ওয়ালি মাহমুদ: এক সম্ভাবনাময় কবি
হারূন আকবর
প্রকৃতিগতভাবে অধিকাংশ মানুষই কবি। অনেক বড় বড় সাহিত্যিক গবেষক গল্পকার প্রথম জীবনে কবিতা লিখতেন। পরে তারা বিভিন্ন পরিচয়ে খ্যতির শীর্ষে আরোহন করেন। কবিতা চর্চা মানবজীবনের স্বাভাবিক ধর্ম। অতি সাধারণ পেশার মানুষকেও দু’চার লাইন কবিতা তার নিজস্ব ভাষায় বলতে শোনা যায়। কবিতা দিয়েই অনেকে মেধা ও মনন চর্চার জগতে প্রবেশ করতে আগ্রহী। এমনি আগ্রহী ও মেধাবী কবি হলেন ওয়ালি মাহমুদ। বয়সে তরুণ এ কবির বাড়ী সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার জলঢুপ পাতন গ্রামে। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে ১৯৭২ সালে তার জন্ম। বাবা মতিউর রহমান মাহমুদ পেশায় শিক্ষক, মা সুফিয়া রহমান মাহমুদ গৃহিনী। কবি নিজেও শিক্ষকতার মহান পেশায় রত। আশির দশক শেষ হতে লেখালেখির শুরু। প্রকৃতি, নদী ও নারীর সমষ্টি তার লেখায় মূর্ত হয়ে ফুটে উঠে। ভালবাসার বিমূর্ত আবেগকে কবি কাব্যের চয়নিত শব্দকল্প, উপমার বোধানুকূল প্রয়োগ করেছেন ভিন্নভাবে। তিনি কখনো বৈরাগী হয়ে প্রেম-তীর্থ ভ্রমণে, কখনো উদ্দাম তারুণ্যে ভালবাসার আকাশ ছুঁয়েছেন বিচিত্র আঙ্গিকে। অন্যদিকে অনুভূতির তীব্র দাহনের উপস্থিতি তার কবিতায় লক্ষণীয়। ভালবাসাকে কবি অনুভব করেছেন হৃদয়ের উপলব্দিতে।
‘ভালবাসা, আসলে কি ভাল
সর্বনাশা খেলা খেলে
আগুন যে তার আলো’
(যৈবতী শোন, পৃষ্টা-৩)
কবির উপলব্দি আরো তীব্র ও বিধ্বস্ত হলেও আলোর প্রচ্ছায়া তাকে আশান্বিত করে তুলে:
‘ক্ষতাক্ত হৃদয়
লেলিহান শিখা
অনিরুদ্ধ ফোয়ারা আর
যেখানেই শূণ্যতা রিক্ততা
অনুর্বরতার চিত্র
সেখানেই প্রদীপ্ত আমি।’
(যৈবতী শোন, পৃষ্টা-৯)
রোমান্টিক কবি প্রেম ও ভালবাসাকে অন্তরে জাগ্রত দেখতে চান। মানব হৃদয়ের প্রেম মানুষকে উদার হতে সাহায্য করে। তার দিগন্তকে বিস্তৃত বিশাল আকার দেয়। তাই কবির ইচ্ছা জাগে:
‘ভীষণ ইচ্ছে করে
প্রচন্ড শীতের এই রাতে
তোমার বুকে মাথা রেখে
উষনতা নেই ভালবাসার।’
(যৈবতী শোন, পৃষ্টা-১৩)
প্রেমকে কবি স্বপ্নিল দৃষ্টিতে দেখলেও বিরহের ভাবনা মনকে অশান্ত করে দেয়। মানসিক বেদনা ও মর্মপীড়া প্রবল যন্ত্রণাকে উপচিয়ে তুলে। তখন জীবন শূণ্যতায় ভরে যায়।
‘অজান্তে চোখের কোন ভিজে উঠল।
গভীর আবেগে কাছে টানলো
তার তপ্ত নি:শ্বাস আমার বুকের
হাড়গুলো ভেঙ্গে দিতে চাইল।
এক পরিপূর্ণ দীর্ঘশ্বাস।
(ভালবাসার পোয়াতি, পৃষ্টা-৪)
কবি প্রেমকে তার কাব্যে প্রদান বিষয়রূপে প্রচার করলেও আবেগ তাড়িত হৃদয় আর মনের উচ্ছ¡াসে আকড়িয়ে না ধরে মূল্যায়নের মানদন্ডে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। প্রেয়সীর উদ্দেশ্যে তার অনুযোগ:
‘যদি ভুল করে তুমি কাছে আসো
আমাকে পাবেনা তুমি
দেখো তোমার মন
সেখানে কি তুমি আর আমি।’
(ভালবাসার পোয়াতি, পৃষ্টা-১৪)
তরুণ কবি তারুণ্যের প্রভাবে প্রেমের মরুভূমিতে তপ্ত বালিয়াড়ি উড়ালে অথবা গহীন সাগরে প্রবল ঢেউ তুললেও তার অনুভূতি ও চেতনাকে মানব কল্যাণী সুশীল সমাজের অনুসরণীয় হতে দেখি অন্যত্র।
‘সত্য সংগ্রামে ছন্দ এবং মাত্রার গাঁট খুলে
যতোই জানতে চেয়েছি; সে যেন এক অজানা কবিতা
যে জীবন ও তার কলম লড়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত
আমার আগ্রহে আমি লিখছি।’
(একটি দীর্ঘশ্বাসের মৃত্যু, পৃষ্টা-৪৭)
তরুণ কবি তারুণ্যে ভরা মন। জীবন ও যৌবনকে তার কাব্যে উপজিব্য বানালেও মরমী চেতনা মুক্ত নয় তার অন্তর । প্রেমের কাজে ভালবাসার অন্ধকারে প্রেয়সীকে খুঁজে বেড়ালেও ভিন্ন সুর বেজে উঠে তার কন্ঠে।
‘মনে আমার জোয়ার ভাঙ্গে
বুকে উঠে ঢেউ,
দু:খে আমার অন্তর কাঁদে
দেখলো না তো কেউ।’
(আমি এক উত্তরপুুরুষ, পৃষ্টা-১৯)
এখানে কবি রূপের সন্ধানে নয়। নিজেকে বাংলা শ্বাশ্বত ধারায় এগিয়ে নিতে আগ্রহী। এহেন ইচ্ছা তার সন্ধানী মনের ব্যর্থতার প্রকাশ না অনন্ত কামনার আভাষ বলা মুস্কিল। এখনও তিনি বিরাগী মন নিয়ে তার কাব্যের জগতে বিচরণশীল।
‘তোমার নামে সঁপি মন
তনু আর তনাই, জনমভর
দিবা নিশি খুঁজে বেড়াই।
(আমি এক উত্তরপুুরুষ, পৃষ্টা-১১)
তরুণ কবি ওয়ালি মাহমুদ বাংলা কাব্যের এক বলিষ্ট উত্তরাধিকারকে তার কাব্যে অগ্রসর করার প্রয়াসে লিপ্ত। তিনি নিজেও একটি সচেতন উত্তরাধিকারের উত্তরপুরুষ। বাংলাদেশের এক প্রথিতযশা কথাশিল্পী আকাদ্দস সিরাজুল ইসলামের দৌহিত্র কবি ওয়ালি মাহমুদ। কাব্যের ভূবনে পদযাত্রা অব্যাহত রাখলে একজন সৃজনশীল কবি হিসেবে ভবিষ্যতে খ্যাতির আসন চড়ার সম্ভাবনা আছে। তার ভাষা ও শব্দচয়ন সুশীল ও সুরুচির পরিচায়ক। বাচনশৈলী ও প্রকাশভঙ্গি আকর্ষনীয়। এ পর্যন্ত তার চারখানা কবিতা গ্রন্থ ‘যৈবতী শোন’(১৯৯৯), ‘ভালবাসার পোয়াতি’ (১৯৯৯), ‘একটি দীর্ঘশ্বাসের মৃত্যু’ (২০০১), ‘আমি এক উত্তরপুরুষ’ (২০০২) প্রকাশিত হয়েছে। সবগুলো কাব্যগ্রন্থ একুশের বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত এবং পাঠক আকৃষ্ট।
‘একটি দীর্ঘশ্বাসের মৃত্যু’ এবং ‘আমি এক উত্তরপুরুষ’ কাব্যের ইংরেজী অনুবাদও সংযুক্ত। অনুবাদক লেখক স্বয়ং। তাতে লেখকের অতিরিক্ত যোগ্যতার প্রকাশ। আমরা সিলেটের সম্ভাবনাময় এ তরুণ কবির উজ্জ্বল ভবিষ্যত ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।
দ্র: আলোচনাটি ২৯ সেপেটম্বর, ২০০২ ‘দৈনিক সিলেটের ডাক’ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।