ওয়ালি মাহমুদ : কবিতার পথ সন্ধানে | ড. মুকিদ চৌধুরী | সাপ্তাহিক ইউরো বাংলা | লন্ডন, যুক্তরাজ্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,

বাসরঘরের বর এবং পাঠকসভায় লেখকের প্রায় একই দশা।

-সাহিত্যের পথে; রবীন্দ্র-রচনাবলী; ১২ খন্ড।

 

কবি একে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন যে,বর ও লেখক অন্যদের উৎপাত নিঃশব্দে সহ্য করে নেন। উভয়েই জানেন শেষ পর্যন্ত তারাই জয়ী হবেন; কারণ- বরের বেলায় তার কনেকে যেমন লেখককের বেলায় তার লেখাকেও তেমন কেউ হরণ করতে পারে না।

আমি তাই,একজন পাঠক হিসেবে,আমার উৎপাত নির্দ্বিধায় শুরু করতে পারি।

[ .. ]

উৎপাত

এখন শুরু করা যাক আমার উৎপাতÑ সূচনাটা হোক মূল-প্রবন্ধকে ঘিরে। লেখক, সমালোচক মনজুরুল আজিম পলাশ প্রথমেই আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘কবি ওয়ালি মাহমুদ-এর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বাসনে নির্বাচিত দ্রোহ’ বিভিন্নভাবে ব্যতিক্রমধর্মী।

আর এই গ্রন্থটি কেন ব্যতিক্রমধর্মী তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘গ্রন্থটির আকার, প্রচ্ছদ, ভেতরের কাগজ, কাগজের ভারীত্ব-রঙ এবং সর্বোপরি জরুরী যে বিষয়- টানা গদ্যে নির্মিত তার কবিতাগুলো পাঠ করা শুরু করলে, এক ধরনের ঋজু ভাব আসে; ….

আমি এ-বক্তব্যকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করি না, কিন্তু দ্বিমত পোষন করি; কারণ- যেহেতু কলকাতা থেকে কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের একটি বই যা কবি ওয়ালি মাহমুদের বইয়ের ঢঙে এর আগেই প্রকাশিত হয়েছে-  তার ‘আকার, প্রচ্ছদ, ভেতরের কাগজ, কাগজের ভারীত্ব-রঙ’- সবকিছু কিছু মিলে বইটিকে উন্নতমানের ব্যতিক্রমধর্মী বলা চলে।

‘টানা গদ্যে নির্মিত তার কবিতাগুলো’- এ-মন্তব্য আমাকে বারবার ‘কবিতা’ সম্বন্ধে অন্বেষণের স্পৃহা জাগিয়েছে, অভিলাষি করেছে। তাই মাথা-মগজ জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে একটি প্রশ্ন-  ‘কবিতা’ কি?

[ .. ]

কবিতা কি?

আলোচ্য মূল-প্রবন্ধের লেখক নিশ্চয়ই বিচক্ষণ; তবুও- এ কথা আশাকরি আপনারা সকলেই স্বীকার করবেন যে, পাঠক বড় অদ্ভুত; বড় বেপরোয়া। তাই প্রথমে ‘কবিতা কি?’- এ প্রশ্নের সমাধান চাই। সামাধান চাইতে গিয়ে একটা আবছা কাঠামোতে পাঠকের মনকে স্থির করতে হলো। সাথে সাথে পাঠকের মাথায় একটা সংজ্ঞাও তৈরি হয়ে গেলো- কবিতা- ভাবনায়, চিত্রকল্পে, রূপকে, উপমায় স্বতন্ত্রভাবে মনের কথা প্রকাশ করা হয়; অথবা কবিতা হচ্ছে মানবমুখী কোয়ালিটির দুঃসাহসিকতার উপর ভিত্তি করা একটি সৃষ্টিকর্ম- যা মাপা-মাপা অলংকারে বিশাল জগত তৈরি করে, অবশ্য অর্থালঙ্কারের ক্ষেত্রেও তার ঐশ্বর্য ব্যাপক, কাব্যোপকরণ ও জীবনোপলব্ধির দ্বার যার দ্বারা উন্মোচিত হয়। এক কথায় অলঙ্কারের প্রাচুর্যে ও প্রয়োগ-নৈপুণ্যে কবিতার জগত ঋদ্ধ ও শৈলীতে মন্ডিত। এখানে ধ্বন্যুক্তির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে; যা বাংলা কবিতার একটি শক্তিশালী অলঙ্কার।

[ .. ]

কবিতা কি সব এক রকম হয়?

না, কবিতা এক রকম হয় না- তাকে একটা গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। কবিতার প্রকৃতি- কবির আয়োজনে এবং শব্দ ও ছন্দের বিচিত্র মিশ্রণেই কবিতাকে সন্ধান করতে হয়- যাকে বলা যায় ‘সম্ভাব্য সঠিক’ পন্থা। ‘সম্ভাব্য’ বলতে বোঝাচ্ছি- আঁকড়ে ধরা মানুষের বিশ্বাস- ইমোশন বা আইডিয়া, যে কোন ধরনের কল্পনা শক্তিও। আর ‘সঠিক’ বলতে বোঝাচ্ছি সাহিত্যের ক্ষেত্রে- শক্তি, অলংকার, যথা সম্ভব প্রয়োজন মতো বাক্য বা শব্দ গঠন পদ্ধতিকে।

এ-পদ্ধতিতে আমাদের ভালো-লাগা, মন্দ-লাগা, আমাদের ভয়-বিস্ময়, আমাদের সুখ-দুঃখ, আমাদের জানা-অজানা জগতটি জড়িত থাকতেও পারে না পারে; বিমূর্ত চিত্রকলাও হতে পারে; তবে এই বিমূর্ত চিত্রকলা এমন সৃষ্টি হতে হবে যে, বটবৃক্ষের জঠের মতো নানাভাবে প্যাঁচিয়ে আমাদের হৃদয় ও মগজকে এমন একটা জায়গাতে পৌঁছে দিতে সক্ষম, যেখানে কল্পনা হয়ে ওঠে বাঁধা-বন্ধনহীন; নতুনের নিমন্ত্রণে নানা রাগিনীর স্পন্দনে আমাদের ভেতর আন্দোলন সৃষ্টি করে।

এক কথায় এই ‘সম্ভাব্য সঠিক’ পন্থা নির্ধারণ করলে সন্ধান করা যায় কবিতার মূল রূপটিকে; যা বস্তু (মূর্ত বা বিমূর্ত যে কোন স্বরূপই হোক), শক্তি ও সৌন্দর্যময়তায় ভরপুর। কবিতা এ জন্যই আমাদেরকে, বিশেষ করে পাঠককে, আনন্দ দেয়; দুঃখও দিতে পারে তা অস্বীকার করি না। তবে আমার আনন্দ দুঃখকে নিয়েই। দুঃখ, অভিমান বা বিষাদ ছাড়া আনন্দের কোনো মূল্য হয় না।

[ .. ]

কবিতা পদ্য না গদ্য?

কবিতা পদ্য হতে পারে গদ্যও হতে পারে; তবে যে কোন পদ্য বা গদ্যের আঙ্গিকে লেখা রচনা কবিতা হতে পারে না।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘কাষ্ঠবস্ত গাছ নয়, তার রস টানিবার ও প্রাণ ধরিবার শক্তিও গাছ নয়।’ এখানে রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘গাছ’ বলেছেন তাকে আমি ‘কবিতা’ বলছি। বস্তু (মূর্ত বা বিমূর্ত), শক্তি ও সৌন্দর্য যখন একত্রিত হয়ে একটি সমগ্রতার মাধ্যমে, অখন্ড ভাবে প্রকাশ পায় তখনই পাঠকের কাছে তা ‘কবিতা’ হয়ে উঠতে পারে; তা পদ্য না গদ্য সেদিকে পাঠক বেখেয়াল। সার্থক কবিতার মধ্যে কবি-আত্মার তিনটি রূপ প্রকাশ পাওয়া যায়- ‘আমি আছি’, ‘আমি জানি’ ও ‘আমি প্রকাশ করি’। এই আমিত্ব প্রকাশই হচ্ছে কবিতার মূল রূপ।

তাই বলবো-  ওয়ালি মাহমুদের কবিতাগুলো নির্মিত হয়েছে তার নিজস্ব ধারায়; ভিন্ন সুতোর মেলায়। এ অবশ্যই অন্য কবিদের ঢঙে বা আঙ্গিকে রচিত কবিতাগুলোর মতন নিজস্বতা বজায় রেখে কবিতার জগতে সহবাস করে; তবে অতিক্রম করে না; অতি নতুন জগতও সৃষ্টি করে না।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়- ‘পিতৃপুরুষ ও তাঁর পরিভ্রমণ সংক্রান্ত’ কবিতাটির সাথে সুরমায় দু’বছর আগে প্রকাশিত রব দেওয়ান-সৈয়দ-এর ‘একটি পরিবার ও এদের বাস্তবে লুকায়িত অচেনা সত্য’ কবিতাটির অন্তর্গত মিল থাকলেও দু’টিই স্বাতন্ত্র্যের দাবি রাখে। তবুও একটি অন্যটিকে অনায়াসে ঢিঙিয়ে যায়; বিমূর্ত শব্দমালায় চেনা-অচেনা ভাব ও অর্থে প্রাণের কথা সহজে প্রকাশ পায়। এর মধ্যে একটি কবিতা কবির অজান্তেই ‘সর্বনামের মাইজলা অবস্থান-কে আড়াল করে সামনের তিমুখীতে মিশে’ যায়; হোঁচট খেয়ে।

[ .. ]

কবির কবিতা ছন্দময় কি?

কবিতায় নতুন যুগের কবিরা আগেকার কবিদের মতোই পুরাতন প্রবাহকে ভেঙে নূতন দিগন্ত সৃষ্টি করার প্রচেষ্টায় আছেন। এ-প্রচেষ্টায় আবদ্ধ কবিরা তাদের বলিষ্ঠ তুলি ও রঙের আঁচড়ে মনের কথা নানা রূপে প্রকাশ করে চলেছেন।

প্রিয়-অপ্রিয়, সুন্দর-অসুন্দর, আমাদের ভালো-লাগা না-লাগা শব্দ বা বাক্যের আভাসেই প্রকাশিত করে চলেছেন তাদের কথা। এ-সব কবিতা হতে পারে ছন্দময়; আবার না-ও হতে পারে। তাতে আমার মতো পাঠকের কিচ্ছু যায় আসে না। আমরা শুধু দেখতে চাই- কবিতার মাধ্যমে কবি কি তার নিজের হৃদয়ের ব্যাকুলতা ব্যক্ত করতে আগ্রহি; না তিনি একেবারেই আকুল নন। তার হৃদয়ের অধিকার কতটুকু কবিতার শরীর জুড়ে বিরাজ করছে; এ কি স্থায়ী ভাবে বসতি স্থাপন করেছে; না আদৌ করে নি। আমার মতো পাঠক, কবির রচনার গভীরতা এ-সব দিয়েই যাচাই করে তৃপ্তি পায়।

কবি ওয়ালি মাহমুদের কবিতায় ছন্দের সন্ধান পাওয়া যায়। ওয়ালি মাহমুদের কিছু-কিছু কবিতায় আবার রবীন্দ্রনাথকেও আবিষ্কার করা যায়। ওয়ালি মাহমুদের কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে ড. রেণু লুৎফা রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে বলেছেন, …. রবি ঠাকুর শুধু বাংলা কবিতাকে নয়, গোটা বিশ্ব সাহিত্যকেই, মানুষের চিরকালীন শিল্পভাবনাকে এবং সমগ্র দার্শনিক চিন্তার জগতকে দান করলেন রোমান্টিক-মানবতাবাদী ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে পরিণত তত্ত¡ ও দৃষ্টান্ত।

– সুরমা।

এর সাথে ড. রেণু লুৎফা আভাস দিয়েছেন যে, ওয়ালি মাহমুদ মাইকেল-রবীন্দ্র ধারায় আপ্লুত। তার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে আমিও বলতে চাই সেই ধারায় আপ্লুত হয়ে ওয়ালি মাহমুদ কবিতা রচনা করছেন। একটা উদাহরণ দেয়া যাকÑ

যে অশ্রু/ ফেলিছো/ বসি, সে তো/ স্বচ্ছ/ নহে। ৩/৩/২, ২/২/২

অক্ষরের/ অনিমা/ প্রয়োগে/ রেখছো/ অজিত/ করে, তর/ না সহে। ৪/৩/৩/৩/২, ২/৩

অস্বচ্ছ-সলিল যাহা উত্তরের অনুদ্দেশ, অনুদিন ভাবনাতেই রহে। ৪/৩/২/৪/৪, ৪/৫/২

কবে সে কখন করেছে বসত, হৃদয় স্খলনের যৌথ বিরহে। ৩/২/৩/২, ৩/৪/২/৩

যে অশ্রু ফেলিছো বসি হে, সে তো স্বচ্ছ নহে। ৩/৩/৩,২/২/২

-রেখাপাতন চিত্র।

অসম ছন্দে এই কবিতাটি বাঁধা হলেও এতে অনুপ্রাসের কাব্যলঙ্কার, বিশেষ করে দুইমাত্রার   অন্ত্যানুপ্রাস, লক্ষ্য করা যায়।

গদ্য ঢঙে লেখা কবিতার মধ্যে যে ছন্দ লুকিয়ে আছে সে-দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য একটি উদাহরণ দেয়া যাক-

…. শরচ্চন্দ্র মনের গগনে পোষে আশা, নিরূপিত ভাষা।

…. প্রবাহ সম বাঁধা, জগতে আছে সাধা।

…. আপত্তিকর সাফল্য গাঁথা।

-সারাংশের একাংশ।

এখানে শ্রুত্যনুপ্রাসের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। বর্ণ আলাদা এবং ধ্বনিগত দিক থেকেও আলাদা; কিন্তু উচ্চারণস্থান কাছাকাছি হওয়ায় লঘুধ্বনি ও গুরুধ্বনি অনেক সময় শ্রুতিগত দিক থেকে সমধর্মিতা লাভ করেছে।

[ .. ]

কবি কি প্রেমিক বা দ্রোহী?

মূল-প্রবন্ধে আবার ফিরে যাওয়া যাক। লেখক বলেছেন, ওয়ালি মাহমুদ প্রেমিক বা দ্রোহী হলেও ঘন-ঘন প্রস্তাবনা বা বিদ্রোহ- কোনটাই করেন না।

আমিও লেখক মনজুরুল আজিম পলাশের সাথে একমত। এ-বইয়ের প্রথম ছত্র থেকে শেষ ছত্র পর্যন্ত ওয়ালি মাহমুদ যেন অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। মনে হতে পারে সারা দিন ধরে কবিতার পন্থা সংগ্রহের কাজ চলেছে, অনুসন্ধান চলছে- তিনি যেন দিকচিহ্নহীন অনন্তের যাত্রী।। এখন কেবল উপচার সাজিয়ে সাগ্নিকের উপবেশনটাই বাকি। কিংবা এও মনে হতে পারে যে, শক্তিধর কোনো উপাসকের কাছে এই নতুন পন্থার খবরটি জেনে নিতে তিনি অপেক্ষা করছেন। যেমন-

শব্দের চতুঃসীময় যেতে-যেতে, এক নিরনজন হেয়ালির সম্পাতে কেঁপে উঠে কবিতার স্বর। – পৃষ্ঠা ১০।

মনের মধ্যে যদিও স্থিত হয়নি চয়নশৈলীর পুনরুত্থান- পৃষ্ঠা ১১।

এই আমিও হাঁটছি পানি ভেঙে তালে-তালে, মোহনার খুঁজে। – পৃষ্ঠা ১২।

আনন্দের বিভায় মোহগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘ সময় অতিক্রম করে বুঝেছিলাম, এ শুধু জাগতিক মোহ। পৃষ্ঠা ১৩।

…. এখনো আঁধারের নিশি কাব্যে ডুব দিই। পৃষ্ঠা ১৪।

ওয়ালি মাহমুদ সবেমাত্র অন্ধকারে ডুব দিয়েছেন এবং তার ‘সামগ্রিক সমষ্টিতে দেখেন শুধু প্রশ্নবোধক চিহ্ন।’ পৃষ্ঠা ১৭। তাই মন্থন প্রয়োজন- তাকে খুঁজে বের করতে হবে ‘পদ্যের তথ্য’। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে- ‘ভেদ রেখা’ কবিতার পদ্ধতি নির্ণয় করার প্রয়োজনে। ‘য-ফলা’ ও ‘ব-ফলা’র সন্ধান করতে হবে। তার জন্য সময়ের প্রয়োজন। তবেই তিনি পারবেন ‘অপরিচিত সিঁড়ি বেয়ে’ ‘কবিতাকে পাঁজাকোলা’ করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে। এ জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে।

এখন আত্ম-সন্ধান, সত্তা-সন্ধান বা অনুসন্ধানেরÑ মৌলিক বিষাদের প্রেক্ষাপটেই তার দ্রোহ প্রকাশিত হচ্ছে। হয়তো বা একদিন তিনি অন্ধকারের মধ্যে কবিতার সন্ধান পাবে; যেমন পেয়ে ছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, তবে হয়ত মৃত্যু প্রসব করেছিস জীবনের ভুলে। অন্ধকার হয়ে আছি, অন্ধকার থাকবো এবং অন্ধকার হব।

-জরাসন্ধ।

আশাকরি এই অন্ধকারের মধ্যেই ওয়ালি মাহমুদ খুঁজে নিতে সক্ষম হবেন আলোর অভাবজনিত প্রতিবাদ; যেমনি এই অন্ধকারের মধ্যেই সন্ধান পেয়ে ছিলেন রঊফ। রউফ বলেছেন,-অন্তরের এই প্রশ্নগুলোই অন্তর-তরঙ্গের ঘাত-প্রতিঘাতে প্রতিক্রয়া সৃষ্টি করে রচিত করে বিদ্যুৎ; যার আলোতে দেখতে পাওয়া যায় আঁধারে গ্রাস করা টানেলের অপর পাশে আলোক-রশ্মির খেলা। সেখানেই শিশুর মুখে হাসি ফুটে, মায়ের বুকের ভান্ডার উপচে পড়ে। সেই আলোক-রশ্মির কাছে সবাইকে নিয়ে যেতে হবে সুড়ঙ্গ পথে ধরাধরি করে, কাঁধে-পিঠে বহন করে। তজ্জন্য চাই বন্য-হস্তির শক্তি, চাই সিংহের সাহস।

-নতুন দিগন্ত; প্রথম খন্ড।

কবি ওয়ালি মাহমুদ সময়, সমাজ ও অভিজ্ঞতার বিচিত্র চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে রচিত করবেন বৈচিত্র্যতা। আর সজাগ পাঠকবৃন্দ একটু-একটু করে বুঝে নেবে বিষাদের মৌলিকতার মধ্যে সন্নিবিষ্ট থাকলেও কবি আসলে আলোর অভাবজনিত প্রতিবাদের ডাকই দিচ্ছেন- যাতে কেবল প্রেমই নয়; দ্রোহও সমপরিমাণের।

[ .. ]

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতা প্রসঙ্গে

মূল-প্রবন্ধে  লেখক বলেছেন, এই বইয়ের কয়েকটি কবিতায়ও মুক্তিযুদ্ধ এসেছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, সংক্ষোভ ও রক্তপাত ওয়ালি মাহমুদের চেতনাজগতকে আন্দোলিত করেছে। লেখক যথার্থই বলেছেন, ‘স্বাধীনতা ভাবনায় ওয়ালি মাহমুদের অনুসন্ধান-ভাবনা শুধু একটা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। …. কবির ইতিহাস সচেতনতা বিস্তৃতি অনেক পেছনেও।’

তবুও সুভাষ ঘোষালের ভাষায় বলা যায় যে, যাঁদেরকে জাগতিক কবি বলা হয়, তাঁদের নিয়ে দেশে দেশে সমস্যা একটাই। তাঁরা পার্থিবতার ভার বহন করতে গিয়ে তাঁদের অজান্তে কবিতার শরীরেও চাপিয়ে দেন এতো বেশি বাচনিকতার ভার যে মাঝে মাঝে মনে হতে থাকে, ব্যঞ্জনার আলো হঠাৎ বুঝি কমে এল। অথচ, পল এল্যুয়ার যখন ‘লিবার্টি’ লেখেন তখন স্বাধীনতাকে ছড়িয়ে দেন দিগ্দিগন্তে। পাঠশালা থেকে শুরু করে কুকুরের কানের ওপরেও ফুটে ওঠে স্বাধীনতা। তবু সে ভার হয়ে ওঠে না, প্রতিষ্ঠিত করে নির্ভার ব্যঞ্জনাকেই; [দেশ, জুলাই ২০০৪]।

আমি মনে করি, ১৯৭১ সালের জাতীয় জীবনের রক্তপাত, যুদ্ধ, নিপীড়িত-নির্যাতন বাঁধ-ভাঙা রক্তিম স্রোত ওয়ালি মাহমুদের চেতনায় পুঞ্জভূত হয়ে বড় রকম গুণগত পরিবর্তন সাধন করবে; সৃষ্টি করবে এক নব রূপায়ণ জগত। জিজ্ঞাসা, আত্মবিস্তার, আত্মাশুদ্ধি এবং আত্মশুদ্ধির পর একটা অবস্থার পটভূমি এ-পর্যায়েই শুরু হবে।

[ .. ]

আঞ্চলিক ভাষা ও কঠিন শব্দ প্রসঙ্গে

আঞ্চলিক ও কঠিন শব্দ প্রয়োগ প্রসঙ্গে মূল-প্রবন্ধ লেখক যা বলেছেন তাতে একমত পোষন করি; তবে শব্দের সঠিক প্রয়োগে আঞ্চলিক শব্দও যে অন্য একটি জগত তৈরি করতে পারে তা দেলোয়ার হোসেন মনজু’র ‘ইস্পাতের গোলাপ’-ই প্রমাণ করে। কঠিন শব্দ- মাইকেল মধুসুদন-ই যথেষ্ট। তবুও সহজ ভাষাতেও যে কবিতা হতে পারে তা আমি কবি সালেহা চৌধুরীর কবিতা থেকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি-

গরু ও পাল্কি / বাঁশ বনের পথ / নতুন বউ -হাইকু।

এ-ই যথেষ্ট। অন্য কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। পাঠকের চোখের সামনে ভেসে উঠে একের পর এক দৃশ্য। কল্পনার দুয়ার অচিরেই খুলে যায়। বাঁশবনের নিস্তব্ধ পথে একটা গরু- হয়তো বা গলায় দাড়ি নিয়ে ঘাস খাচ্ছেÑ চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পায় পাল্কিটা এগিয়ে চলছে। মুহূর্তে ছয় বেহারা ‘হু-না-হু’ বলে পাল্কিটাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই একটু সময়ের ভেতর বউয়ের মুখটা পাঠকের দেখে নিতে কষ্ট হয় না। কবি শুধু সূত্রপাত করেছেন- পাঠক তার ইচ্ছে মতো ক্যানভাসটা সাজিয়ে নিতে অসুবিধে হয় না।

[ .. ]

উপসংহার

পরিশেষে আমি আবারও বলবো, ‘কবি ওয়ালি মাহমুদ তার কবিতায় একটি নিজস্ব ধারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ফরীদ আহমদ রেজার কথা উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়। তিনি বলেছেন, কবি যা সৃষ্টি করেন এর কোন নির্দিষ্ট ফর্ম বা আকার-আকৃতি নেই …. প্রতিটি সার্থক কবিতাই নতুন সৃষ্টি। কবির উপর তার সমসাময়িক জগত এবং অগ্রজ কবিদের প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যা সৃষ্টি করেন তা তার নিজস্ব।

–কবিতা।

এর সাথে আমি আরো একটি কথাও বলতে চাই- ওয়ালি মাহমুদ বিনা পরিশ্রমে তার কবিতার জগতে হেছকা টানে ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন আমার মতো এক পাঠককে। আমি এখানে ড. রেণু লুৎফার কথা মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছি। তিনি ওয়ালি মাহমুদের অন্য একটি কাব্যগ্রন্থ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ওয়ালি মাহমুদের কবিতাগুলোর পরিস্ফুট শব্দ চয়ন এবং ভাব প্রকাশের ভঙ্গিমার সাথে পাঠক অতি সহজেই নিজের চেনাজানা চৌহদ্দির ঘনিষ্ঠতা বোধ করতে পারেন।’

-সুরমা।

[ .. ]

বইটির প্রকাশক- ম্যাগনাম ওপাশ, শাহবাগ, ঢাকা, বাংলাদেশ । প্রকাশ কাল ২০০৪। প্রাপ্তিস্থান- মীরা বুকস্, সঙ্গীতা লিমিটেড, লন্ডন। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে পিতা-মাতা যথাক্রমে মতিউর রহমান মাহমুদ ও মিসেস সুফিয়া রহমান।

 

দ্র: আলোচনাটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইউরোবাংলা পত্রিকার ১৮-২২ মার্চ ২০০৭ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

Share Now

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *