হৃদয়ের ভাষা | মেঘ প্রকাশনী | ২০২৩

হৃদয়ের ভাষা

 …

ওয়ালি মাহমুদ

প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০২৩

প্রকাশক: মেঘ প্রকাশনী

বাংলাদেশ।


উৎসর্গ

শ্রদ্ধেয় প্রপিতামহ— দেওয়ান এম. মনসুর আলী

সামন্ত ও জোতদারদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া নাগরিক।


হৃদয়ের ভাষা

ক্ষমা ও মিনতি—পুরোটাই বদ্ধ, তবুও একান্ত থাকি তোমার কাছে। দিনদিন বিকেল হলে, সে হয় অমলিন। শূন্যতার দেয়াল পেরিয়েই প্রত্যাশার আলোকিত আকাশ। দেখো—স্বাধীন বাংলাদেশের ভোরের শিশু হাঁটে মানচিত্রের বুকে। পঞ্চম সুখী দেশের একমুঠো হাসি ভাসে স্বদেশের চোখে। দেখো—সবুজ এবং রোদেলা সবুজের মাঝে বড় হয়, প্রিয় মানুষ। এমনই প্রত্যয়ী প্রয়াসে কোয়ান্টাম কোড সূত্র ছাড়া; তুমিও পড়তে পারো আমার হৃদয়ের ভাষা।

বিশেষ দ্রষ্টব্য অংশে লিখে রাখি আগামীর ইচ্ছে সমূহ। প্রেম জীবনের পাশে—হে পূর্ব পুরুষ, কোন পথে ফিরতেন বাড়ি? কোন পথে শ্রেণী সংগ্রাম শেষে, ক্লান্ত দেওয়ান মনসুর—মানবতার উচ্চতায় লিখতেন বন্দনাগীত। ‘এসো স্বপ্ন তৈরি করি’—বাক্যের জন্য কত জীবন হারিয়ে যায়। হাজার বছরের নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদ মিশে। সমাজের ভাগ-বিভাজন সহজ চোখে ভাসে। তবুও একখন্ড নিরাপদ আগামীর জন্য বেঁচে থাকি, বাঁচিয়ে রাখি স্বপ্ন-সমষ্টি।

বহুমাত্রিক রঙমাখা আবরণে ঢেকে রাখা, কোন সে কথা? যা শোনার জন্য উন্মুখ থাকে যে হৃদয়। হে কথাকার, কত দিন পর উষ্ণতা মেখে, লাল-নীল মাটির জায়গা জমিন রেখে, কতখানি ভালবাসার বায়না জমা হয়। বর্ষার রাতে যে কাহিনীর প্রথম পাঠক হও। যে নিজস্ব ঘরে আবেগের মায়া টেনে দাও। সে আয়োজন যদি মুছে দেয় কষ্টের দাগ। মনের কথা তুলে রাখিও—যেখানে পরাগ।

বিশ্বাস রেখেই জীবনের গল্প আসে। অতি সাধারণ মানবীয় গুণাবলী সঙ্গে করে আমিও বিশ্বাস করি—বাকি অর্ধেক নিঃশ্বাসের দোলাচল। সময় কি সর্বোচ্চ দামে কেনা যায়? যায়নি বলেইতো একদিন অতীত হবে। স্মরণে পড়বে মনে, দিন বছরের খুচরো পাতায়। প্রথম দেখার দিনে ফুল আনিনি, এনেছিলাম পুষ্প। লজ্জামাখা আনত মুখখানি দেখার মায়ায় কতবার খুলেছি বুকের কপাট। যেখানে বসত করে আমার জন্ম-নিগড় মাতৃভূমি। অতীত হবে সময়, সম্পর্ক এবং আদর। অতীত হবে—ষড়ঋতুর রঙিন প্রচ্ছদ। সুখ পাখিদের শব্দছায়ে, জন্ম হবে মায়াবী শব্দমালা।

কিছু জানতে—নিশ্চিন্ত ধ্যানে হাত খানি ধরে রাখার; এমন অভ্যাসও অতীত হবে। তবু মনে করো—যদি বিনিদ্র রজনী না হয় নি:শেষ। মনে করো চাঁদ মুখে ফোটে জোৎন্সার আলো। কতখানি যুগল ছায়া দেহ ভরে নেয়া যাবে বলো? ছেড়ে দেবার আগে ঢেকে যাবে অন্ধকার। পূর্ণসম্বন্ধ রোপণ করে গড়ে ওঠে পরিবার।

কোয়ান্টাম কোড সূত্র ছাড়া পড়তে পারো—আমার হৃদয়ের ভাষা।

 

সম্পর্ক সম্পাদকীয়

পৃথিবীর নামযুক্ত মানুষের ভিড়ে, আমি না হয় নামহীন মানুষ হই—দিনমান। জঠর নাভিমূলে জন্ম মানবমাতা; প্রিয়তমা যে-ই থাকুক না নিখোঁজ সে; হে বিধাতা। সম্পর্ক সফল ধরে নিয়ে ব্যবহার করা বাক্য লিখে থাকে আগ্রহীগণ। শূন্যতায় জরুরি কথার দাগে দাগ ফেলে চলে প্রীতি সমাবেশ। অথচ এইখানে কান পেতে শোন নিরন্তর স্পন্দন। অতঃপর সুখধ্বনি আকাশে উড়িয়ে… স্বপ্নের কাছাকাছি যাবার বেলায়; পাঠ হবে মানপত্র। তখন দু’হাত ভ’রে উড়ায়ে দিও—চাহনিখানি .. পরাণ ভরে।

বড় মায়া লাগে।

কি এমন ভালবাসার মায়ায় বান্ধিয়া রাখো, কও? না বলা গোপন কথাগুলোতে কি আদর মাখো। যে ভাষায় টেক্সট লিখো,‘আপনি আমার কানের দুল, আপনি আমার নাকের ফুল, আপনি আমার চোখের নীল, আপনি আমার ঠোটের তিল।’ জেনে রাখেো—ভাল লাগে দুল-ফুল-নীল, আরও লাগে তিল। হৃদয়ের কাছাকাছি থাক বলে—সহসাই খোঁজে পাই মিল।

বড় মায়া লাগে।

যে বন্ধন আপন করে লজ্জাবতীর শব্দপাঠে। হে ললাট—এটা কি আজন্ম উত্তরাধিকার? অর্পণ-ঘাটে! হোকনিয়া মহল্লার পথে ফুটেছে যে উজানি ফুল। দ্যাখোনা—সৌন্দর্য পানে তাকাবার জন্য পুষ্প কেমন ব্যাকুল। একবার—শুধু কও, কোন পাঁজরে তুমি লুকিয়ে থাকো। কতটুকু স্পর্শ-ঘ্রাণ দিলে উষ্ণতা থামবে নাকো। কোন শিওরে গুজে রাখো—আমার জন্য গুচ্ছ ফুল। যত দূরে যাই যতটুকু বাঁধি, জুড়ে থাকে স্মৃতির কূল।

যে বেলায় আকাশ রঙিন হয়, তখনও স্বপ্ন জাগে। যে আশায় পূর্ণিমা অপূর্ণ রয়—তবুও মায়া লাগে।

 

১২৩৭ দাগ

সেদিন বুধবার.. ১২৩৭ দাগে কেউ নেই। দক্ষিণে ঘনবাঁশঝাড়, উত্তরে কৃষ্ণচূড়া, পূর্বে—ঢালু টিলার বাঁক ধরে পুকুর। পশ্চিমে? দুজোড়া কদমফুলের গাছ, হাস্নাহেনা, রজনীগন্ধা, কাঁটাগোলাপ, নিমগাছ এবং বিষণ্ন বকুল। আর নিশি অভ্যন্তরের প্রথম সংস্করণটি বহন করে আবেগের অস্তিত্ব …

সময় সন্ধিক্ষণে বিধৃত করে আশির দশক হতে অদ্যাবধি। ফেলে আসা জীবন চরিতের নৈঃশব্দের উপলব্ধি, বাঁচিয়ে রাখে ঋদ্ধটানে। অচেনা বৃক্ষের শাখায় বিহঙ্গ নড়ে ওঠে। প্রত্যাশার আধিক্যে যে দীর্ঘ পরিসর ঘিরে থাকে অন্ধকার, তার অন্তহীন সীমানার অন্তঃপুরের ছায়াপথ অতিক্রম করে আর্তনাদের ভাঁজভাঙা পঙ্ক্তি।

ও সকল ফিরে না দেখার অনিমেষ তাড়িত করে নিয়ত যেন চেরাপুঞ্জির একখণ্ড মেঘ নন্দনে আবৃত করছে ক্রমাগত। অমিত সম্ভাবনার দোলে পুড়ে, কষ্ট-সুখে সমন্বয় গড়ে তুলে, অবসন্ন কাব্য-কুঠির হতে বেরিয়ে আগ্রহের ব্যাসার্ধর সূচনা সংখ্যা মেপে মুক্তাকাশের নিচে চলে আসে স্বপ্ন। তারপর?

সৃজন প্রয়াসে ধ্যানস্থ’র অবলম্বনে পাইকা প্রিন্টে মুদ্রিত হয়—এক দায়বদ্ধ মানুষের আলাপন।

 

পদ্য’র অভিধানের নিমিত্তে

গদ্যের মধ্যি প্রবেশ করে পদ্যের জননেন্দ্র খোঁজে কামুক..

প্রচ্ছায়ার আবরণে ক্লান্ত হয়নি এখনো। বিশুদ্ধ আবর্তনের উত্তরণে অস্থাবর সম্পত্তিগুলোর অনুক্রমণিকা—চারিদিকে স্থায়ীত্ব খুঁড়ে। সেখানে এক সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি কাজ করে জীবনাভ্যন্তরে। প্রতিটি কোষে কোষে পারদ ঢেলে হাতে ধরায় কুসুম ফুল। অধুনালুপ্ত বৈরাগ্য একগাল হেসে বলে, আমি সেই উত্তরপুরুষ—এই দিকে, গোধূলির শেষে। ছাপচিহ্ন রাখতে; আলু-থালু পথে অগ্রসর হয় উচ্চ অভিলাষে।

আমাকে অধে রেখে বেরিয়ে যায় ভেতরের মানুষ। নির্জীব খোলস সর্বস্ব মাটি দেহে পড়ে থাকি প্রয়াত শব্দাঙ্গে হেলান দিয়ে। তারপরেও যে গদ্যের মধ্যি প্রবেশ করে, পদ্যের জননেন্দ্র’র অভিধান খোঁজে এখনো।

 

স্মৃতির সুরতহাল

হৃদয়ে প্রিয়জনে’র জন্য চাঁদোয়া দিয়ে ঢেকে রাখি নিষিদ্ধ শব্দাবলি। কুলীন কষ্টরা অনুস্বারে মাত্রা দিল না যে.. অমনি করে জীবননৌকার অর্ধনাব আটকে থাকে খেয়াঘাটে। হয়তো সুখে আছো—সে শংকায় আর খোঁজতে যাই না।

প্রযত্নে’র ঠিকানার খবর রাখোনি বলে পিয়ন কোন চিঠি বিলি করেনা। না-জানি সংশয় কাটেনি বুঝিবা এখনো। বেনামী মনুজ তারুণ্যের সিঁড়ি টপকায়। দুখের সুরতহাল পড়ে থাকে পিত্রালয়ে।

ধ্বনির অঙ্গনে প্রতিধ্বনির রোদন বাজে বুকের মাঝে। বসন্তের বার্ষিকীতে ভাটা পড়ে অনর্পিত দান। প্রান্তিকের তরে তরণী বেয়ে সাজায়েছো—সযত্ন কারুকাজে। আমি তার জন্য পুষে রাখি যত অভিমান।

হ, তুমি সুখি হ

র, তুমি সুখে র।

 

নাড়ি ছিঁড়া সময়ে

যে কথায় আবেদন কর। কর্ম থেকে ক্রিয়া পর্যন্ত নিয়ে যাও—কোন দৈন্য ভাষা ভুলে। সেটা সপ্তমী হলে তোমার কাছেই থাক। খারিজ করে দিও। কৈশরের ঘটনাপঞ্জির পুঁথি বিছিয়ে দিলে তুমি অবসর নিতে পার সেখানে—আজীবন।

গল্পের সঙ্গে নাটকের প্রথম বন্ধনী ভেঙে গেছে। যা আছে, সকলি মিছে¬— হারিয়েছে কোন দূর অবেলায়। হয়তো এখন সে মমি। সাধনে-ভজনে তত্ত্বের কালীক—নাড়ি ছিঁড়ে সময়ের। একশ’ বছর পর ধ্বংসপ্রায় দেহাবশেষে খাঁজ কাটবে অজানা প্রত্নতাত্ত্বিক।

মাটি তাপে শিরায় শিরায় জ্বলে-নিভে আঢ়মাইয়া বজ্রপাত। উদ্ভিন্ন নিশায় হাত কাঁপে পরাণের। খরতাপে চৌচির হয় অফুরান চাহিদা সমতে মানব প্রজাতির। জনম নগ্নতাকে ভুরু কুচকে নাগর, তবুও পাঁজরের ডান ছাড়ে না।

 

অন্ধকারের অন্তরবাসী

প্রেম—অস্থায়ী বাসিন্দাকে সূত্রাবদ্ধ করে ফেলে। জীবনের ছাপচিত্রে কর্ম ঘনিষ্ট দায়বদ্ধতার আবর্তন; তাকে পরিক্রমশীল বৃত্তে রাখে। ব্যক্তি, সমাজ, সম্পর্ক, নিগ্রহ—শব্দগুলো জোড় বাঁধেনি। আগমন ও প্রস্থান দৃশ্যের মধ্যাকর্ষণজনিত কারণে হয়তোবা একান্ত অনেক অনুধ্যান অজানা থেকে যায়।

হেরে যান কলাকার। পরাজয়ের দহনে দাহ্য হতে হতে জীবের ভাগ্যের পিঁড়িতে বসেন। ওদিকটায় অমানুষদের চরিত্রে পা রেখে শরীর এলিয়ে দেন। তবুও সত্যরা এসে হাত ধরে দাঁড় করে রেখে যায়।

অন্ধকারের অন্তরবাসী হয়ে আলোকবর্ষে শয়ান করে নির্মিত হয় কাল। যেখানে নিভৃতে হাত রাখেন—হাজারো কবিতার আরি-ফরি। বিমূর্ত সুখের পরিসরে পুরো কাহন দিয়েও করেনি গ্রহণ। অনাসৃষ্টির প্রজন্ম কোন সাক্ষী রাখেনি। যদিও সীমাবদ্ধতা উৎরে, যুগের সমষ্টি হতে গাঁথনি দিয়ে সংস্কার করেন—ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ হৃদয়ের অভ্যন্তর।

 

অভিন্নতার ছলে

যে ভরসা অর্থহীন হলেও পলিহীন স্রোত ঢালে। অনবদ্য মরশুমে জোয়ারের সেøাগান তুলে। বরষার নেমতন্নে শরীর ভেজাবো বলে।

শক্ত করে বেঁধে রাখি— অভিন্নতার ছলে।

 

শূন্যতার কুঠি অবধি

এমনি একদিন বলেছিল—ভালোবাসি। সুবর্ণ সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। শেষ বোশেখের ফুল তুলে মেলার যাত্রীক হয়ে—পিছু ফেরা হয়নি আর। ‘সব ঠিক আছে’ শব্দগুলো বাক্য গঠন করেছিল একসময়। প্রতিশ্রুত শব্দের প্রতিদানের জন্য শূন্যতায় ঘর বাঁধি—নিরবধি।

বিজোড় সংখ্যার আড়ালে ঢাকা পড়ে ভালোবাসার পোয়াতি অথবা যৈবতী শোন পদ্যের বক্তব্য। স্বজনদের নষ্ট সময় এখন.. স্বভাব’র বুকে ক্ষত হয়ে আছে। প্রচলন ডানে রেখে বায়ের পাতায় নজর রাখি। এখন সে গোপন কবিতার গোপন আস্তরণ হয়ে বসে আছে মনে। সুন্দরের আলোক-মায়া স্মরণে।

একহারা গড়নের প্রিয়জনের জন্য অনাবাসী কবিতা হাতে দাঁড়িয়ে, চিরবসন্তে চিরদিন। যে পথ গিয়েছে মিশে অমলিন—স্মৃতির কুঠি অবধি।

 

শেষ চিহ্ন

জেগে থেকো কবিতার উঠোনে। আমার হৃদয় যেখানে টানে। কেন বলো—চলে যাবে দূরে। ঐ দিগন্তের ওপারে।

শেষ বারে এসে পুষ্পের পস্রা সাজায়ে’দি রেখে যাও—শেষ চিহ্ন।

 

প্রশ্নাংশ

আজ বহুদিন নয়ন মাঝে পলকহারা চাহনি দেখিনি। কেশরাজি বাহুমাধ্যমে লুণ্ঠিত হয়নি। বুকের দীপ্র শিখার উদ্দীপ্ততায় কোন সাড়া পড়েনি। আর কত বিরহ কুসুম অম্বরের বাসর সাজাবো..। শ্বেত কোমল নিশুতি চোখের মণি এবং পূর্ণ সমান্তরাল একটি বুক—তবুও অন্তিম খোঁজে।

শুধু একবার বল প্রিয়তমা—হৃদয়ে কেন এত কষ্ট রেখেছো জমা।

 

সংব্যান খোলার আশে

নতুন বিভায় উদ্ভাসিত কাব্যের সংব্যান খোলার আশায় গিঁট দিয়েছে মুক্তকছন্দ। কোথাও স্বগত কথন, কোথাও অন্যথা। অক্ষরের বীক্ষণে সন্নিকর্ষ হয়ে ভাসে জলবিম্ব। প্রতিপাদ্য বিষয়াবদি বাস্তুহারা সমিতি গড়ে।

স্বতন্ত্র ঘরানার সারাংশ মিলে আবারো ইজারাদারের তালিকার নাম দিয়েছি। হাজারো ব্যস্ততায় প্রকৃতি ঢালি সাজায়ে দেয়। তারই মাঝে খুঁটে খুঁটে তুলে নিই সযতনে। আনকোরা মোড়কে দেহসঞ্চয়ী হিসেবে জমা রাখি।

উপমিত কবিতার উপমান নির্ধারণের জন্য ক্লান্তিহীন অভিনিবেশ। প্রান্তে যাবার অভিলাষে প্রতীকী অনশন করেও যেতে পারিনি। সে কতদূর? স্বজনহীন অকৃতদারের নিকট সকলই প্রদেয়। তারপরও থেমে নেই। না দেখা পর্যন্ত—যদ্যপি।

 

মা, তোমার জন্য

মোরা ধন্য মাগো—তোমার জন্য। জীবন দিয়েছো স্বপ্নভরি। তৈরি করেছো দেশ আমারই। সেজন্যই তোমায় বলি যে অনন্য।

মোরা ধন্য মাগো—তোমার জন্য।

স্নেহভরা আঁচলে মুছিয়েছো ঘাম। মমতা বিলিয়ে দিয়েছো যে দাম। কি করে শোধাব বল—আছে কি কোন পণ্য?

মোরা ধন্য মাগো—তোমার জন্য।

 

বৃত্তের বেহাগ

কার্তিকী পূর্ণিমায় তোলপাড় করে মনের আকাশ। আদিমশক্তি বিপন্ন হয় যযাতির সনে। অপ্রতিরোধ্য কামনায় ছুঁয়ে ফেলে হৃদয়ের সবটুকন। নতুন স্বপ্ন-প্রেরণা—যদি না জীবন ডুবে থাকে শয়ানে। সন্ধ্যার আঁচল না খোলে, অন্ধকারের গহীন ঘোমটা খোলি।

ষাট ওয়াটের আলোয় কবিতার টেবিলে বসে উদাসী মুহূর্ত সমষ্টি, আলমারিতে ভাঁজ করে চিন্তার লঘুযতি। অক্ষরবৃত্ত নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে জানালা মেলে। স্বরবৃত্তের নিশি হলে নেশার বোতাম টেনে ধরে মাত্রাবৃত্তের পূর্ণযতি।

রুদ্ধ মনের এক কোণে জীয়নকাঠিতে কষ লাগিয়ে লিখে রাখি—সুরেলা বেহাগ। বীজের পানদানে চুনদানি হয়—জয়তুনের পরাগ।

 

হারানোর তাগিদ

চল, হারিয়ে যাই অরণ্যে। যেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে সৌজন্য প্রকাশে বৃক্ষরাজি। সবুজাভ প্রকৃতির মিশেল সুরে সমাবর্তনের অন্বেষায়। যেখানে দরদীর বাড়ি আছে। আছে যত্নে গড়া অর্পিত নাতিদীর্ঘ প্রেমাঞ্জলি’র টালি।

মনকে তৃতীয় পক্ষের নিকট বন্ধক দিয়ে চল না—হারিয়ে যাই।

 

অজ্ঞাত শিরোনাম

ছায়া ছেঁড়ার টুকরো গল্প। সায়ন্তন বেলা ছিল তখন। অন্তরার অনুনয় নিয়ে জিজ্ঞাসিলে, কি দেখছো? নয়ন আপন গতিতে স্থান নিল নীলিমায়। শিরশির করা উপশিরাগুলো হিমায়িত হল। থমকে দাঁড়ালো জীবন্তিকা, স্পৃষ্ট হতে চাইল। কিন্তু গ্রাস করল মোহনাবেগ। তখন তৃষিত স্বাক্ষ্য বহনকারী সময়ে বিপরীত গ্রীবার প্রতিদানে মত্ত আলজিব, ওষ্ঠ। শেষাগ্রে পর্যালোচিত পদাবলি।

তোমার ও চোখে বর্ষা নামুক, শ্রাবণ আসুক। নীল অধরে প্রিয় সকল ঢেকে রাখুক।

 

বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

# যে জীবনের ভেতর—স্বপ্নও ধারণ করে বন্দীত্বকাল।

মানুষ জেগে থাকে, নীরবে চেয়ে থাকে রাতের গভীরে। দৃষ্টি মেলে চেয়ে দেখে ক্রসফায়ারে পড়ে থাকা দেহ। রাষ্ট্র—কথিত প্রেস বিজ্ঞপ্তির অফিস।

মানুষের ক্ষমতার ভীড়ে মানবতা হারায়। যে হারায় স্বজন, সে-ই জানে বেদনার কি নিবিড় বিষ। সময় কাস্টোডি থেকে মাঠ-জংলা পেরিয়ে—অক্সন নগর। নিশ্চয়তার ছলাকলায় বিশ্বাস বেড়ে ওঠে। হে ক্লান্তি নির্ঘুম রাত্রির দীর্ঘ প্রহরে একফালি নীলে জমে থাকে আকাশ, ধরে চিত্রাবলী।

যে গুম হয়, আজীবন নিখোঁজ রয়। সাদা-কালো তালিকায় মুদ্রিত নামাবলি। একদিন আমার জাতি কেন মুখোমুখি হবে—রক্তমাখা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের।

সংগ্রাম—ঝড়, বন্যা আর কাঁদা মাটির মাঝে বেঁচে থাকা মানুষেরা আমার; ঐতিহ্যের সম্পর্কিত ঘরে-ই থাক অনাদি।

 

দাহন কূলের অনুলিখন

রাতের প্রয়াণে দিন, নাকি দিনের প্রয়াণে রাত? সামন্তের সমান্তরাল অবস্থান নিয়েই কৃষ্ণপক্ষ জেগে থাকে—অবিরত। ভাবনা তার উদ্দেশ্যের দিকে ছুটে চলে নিরন্তর। তখন চাঁদ কৈরবী’র পোশাকে গ্রহণ করে পৃথিবীর একাংশ। স্বপ্নভূক মানুষগুলো বিরহের কংকাল হয়ে শুয়ে আছে গোরে। নতুন লাশের জন্য প্রতীক্ষার প্রহর হয়ে ঘুরছে মৌজাভুক্ত এলাকাজুড়ে। জোনাকির নিঃশব্দ জাগৃতি—সমার্থক অবস্থানের খোঁজে।

হায়! কি সখ্য মাটি আর মানুষে। প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সহাবস্থান। বেঁচে যাওয়া কোন প্রবীণ জানেন না কবে শুরু হয়েছিল পৃথিবী হতে। মুঠোভর্তি মাটিতে শরীরের গন্ধ মিশে আছে। জীব যখন জীবন্ত, হানাহানির প্রাধান্যে নিত্য বহাল। অথচ মাটিতে মিশে যাওয়ার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথাটি নির্ধারিত। শুধু কর্মের স্থায়ীত্বই অনাদিকাল।

ভুলে যাই এসব। মনন দৈন্যের পাঠ খোলে বসি। মরত-ভবন ভুলায়ে রাখিছে মোরে। ছায়াটি দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হচ্ছে। ছায়ার মাঝে হারিয়ে যাবার অপ্রসঙ্গটি আমিত্বকে প্রমিত করে। ক্রান্তি ফেলে জেগে তুলে ভোরের কুসুমাভ সূর্য।

 

জ্যামিতিক বিভাজন এবং

হে মায়া—তুমি ধাতুর অলংকার। হে স্বপ্ন—আমি জওহরী। হৃদয়পন্থে ভাজকে সমান ভাগ করি। পরিপুরক সম্পাদ্য থাকে সারে সার। শুধু সৃষ্টিতে হয় হার।

ভাবনা—হয়তো হবে দেখা। কল্পনাহীন ছেঁড়া তারে বাইন্ধা রেখো সখা।

 

আলিঙ্গন

সম্যক প্রলুব্ধে প্রলম্বিত সমঝদার যে। জীবাশ্ম তৈরির হাতিয়ারে মত্ত। তার স্বরে চিৎকার পর’চ্ছেদে রক্ত—সফেদ বিছানায় চিত্র।

ইচ্ছার উপস্থিতিতে ইঙ্গিত করে কাম্য বনে এবং উৎকর্ষে একধাপ এগিয়ে যায়। নেপথ্যে পতিত হওয়া কাহিনীর মাঝে আমার শ্যামল দিন বদলে দেয় রাত। একরাশ প্রীতি আর সঙ্গতি, কখনো ঘিরে ফেলে অনূদিত অনুগ্রহ।

আনন্দন আমন্ত্রণের আহবান ও লজ্জা ঢাকা আনন—এমনই স্বাগতম আলিঙ্গন।

 

বিবি সংক্রান্ত শৈশবনামা

শৈশবের সময়পোড়া দুরন্ত বয়সকালীন অনুভূতির অত্যুক্তিটি এখনো কানে বাজে। এ্যই, এখানে কি করছ? বিজলীর চমকে চমকানো বিকেল। মাঠে দিগ্রা দেয়া গাভীর ডাক। বিবি’র তাগদায় লুকিয়ে থাকি দুয়ারের চিপায়। ভোঁ করে কাঁপিয়ে দিয়ে দৌঁড়ে যাই পালাবার পথে। দেখতে দেখতে বছর পেরিয়ে সমর্থ এক পুরুষ হলেও পেনশনের একভাগ আমারই ছিল। অনুজ’রা বলত—আমরা আধেক, তিনি আধেক। এভাবেই আদরে প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠি অবশিষ্ট দিনে। দাদা’র আঁকা জাহাজের ছবিটি দেখিয়ে ইচ্ছে করেই বলতাম—বিবি, ‘এ ছবিটি কি দাদা এঁকেছেন? চিত্রিত ছবিটির দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বলতেন—হ্যাঁ।

এমনি এক রাতে হঠাৎ মা জোরে ডেকে ওঠেন, ওয়ালি—দেখে যাও তোমার বিবি কি করছেন? দ্রুত খাবার টেবিল ছেড়ে গিয়ে দাঁড়াই উত্তর-দক্ষিণ করা দেহের পাশে। ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে জীবনদীপ। চোখের জলে কেঁপে ওঠে কন্ঠ।

দৃষ্টি সাক্ষী হয়ে গেল—মৃত্যুর। কালের আবর্তে হারিয়ে গেলেন প্রিয় হুরজান বিবি এবং তদ্সংক্রান্ত শৈশবনামা—সমুদয়।

 

শূন্যস্থান’জন্য

শূন্যস্থান’র জন্যে উত্তাপময় অন্তর স্পর্শ করতে চায় চৌষট্টি কলা। অন্তর ফোঁসে ওঠে, অবাধ্য হয়। স্থির থাকেনা ইচ্ছেগুলো। প্রতিযোগিতায় নামি আরাধ্য জৈবের। সফলতা আসে নিদারুণ। অনুক্ত—দিতে কিংবা নিতে।

আমি পৃথিবী হবো সন্ধ্যার কক্ষপথে। হন্য হয়ে ছায়া ফেলে গ্রাস করবো তাবত। লুকোবে কোথায়? তন্নতন্ন করে বিভাজন করে দেব।

 

মাঠি কৃষক: অনুভূতির জমিনে

বাংলার মাঠ থেকে অদ্য শ্রম ঢেলে যে কৃষক জোয়াল কাঁধে ঘরে ফিরে ..

ক্ষেত-কৃষির জমিনে দুপুরের ডাইক ভেঙে চালায় লাঙলের ফলা। মাটির দলা ভাঙে নিড়ানী। ভৌগলিক সীমারেখা বহাল রেখে ফলন সুখে মাতে। অনতিদূর, গ্রামের পর গ্রাম ঘিরে বোরো চাষের চাষী। গ্রামীণ বধূয়া কাজ শেষে আছে বসে। সোয়ামী কখন আসে ঘরে। বেরিয়ে গেছে সেই শিশির ভেজা প্রাতে। আলনা থেকে আদর করে তার কাপড়গুলো টেনে নেয়। চুলায় বসানো উমলিগরম পানির তাপমাত্রা দেখে, দারুও নাড়ে। পরিশ্রমী প্রাণীগুলো তৃষ্ণায় চোখ বুজে। শস্য শ্যামল ভরা মাঠে ও মানচিত্র জুড়ে ফলাদির প্রান্তরে।

প্রিয় কৃষক—আপনার হাল বাওয়া মাটির গন্ধ, আমার সর্র্বোচ্চ দামে কেনা সুগন্ধী থেকেও দামি। সে আমি জানি এবং জানেন অর্ন্তযামী।

 

স্বজনতুমি হাত বাড়াও

অক্ষাংশের যে অংশে দাঁড়িয়েছি—অত্রস্থানে অধীর হয়ে থাকে অতিসর্গ করা দ্রোহীর দ্রোহ। অগ্র পশ্চাতের অনুমোদিত প্রতিনিধি হয়ে কাব্যমালা আবর্তন করে, পৃথিবী নামক গ্রহের চারপাশে। দ্রাঘিমাংশ তাড়িয়ে বেড়ায় মৃত্যুর কাছাকাছি বসত করা উত্তরপুরুষ—যে শুয়েছিল পূর্বপুরুষের পাশে। সে এক শীতের রাতে। আটকে যাওয়া নিঃশ্বাসের বেপরওয়া তীব্রতায় অস্থির করে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার সুখের প্রলেপ শরীর মুড়ে দেয়।

অবরুদ্ধ তন্ময়ে অদৃশ্য হাতে চোখের সামনে মেলে ধরে সম্পর্কের খতিয়ান। প্রজন্ম’র চৌদ্দসিঁড়ি অস্পষ্টভাবে নেমে গেছে মাটির দৈর্ঘ্য। নাকি দৃষ্টি বিভ্রম? সিঁরদাড়ায় হিমশীতল স্রোত নেমে গেলেও বাঁচতে চাই। অসমাপ্ত কার্য সম্পন্ন করার অধিকারবলে—বাঁচতে চাই। জীবনের প্রয়োজনে, জেগে উঠে শোণিত দ্রোহ। নিপীড়িত স্বজন—তুমি হাত বাড়াও। মৃত্যুর হাত ধরে প্রতিবাদী কন্ঠ ধর। নিপীড়িত মানুষের জন্য সেথায় যাদের আমৃত্যু দেহ।

অক্ষাংশের যে অংশে দাঁড়িয়েছি, অত্রস্থানে অধীর হয়ে থাকে অতিসর্গ করা দ্রোহীর দ্রোহ।

 

আবেদন

আল নাকবা—স্মরণিকার পৃষ্ঠায় প্যালেস্টাইন, বসনিয়া অথবা মধ্যপ্রাচ্য। দুইহাজার চার সালের ক্রোড়পত্রের সেলামী পর্বের প্রতিবেশী, নিরপরাধ বিশ্ব শিশু-অধিকার দিবসের নিপাঠ। হায়! লোপাঠ হয়ে গেছে নিদ্হাঠে।

শত বছরের নিদর্শন নিশ্চিন্ন করতে—যাদুঘরকে ধ্বংশস্তুপ বানিয়ে রাখে নিকৃষ্ট বর্বর শক্তিগুলো। যেন নতুন প্রজন্ম জানতে না পারে—তাদের সমৃদ্ধ সঞ্চিত অতীত। আর মধ্যরাতে সন্তানের কান্নায় আতংকিত হয়ে উঠে মাতৃ-হৃদয়। হানাদারদের বুটের আঘাতে লুন্টিত হয় মানবতা। রহস্যজনক নীরবতা পালন করে মানবাধিকার সংগঠন। অপরদিকে গোমরে কাঁদে শান্তিকামী জগতের তাবত প্রাণময়।

যে মা বুকের মাঝে নবজাতকের খাদ্যসামগ্রী রেখে লুকিয়ে থাকে ঘরের কোনায়, অন্ধকারে। যে শিশু মরে যায় মায়ের কোলে; নিষ্পাপ, তারা কি জানত—ছিল কোন অন্যায় পৃথিবীর সঙ্গে। হে নীরব সম্প্রদায়, আহত মানুষেরা ডাকছে তোমায়। শেষবারের মতো বলে যায়—এক হও অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

যাদের হত্যা করা হয়েছে,  সে যদি আপনার সন্তান হয়; যে মানুষদের খুন করা হচ্ছে, সে যদি আপনার ভাই হয়; যে মহিলাদের সম্ভ্রম যাচ্ছে ; নয়তো মারা হচ্ছে—সে যদি আপনার বোন হয়, কি করতেন আপনি? ..জেগে উঠুন। জেগে উঠুক বিশ্ব, প্রতিবাদের শ্রেষ্ঠ প্রকাশে।

ক্ষতবিক্ষত বুকের আর্তনাদে কেঁপে উঠা পৃথিবী—তার দেহ ঢেকে রাখে আকাশের মলাটে।

 

অবিচ্ছিন্ন পঙ্তি

সমুদ্দুরে, ঢেউ সমুদ্দুরের। সংখ্যা ভেঙ্গে তীর ভাঙ্গে, আছড়ে পড়ে সীমানায়। হাত ধরে বসো পাশে, অদূরেই আমি আছি ঐ—বঙ্গপো মোহনায়। সাহারা মরু যদি হতো ওপারে; বলতাম—ও সাগর, তুমি বাংলা ছোঁয়া জলরাশি। প্রিয় কাঁদছে বসি, স্নাত করো এক পশরে—ভরে দাও কানায় কানায়। মনে রাখো মন, হাতে রাখ হাত। মঙ্গল যা কিছু সকল; হৃদয়ে প্লাবিত হোক।

যারে বাঁধতে পার শিকল বাঁধনে হাজার বার। তবু সে থেকে যাবে পর। হৃদয়ের কাননে না বাঁধলে কেহ—হবে না আপনার। আহ্! চোখের জল ফেল না, কান্না ঢেলনা বুকে। ও মনে সুর তুলনা বিষণ্নতায় ধুঁকে। দুখের আলোয় কান্নাটা আজ বুঝি গেছে যে থেমে। মনের রং মরে গেলে, হৃদয় বুঝি ওঠে ঘেমে। স্বপ্ন নয়, কষ্ট নয়, নয়তো দীর্ঘশ্বাস। ওখানে তোমার অঙ্গনও জুড়ে রয়েছে যে বিমূর্ত অবকাশ। অনিবার্য নিয়তি বেঁধে রাখে গহীন সূতোয়। যার সনে যার ঠিক হয়ে আছে জোড়ায় জোড়ায়।

বেঁচে থাক অনাদি বছর, মায়া মমতার বাঁধনে বেঁধে—বেড়ে উঠুক ঘর। ভাল থেকো, সুখে থেকো। সারাটা জীবন জড়িয়ে রেখো। যে মানুষ বলবে এসে, আমার সব জানা। আমি তো তাঁর, ভালোবাসিবার—শুধুই একজনা।

 

অন্যথা

সবাইকে যেতে হয় যেহেতু—আমাকেও যেতে হবে। গৎবাঁধা পরিধির দাম্পত্যে, আপত্তি জানিয়ে আবেদন করে রিপুর বাহক। জীবনের আয়ু’র ভেতরে দিনরাত্রে, আহ্নিক গতির সূচির সংসার পুষে সবে। অনুবাদ্য কতকথা’র দুঃসময়ের কথক। যে বাড়ি বাড়ি প্রচার করে পূর্ণগ্রহনের ভূমিকা। বার্ষিক গতি ধারণায় রেখে প্রশ্ন জাগে, কবে? … দলছুট অক্ষরের ব্লকথেকে খসে পড়ে বর্ণমালা, বিচ্ছিন্ন পদাবলির স্পর্শকাতর শিখা।

সূদীর্ঘ জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি অসম্পূর্ণ থেকে যায়, মূলসূত্র এবঙ সমকালীন দ্বন্দে। শব্দরা পালিয়ে বেড়ায় সন্ধ্যা বিহনে। দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনগুলো ধাক্কা খেয়ে ফিরে—মাঠির ঘরের মাঠির দেয়ালের স্কন্ধে। অনিশ্চয়তার জীবন নিয়ে বয়ে চলে লাখো গৃহহীন মানুষজনে। অনাহুত কষ্টের কুশলাদি জেনে গেছে সভ্যতা। আনন্দঘন মুহুর্তগুলো বঞ্চিত হয় বিমূর্ত অভিমানে। কবে সে নীরবতার ঘোর ভাঙ্গে—কে জানে। মরমীর স্বাক্ষরিত সনদে লৌকিকতার মরম খোলে। খোলে অন্তর আঁখির প্রেস বিজ্ঞপ্তি। অলিখিত শর্তাবলি’র শীর্ণ শাখা, ভরাট হয়ে যায় কালের আকালে। যদিও ভোরের সবুজপাতার সঙ্গে শিশির ধরে রাখার আনন্দে মাতে প্রকৃতির প্রাপ্তি—প্রতিদিন, দিনের আলোকে।

জন্ম দিবস থেকে মনুষ্যত্বের স্তবক জপে জপে, কথ্যরুপের অপভ্রংশ হয় জন্মান্তরে। বিরহের ঘরকান্না কি সৃষ্টির প্রথম পিতা-মাতা..আদম-হাওয়া? অতঃপর চাষ হয়, বাস হয় মৃত্তিকার উদরে। ভরে উঠে বসবাসযোগ্য করে গড়া পৃথিবীর উপরিঅংশ। প্রান্তিক-সমাজ ঘেষে থাকে অদৃশ্য নিরাপত্তা বেষ্ঠনী—অনিরুদ্ধ ছায়া।

স্মরণে রেখ হে—সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে, ছাড়িয়ে সকল জাত পরিচয়ের সখ্যতার বিভাস।

 

অর্জন এবং বেদজহুর

কতিপয় মানুষ নির্জনতার বিরুদ্ধে অর্জনকে ঢালে। বেদ জহুরে সুর তুলেন— মরমি’র। অস্থিত্বের সজ্জিত ঝংকারে মর্মবেদনা গলে। নাগরী হরফে খোদিত যার সবটুকুই কবি’র। যুগের কন্ঠ ফিরে অপমৃত্যুর উপত্যকা ঘিরে। মহাকালের বিশাল ছাড়ে বেড়েছে বাড়। ভাঙন ধরেছে ভূগর্ভস্থ এলপাইড প্লেটের শিরে। তবুও লোকন’র নৌকায় আরকুম শাহ বেয়ে যান—দাঁড়।

আমার কানে বাজে জনকের গান। চন্দ্রবিন্দুসহ পঞ্চাশটি বর্ণ দিয়েছে আমারে কূল। জননী জানিয়ে দিল—জন্মের মান। যেখানে মাটি হাতে দাঁড়ানো এক চতুর্থাংশ স্থল। অনাবৃষ্টির জন্য মাঠি ফেটে চৌচির হয়। একমূটো অন্নের জন্য মারা যায় কংকালসার জীবন এক। ক্ষমতার মিছাল তুলে দেশটি—লিপ্সুদের চাপ সয়। তরফ, বিভোরে কষ্টে ভোগে, খোঁজেনা প্রান্তিক।

জাগ্রত কলম লিখে; আবেগকে মাটি দিছি নিপূন হাতে। ধূসর অসত্য-কে দলিত করে, সত্য লেগে থাকে সাথে।

 

ভূ-ভাগের ভাগী

অন্তঃস্রোতে নিশ্চিত দূরত্বের ধরাবাঁধা বিকাল ফুঁড়ে উঠে গুঞ্জনের পুরান বাড়ি। ও মন মানুষের ধন, কি সুখে চালাও অন্তর মাড়ি। আদম সন্তানমূলে সকল জমিনে; মৌরসী স্বত্বের অংশ চষে। অতঃপর জমিন ভাগ হয়, ভূ-ভাগে দাগ হয়। মানুষ দাগী হয়। ব্যক্তি স্বার্থের প্রাপ্তব্য কষে।

ভাগাভাগির এই পৃথিবীতে মাটির তৈরি মানুষ অস্তিত্ব খোঁজে—মাটির ঘর।

পদছায়ার সহি শিল্পনামা ১৯৮২-তে অকালপ্রয়াণে যায়। বৈরুতের শাতিলা ক্যাম্পের গণহত্যা, যেখানে ইতিহাস কথা কয়। এরই পাশে সেই প্যালেস্টাইন—যেখানে জন-দ্যা ব্যাপ্টিস্টের মস্তক চেয়েছিল রাজকন্যা সালোম। আর এখানেই মুসলমানদের মসজিদুল আকসা, খ্রিশ্চানদের যিশুর জন্ম ইহুদিদের হায়কল-ই-সুলায়মান। সেমেটিক ধর্মের মিলন কেন্দ্রচেতনার মূলধারা। তবুও থামেনা রক্তপাত, থামেনা প্রাণহানি। মাটির তৈরি মানুষ মাটিতে মিলায়। মতভেদ ভিন্নতা, ভিন্ন মতবাদ। শান্তির অন্বেষণ থেকে সরে এসে গড়ে বিসম্বাদ। হিংসা হানাহানিতে শেষে যুদ্ধে গড়ায়।

তবুও অন্যায়ে পরাজিত নয়—ন্যায়-ই জয়ী হয়। ভাগাভাগীর এই পৃথিবীতে মাটির জীবকূল অস্তিত্ব খোঁজে—মাটির ঘর। হেঁকে যায় ভোরের প্রার্থনা। এসো হে—মানুষে মানুষে গড়ি সম্প্রীতি, বন্ধনে বাঁধি অপরাপর। দুঃখকষ্ট ভাগ করি একে অন্যের। সৌহার্দ্যের পাশে গড়ি শান্তির নীড়।

 

বঙ্গবন্ধুর এপিটাফ

বাংলাদেশের দায়ভার নিয়ে একটি রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল পূর্ব বাংলায়। যেখানে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ভূমিকা তৈরী করেছিলেন—এক ক্ষণজন্মা শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তবে শোন হে প্রজন্ম—হাজার বছর থেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা বাঙালিরা কি জানত? তাদের একজন মুজিব আসবে? নিজস্ব পতাকার পরিচয়ে বেড়ে উঠবে এই বিশ্বে?

যে স্বপ্ন বহমান ছিল গ্রাম বাংলায়। পূর্ণ বৈচিত্রের অপরূপ রূপে এই মৃত্তিকায়—গাঙ্গেয় অববাহিকার ব-দ্বীপে। যেখানে মিলেছে অসাধারণ সৌন্দর্যের তারুণ্যপট। বিমুর্ত চিত্রের নিকেতনে প্রকৃতি এখানে বড় উদার, সুন্দরের সমারোহ ঘিরে রাখে সমগ্র বাংলাদেশ। দেশের পরতে পরতে এই ভালোবাসা নিয়ে জাতিকে বরণ করেছেন—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর বুকে স্বর্গীয় সৌন্দর্য—বিস্তীর্ণ জলরাশির মতো জেগে উঠা ঢেউ। এখনো এই বাংলায় যাঁর আঙ্গুলির বিকল্প আসেনি, আসবেনা কেউ। কতকাল, কত মহা যুগ অপেক্ষার পর— শুধু আমাদের—একান্ত স্বাধীনতার জন্য জন্ম  হয়েছিল তাঁর।

মোর জন্মের কালেও তুমি শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য কারাগারে—মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। গণমানুষের হৃদয় সিংহাসনে টাঁই নেয়া প্রাণের নেতা—আমাদের এই বাংলায়। এক অনবদ্য সংগ্রামী জীবনের প্রমাণ—হে বঙ্গবন্ধু মুজিব, তুমি যে স্বদেশী প্রত্যয়ের আরেক নাম। তোমাকে দেখিনি, শুনিনি তোমার কন্ঠস্বর। তবুও  তোমার বাঙ্গালিত্বের উচ্চতা, বোধের বিশালতা—প্রাণিত করে। প্রতিনিয়ত বিস্ময় জাগে—৭ই মার্চের স্বাধীনতার দীপ্ত উচ্চারণে।

রাজনীতির কবি বলেছিলেন যে দিন—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’ তারপর আরো শোন—পঞ্চখণ্ডের বিহান, কুশিয়ারা-সুনাই-লোলা গাঙে’র কলকল ছলছল জলসমগ্র.. সেদিন ভরা পূর্ণিমার আলোয় রাত হাসে, স্রোত চলে যায় মুক্তির মোহনায়। এই বাংলার হাটে মাঠে, পথে প্রান্তরে—কিশোর, যুবকের দুরন্তপনায়, প্রবীনের প্রাজ্ঞতার সামনে স্বাধীনতার দুয়ার খোলে দিলেন তিনি। পৃথিবী দেখল সেদিন—পতপত করে উড়ে থাকা পতাকা আর মাঝখানে একটি বাংলাদেশ।

জাতিসংঘে যেদিন প্রথম বাংলা ভাষায় ভাষণ  দিলেন—সেই দিন ভাষা শহিদের শ্লোগান সমৃদ্ধ হাতের প্লাকার্ড দেখেছিল পৃথিবী। কালের কীর্তিমানের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ আজো ফুল হয়ে ফোটে রয়—সংঘের রেজুলেশন বুকে, ইতিহাসের পাতায়। আমাদের দেশের আকাশ ছিল—মেঘহীন, জাতীয়তার সূত্রে উচ্ছ্বসিত কবিতার পঙক্তির মতো।

তোমার প্রতিকৃতিতে ছায়া জাগে শোষিত, নিপীড়িত, নির্যাতীত মানুষের স্বাধীনতা—হয়ে ওঠো শান্তির প্রতিক। দেশ মাতৃকার মাটির সাথে, স্বাধীনতা ও জাতিয়তার সাথে, সার্বভৌম পতাকার সাথে মিশে থাকা আত্মার নাম—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

 

স্বপ্নের বীজপর্ব

ভোর জেগে ওঠে আলো-আঁধারীর হাতে হাত রেখে। দেহবীজ স্বপ্ন দেখে—মেখে নেয়, আদি কাব্যকলা’র পাঠ। স্নিগ্ধতার আবেশ মাড়িয়ে প্রজন্ম পরিবহণ যাত্রীক হয়—কালের পটে। জীবনের নিঃশ্বাস ছুঁয়ে থাকে সকল কোলাহল। নির্জনতার নতুন শব্দার্থ যখন লেখা হবে; মনে রেখো—একদিন আমাদের অসংখ্য বাক্যহীন সময় উৎসর্গ করেছিলাম। অতীত-বান্ধব কবিতায় জেগে আছো বন্ধনে-বন্দনায়। স্বপ্নের চৌকাঠ ধরে—বদলে দেবার আহবানে ভরে উঠে ঘর। কথা বলি আগামীর—এক সম্পূর্ণ মানুষের। গ্রন্থিত বাক্যমালা তুলে রাখি হৃদশহরের মনোবাসায়। যতটুকু বাকী আছে, পড়ে থাক—প্রাপ্তির জমা খাতায়। তবুও শূন্যদশক ছুঁয়ে যায় কবিতার সমতল গন্থব্য … অতএব প্রিয়, ভাল আছি জানিও।

অনেক দেখেছি, কিন্তু বলিনি। রেখেছি গোপন, অন্য দিনের জন্য। যখন হৃদয় হেঁটে যায় আলপথে। এখনো কি জেগে অথবা পথচেয়ে? দোকান থেকে খুচরো প্রত্যাশা কিনেছি। মধ্য নিশি পেরিয়ে; শুধু নিশ্চিত ভোরের জন্য দিই দু’হাত বাড়িয়ে। এসো আত্মজার মাঝে, অনন্তের ভেতরে লুকিয়ে রাখি। যার খোঁজে সন্ন্যাসে যায় নিমাই চান।

যে মিথ্যে বলতে না পারার জন্য হারিয়েছি বিনোদিয়ার সুখাচল। কারণে’র কোন অনুশোচনা নেই বহুকাল। অভিমানে বিবর্ণ হওয়া অনুভূতির প্রান্তসীমায়। যত ফোটা বৃষ্টি নেমেছে বাংলো বাড়িতে—তার সকল শব্দসুখ তুলে এনে ধরিয়ে দেবো। ডানহাতি মানুষের ডাক শুনে, রূপালী চাঁদ উজাড় করে ঢেলে দেয়—জোসনা। যেন অপলক দেখা মোর মায়াভরা প্রিয় মুখ।

কতকাল পর…বাক্যালাপ দিয়ে ধ্বনির লেনদেন শেষ হলেও পড়ে থাকে নীরবতার স্পন্দন। অঙ্গণ ঢেকে যায় ভালবাসার আলিঙ্গনে। নির্বাসন থেকে আসতে শুরু করে ইচ্ছেগুলোর মধ্যবয়স। ঘাস-বন ঘেরা পথের দুপাশে ছড়িয়ে থাকে ছত্রগাথা।

তুমি কি শুনছ? পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে পড়ে—সুনশান নীরবতাকে বামে রেখে। আশাভরা কন্ঠস্বর পা ফেলে প্রতিনিয়ত। তোমায় বিদায় বলি আলোর নীচে বসে। কষ্টগুলো মাটির বুকে রাখি অবশেষে। তবু যদি হয় দিতে আরও, নিজেকে জেনে শুধিও—আমি তো নই অন্য কারো।

 

এপিটাফ

# পরম পিতা’র প্রয়াণের পর, যে নির্বাক ছবি শুধু তাকিয়ে রয়—নিরন্তর।

রাফখাতা, হাফহাতা, রুল খাতা—স্মৃতির জমানো ঘরে কতকিছু পোতা। বাবা—‘একপ্রস্থ কাপড়, কুমিল্লার এক সেট খাদি পাঞ্জাবী এনো।’ এমন নিশ্চিন্ত দাবি করে বলার আর কেউ রইলনা। দেরী করে বাড়ি ফেরার জন্য নির্ঘূম অপেক্ষা—এমন নিঃস্বার্থ অপেক্ষার স্মৃতি মনে হলে, আমার পৃথিবী কেঁপে ওঠে। ছোট থেকে বড় হতে হতে ছায়ার অনুসরণ করে হাঁটা—পড়ে রয় জীবন পাতায়।

হে পিতা—হেঁটেছি পিতৃপুরুষের বিলেত বাড়ি। বার্মিংহামের বেসকট রোড ধরে হেঁটেছি, যেখানে তিনি ফরোওয়ার্ড ব্লকের জন্য গ্রেফতার হয়েছিলেন। হেঁটেছি ওয়ালসল টাউন সেন্টার, যেখানে তিনি কাটিয়েছেন উইকএ্যন্ড। স্বাধীনতার জন্য মহার্ঘ পিতামহের দুঃসহ জেল জীবন আর সংগ্রাম গাঁথা কাহিনী শুনে—ভূমিপুত্রের বুকে মাথা রাখি। এক বিপ্লবীর অবয়ব দেখে জন্মদাতার পাঁজর গুণে গুণে আমিও বড় হই। পিতা-বৃক্ষ-ছায়া ছাড়া যে বড় নিঃস্ব। আহারে দুঃখ।

এক যুগেরও বেশী প্রবাসে থাকার জন্য—শেষবিদায়ে ছুঁয়ে দিতে পারিনি তোমার চিবুক, আঙুল। যে চিবুকে আমার পরম নিশ্চিন্ত মায়া ছিল। যে আঙুল ধরে কেটেছে শৈশব আর বিদ্যালয় ফেরত পথ। ক্ষমা চেয়ে নেবার যে অধিকার আগলে রেখেছিলে, তা’। ছুঁতে পারিনি তোমার সমগ্র উচ্চতা।

হে পিতা—সেবার অবৈতনিক সংজ্ঞা আমায় পড়িয়েছো—পড়ার টেবিলে, বারান্দায়, টিউবলাইটের আলোয়। এক ক্লান্তিহীন অবয়ব ঘিরে রাখে মানবিকতায়। শিক্ষণের মলাট আমার চারিদিকে দেয়াল হয়ে রয়। সয়— আগলে রাখা সমাজ দর্শন পরম্পরায়। রেখে যাওয়া পদচিহ্ন নির্দেশনায় খোলে দিই—উৎসর্গ লতিকা। উদারতার উত্তরপুরুষ প্রেরক হয়েছিল, তাই নিঃশব্দ অন্ধকার ছুঁয়ে যায় প্রাপকের নিথর দেহ। পিতা, তোমার স্নেহের শপথ—আমার চারিদিকে জেগে থাকে তোমার দীপ্ত উচ্চারণ—‘তুমিও ভাল থেকো পুত্র।’

বুনিয়াদি মনোভাবের প্রান্তিক প্রত্যয়ে, দৃঢ় বিশ্বাসে গড়ে তুলেছিলে শিক্ষাঘর। হৃদয়ের চৌকাঠ ভেসে যায় লোনাজলে। বৈঠকী ইতিবৃত্তে সুখদুখের অনুবাদ ফিরে আসে ঢেউয়ের মতোন। উৎসব ঘিরে এক নিরন্তর শূণ্যতা খোঁজে যায়—আড্ডাপ্রিয় মানুষের উপস্থিতি। আশ্রয়সর্বস্ব মানুষেরা কি ঠাঁই দেবে—সময়ের আলোকচিত্রে। হে পিতা—সাম্যবাদী শেকড়ে প্রোথিত বৃক্ষটির ছায়ায় ঢেকে যায় হোকনিয়া মহল্লার পুকুরঘাট, খোলা আকাশের আংশিক মেঘ। ১২৩৭ দাগে দেওয়ান ভিলা’র ভূগোল।

এই শান্ত গাঁয়ের সুনসান নীরবতার কি ভাষ্য লিখে দেবো? কি হবে শোক প্রকাশের মাধ্যম? বলো! চেতনায় মিশে থাকা অধ্যায়গুলো ব্যক্তিত্বের নিমগ্ন পাঠ নেয়। আমি তার অংশ হয়ে বেঁচে থাকি, রেখে যাওয়া সততার প্রশস্ত উঠোনে। এক জীবনে কিছুই চাওনি বলে অসীম দূরত্ব এখন আমার সীমানায়। কি করে অতিক্রম করি সেই মাটির স্থাপত্য? অমোঘ বিধানের বাঁধকতায় আমিও বাঁধা পড়ি—অস্থায়ী আবাসে। আমিও প্রাণহীন হলে যেনো পাশে পাই ঠাঁই। ক্ষমা করো পিতা, এই সন্তানেরে।

যে প্রস্থান—স্মরণকোটা ভরে দেয়, ডেকে আনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার আন্দোলন, ছয়দফা থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম। ডেকে আনে প্রতিনিয়ত শিক্ষা সেবার কাজে ব্রতচারী অস্তিত্ব। জ্ঞান রস্মি ঢেলে দিলে পাড়ায়, গ্রামে, উপজেলায়। নিজে হলে ক্ষয়—চারিদিক করে আলোকময়। পদপদবী পায়ে ঠেলে কাজ করেছো অন্তহীন। রুগ্ন সমাজ গড়তে গিয়ে খুইয়েছো যে অনেক কিছু। সত্যবাদী সাহস ছিল, টান ছিলনা পিছু পিছু। সৃষ্টি মাঝে মিশে আছো—সতত অম্লান।

ধীমান লোকায়ত হলে, সময়ের কোল দেয়াল হয়ে ওঠে রঙিন প্রচ্ছদ। কারুকাজেও পুড়ে শ্রম বিবিধ। উপসংহারের পর, পৃথিবীর আয়ু রেখে গেলে শূণ্যের ওপর, জন্মের আবর্তন কি দমে যাবে? যে মুগ্ধতার দৃষ্টি ঘিরে রাখে বিমূর্ত চারপাশ—কোথায় হারাবে? নিপুন দক্ষতার অনুপম এপিটাফে খোদাই হয়ে থাকে আত্মনির্ভর দৃষ্টান্ত—আয়ূ এবং ০২ সমেত।

হে পিতা—মূল্যবোধ নগরের নাগরিক স্মারক গড়ে ওঠে চলমান যত্নে।

Share Now

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *