মনে হয়। বোধ বা বাক্যকে এগিয়ে নেয়ার জন্যেই শব্দ কিন্তু আগে আগে কঠিন শব্দ নির্ধারণ করে তার ভিত্তিতে বাক্য তৈরী করলে অনেক সময়ই সেই শব্দ ‘আলাদা’ হয়ে থাকে বাক্য থেকে, আরোপও মনে হতে পারে। দু’একটি কবিতা থেকে উল্লেখ করছি- ‘দশ বসন্তের সমাপ্তি শীর্ষক নির্মিতি আমার যৌবন খোলা খেরো খাতার সন্দর্ভ, তা যে প্রভেদেই হোক’ (নব্বই দশকের প্রয়াণ কবিতা থেকে), ‘সাবলীল নীলাম্বরী অনন্বিত কদর্য মনীষিতা পরিত্যাগ করে আদি প্রেষণ হয়েছিল’ ( দেরী কবিতা থেকে), ‘অবিরাম শ্রম ক্লান্তি সুখময় ভোগের স্বপ্নময়তার অগনন প্রকাশে মৃয়মান মুখ, (দুখের বিপরীতে সুখের রকম কবিতা থেকে) ইত্যাদি পাঠ করলে মনে হতে পারে কয়েকটি কঠিন শব্দের ব্যবহার করবার জন্যেই যেনো বাক্যগুলো তৈরী হচ্ছে। তার কোন কোন কবিতা বা বাক্য দূর্বোধ্য হিসেবেও চিহ্নিত হতে পারে। দূর্বোধ্যতার আপেক্ষিকতা বা ব্যাপক বিতর্কিত অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থেকে এ ছোট্ট পরিসরে শুধু বলবো- দূর্বোধ্যতা চুড়ান্ত অর্থে দূর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং এই ধরণের দূর্বোধ্যতা কখনোই কবিতা বা সাহিত্যের শক্তি বা সৌন্দর্য হতে পারে না। কবিতা বা সাহিত্য বিচারের গ্রহণযোগ্য মানদন্ডটি হচ্ছে- এর গভীরতা, দূর্বোধ্যতা নয়। এই বিষয়গুলোও ওয়ালি মাহমুদরে বিবেচনায় আছে বা থাকবে বলেই মনে করবার প্রত্যাশাটুকু রেখে উপদেশ বা পরামর্শের মতো এইসব পাপ করা থেকো বিরত থেকে বন্ধুর মতো এবার বলি- এবং জরুরী যে বিষয়- ওয়ালি মাহমুদরে কবিতারা চমৎকার পথ চলতে শুরু করেছে। এই পথ নতুন একটি পথ তৈরি করবারও চেষ্টা করছে। এই পথ পরিক্রমায় ওয়ালি মাহমুদের কবিতার শক্তি যে এক সময় আঞ্চলিক-কঠিন শব্দগুলোকে বা যাবতীয় দূর্বোদ্যতাকে তার কবিতার শরীর থেকে ঝেরে ফেলবে অথবা আরও প্রয়োজনীয়ভাবে ধারণ করে নেবে- তাও বিশ্বাস করি। আরও বিশ্বাস করি- কবিতা লিখবার জন্য যে বোধ প্রয়োজন- তা তার আছে। সূতরাং সেই বোধ এক সময় তার নিজস্ব বেড়ে ওঠা বা পুষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় যথাযথ শব্দ খুঁজে নেবেই। কবিকে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে চিনি বলেই হয়তো আরও একটু জোর দিয়ে বলতে পারি- ইতোমধ্যে স্বয়ং ওয়ালি মাহমুদ কবি হিসেবে চমৎকার  ছুঁয়ে যায়। কাঁধে ঝোলা, বিশুদ্ধ খদ্দর, ছেঁড়া জিন্স বা বাবরি চুলের সনাতন কবি কবি দৃশ্যমানতার জন্যে নয়, তার অনেকগুলো কবিতার বই আছে এই সরল মাপকাঠির জন্যও নয়- বরং কবিত্বের জন্য অপরিহার্য বা নুন্যতম যে বৈশিষ্টের সমাবেশ সেই মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষতা, মানবিক স্পর্শকাতরতা, অনুভব-দেখার বোধ, আদিগন্ত সারল্য, নির্লোভ-নির্মোহ জীবন যাপনের চেষ্টা, সহজান দার্শনিকতা ও সৃষ্টির নিন্তর বেদনা তার মধ্যে বর্তমান বলেই তিনি উন্নীত হয়েছেন বিশেষ মানুষ হিসেবে-  যে মানুষদের আত্মার অপেক্ষকৃত পরিশুদ্ধ অবস্থার নামই কবিত্ব বলে মনে করি। ওয়ালি মাহমুদের সাথে মেলা মেশা করলে বা তার কবিতার প্রাণ স্পর্শ করতে পারলে এরমম আবিষ্্কার খুব কঠিন কাজ নয় বলেই মনে হয়। এ কারণে তার কবিতার সবলতা ও দূর্বলতা আবিষ্কার করবার চেয়েও এখন জরুরীভাবে যে কথা বলা জরুরী- নিরন্তর অভিমানে পথ চলতে চলতে ওয়ালি মাহমুদ কিন্তু কবিতা লিখতেই এসেছেন। আমরা নিশ্চয়ই তার প্রকাশিতব্য বইগুলোর জন্যেও অপেক্ষা করবো, পড়তে পারবো আরও আরও ভালো কবিতাদের।

 

 

দ্র. লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকার ইস্যু ১৩৭৫, অক্টোবর ১৩, ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয়।

 

Share Now

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *