
নিষিক্ত পরত
ওয়ালি মাহমুদ
প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০২৩
প্রকাশক: মেঘ প্রকাশনী
বাংলাদেশ।
উৎসর্গ-
শ্রদ্ধেয়া মাতামহ— ময়রুন্নেছা চৌধুরী,
যাঁর পরম স্নেহ-মমতা অথবা নিখাদ মায়ায়,
শৈশবের সোনা ঝরা রোদ-সকাল মনে পড়ে যায়।
নিষিক্ত পরত
কবিতার কসম লাগেরে মায়াধারী—হৃদয়ের অর্ন্তগত গ্রামে, এখানে জন্মে ছিল প্রাণ। কাঁটাতারে খন্ডিত পৃথিবীবাড়ির দক্ষিণ কোঠায়—জীবনজীবী। শিশু জন্মহারের সুসময়ে আদমশুমারীর প্রয়োজনীয় উপাদান হয়ে যদিও কেউ বলেনি, মৃত্যুর আগে বিবেকের মৃত্যুকে বরণ করো হে। বিশ্বে মানবসংখ্যা আরো একজন বেড়েছিল বলে—আনন্দ উচ্চারণগুলো মাতিয়ে রাখে দেওয়ান ভিলা। হাত-পা এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ’র মালিকানাধীন শিরা-উপশীরা, আনাচে-কানাচে, তা-ও পৃথিবী নামক গ্রহবাসীর ক্ষমতাবলে।
গ্রহের শরীরে এখন সময়ের উত্তাপ। রাতের আবাসে দর্শনার্থীদের দরজায় পোস্টার সাঁটা কাগজ দেখে হারিয়ে যায় সময়ের সিঁড়ি—বৃক্ষে লিখা শাখার পাতা। পৃথিবীর পাহাড়স্থানে জমেনি বরফ, জমেনি জল। একটুকরো কামনার জমিনে চাইতে পারো—এগুলো আমার, ওগুলো আপনার। এতো নিবিড় আবেদন—সূর্যমুখী দিনের সময়গুলো এখন শতরূপা অতএব এ সুখগুলো বৈধভাবে একান্তই আপন। ঘোষনা দিয়ে সম্পর্ক আসেনি—তাই বলে কবিতারা কি ঋতুবতী হবেনা?
তাম্রফলকের মাঝে খোদাই করে লিখে রাখি—আগুনঝরা অনুভূতির ভাষা। জীবন সুধার অপার পানে লিখি—যেভাবে নিষিক্ত ফোটায় গোপন থাকে জেনেটিক কোড। ফোটাজল থেকে সাগরের উৎস ভূমি। সৈকতের চোরাবালিতে আকাঙ্খারা আটকে থাকে না, জীবনের পাতায় লুকিয়ে থাকে। অভয় দিলাম সজ্জন বলো—সুখী। রাখো এই স্নিগ্ধ শিশিরস্নাত ভোরের উপর হাত, প্রস্ত জুড়ে মেহেদী রাঙাও নিজ হাতে, আপন মনে। কাম-পর-বেলা ঘুম ভাঙ্গানো জড়প্রাণের কুঠুম হয়োনা আর।
এতো সব পছন্দ অপছন্দ’র ফর্দটি শুভক্ষণের দিন—ইচ্ছে বলার অপেক্ষায় থাকে। হৃদযন্ত্রের যন্ত্রাংশে স্নান করে নেবার যে আকূলতা—সেমানুষ সমেত ছায়া মানুষের কায়া-মায়া। অস্থি মজ্জার অধিকারীহলে যেমন হয়—সেই যৌবন। ব্যথা পেলে আশ্রয় খোঁজে, সুখানন্দ পেলে মুখ লুকোয়। সরে যাওয়া আবহাওয়া সম্বন্ধে নীরবতা ভাঙ্গার ছলে যেমন করে হে—কথা রাখতে শুরু করি। বিম্বিত বাক্যরা ভেসে যায়। সময়ের রাত্রিবেলায় অধিকারের বড় দুঃসময় এখন। রূহ থেকে প্রাণী, জীবন ধরে স্বপ্নের মহাসড়ক।
এক হলকা বৃষ্টিভেজা বাতাস ভিজিয়ে দিয়ে গেল। এখন বর্ষাকাল, বৃষ্টির পৌষ মাস। হায়রে তুলসী পাতার সাধ আহ্বলাদ। ধোয়াশে স্বপ্নালোক হারিয়ে যায়। জোয়ার-ভাটির বিবাদময় বিবাদীরা খেলা করে। শিলালিপির যুগে অথবা আরো আগে, ভালবাসার যেখানে ক্ষয় নেই।
সঙ্গতার নিঃসঙ্গতা মিলে—ও আমার যতনের ধন, আন্ধাইরে আন্ধাইরে গেল সারাটা জীবন।
তরঙ্গ শব্দে খেলে যাওয়া মনটি, তার বাক্যগুলো ফিরিয়ে নিতে অপারগতা জানালো। ভাবগুলো প্রকাশিত হয়নি তাই পেছন ফেরার রুদ্ধ দুয়ার’র কাছে শব্দ অস্থিত্বহীন। প্রাণীজ সকল—হতে পারি নিঃস্ব, হতে পারি কূল সর্বস্ব। তবুও তো দায়আছে, সায়আছে। দেরীতে আসা জীবনের এই মাহেন্দ্রক্ষণের দ্রুতিটি ধরতে পেরেছিল তাবত সঙ্গীন। ওহে, কি সুখে রাখিব তোমায়। সুখদিতে এসে যে জীবন জড়িয়ে পড়ে কোনে কোনে। এ কেমন বাতিক বলো। কবিতার বিনিদ্র স্লাঙ্গ ভাষাগুলোর কি কোন অবসর নেই?
স্থপতিকে ঘিরে জীবনের নামফলক’র উদ্বোধন হয়নি কোন; তবুও প্রিয়—ক্ষমা করে দিও। বিরহের স্তবক নিতে আসিনি।সুখ সমস্ত কষ্টভাগের অভিমান এবং কবিতা সমস্ত মাত্রা ভাগের শব্দগুলো; রাত্রির উদ্দাম অংশে বেণী বাঁধে। ভোরের সম্ভ্রান্ত অংশে সাঁধে দুল, জানো—আমি কি বলতে চাই? দুয়ারখানি খটখট করে নেমে যায়, নিঃশব্দে ঝরে গেল যে পাতা হায়। রাত্রির হাত ধরে লভ্য বাঁকা পাঁজরখানি, হয়তো বলবেনা আর—আমার উৎস জানি।
তনু-তনাই’র কসম লাগেরে মায়াধারী—গ্রহনকরো।
কবুল এবং শংকামুক্ত সম্পর্ক
অর্পিত অনুরোধ রাখতে পারিনা, তাই তোমার এতো অনুযোগ। পুড়েছে গহীন, বলো—শুধু কি গহীন? আমি তো বলেছি, আমি যে ভিন। করবির পাপড়িতে কুসুম ফোটে কি ফোটেনি? দেখিনি যে চেখে। এতো কথামালার বিবর্ণ বেলা, গিয়েছি কি রেখে? বুকের আঙ্গিনায় যে ’নু আমার নিরদরিয়ার ধন। সুখের লাগি আমিনু সপি দেহ-তনু-মন। যদি নদীর স্বচ্ছ ঢেউ’র জন্য বলতে পারি—ভালোবাসি। বৃষ্টির এক ফোটা কণার জন্য বলতে পারি—ভালোবাসি, তাহলে কেন পারব না বলো—অনুক্ত অভিমানী।
আমার সিনায় ভরে, হৃদয়ের কম্পিত স্বরে বাসা-বাসির সোপান। কবিতার অক্ষরে অক্ষরে গড়ে উঠে চৌকোনা দালান। এ তো শুধু ভালবাসার এক পরত সোনা, এক পরত। সুখ বর্ণমালার হাউশ ওঠে বাক্যের লাগি। নিবেদন—ও আমার সুখের পরত, কবিতার পরাণ বলে—প্রিয়জন নেই, তবুও চরণ লিখি ছায়ায় ছায়ায়।
কষ্ট পেতে পারি, যেতে পারি সুখের ঘরে। আমারে ছুঁইও শুধু কবুলের পরে। আমি ধরতে যাইনা ভ্রুণ রাখতে। চাইনা অসতর্ক মুহুর্ত বয়ে বেড়াতে। কবিতার কাবিনে আমি শুদ্ধতম প্রার্থী। বুকভরা দলিলের’নু আপন উকিল। মায়া বদনে—বাঁধন খোলা জমানো বিকেল। আঙ্গুলির ফাঁকে ফাঁকে ঝরে পড়ে খুচরো গোনাহ। সে যে অনুমোদিত কবুলের পর, আমি ভাঙ্গতে যাই—সিলগালা দেয়া হৃদয়ের ঘর। ধরো, এই নাও ফাতিমা মোহর। শব্দের ধ্বনি কাঁপিয়ে বলো—কবুল, কবুল, কবুল।
’ই তোমার আঁচল বিছানি সোহাগ। ফোটে ঘাসফুল তরুলতায়, এক হওয়া যুগল পত্রে। কোন জেন্ডারে ঠিক চিহ্ন দেব বল। অতঃপর আমি মিশে যাই আমাদের পরাগে। ঢেলে দিই, চুড়ান্ত সুখ দাগ।
কবুলের পর—আমি ভাঙ্গতে যাই, সিলগালা দেয়া হৃদয়ের ঘর।
কবি’র স্মরণে
সময়ের হাত ধরে হে অনাদি কাল—আমাদের কবি প্রয়াত …বাঙলার মানচিত্রে এখন কষ্টের একফালি বিরহ। কবি নেই। যে নামের অনিবার্য উপস্থিতি আমাদের সাহিত্য সমালোচনায়, যে মানুষকে আপন করে—দেশ দিয়েছিল ঠাঁই; তার প্রয়াণে ভেসে যায় দূরদেশের দীর্ঘশ্বাস।
তারপর
শিল্পীর অনেক কথা বর্ণিত হয় গদ্য-পদ্য’র সারাংশে জুড়ে। যেখানে স্বপ্নজমিন বরাবর স্বপ্ন খোঁজে, ভেঙ্গে যায় লালিত প্রতিশ্রুতির সিন্দুক। তবুও ফিরে আসে আঘোষিত ইচ্ছেগুলো … নদীর মতোন।
তারপর
বিষন্নতার ভার একপাশে রেখে, সঙ্গী করেছ মৌনব্রত। নিয়তই খোলা পড়ে থাকে সার্বজনীন আব্দুল মান্নান সৈয়দ। যে মৃত্যু আমাদের কাব্যশূন্যতা তৈরি করে।
হে সাহিত্য বান্ধব—বিনম্র শ্রদ্ধা তোমায়।
স্মারকের বুকে স্মরণচিহ্ন
নবদ্বীপের বুকে হে কীর্তিমান, হলওয়েল মুভমেন্ট থেকে স্বাধীনতা-সংগ্রামের মিছিলে, শ্লোগানে উঠেছিল প্রত্যয়ী হাত … শোষিত সমাজের শৃঙ্খল ভাঙ্গতে নিয়েছিলে শপথ। এভাবেই কেটেছে ১৯৪৭ সাল। ১৯৭১—বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। মা-মাটি-মানুষ পাবে জন্মগত অধিকার। যুদ্ধে তাই মিশেছে সবাই—মানুষ আর মুক্তি চেতনায় হয়েছিল একাকার।
পাক্ষিক মুক্তবাংলা’র কলম সৈনিকরূপে যোদ্ধাকে দিয়েছ প্রেরণা, সাফল্য-কে করেছো শক্তি। আপনার কর্মের কাছে আমাদের অনেক ঋণ। সে সব কথা বুনেছিলেন বাউল কমর উদ্দিন। তৃণমূল সাহিত্যের কারিগর, গল্প-উপন্যাসের পাতায় ফুটে থাকে জীবন চিত্রকর। মৌলিক কথাসাহিত্যের ভীড়ে ভেসে ওঠে ‘সাবুর দুনিয়া’। ‘নয়া দুনিয়া’র চরিত্র বেঁচে থাকে বাংলার পাড়া প্রতিবেশীর শরীরে।
পুড়েছে বসত ভিটা, পুড়েছে প্রাচীন গ্রন্থবাস। সন্তান দেখেনি পিতার মুখ—এভাবেই কেটেছে ন’মাস। হে সংগ্রামী সিরাজ—ভয় নেই। বাঙালি ভুলেনি সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, নেতাজী থেকে মুজিব—ভুলবেনা কখনো, মনে রেখো।
যে মানচিত্রের পতাকায় লেগে আছে শহিদদের রক্ত—আমরা ধারণ করেছি সে পতাকা বুকে। তার-ই মাঝে জেগে আছো—এখনো অমলিন, চিরন্ময় পুষ্পে সিক্ত।
কবিয়াল
এক অনন্ত সময়ের পথে জাগরূক আত্মজ…
কাব্যপানে সুরমার স্রোত বেড়ে চলে। শৃঙ্খল ভাঙ্গা দ্রোহের অনলে পুড়ে—যে পোড়া নিয়মের বর্ণে। যে পোড়া—গণমানুষের মায়ার টানে। শোষিত মানুষের প্রাণে, শব্দে যার উদ্দীপ্ত শ্লোগান। হৃদয়ের কোনে উচ্চারিত ফাগুন। যে প্রয়াণ এখনো স্থির, চির বহমান।
যে আবেগে অনাদি অস্থিমূল স্পর্শ করো—কবিয়াল। জলফোঁটা নীরবে গড়িয়ে পড়ে, তুমি তা ছুঁয়ে দেখো কবি। ভালবাসার একমুঠো উৎসর্গপত্রে পৃষ্ঠাভর্তি বাক্য পরম্পরা। অদৃশ্য শোক মন্তব্যে ভরে যায় কাগজের পাতা। কবরের পাঠাতনে প্রার্থনার কবিতা রুইয়ে দিই—ভোরে।
অধীন ওয়ালি মাহমুদ কয়—যে মায়ায় মায়া রাখে, সে কখনো তামাদি হবার নয়।
নবদ্বীপ: আলোচ্যধ্বনি
সু-স্নাত রহে সুরমা, কুশিয়ারা ও সুনাই
উত্তরের ঘাটে’ব সদা থাকেন যে কানাই
দক্ষিণে বড়লেখা, পশ্চিমেতে গোলাপগঞ্জ
পূর্বেতে সীমানা লাগে ভারত-করিমগঞ্জ।
কত’ই অনাদি সবুজাভ পাতার ছায়ায়, নানান ত্রিভুজ সাহিত্য বর্ণিত উপমায়। মানব প্রাণীজ সাবলীল নিষ্পাপ মায়ায়, যে জননী-জনকের সুগভীর বেদনায়। বড় অচেনা শহরের ভেতরের শহর, কেটেছে অনেক রাত্রি যেথা—সহস্র প্রহর। কোনো মলাটে বসেনি মন, হয়নি ’ক ঠাঁই, এই অখণ্ড অবেলায় আরাধ্য জুটেনাই।
প্রচলিত প্রবাদের মাঝে যেনও না হয় কোনও মিথ অথবা উৎসের ধারণা। অসাম্প্রদায়িক অঞ্চল হিসেবে গৌরবের শতবর্ষ সংখ্যায়—যোগ হবে ঊপভাষিক পূর্তি পর্ব। পঞ্চখণ্ডের সেতুবন্ধন হয়ে ষষ্ঠ খণ্ড বেঁচে থাক—পৃথিবীর সবখানে। যেমনি নদীর ঢেউ—নিয়ত ধুয়ে যায় জল-সীমানার মাটি। গণভোট বিষয়ক বাস্তবতায় এখনো পোষ্ট অফিস রোড খোলা থাকে..মনে রাখে—বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, আকাদ্দাস সিরাজের শব্দায়নের শ্লোগান-সিম্ফনি।
কৃতজ্ঞতার অনেকগুলো কায়া-বোতাম খোলে; বহুবিধ সংহতির জনপদ এখনো জেগে থাকে। জন্ম সিঁড়ি শুধুই নামে; চির চেনা নৈবেদ্য উচ্চারণে, রূপায়িত রূপআছে—পঙতি-পয়ারে, অনবদ্য প্রাণে। উজান আছে, ভাটি আছে, আছে অনেক ঐতিহ্য-প্রথা। বিমূর্ত জলরঙে মোর হোমটাউন সাজিয়েছেন বিধাতা। হে জন্মনগর আমার—এক সূর্যমুখী দিন … ফিরে আসে—বেড়ে ওঠা ঘন টিলা ঘেরা গাঁয়। যেথায় শুয়ে আছেন আদি পূর্বপুরুষ—বনি শেখ মোহাম্মদ পরম্পরায়।
নাগরিক: বংশবাতি
পৃথিবীর পথে, বাঁধা সব মতে—মানুষের পদচিহ্ন পড়ে থাকে। জীবনের পরিচিত সব মুখ—আড়াল রাখে; কালের বুকে হাত রাখা র’থে। এই যে স্পর্শ করা স্ট্রীট-রোড-এভিন্যু বনাম সকাল-সন্ধ্যা..যতন করে পোষে রাখা স্মৃতির সঞ্চিত সহায় … কথনের আকাশে কত রঙ মাখে—উত্তর-দক্ষিণ হাওয়া। কেউ না কেউ যদি জানতো, তবে কি মানতো, এমন দিনে?
স্বপ্নের ক্লান্ত ঘড়ির কাটা ছুঁয়ে যায়—আশায় আশায়… দৃশ্য দূরত্বে বসত করা শব্দ স্বজন ফিরে আসে মায়ায় মায়ায়। বহমান স্রোতের মতো ঢেউ মাঝে ঢেউ; দূর বহুদূর… সোনালি সময় ঢেলে প্রজন্মের হাতে দেয়া—বংশ বাতিঘর।
প্রতিবাদের প্রত্যয়
আজো শহীদের রক্ত ছুঁয়ে যায় বাংলার মাটি। আমরাও জাগ্রত সেনা; এখনো বেঁচে আছি। প্রাণ যায় যাক—অতন্দ্র প্রহরায় গড়বো ঘাঁটি। ভয় নেই—শপথ নিলাম থাকবো কাছাকাছি। মানুষের ঐক্যে লেখা হবে মুক্তির আখ্যান। স্বাধীন দেশ—তুমি জেগে ওঠো..অফুরান। মা-মাটি’র ডাকে কেউ কি আটকে থাকে। ধরা’র কোনও কোনায় অথবা কারও বুকে। আমরা লড়তে জানি, মরতে জানি। স্বাধিকার আদায় করতে জানি। অস্ত্র ধরে পরাজিত করতে জানি—দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণতায়…
বীর বাঙালি—সংগ্রামী চেতনায় দাঁড়াও। মুক্তির শানিত প্রত্যয়ে হাতখানি বাড়াও। দেখা হবে মাঠে-ঘাটে- পথে-প্রান্তরে সমাজের অঙ্গনে।
তারুণ্যের শক্তিতে,
মুক্তির মিছিলে,
জয় বাংলা শ্লোগানে..
রাজাকারের ফাঁসির দাবীতে দাঁড়িয়েছে চেতনার চত্বর। বাঙালি-ব্লগার স’বে; দাবীতে অটল র’বে—যেন স্বপ্ন-কারিগর। প্রিয় বাংলাদেশ—পুরো হৃদয় জুড়ে আপন মানচিত্র আঁকা। লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা—গর্বে’র লাল-সবুজ পতাকা।
সুদীর্ঘ শব্দ-কথা
স্বপ্ন-শুমারির দিনে কবিতারা জেগে থাকে
প্রান্তিক স্বজনেরা হাত বাড়িয়ে রেখে দেয়
নিঝুম পাঠ-প্রকাশের পয়মন্ত বেলায়
সভা’র বিকেল হলে তবুও জমিয়ে রাখে..
হে জন্মভূমি আমার—যার বুকে জীবনের তিরিশ বছর জমা
রৌদ্র ঢাকা, নৈঃশব্দের দুয়ার খোলে চেয়ে থাকা, যেন প্রিয়তমা
মৃত্তিকায়-বেড়ে ওঠা পথে দেশের কাছে জীবনের অনেক ঋণ
যে গ্রামটি সুদীর্ঘ, হে শব্দমিতা আসবে সুদিন—শুধিবার দিন।
চির সবুজ প্রকৃতির পরিসরে দেখে রাখি মাঠ-ঘাট-শৈশব
সব বাঁধা-ই সরিয়ে ভাল বাসায়—সংহতিতে ভরা প্রিয় স্বদেশ
একদিন শরদিন্দু ছাড়িয়ে আমিও যে কোল নেবো, আশ্রিত হবো
নদী-নালা-খাল-বিল-বৃক্ষ-ছায়ারা মিলে কি অপরূপ ভাবাবেশ।
অমাবস্যা’নু কেটে গেলে, হেসে ওঠে চন্দ্রিমার চতুর্দশী লগন
একটি সুনির্ধারিত সীমানা, ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে কেনা
পৃথিবীতে শুধু আমাদেরই—যে প্রাঙ্গণটি আপাদমস্তক চেনা
বাঙালি বাংলাদেশ নিয়ে বেঁচে আছি, জাগরূক থাকুক চিরদিন।
বৃত্তের বেহাগ
কার্তিকী পূর্ণিমায় তোলপাড় করে মনের আকাশ। আদিম শক্তি বিপন্ন হয় যযাতির সনে। অপ্রতিরোধ্য কামনায় ছুঁয়ে ফেলে হৃদয়ের সবটুকন। নতুন স্বপ্ন-প্রেরণা—যদি না জীবন ডুবে থাকে শয়ানে। সন্ধ্যার আঁচল না খোলে, অন্ধকারের গহীন ঘোমটা খোলি।
ষাট ওয়াটের আলোয় কবিতার টেবিলে বসে উদাসী মুহুর্ত সমষ্টি, আলমারিতে ভাঁজ করে চিন্তার লঘু যতি। অক্ষরবৃত্ত নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে জানালা মেলে। স্বরবৃত্তের নিশি হলে নেশার বোতাম টেনে ধরে মাত্রাবৃত্তের পূর্ণ যতি।
রুদ্ধ মনের এক কোণে জীয়ন কাঠিতে কষ লাগিয়ে লিখে রাখি—সুরেলা বেহাগ। বীজের পানদানে চুনদানি হয়—জয়তুনের পরাগ।
নিষিদ্ধ পরত
খোয়াব মাড়িয়ে তাড়নায় তাড়াতে গিয়ে দেখা পাই—খরতাপ আর তীব্র দহনের কারুকাজ। ঐতিহ্য ছুঁয়ে যাওয়া বাউশী কবিতার নাভিচরের হাউশী জমিন, আদর মাখে গায়ে। কবিয়াল শব্দ বান্ধে সুরে, সুনাই গাঙের কূল ধরে…
আবেগের সেফ্টিপিন খোলে, জীবনের দু’ফসলী সন্ধি ঘাম ঝরিয়ে গোডাউন বাজারে হেঁটেছিল একদিন। তৃণমূল বরাবর হাজার পদব্রজ দিয়ে পইছমোর বন্দের একগাছি ধরে হেঁটে যায় মানুষের দল। আইল-কাঁদা-ঘাস-ছায়ার সমবয়সী সমঝোতা করে হেঁটে যাই.. যে আমার চিরচেনা গো-পাঠ’র পুল… আপন অবয়বের ভেঙ্গে যাওয়া ছবি ভাসে—চলমান স্রোতে।
আমিও হাছা কথা বলি। নন্দনের ছলে, চুনকাম করা পুরাণ ঘরের বারিন্দার তলে, বলি—সুয়াচান—ভালোবাসার খ**কী, ই*র সভ্যতা পেরিয়ে এসে আমাদের মাত-কথা ছূঁয়ে ছিল শিলং’র পাথর পাহাড়, মুড়িয়ার হাওর ভরা যৌবন জলের স্পর্শ। হাতের তালুতে লোলানো লুকলুকির উষ্ণতায় পিছলে পড়ে শেষ ফোঁটা। মায়া করে ডাকি—হায়রে চরণফেলা আদিগন্ত ঢেউ আমার; তোমার লেঙ্গলেঙ্গিরও একদিন মনোপজ হলে … বৃষ্টি-রৌদ্র মাঝে ফেলে দৌড়াবে অনুভূতির শেষ সম্বল।
ইউ নো, কছমা পাতার দেহখানি একসময় চন্দনকাঠ হয়, হয় রাইত চুক্তির অসমাপ্ত পৃষ্ঠা। গুনে গুনে অনেক শোক … তার গর্ভের সুয়ারিতে চড়ে যায় বজ্রপাত। রঙ বেরঙের নাড়ি নক্ষত্র আমলে নিয়ে পরাণ লুঠে। টুটে গভীর জলরাশি মাঝে জেগে ওঠা ভূমি খন্ডের দখলী—গুপ্তকথা।
গোপন আমার সুখ-শখ-কৌমার্য ভাঙ্গার দিনসমেত—নরফোক কাউন্টির থৈ থৈ হাঁসগুলো যেমন আকাশে উড়াল দেয়।
মাত্রা
দেশের গর্ভে স্বকাল ধরেছে—ফোটেছে অর্ঘ বীজ।
বহুমুখী মানুষের ভীড়ে যে জাতি রুইয়েছিল সংগ্রামী বৃক্ষ—যেখানে ফলিয়েছে ’৫২, ’৬৬, ’৭১ ’৯০ আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। হে বৃক্ষ—তুমি বাঙালির বক্ষ জুড়ে প্রোথিত লাল-সবুজ পতাকা। শহিদ মিনার এবং স্মৃতি সৌধ’র ওপর ওড়ে যাওয়া দুরন্ত বলাকা। আমার কবিতার প্রতিটি মাত্রা—সহিংসতার বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, জ্বালাও-পোড়াও মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে। কবিতার সকল মাত্রা—মানবতার পক্ষে।
দেশের নিষ্পাপ দেহে কারা দেয় আগুন? এই পোড়া দেহ, আমারই ভাই-বোন-সন্তান। বঞ্চিত মানুষের আর্তনাদ কি পৌঁছবে বিচারের দূরত্বে। ক্ষোভ ও শোকে নির্বাক হয়ে রয় মানুষ। তারপরও ঘোষণা আসে—আরও হরতাল। কান্নার জলে মিশেযায়—পোড়া মানুষের দীর্ঘশ্বাস। দুপুরের রোদ থেমে থাকে—শস্যের মাঠে। ক্ষমাহীন পাপে ভরে যায় বাঙলার আকাশ।
হিংস্রতার দাবানলে নিঃস্ব হয় মানচিত্রের নাগরিক। বোধে’র দহনে কবে হবে দ্রোহ? প্রতিবাদী মুষ্টিবদ্ধ হাত এক হবে মিছিল, শ্লোগানে। প্রিয় স্বদেশ আমার, ওরা কি ভূলে গেছে সংগ্রামের ইতিহাস? যায় যাক, আমরা ত’ ভূলিনাই। চিনে রাখো—আগাছা হয়ে জন্মায়, ওরা মীরজাফর তনয়। বিবেকের অবরোধে, একদিন তারা মিশে যাবে—রাজাকারের গোরস্থানে।
মানুষ জাগবে শেষে—দাঁড়াবে বাংলাদেশ।
অবর্ণিত
একটি স্মরণ সভায় শ্রোতাগণের হৃদয় যা বলে, আমি কেন আপ্লুত হই হে, কোন অনুভূতির জানান ছাড়া। কবি, তোমার কাব্যের জন্য, যা জীবন সংগ্রামের কথা বলেছিল…
যদিও কবিতার তন্ত্রীতে আসাদের শার্ট এখনো মলিন হয়নি। লক্ষপ্রাণ আজো গায়—স্বাধীনতা তুমি’র চেতনায়। মুক্তির হাত ধরে স্পন্দিত হয় ভাষার যৌবনখানি। একটি জীবনের প্রয়াণ হয়েছে বলে বাংলাভাষী অপুরণীয় ক্ষতির শোকে, স্মারকের বুকে দাগ দেয়। পল্টনের ময়দান আর ঢাকা ভার্সিটির প্রত্যন্ত প্রাঙ্গণ ধরে অক্ষরের মিছিল বহে, কহে—আমি প্রতিবাদী, আমি দ্রোহী। আন্দোলিত শব্দমালা শহিদ মিনার ধরে দাঁড়ায়। মাঠি ছুঁয়ে উচ্চারণ ভাসে, এখানে সালাম-বরকত-জব্বার, এখানে নাম না জানা শহিদান। তাঁর মাঝে বসে থাকে তোমার অর্ন্তধান।
শোষণ’র প্রতিবাদ ও সময়ের দাবীতে কলম সৈনিক, উপাধিটুকুন আপোষহীন—এ শুধু প্রতিক্রিয়া, বাজে নিরন্তর।
অনুভূতির স্মরণ সকাশে
যে মৃত্যু সংবাদে স্থির হয়ে যাই—মূহূর্তগুলো নিভে ছিল ক্ষণিক…
কেননা তোমার দৃষ্টিতে দেখেছি আমি হাসনের মদির চোখ। কাব্যকথায় আছে উঠানামা, আছে সুখ-দুখ। চাঁদের আলোয় নিভে যায় পৌর স্ট্রিট লাইট। চাঁদনী রাত দেখাবে বলে, উপবন ভ্রমণ শেষে জালালী কৈতর অভিবাদন জানিয়েছিল; ভোরে। একখন্ড সাহিত্যপ্রাণ—বিদায়ী তোমার মরদেহ ঝুরে… হাসন নগর আর এপার-ওপার ধরে।
আমিও লিখেছিলাম পত্র। বড় দেরী করে পেয়েছিলে হে … শত ব্যস্ততার বিনীত এক্সকিউজ দিলে, শীষ মাখা ছত্রের ধুসর কুয়াশা মিলে। একান্ত ঘরানার মানুষ হারানোর দীর্ঘশ্বাসে ভরে যায় বাঙ্লাকাশ। তার সঙ্গে হাজারো পাঠক ছুঁয়ে যায় তোমায়—কবি। তুমি ঘুমাও হে..নিশ্চিন্তে। নিদ্রাহীন কবিতাগুলো কাঁদেনা এখন—ত্রস্তপদে হাঁটেনা সদর দরজা খোলে, তাবত শহর। উৎপ্রেক্ষার ধ্বনি ভেসে বেড়ায় শুধূ কাব্যমোদীর কাঁধে কাঁধে। স্মরণ সভার নির্বাক নিশ্চুপ পাঠোচ্ছবি সব সাময়িকী ছাপিয়ে যায়।
মহাকালের পাড়ে সুরমার জল ও জরুরী বিষয়—সাঁকো হয় মউজদীন সাহিত্যঘাট। নেমে এসো হে, নদীর মোহনা’দি কেটে যাও দৃশ্যান্তরে—হাওর-বাওর ঘেটে জলতরী পেরিয়ে কাব্যদানার মতো তুমি আছো মাঠিতে মিশে।
অভিবাদনওহে বিদেহীআত্মা—তোমায়, শান্তিরপ্রান্তরে স্থায়ীবাসা হোক।
হাই স্ট্রীটের পথে হাঁটা পরবাসী
এটাই সত্য। মিথ্যে নেই। ডিসেম্বর, ’একাত্তর। নিকষ কালো রাতের অন্ধ থাবায় পুড়ে যাওয়া ক্ষতের দাগ। অনেকেই বলে ভূলে যাও। ন’মাস পিতা-মাতা-পুত্র-কন্যা-ভ্রাতা হারনোর ব্যথা। কেউ নিখোঁজ, কেউ ধর্ষিত, কেউ বিক্ষত। আমার রক্ত, আমার উত্তরাধিকার। অথচ মানুষে কেমনে কয়—ভূলে যাওয়ার কথা?
রবিবার। ঘুম ভাঙ্গে শহরের পাশে শহরের। ব্যস্ত স্ট্রীট। ব্যস্ত মোটরওয়ে, হাইওয়ে আর আন্ডারগ্রাউন্ড। স্নো পড়া সকালের পালস্ উনসত্তুর ছাড়িয়ে যায়। অ্যা ম্যান, এম টুয়েনটি ফাইভ ডিলেই … ট্রাফিক সাইন দেখতে দেখতে জীবনের খাতা থেকে খসে গেল অলস কিছু সময়।
সাত দিনে সপ্তাহ ছুটিহীন
পুরোটা বছর ছুটিহীন
অন্তহীন অন্তরীণ।
সে দিনের সূর্য্য অস্ত যায়নি, বিশ্বাস করো—এই হাত স্পর্শ করে বলি—শুধু আমাদের এখানে রাত, অন্যখানে ভোর হয়। ওখানে জাগ্রত মানুষের কোলাহল। সেখানে গোধুলি, এখানে উদয়ের আভা’র পাড়াগাঁ। সময়ের স্টিয়ারিং-এ রাখা হাত—শূন্যতার কপোল ছোঁয়।
জন্মের তিন দশক পরে, অসমর্থিত খবরে প্রকাশ—মায়া’র অশ্রু ভাঙ্গে জীবন পারের মাটি-ঘর-বাড়ি। নদী, ভাঙ্গে তার কূল-ঘাট-জল ঢেউ ছাড়ি। ও মাটিরে, তোমায় ছুঁয়ে দেখি—যে আমার জন্মদাত্রী মায়ের স্পর্শন। মিঠা পানির আবাসী সমূদ্রগামী স্থল—জলবায়ূর মফস্বলী মৌনতার নাড়ি। মায়ার অশ্রু ভাঙ্গে জীবন পারের ঘর বাড়ি।
দরাজ কন্ঠে গাই প্রেমের স্তুতি, পূর্ণতার নিকাশ। নির্ভয়ে তৃপ্তিতে দোলে সান্ধ্যকালীন রূপাকাশ।দ্বিমত পোষন করি বলেই এ স্মরনীয় দিনে তফাত ভাষ্য তুলে। রিনিঝিনি কনকন শীতে হাঁটা আগন্তুক, স-ব কামনা ভূলে। এখন কও প্রিয়—কেমনে সদাই ত্রাণ করো? বিভেদে দৈন্যতা ভুলে আমারে’নু সঙ্গে নিও। যেখানে দেখেছি আমি দগদগে ঘা, দেখেছি—লাশের স্তুপ। স্বামীহারা, পুত্রহারা মায়ের বিলোপ। দেখেছি—স্বজনহারাদের কান্না, আর রক্তে মোড়া বিধ্বস্ত বাংলা।
উনিশ’শ সাতচল্লিশ-এ যে রাষ্ট্রদেহ একছিল। যে দেহের মাঝখানে বারশত মাইল। সংবিধান ছিল, সংসদ ছিল। সংখ্যাগরিষ্টতাও টেকাতে পারেনি, সংযুক্ত মৃত্যু। ভাঙ্গতে আইল। কি নিলা কি দিলা? দিছি—ভাষার জন্য প্রাণ, সোনালী আঁশ, দিছি—চব্বিশ বছরের কাঁদা মাঠির ফসল… ইনফিটিভ।
মা থমকে দাঁড়ায়—জনম ঘরের পোড়া মাঠি হাতে। জায়গা-জমি’র বিনিময়ে যে গ্রন্থরাজি জমিয়েছিল তাঁর পিতা, পুড়ে ছাই করে—ধূয়ার কুন্ডুলিতে ছেঁয়ে থাকে জাফ্র মন্জিল। ধুম্র যেনো আল্পনা আঁকে, এতোটুকু সুখে—স্বাধীনতা।
হয়তো বছর পাঁচেক, পলজশিলা ভূ-স্থরে জমাট বাঁধে। মৃন্ময় ও স্বভাবের মিশ্রণ—গড়ে কাদামাটির আবাদি জমি। বিলাও, বিলাও সবাই স্বাধীনতার সোয়ারি।
মনো’জ দর্শনএবংকবি
অনুসন্ধান সূত্রের নিয়ত সংশয়ে অবনমিত হয়—সম্মোহিত হয়। প্রকৃতির প্রজনন যন্ত্রের প্রাচুর্যে। মনের অবহেলায়, রাত্রি বেলায় শতপত্র’র জন্য। স্বনির্বাচিত মনাগুণের জীর্ণতায় দু’চোখ কখন নিথর হয়ে যায়। কেমন নেশাধরা বাতাসের ঝাপটা লাগে। যেসব হয় আকাশের সঙ্গে ঘর-সংসারে। মনো’জ দর্শনের নগ্নতায় গর্বিত জন্ম, যা সমাজ সংস্কার ও সংক্রাম—এক।
খেটে খাওয়া শ্রমিকের মিছিলে হারানো যুবা—ত্রিশোর্ধ্ব। কবে বন্ধ হবে মৌলিক অধিকার না পাওয়া মানুষের দাবীর শ্লোগান? রক্তের মানচিত্র হবেনা রাজপথ। রচিবে না কেউ মর্সিয়া। যুগপৎ প্রতীক্ষার ভীড়ে ভাবছে বসি—কোন সে দরদিয়া।
প্রত্যক্ষ বেদনের বিভাব সঞ্চারী ঘনভবের অনবদ্য স্মারক, অতি নির্দিষ্ট। শব্দের চতুঃসীমায় যেতে যেতে—এক নিরঞ্জন হেয়ালির সম্পাতে কেঁপে উঠে কবিতার স্বর।
জীবনের সঙ্গে যার স্বাধীনতার জমিন
রক্তমাখা দেহে পড়ে থাকা মানুষটিকে অতিক্রম করে—কালের পরিক্রমা। লালে লাল হয়ে ভিজে যায়, সাধের সিগার পাইপ, লুঙ্গি ও ফুলহাতা জামা। যে পরিশ্রান্ত হৃদয় বলেছিল, ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’যার লাগি লক্ষপ্রাণ বিনিময়ে শুধেছিল দাম।
খণ্ডিত হোক কেবা চায় বলো? সাংবিধানিক অধিকার মানেনি বলে রুদ্ররোষ থামাতে পারেনি শাসন, পারেনি বুলেট। নির্বিচার গণহত্যা জন্ম দেয় প্রতিরোধের, প্রতিশোধের। জনক হয় প্রতিবাদের। বিদ্রোহী সাধারণ ক্ষুব্ধ জনতা সংগ্রামী হয়ে ওঠে। যুদ্ধ জয়ের উদ্যমলিপিতে একখানি মানচিত্রের মাঝে মিশে গিয়ে বলে, আমি জনম মাটির মুক্তির জন্য লড়াই করি।
দুই.
ছাব্বিশে মার্চ, উনিশশ’একাত্তর। ঢাকা যেন এক লাশের শহর। ভার্সিটিতে লাশ, ড্রেনে, রাস্তায়, গলিতে লাশ, দরজার পাশে লাশ আর লাশ। সাত কোটি বাঙালির দেশে, খালে-বিলে-ঝিলে, টিলা-ঝোপ-ঝাড়ে ন’মাস গর্ভ ধরে প্রসূতি জননী—স্বাধীনতার মগ্নতায়। শহীদ মুজিব, তোমার রক্তে গড়ায় বত্রিশ নম্বর বাড়ি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠসিঁড়ির ছলাকলায়। তোমাকে ধরে রাখে বাঙলার মাটি আর লাল সবুজ পতাকায়।
কালের আগুনে পুড়ে, স্মরণের ফাগুন তোড়ে জ্বলে—স্বর্ণালি লালিমা। রক্তমাখা দেহে পড়ে থাকা মানুষটিকে অতিক্রম করে, কালের পরিক্রমা।
শোকাবহ ১৫ আগস্ট
যুগ শতাব্দী ধরে আমাদের এই ভূ-খণ্ড দখল হয়েছে বারবার। শোষনের বিরুদ্ধে লড়েছে বাঙালি—হয়েছে প্রাণ সংহার।
১৫ই আগস্ট—খুন হতে লাগল বাংলাদেশ। রক্তের ফোটায় জমাট বাঁধতে বাঁধতে ভেসে যেতে লাগল—ইতিহাস, শহিদদের ঘরবাড়ি, কবরস্থান। দেশ—পথ ভূল হতে হতে যেতে থাকল মীরজাফরদের গন্থব্যে দিকে। জনকের রক্ত মাড়িয়ে যারা মেতেছিল তাণ্ডবে, তারা নিকৃষ্ট। ঘৃণ্য, অতি নগন্য।
হে পরম পিতা—তোমার রক্তে ভিজেছে এই মাটি, কেঁপেছে বাঙালির শিকড়। শ্যামল সবুজের স্বদেশ যেন শোকার্ত নতমুখ। অন্ধকারে ঢাকা মেঘের বিষন্ন মগ্নতায় ঢেকেছিল বাংলাদেশের আকাশ। জাতির পিতা হারানোর ব্যথা—কষ্টের নদী হয়ে সাগরে মিশে রয়। ভোরের আজানের পর—বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটি সেদিন ঝরে পড়ে গেল, দুঃখে। মুক্তি পাগল মানুষের হৃদয় থেকে ওঠে ‘জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান। কতশত সংগ্রাম, বঞ্চনা, ত্যাগ পেরিয়ে এসে প্রত্যয়ের প্রতীক, হে মুজিব। বাঙালি জাতি যুদ্ধ করেছে তোমারই নামে। চাওয়া পাওয়ার উর্ধ্বে ওঠে সমার্থক শব্দনাম। শোক হয়—শক্তির মিছিল।
চেতনার মানস পটে আঁকা এ ছবি। স্বাধীনতার রক্ত লাল কবি’র রবি। ভালবাসার অখণ্ড সবুজে ছুঁয়ে দিই তোমার বিস্তৃত অবয়ব। রাতদিন—এই বাংলার পথে প্রান্তরে, ভাষার উচ্চারণে থাকে শ্রদ্ধা’র কলরব।
ষড়ঋতুর এই শাশ্বত বাংলার পুরো মানচিত্রই তোমার দেহ। হাজার বছর পরেও জনকের কথা বলে যাবে—মানুষের পিতামহ।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
অধিকার আদায়ের পথে শ্লোগান মুখর মানুষের ভিড়ে, আজন্ম স্বপ্ন বয়ে নিয়ে যান মনু মিয়া—বিয়ানীবাজার থেকে সমগ্রপূর্ব বাংলায়। আন্দোলনে উত্তাল, উন্মুক্ত আকাশের নীচে জমায়েত হাজারো মানুষের সমাবেশ, সাধারণ জনগণ, তাঁদের মুষ্টিবদ্ধ হাত অগণন।
সাত বছরের কন্যা পুতুলের কাছে বলা স্বাধীনতা বুঝিয়ে দিতে হবে। নিজস্ব জাতির পতাকা গর্বিত হাতে তুলে দেবেন, বয়ে যাবেন নিরবে। বাঙলা আর বাঙালির পরাধীনতার কষ্ট, ক্ষয়ে যাওয়া চেতনার বিবর্ণ কষ্ট ধারণ করে উচ্চারণ করেন—এ দাবী বাঁচার দাবী, এ দাবী মানতে হবে।’ সর্বোচ্চ শব্দের মিছিলে বলেছিলেন—আগে বাড়ো।’
হঠাৎ তাঁর ডান পাঁজরে গুলি করা হল। গুলিবিদ্ধ মনু মিয়া মাটিতে পড়ে গেলেন। রক্তে রঞ্জিত হল মাইল পোস্টের ঠিকানা। বুকে ৬ দফার বর্ণমালা আগলে নিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। তখন রক্ত ঝরা জায়গাটা চেপে ধরলেন নূরে আলম সিদ্দিকী। আহত বীর বাঙালি বলে উঠলেন—আমাকে ধরা লাগবে না, আপনি কইয়া যান। সংগ্রামের কথা বলেন।’ সেই কথাগুলো শুনতে শুনতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ঊনসত্তর, সত্তর ও একাত্তরের সংগ্রামের জানালা খোলে দিলেন।
স্বাধিকারের মুক্তির সনদ পাতায় মুড়ে গেল—একটি মানচিত্রের কাফন। হে শহিদ—তোমাদের আত্মদানের মধ্য দিয়েই স্বাধীন, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
দ্যা লাস্ট হোম অব দেওয়ান মনসুর এস্টেট
বেসরকারি কথাবার্তার মাঝে—জেগে পোহাই বেলা-অবেলা। ফেলে আসা সড়ক বরাবর স্মৃতির অজস্র মেলা। ভাল থাক দেশ শিশু, সততার দোকান। ভাল থাক—জয় বাংলা শ্লোগান।
হোক না যা কিছু পুরাণ। দেখুক সবাই মুক্তির জন্য লড়ে যাওয়া তিন পুরুষ’র বয়ান। দ্যা লাস্ট হোম অব দেওয়ান মনসুর এস্টেট। পোড়োবাড়ির চিহ্নে রয়েছে সংগ্রামের ললাট।
কদমফুল আজো ফোটে … পাখি ডাকে, ভাঙ্গে ঘুম—ভোর লুঠে আনন্দ-স্নান। ইতিপূর্বে যে বিনোদন ছুঁয়েছে পরাণ। ইতিহাস যেন শৈবাল স্বর। বুকভরা জীবনের আপন ঘর। পুরাণ কথা যদিও পুরাণ—মূল্যতা যদি না হয় বিরাণ। হৃদয় মেলে করিও ধিয়ান, সমূলে হৃদনগরে। পরাণও বান্ধিয়া লইও, জন্মদিনের পরে। কি সুখে থাক হে বন্ধু, সুখ সখ্যনগরে।
নি মনে আছে—পূর্ববঙ্গ পুড়ে যাবার কালে। নি মনে আছে—স্বাধীন বাংলার পতাকার লালে। এক কালে স্বদেশী যারা, অনেকে প্রয়াত তারা। যাদের কল্যান কামনায় সালাম—হে শহীদ যোদ্ধারা।
না লইও দুখেরও কথা, না লইও ন’মাসের ব্যথা। কখনও না লাগে যেন ফুলের টোকাও গায়। রঙে রঙে সাজাইব—পাইলে তোমার সায়। স্বপন পুঁথি ডাকিয়া নিও বিরহীর লাগি। মুক্তবাংলা থাকবে মুক্ত, সতত তাই জাগি। কত কথা লিখে রাখি, কত থাকে মনে। অজান্তেও প্রার্থনা আসে—মাতৃভূমির সনে।
বেদনার মলাট
নিমগ্ন কবিতায় পরাণ পড়ে থাকে—কাব্যের ঔজ্বল্যে। বিষাদের ছায়ারা বড় নিঃসঙ্গ, ভাষা তাদের—কান্না। রাতের ক্ষণে অথবা ঘন গহীন হৃদয়ের গল্পাংশেই যায় জানা।
মাটির লগ্ন হতে মৌনতার নিখিল অনুভূতি, পোষাকের মত ছুঁয়ে থাকে মুক্তক ছন্দের দীপ্তমান সময়। লিখে রাখা পুঁথির বিবর্ণ কালের গোত্রহীন আলোয়। হাঁটতে থাকা পরিবর্তনের শব্দে লিখে যায়—সময়ের স্তুতি। ফেলে আসা ছবির প্রাচীন ফ্রেম খানি আটকে থাকে মুখোমুখী দেখায়। ভাল আছো কবি?
মেঘের বুকে বৃষ্টি থাকে, মনের ভেতর ঘর। সয়াল জুড়ে সন্ধ্যা বেলা—স্বপ্ন নামে ভোর। কি নামে ডাকবো তোমায় বলো—শব্দ কারিগর। লয় যে সবার আপন হয়না, না থাকিলে পর। চেতনা পাহারা দেয়া নিশুতির কথন। বলেছিল—সাম্যবাদ, আগলে রেখো—অসাম্প্রদায়িক মানবিকতায়। আজন্ম কবিতার চরিত্রের মতো বেঁচে থাকা পরিসেবায়।
বেদনার আকাশে উড়েছিল নীল গ্রন্থের মলাট। কতশত ছাপার অক্ষর ছিল পাতায়—তবুও পদচিহ্ন পড়েছিল বালুচরে। সমুদ্রের ঢেউ জানে আমাদের অতীত। পূর্বসূরী যেভাবে গিয়েছে চলে, তেমনি করে একদিন পড়বেনা মনে। নিজকে পুড়িয়ে গড়ে দিলো ভিত। অন্ধকারেও হাত উচু করে জ্বলছে বিশাল মিছিল। তোমাকে খুঁজবো বলে—সতীর্থের অন্তিমে নামি, এ যেন অবিকল অবয়ব মৃত্তিকার তৈরি, সেখানেই থামি।
সতত শান্তির আশ্রমের নিপাঠ খোলে চিরঘুম হোক—সাহিত্যময়।
মানপত্রের খসড়া
লিটলম্যাগ আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী—যিনি প্রকাশিত হবেন প্রস্থানের অন্তরালে। জীবনের নানা মাত্রায় দীর্ঘ লিটলম্যাগ সত্যায়িত হয়েছে সুবর্ণ জয়ন্তীয় ফলক। যেখানে খোদাই করা দর্শনবোধের পদাবলি টেনে নেয় পাঠকের ভালোবাসা। খসড়ার ভূমিকায় বর্ণিত হয় হৃদয়ের অনুবাদ, নান্দনিক কত কথা। অর্পিত শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদিত হয় সাহিত্য চর্চার মৌলিক আন্দোলনে, কবিদের মিলন মেলায়। যার ডাকে সাড়ে তিনশ মাইল দূরবর্তী আবহাওয়াকে অতিক্রম করে আগন্তুক ফিরে আসেন—সম্পাদকের টেবিলে। সংস্কৃতির পটে পাঠ নিতে নিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা লেখক সমাবেশ। স্বাগত বক্তব্য মুদ্রিত হতে প্রজন্মের উত্তরাধিকার তুলে দেয় শব্দপাঠ কারিগরের হাতে। আজ মানপত্র লেখাহবে—আমন্ত্রণ জানাই।
মানপত্র নির্জনতার অস্তিত্বে রেখে দশকের যোগফল দৃশ্যমান হয়। কত সুখ-দুখ যাপিত সময়ের ভোগ, প্রিয়মুখ শুধু বিমূর্ত রয়। বাংলা ভাষার মায়ায় যে মানুষ নিজেকে উজাড় করে দেয় বিলেতের সাহিত্যাঙ্গণে—তাঁকে নিয়ে এই পত্র বাক্য মনে। নীল আকাশের পরিধির নীচে নিত্য যার বসবাস। বিনয়ের বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে দীর্ঘ প্রবাস। আমাদের সম্পর্ক সমগ্র উৎসর্গ হোক স্বকীয়তার টানে। এই জনপদ জানে, সাময়িকী জানে—কী আকূলতা রয়েছে প্রাণে।
কবিতা আড্ডার প্রাণ পুরুষ, কি নামে ডাকিব তাঁরে, কি বা সর্বনামে? পথিকের ছায়াও বলে যায়—রয়েছে অর্ধশত জীবন পৃষ্টার কর্মে।
সময়েরকাব্য
কোনো মধ্য বসন্তে মিসরের দরজার কপাটে আঙ্গুল রেখে দাঁড়াতেন ক্লিওপেট্রা
তখন পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় স্নান করে উঠে আসতেন টলেমি।
বালুকা বেলায় সেই জ্যোৎস্নার যৌবনে—ডাকে নাম না জানা পাখি।
সৌজন্যতা ম্লান করে বলে—আরো উষ্ণতায় কাছে এসো সখি।
মিশরীয় ভালোবাসার ঐতিহ্যের চাদরে ফাল্গুন ঢেকে রাখে।
টলেমিক মিশরের সর্বশেষ সক্রিয় ফারাও..পৃথিবীজুড়ে
নিঃশব্দে ও নিশ্চিন্তে মিশরের সিংহাসনের ওপর রাখা তাঁর হাতের মতো।
পিরামিডের ভাঁজেভাঁজে শ্রমিকের প্রাচীন শ্রমের ঘাম, এখনো চুইয়ে পড়ে
গ্রাভিটির ওপর।
কিংস উপত্যকার সমাধিগুলো জ্বলজ্বল করছে যাদের হাতের কারুকাজে,
সেই শিল্পী, তাদের জন্য বৃষ্টি হয়, জল মিশে—নীল নদে।
সম্পর্কের সিল্করুট ধরে রাজা তুতানখামুন, রাণী নেফারতিতি,
রামেসেস থেকে রাজা আখেনটেন পরম্পরা।
মিশরীয় মাটি ও মানুষের গল্পকথা থেকে যায় হাজার বছরের পাতায় পাতায়
যে মুখগুলো অক্ষত রাখতে ব্যস্ত ছিলরাজ পরিবার।
প্রতিটি ব্যান্ডেজে, সূক্ষ কাপড়ের ভাঁজে হারিয়েছে স্বপ্নের ক্ষমতা
নদীর জলের বাঁকের মতোন।
পৃথিবীর মানুষেরা আজো বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে মিসরের পিরামিডের দিকে,
তৎকালীন অগ্রগামী ইতিহাসের দিকে।
পাঠ্যবই আর ট্যুরিস্টদের পছন্দের তালিকায়, অবাক করা উৎসুক জ্ঞানে
পুরনো শহর ও জনপদের সূর্যসন্তানদের অশ্রু মিশেছে দ্রোহের আগুনে।
বিজ্ঞান ঘরের জানালার পাশে, গোরস্থানের ছায়ায়, আজো রক্তজবা ফোটে।
না ফেরা মানুষদের দেশে, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে—মিশর।
সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায়
অধিকার প্রতিষ্ঠায় যাঁরা প্রাণ উৎসর্গ করে, বুকে জড়ানো পতাকা হয় শেষকৃত্যের কাপড়—সেই প্রিয়জন, যে জানেনা তাঁরা বেঁচে থাকে শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়।
ক্ষমতার কাছে হার মানা অসহায় মানুষের আর্ত চিৎকারে প্রকম্পিত গোটা বিশ্ব। দখলদার আর তার বন্ধুরা অন্ধ, তারা দেখেনা অথচ লোলুপ দৃষ্টি তার কোটরে, বধির তারা শোনেনা কিন্তু তার জন্মের কান স্থানান্তর করতে পারেনি—স্বৈরাচারী ক্ষমতার মোহে তারা হবে একদিন নিশ্চিন্ন, নি:স্ব। যুগের বিবর্তন হলেও পৃথিবী এখনও কক্ষপথ হারায়নি। শৈশব কৈশরে জন্মের পর যে শিশু দেখে তাঁর পিতা-মাতার হাত, পা অথবা অঙ্গহীন; তার বোধটাই শুরু হয় প্রতিশোধ দিয়ে এবং তা স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য। যে মাটিতে হাজার হাজার বছরধরে ঘুমিয়ে আছেন তাঁদের আদি পিতা—পূর্বপুরুষ। সেই পবিত্রমাটি আজ বেদখল, প্যালেস্টাইনের ও শোষিত গণমানুষের চোখের ঝাপশা দৃষ্টির মতো।
গ্রীষ্মের দাবদাহে যেমন পুড়ে প্রকৃতি—তেমনি পুড়ছে মানবের অধিকার। রাজনীতির বিস্তীর্ণ মাঠে মারা যায় বঞ্চিতদের দাবী—মুক্তি চাই, স্বাধীনতা চাই শ্লোগান। ফিরে আসে প্রতিবার মুষ্ঠিবদ্ধ প্রত্যয়ের হাত। যে হাত ছুঁয়েছে শহীদের কাছে দেয়া শপথের। বঙ্গবন্ধুর মতো শেখ হাসিনা প্যালেস্টাইনের পাশে রাষ্ট্র নিয়ে দাঁড়িয়েছেন অটল, স্থির।
পৃথিবীকে বিপন্ন করছে যারা—তারা তো অভিশপ্ত, খুনী। অধিকৃত গাযায় যে শিশু এতিম হলো সদ্য, তাদের জন্য এই গ্রহের মধ্যাহ্ন পেরিয়ে সময়ের বিকেলে—প্রকৃতির প্রতিশোধে কেঁপে উঠবে শিকড়ের ভিত। তাহলে—সুপেয় নদীর তীরেও; সভ্যতার একুশ শতকেও মানবতা বড় অসহায়। সেমেটিক ও এন্টি সেমেটিক থেকেও কি মুখোমুখি মানচিত্র জবর দখল?
প্রতিরোধে—প্রতিবাদ চিহ্ন রেখে যাবে তাবত মুক্তিকামী মানুষ। নিপীড়িতদের যৌথ ঐক্য পৃথিবীর বুকে দাঁড়াবে একদিন। পূর্ব দিগন্ত আলোকিতকরে শোষনহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে—সেপ্রতীক্ষায়, সংগ্রামী সূর্যোদয়ের।
কাব্যিক পৃথিবী
আগুন পোড়ানো তাম্র যেনো—চমকিত দৃষ্টি।
কে আসে আজ, মুষ্টিবদ্ধ শ্লোগান সাজ—
সমাজ নির্মাণে, রেখে যাবে অনুপম সৃষ্টি।
হাস্য উজ্জ্বল সময়ের ছবিটা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে দিই।
জীবনের গৃহস্থালি জমা রাখি—স্মৃতির ঘরে।
আমাদের বিবেকের আড়ালেও বিবেকের ভাবনা থাকে
মানবতার কোনো সীমানা নেই—বিশ্বের সবখানেই সমান।
মানুষের স্বার্থের কাছে বিক্রিত হয়ে যায় কোথাও, তবু
কোভিড ১৯ আসে, কোভিড যায়। মেঘের আড়ালের মতো,
পৃথিবীর মানুষের কাছে মানবতা হারায়।
আমার অথবা আপনার ভাবনা যদি সার্বজনীন হয়
মনে রেখো—এই সমাজ আমাদের, প্রাণীগুলোও আমাদের।
চলমান ঘড়ি থামার আগে, আবহাওয়া অনুকুল থাকে।
ভালোবাসার জমিনে, হৃদয়ের আবেগে স্নেহ মমতা রাখে।
বৃষ্টির দিনে, ধুয়ে মুছে দিয়ে যায়—প্রকৃতি
এই গ্রহ আমাদের বাস যোগ্য হোক, কবিময় কবিতার হোক।
ফিলিস্তিন
পৃথিবীতে নৈতিকতার মৃত্যু হলে—সে মৃত্যুর আরেক নাম ফিলিস্তিন। অর্ধ শতাব্দী ধরে আহত বা নিহত সংবাদে শুরু হয় বিশ্ব ভোর। হে ফিলিস্তিন—বড়-ই খুচরো নিয়তি তোমার। ভাষাহীন দৃষ্টি সম্প্রচারে’র ভীড়ে মানবতা আজ লয়হীন। পৃথিবী দেখে—অনুভূতিহীন অপরাহ্ন। দেখে—গণহত্যার রক্ত ছুঁয়ে যাওয়া মাটি। দেখে—শান্তিবাদি মানুষের বিবিধ কর্মসূচী। নিজ ভুখণ্ডে পরবাসি জনগন চেয়ে থাকে ছায়া পথে, যে পথে আসবে মুক্তি।
ক্ষমতার পাশে ক্ষমাহীন রাজনীতির দানবেরা পুড়িয়ে দেয়—নিষ্পাপ পিতা-মাতা শিশুদের। মানুষের মুখোশে ব্রিট-মেরিকা দেখে যায় ব্যবসার লাভ-ক্ষতি। প্রিয় ফিলিস্তিন— এক নির্বাসিত জনপদের বিমূর্ত ছবি। দায়বোধের বিস্তারে, রূপক সাজ সজ্জায় হেঁটে যায় সভ্য সমাজ। পৃথিবীর সাহসী মানুষেরা দাঁড়াবে একদিন—হে ফিলিস্তিন। এই জনমে আমরাও বাড়াই স্বজনের হাত। সংগ্রাম—তিন অক্ষরের শব্দদাগ মিশে থাকে শোষিত মানুষের প্রান্তিকে।
আদি অকৃত্রিত স্বীকৃতি—স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র ফিলিস্তিন।
স্বাধীনতার ৫০ বছর
হাজার বছরের ঐতিহ্যের পাঠে উঠেছে—অধিকারের নির্মিতি। ভাষা অন্দোলনের তীব্র শ্লোগানের মতো গড়ে ওঠে বিবিধ শিল্প। জন্মের পঞ্চাশ বছরে এসে শিরোণাম হয়—স্বাধীনতার প্রগতি। জয় বাংলার অদম্য তারুণ্যের দেশ, সবুজ ঘাস, সোনালী আঁশের দেশ।
সেই দীর্ঘ পথে ছিল সন্ধ্যা, অন্ধকার, অমাবস্যাও ছিল। কখনো নিভুনিভু, কখনো অস্পষ্ঠ আলোর রেখা হয়নি বিলীন। তবুও রোদের ছায়ার মতো—ভূগোল ছাড়েনি বাঙালি। নিপীড়ন, নির্যাতনের পরেও দাঁড়িয়েছে ফের।
বিষন্ন অরণ্যকের ঝরে যাওয়া পাতার মতো হারিয়ে গেছে মানুষেরা। সেই বৃক্ষে, সেই শাঁখায় ডেকে যায় পাখিরা, ব্যর্থ করে শকুনের ছোবল। পুড়েছে বছরের স্বপ্ন, শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার তালিকা। আন্দোলনের বিবিধ ব্যবহারেও বিভ্রান্ত হয়নি জাতি।
রাত্রি ভোর হয়, জেগে ওঠে সূর্য্য, আলোকিত হয় পুরো মানচিত্র। পাকি চেতনা উড়ে যায় ধূলোবালির মতো। বিশ্বের শত সহস্র কবিতার শিরোণাম অথবা চরিত্র হয়—স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
দি ফ্রান্স
উপকূলীয় বিস্তৃত সমভূমি জুড়ে পরে আছে উত্তরীয়।
মধ্যভাগের সুউচ্চ বক্ষের নান্দনিক নন্দন।
সবুজ উপত্যকা আর বরফে আবৃত আল্পস পর্বতমালা পূর্ব ধারে।
এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—যেন একটি নির্ধারিত সীমার মতো।
কনকনে শীতে নগরের পাশে বয়ে যাওয়া লোয়ার নদীর মতো
গারনের পানি—তার্ন নদী, লা সেনও অবিকল।
আমার প্রিয়তা—সেই শহরেই ছিল একদা।
পারির নকশায় আমাদের নগর ভিত্তিক সম্পর্কের সংযোগ ছিল।
নদীর উপর বর্দো শহরে হেঁটেছিল বণিক।
নঁত শিল্প কেন্দ্রের স্থাপত্যে জাতীয়তার পদচিহ্ন রয়ে যায়।
নাগরিক সমাজের কল্যাণে ঝরে পড়ে শ্রমিকের ঘাম।
প্রাচুর্য ও দালানের ভীড়ে আমাদের সময়ও লিখে রাখে পরিসংখ্যান।
বিশ্ব মঞ্চে, মানবতার শৈশবে পোড়ে—কতো স্বপ্ন, কতো প্রেম।
প্যারির সংস্কৃতিক জীবনের কর্মে—জগতের কেন্দ্র হয়ে থাকা নাম।
চিহ্নিত পদধ্বনি
স্বকীয় বৈশিষ্ট্য আর ভাগ্যবান মানুষদের কীর্তি
ল্যুভর মিউজিয়ামে স্থান পাবে যে স্মৃতি।
ইউনেসকোর নির্বাচিত জায়গার মতো—
প্রাচীন নিদর্শন সহে সুন্দরের লীলাভূম প্রাসাদ তত।
সাহিত্য অধিবেশনে স্থান পায় চ্যানসন ডি ওজেস্ট
আমাদের আলোচনায় উঠে আসে সেল্টিক এবং ফ্রাঙ্কিশ।
ভেল্টেয়ারের লা ডেসটিনি কিংবা ভিক্টর হুগোর লেস মিসরেবলস—
ঐতিহাসিক সময়গুলোর চিত্র খোঁজি মার্সেলপ্রস্ট-এর সৃষ্টিতে।
সভ্যতার ঘরে কলোনীর আর্তনাদ প্রবেশ করেনা
বিক্ষুব্ধ শ্লোগান হারিয়ে যায়—আত্মজীবনীর পাতায়।
নগর মহানগরের স্ট্রীটে বিমূর্ত সুখ ভেসে বেড়ায়
পৃথিবীর সকল জল সমুদ্রগামী—স্থায়ী ঠিকানা ।
বঙ্গবন্ধুর এপিটাফ
বাংলাদেশের দায়ভার নিয়ে একটি রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল পূর্ব বাংলায়। যেখানে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ভূমিকা তৈরী করেছিলেন—এক ক্ষণজন্মা শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তবে শোন হে প্রজন্ম—হাজারবছর থেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা বাঙালিরা কি জানত? তাদের একজন মুজিব আসবে? নিজস্ব পতাকার পরিচয়ে বেড়ে উঠবে এই বিশ্বে?
যে স্বপ্ন বহমান ছিল গ্রাম বাংলায়। পূর্ণ বৈচিত্রের অপরূপ রূপে এই মৃত্তিকায়—গাঙ্গেয় অববাহিকার ব-দ্বীপে। যেখানে মিলেছে অসাধারণ সৌন্দর্যের তারুণ্যপট। বিমুর্ত চিত্রের নিকেতনে প্রকৃতি এখানে বড় উদার, সুন্দরের সমারোহ ঘিরে রাখে সমগ্র বাংলাদেশ। দেশের পরতে পরতে এই ভালোবাসা নিয়ে জাতিকে বরণ করেছেন—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর বুকে স্বর্গীয় সৌন্দর্য—বিস্তীর্ণ জল রাশিরমতো জেগে উঠা ঢেউ। এখনো এই বাংলায় যাঁর আঙ্গুলির বিকল্প আসেনি, আসবেনা কেউ। কতকাল, কত মহাযুগ অপেক্ষার পর—শুধু আমাদের—একান্ত স্বাধীনতার জন্য জন্ম হয়েছিল তাঁর।
মোর জন্মেরকালেও তুমি শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য কারাগারে—মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। গণমানুষের হৃদয় সিংহাসনে টাঁই নেয়া প্রাণের নেতা—আমাদের এই বাংলায়। এক অনবদ্য সংগ্রামী জীবনের প্রমাণ—হে বঙ্গবন্ধু মুজিব, তুমি যে স্বদেশী প্রত্যয়ের আরেক নাম। তোমাকে দেখিনি, শুনিনি তোমার কন্ঠস্বর। তবুও তোমার বাঙ্গালিত্বের উচ্চতা, বোধের বিশালতা—প্রাণিত করে। প্রতিনিয়ত বিস্ময় জাগে—৭ই মার্চের স্বাধীনতার দীপ্ত উচ্চারণে।
রাজনীতির কবি বলেছিলেন যে দিন—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’তারপর আরো শোন—পঞ্চখণ্ডের বিহান, কুশিয়ারা-সুনাই-লোলাগাঙে’র কলকল ছলছল জলসমগ্র.. সেদিন ভরাপূর্ণিমার আলোয় রাত হাসে, স্রোত চলেযায় মুক্তির মোহনায়। এই বাংলার হাটে মাঠে, পথে প্রান্তরে—কিশোর, যুবকের দুরন্তপনায়, প্রবীনের প্রাজ্ঞতার সামনে স্বাধীনতার দুয়ার খোলে দিলেন তিনি। পৃথিবী দেখল সেদিন—পতপত করে উড়ে থাকা পতাকা আর মাঝখানে একটি বাংলাদেশ।
জাতিসংঘে যেদিন প্রথম বাংলাভাষায় ভাষণ দিলেন—সেইদিন ভাষা শহিদের শ্লোগান সমৃদ্ধ হাতের প্লাকার্ড দেখেছিল পৃথিবী। কালের কীর্তিমানের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ আজোফুল হয়ে ফোটে রয়—সংঘের রেজুলেশন বুকে, ইতিহাসের পাতায়। আমাদের দেশের আকাশ ছিল—মেঘহীন, জাতীয়তার সূত্রে উচ্ছ্বসিত কবিতার পঙক্তির মতো।
তোমার প্রতিকৃতিতে ছায়া জাগে শোষিত, নিপীড়িত, নির্যাতীত মানুষের স্বাধীনতা—হয়ে ওঠো শান্তির প্রতিক। দেশ মাতৃকার মাটির সাথে, স্বাধীনতা ও জাতিয়তার সাথে, সার্বভৌম পতাকার সাথে মিশে থাকা আত্মার নাম—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।